বারান্দা

মৌসুমী মুখোপাধ্যায়

বারান্দা আমার বরাবরই একটা দূর্বল জায়গা। নিজের সাথে কোথাও এক করে দেখতে পারতাম। তবে শর্ত শুধু একটাই, যে বারান্দার শুধু একটা পিঠ থাকবে, আর তিন দিক থাকবে খোলা বাহুর মতো, দু-জোড়া চোখ থাকবে আঁকা। সেখানে আকাশ ঢুকবে কালো মেঘেদের সাথে করে বৃষ্টি ভেজাতে তোলপাড়। ঐ বারান্দাটা, আমার ছিল তাই, না থাকার দুঃখ অযথা করিনি কখনো। আর ছিল একটা পেল্লাই কালো মোজাইকের থাম, অকারণ লজ্জা পাওয়ার ছুতোয় আমাকে আড়াল করে রাখত। ওর সাথে আমার আত্মিক সম্পর্ক, কতো কথা রাখা থাকত বুক জুড়ে।

তখন বয়স সাত নয়তো আট যৌথ পরিবারে আমরা দুই বোন, দুজন তুতো দাদা দিদির সান্নিধ্যও ছিল বটে। বাড়ীর পাশে একটা বাড়ী ডিঙোলেই পর পর দুটো বাড়ীতে দুর্গাপূজো হত, দুই চক্রবর্তী বাড়ী, বলা যতে পারে বেশ ধুমধাম করেই। আমার বারান্দায় আকাশ জুড়ে তখন ঝকঝকে নীল, বাবা বলতেন, "কেমন ছেঁড়া ছেঁড়া সাদা মেঘ দেখেছিস; শরৎকালে এমনটাই হয়," বাবা আমাদের শরতের কবিতা পড়ে শোনাতেন। আর তার সাথে চারপাশে কেমন এক আনন্দ মাখানো রোদ কি যেন একটা মনের মধ্যে হত, কিন্তু বুঝতে পারতাম না। তাকিয়ে দেখতাম আমার বারান্দায় শরতের আকাশ ঢুকে পড়েছে তার অপরূপ সম্ভারে। রোদ যেন সাদা আলো।

আমাদের বাড়ীর উল্টো দিকে রঞ্জুদা-দের বাড়ীর গাড়ী বারান্দার পাশটা জুড়ে এক প্রকান্ড শিউলি গাছ, ঐ সময় ভরে উঠত তার শরীর জুড়ে ঝাঁক ঝাঁক শিউলির পসরা, গাছ তলায় বিছনো শরৎ ফুলের বিছানা সাদায় সাদা হয়ে থাকত, মন করতো হাত ছুঁয়ে একবার দেখি, তবে বাড়ী থেকে সে অনুমতি মিলত না ।একদিন বাবা যখন কাজের সুত্রে বাড়ীর বাইরে, তখন অনেক বায়না করে মায়ের কাছ থেকে ছাড় পেয়েছিলাম শিউলি কুড়োবার, সে কি অসম্ভব অনুভূতি, এতো... নরম; তার স্পর্শ আমি যেন আজও পাই। তখন আর অঙ্কের খাতায় মন বসত না, চারদিকে কেমন একটা আগমনী থৈ থৈ গন্ধ, নতুন কিছু আসার গন্ধ।

দক্ষিণ কোলকাতায় ছিল আমাদের আদি বাস। পাড়া জুড়ে চারটে বারোয়ারি, আর দুটো বাড়ীর পূজো, এই ছিল সর্বমোট। সময়টা ছিল সত্তরের দশক। চক্রবর্তী বাড়ী থেকে সন্তুদা প্রত্যেক বাড়ী বাড়ী গিয়ে পুজোয় আসবার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়ে যেত। ওদের বাড়ীতে মহালয়ার পরদিন থেকেই আগমনীর গান ভেসে আসত কেমন যেন বাতাসে মিশে থাকত, তখন এটুকুই বুঝতাম বাবার চেনানো শরতের হাওয়া কেমন সুরেলা, আর পুজোর পাঁচ দিন জুড়ে সারা সন্ধ্যে শিল্পীরা আসতেন মায়ের গানের আসর বসতো প্রতিমার সামনে, চলত অনেক রাত পর্যন্ত। মায়ের হাত ধরে যেতাম পাশটি ঘেঁষে বসে অবাক হতাম, কোন্ স্বপ্নে থাকতাম কে জানে!

মহালয়ার দিন খুব ভোরে বাবা উঠে পড়তেন, আমাদের কেও ঘুম থেকে উঠে পড়তে হত, দেখতাম সারা বাড়ীতে আলো জ্বলছে মা ভেজা চুলে প্রদীপ জ্বালিয়ে, বাড়ীর সবখানটা জুড়ে শুধু ধূপের গন্ধ, আর রেডিওতে বাজছে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের উদাত্ত কন্ঠে মহিষাসুরমর্দিনী। আমি একবার ছুট্টে বারান্দায় যেতাম পাশাপাশি সব বাড়ী থেকে মহালয়ার সুর ভেসে আসত কেমন যেন বাড়ীর সামনের পথ-বাতাস গম্ গম্ করত; দেখতাম, আমার বারান্দা আবিষ্ট তখন আগমনীর সুরে।

পুজোয় দুটো জামা হত তখন, তবে দু-বোনের একই ছিট কাপড়ের জামা, স্থানীয় দোকান থেকে কখনো সেলাই হয়ে আসত, আবার কখনো বাবা কিনে আনতেন, সেখানে আমাদের ব্যাক্তিগত পছন্দ কখনোই গুরুত্ব পেত না, নতুন জুতো বলতে শুধুই বাটা-র জুতো, তা সে পছন্দ হোক বা না হোক। সমস্যা হত একই রকম জামা নিয়ে, কোথায় যেন কানে এসেছিল স্কুল ইউনিফর্ম, নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া করে নিতাম দুই বোনে কখনোই এক জামা পড়ে বেরোবো না, এই নিয়ে বিস্তর খুনসুটি হত দিনভর, তারই মধ্যে যে জামাটা বেশী পছন্দ হত সারাদিনে অনেকবার ঘুরে ফিরে পড়ে দেখতাম, কখনো কখনো পাশে রেখেই ঘুমিয়ে পড়তাম।

বাবার সাথেই ঠাকুর দেখতে বেরোতাম আমরা সকলে, ছোট বেলার কথা আলাদা করে পাশে রাখলেও বড়ো বয়সেও আমরা দু-বোনে কখনো একলা বা বন্ধুদের সাথে ঠাকুর দেখতে যাবার অনুমতি পাইনি। সে চল্, আমাদের বাড়ীর মেয়েদের ছিল না।

সপ্তমী পুজোর দিন কলা বউ স্নানে যেত, মা-কে দেখতাম খুব ভোরে উঠে সেই অন্ধকার থাকতে বাড়ীর প্রতিটি দরজার মাথায় চন্দন আর সিঁদুরের ফোঁটা দিতেন, হাতের থালায় জ্বলত প্রদীপ। আমি মায়ের পাশটা জুড়ে সঙ্গ দিয়ে যেতাম বিস্ময় চোখে।

অষ্টমীর পূজো দিয়ে বাড়ী এসে ভেজানো মুগ ডাল সাথে আদা কুচি খেয়ে শুরু হত বাড়ীর নিয়ম। সেদিনই মা বাড়ীতে নারকেল কুড়ে ক্ষীর আর চিনি দিয়ে পাক করে সন্দেশ বানাতেন, আমাদেরকেও মাটির ছাঁচেতে ফেলে সন্দেশ বানানোর কাজে হাত লাগাতে হত।

এমন ভাবেই কেটে যেত পুজোর পাঁচটা দিন। বাবা প্রতি বছর আনন্দমেলা পূজা বার্ষিকী আনতেন, তার রঙীন প্রচ্ছদে আঁকা থাকত ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের নানা ভঙ্গি, বার বার হাত বুলিয়ে দিনে অনেকবার দেখে যেতাম, স্বপ্নেও দেখতাম সে প্রচ্ছদ। দশমী সেজে উঠত নানা রকম ঘরে তৈরী মিষ্টি, কুচো নিমকি আর ঘুগনি দিয়ে। সন্ধ্যেবেলায় বাবা আমাদের সবাইকে সামনে বসাতেন, আলতাপাতা ভেজানো লাল কালিতে কলম ডুবিয়ে একশো আট বার মা দূর্গার নাম লিখতে হত, তারপর শুরু হত বাড়ীর বড়োদেরকে দশমীর প্রণাম।

দশমীর বিষাদের সুর ঐ বয়সে সেভাবে মনে দাগ কাটত না, শুধু চারদিকে পূজো ঘিরে যে বেশ কিছু নতুন নতুন গন্ধ, কঠোর শাসনেও বাঁধন ছেঁড়া যে আনন্দ তা, হঠাৎ-ই কর্পূরের মতো উবে যেত, সেটাই ছিল আমার একান্ত বিষাদ। ঘুমের ঘোরেও ঢাকির কাটির তাল আর ধুনুচি নাচের ঘোর লেগে থাকত। সেই মন খারাপের বিষাদ আমার বারান্দার দুজোড়া চোখেও আঁকা হত, সে শুধু আমিই দেখতে পেতাম।

পূজোর ছুটি শেষে স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষার কথা তখন কোথায় হারিয়ে ফেলেছি শারদানন্দে। স্কুলে পুজোর ছুটি হত বেশ লম্বা, একেবারে ভাইফোঁটা শেষে স্কুল খুলত। দশমী শেষে মা দূর্গা বিদায় নিতেন পড়ে থাকত একা শরৎ শুভ্রমেঘের স্তূপ চকচকে গাঢ় নীল সজীবতায়, থাকতাম ছোট্ট টেপ-ফ্রকে আমি, আমার বারান্দা আর আমার চারপাশ।

ফেসবুক মন্তব্য