রবীন্দ্রনাথ ও জাহান-আরার পৃথিবী এবং ভেলভেট পোকা

সুপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়

সে এক বিকেলবেলা ছিলো। মাঠের কোণায় ছিলো একটা বুড়ো আমগাছ, যার পাশ দিয়ে স্কুল যেতো ছেলেরা। তাই প্রাকবসন্তেই ঢিল মেরে আমের বোল ফেলে দেওয়ার উল্লাস ও উত্তেজনায় সে বেচারা গাছটা আম ধরাতেই পারেনি। পাশে মাঠটা এতো বড়ো যে প্রমাণসাইজ একখানা ফুটবল মাঠ থাকার পাশাপাশি আরো চার জায়গায় চারটে দল চার রকম খেলা খেলতে পারতো।

সে এক বিকেলবেলা ছিলো। সে বছর পাহারা দেওয়া হয়েছিলো যেন কেউ বোউল না ভেঙে দেয়। ফলে গাছটা আম ধরিয়েছিলো অজস্র। এক দামাল ঝড়জলের পর যখন মাঠময় পাগলাটে আলো, তখন সেই গাছের তলায় পড়ে থাকা কচি কুসি, ডাঁসা ও একটা আধটা আধভাঙা আম পরস্পরের উল্লাস ও ঈর্ষার কারণ হয়ে ওঠে--- সেটা এই পৃথিবী না। রবীন্দ্রনাথ, আইনস্টাইন, জাহান-আরা শুধু নয়, তৈমুর এবং ঠগীদের বাসভূমি হয়ে এখন গণপ্রজাতন্ত্রী ভারতকে কেন্দ্র করে যে এই পৃথিবী, সেটা সে পৃথিবী নয়। সে বিকেলের পৃথিবী একটা কাল্পনিক পৃথিবী। নেমে যাওয়া মেঘের ওপর দিয়ে যে হলদেটে আলো তাতে প্রতিদিনকার মাঠ সেদিন নতুন কোনও জায়গা যেন। পরের দিন সকালে সেই মাঠের কোনও এক কোণায় ঘাসে বালিতে লাল ভেলভেট পোকা।

সে এক বিকেলবেলা ছিলো। খাঁচায় মানায় না মহারাজা বাঘকে। দেশলাইয়ের বাক্সেই বা কেন ভেলভেটপোকা? ছেলেখেলা এ প্রশ্ন জানেনা, ছোটবেলায় পৃথিবী খেলার পৃথিবী।

সেসব বিকেলবেলার মোচদাড়ি গজায়। কচি রোমে তামাকপোড়া ধোঁওয়া, ভেলভেট পোকা মাঠের যে প্রান্তে ছিলো, সেখানে বর্ষার শুকনো বিকেলে কয়েকটি ফুর্তিময় কুকুর, তাড়া খাওয়া গরু, বাচ্চারা বালিময় উৎসব, শর্ট ক্রিকেট, চটি দিয়ে পায়ের মাপে বানানো গোলপোস্ট। মাঠের কৈশোর তখন গ্যালারিতে, ধোঁওয়াময় রোমাঞ্চ, টিউশনের (ট্যুইশন নয় কিন্তু) ব্যাচের বিশেষ মেয়েটি বাতাসে মদ মিশিয়ে রাখে। তারও পর, তারও পর, তারও পর, ডাইনোসর থেকে বিবর্তিত হতে হতে বিকেলের আকাশ সেই প্রাগৈতিহাসিক আলো ধরে রাখে। অথচ মেঘ প্রত্যেকদিন নতুন।

শুধু খবর নেওয়া হয় না ভেলভেট পোকারা কোথায় গেল। তারা আর আছে নাকি বিলীন হয়েই গেল, তারও খোঁজ নেওয়া হয় না। মনে পড়লে মনে হয়, দেখতে পাই না অনেকদিন। ছোটবেলার কোনো বন্ধু, যার মৃত্যুসংবাদ পাইনি, সে যেমন বেঁচে আছে কোথাও বলে জানি, ভেলভেট পোকাদের ক্ষেত্রেও খোঁজ নিই না।

বিকেলবেলাগুলিতে কোথাও দুপুর, কোথাও ভোর, কোথাও মধ্যাহ্ন, কোথাও সায়াহ্ন চমকে যায়। মেঘ সাদা পাটকিলে ও লাল। অনন্ত এমনই অসীম যে তাতে কার্বন ডাই অক্সাইড নগণ্য থেকে যায়। প্রকৃতিতে মায়ালোকের মতো আলো। একলা বিকেলে, সুদৃশ্য মায়াবী মফঃস্সল শহরে সিগারেট হাতে নিয়ে হাঁটি। রঙ, রেখা, ডাইনোসর ও ভেলভেট পোকা আমার পশ্চাৎপটে রবীন্দ্রনাথ ও জাহান আরার পৃথিবীকে টাঙিয়ে রাখে---

ফেসবুক মন্তব্য