খেলারই ঢেউ জলেস্থলে

ঋকপর্ণা ভট্টাচার্য

খেলতে খেলতেই যাদের এতগুলো বছর চলে যায় তাদের কাছে মধ্যবয়সে এসে যদি খেলার স্মৃতি বা স্মৃতির খেলায় অবগাহন করতে বলে কেউ, তাও আরেকটা খেলা বলেই প্রতীয়মান হয়। তবে মজার কথা, হাতে মোবাইল না থাকা প্রজন্মের কাছে দশ বিশ তিরিশ বছরের ফারাকটা তেমন কিছু না। যে খেলোয়াড়রা এই মাঠে, আজ রেফারি হয়ে সব খেলোয়াড়দের ডাক দিলেন এই -"খেলা খেলা ছোটবেলা ফিরে পাওয়া"- লেখাটার বিষয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে, তাঁরাও আমার সমবয়সী বা সমযুগীয়। কেমন যেন বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছে "আমাদের ছোটবেলা" বলতে যে খেলোয়াড়দের কথা এখানে আসবে তারা সকলেই ন্যূনতম তিরিশ এবং অনূর্ধ ষাট। অর্থাৎ যাঁরা পথ চলতে চলতে বেশ শেষের দিকে এসে হঠাৎ এই মুঠোফোন নামক খেলার যন্ত্রটি কুড়িয়ে পেলেন।

বাস্তবিকই মুঠোফোনবিহীন সে ছোটবেলা আমাদের অন্যরকম ছিলো। একাকীত্ব তখনও এতো নির্মমভাবে আমাদের দ্বাররুদ্ধ করতে শেখেনি। তাই মাঠ কথাটা, তেপান্তর কথাটা,অসীম কথাটা, দলবেঁধে হুল্লোড় কথাটা আমাদের অভিধানের পাতায় পাতায় খেলেই বেড়াতো। খেলা কথাটার ভিতর ছিলো লিঙ্গ, ছিলো বচন, ছিলো পুরুষও। আবার খেলা ছিলো কখনও কখনও অব্যয়, কোনও বিভাজনেই যার কোনও পরিবর্তন হতো না। এই সামগ্রিকতাই ছিলো আমাদের খেলাধূলোর আসল স্তম্ভ।

বেশ মনে পড়ে ধরাধরি, লুকোচুরি বা কুমিরডাঙা দিয়েই অন্য অনেকের মতোই আমারও ছোটবেলা শুরু হয়েছিলো। তারপর এলো নামপাতাপাতি, গজি, বৌবসন্তী। সেটা ছিলো প্রায় পাড়া তোলপাড়িয়ে খেলার যুগ। প্রতিটি বিকেলই বাসন্তী হতো। এমনকি বর্ষার ম্লান সূর্যও কেমন যেন অনায়াসে চনমনে করে তুলতো আমাদের কার্নিশে ঝুলে থাকা সুপুরি গাছের শুকনো পাতার যানবাহনগুলিকে সাড়ে চারটে বাজলেই । আমাদের সাথে ওরাও খেলবে বৈকি। একজন বসবে, বাকিরা টানবে। ঘষতে ঘষতে এবং যাত্রীবদল হতে হতে গাঢ় হয়ে আসবে সন্ধ্যা। মোটামুটি আমাদের বাড়ির মতো একটি দুটি বাড়ি ছাড়া সব বাড়িতেই শাঁখের ফুঁ ছিলো বড়ো অভিভাবক। তাকে অস্বীকার করার সাহস বড়ো একটা দেখানোর চল তখনও ছিলোনা।

পুতুলখেলা ছিলো না এমন না, তবে সেটা ঠিক ততো উজ্জ্বল ছিলো না আমাদের আগের প্রজন্মের মতো। পুতুলের বিয়েটিয়ে আমরা তেমন দিয়েছি বলে মনে পড়েনা, যদিও পুতুল ব্যাপারটা আদরের এবং পুরোনো টিনের সুটকেসে পুতুলের আসবাবপত্রখচিত সংসারটি তখনও আমাদের পজেশনে ছিলো আধুনিকতার হাওয়া মেখেও। তবে অস্বীকার করবো না,একটা অন্য ধরণের পুতুল খেলা আমরাও খেলেছি। কতো সহজেই দেখতাম আমাদের বই এর পাতার হিরোরা অনায়াসে আমাদের পুতুল হয়ে উঠতেন কল্পনার জগৎ থেকে বাস্তবে এসে। কখনও সেটি ফেলুদা, কখনও গোয়েন্দা গণ্ডালু কখনও বা পাভেল বা গোরা। পরে সময়ের সাথে সাথে এই চরিত্রগুলো বদলেছে বটে, কিন্তু তাদের উৎস একই থেকে গেছে। এমনকি কলেজ জীবনে যখন ফিদেল বা চে, কিম্বা উষ্ণতম স্লোগান গুলি নিয়ে পথে নামার দিনেও আসলে আমরা একটা খেলাই খেলে গেছি -- গভীর আদর্শ নিয়ে, সৎ ভাবে খেলে চলা সেই খেলাগুলিও আজ নস্টালজিক করছে ভীষণ বিশেষত এই মুহূর্তে।

আর ছিলো বাড়ি বাড়ি, স্কুল স্কুল প্রভৃতি প্রাতিষ্ঠানিক খেলাধূলো। বলাই বাহুল্য বর বৌ বা ডাক্তার ডাক্তার খেলাও ছিলো। তবে সেগুলোকে চোখ পাকিয়ে--"ইশ,কি অসভ্যতা" বলবার অভ্যাসও খুব চটপট রপ্ত করে ফেলেছিলাম।

এরপর এলো কাবাডি। আমাদের তখন মাধ্যমিকে ওয়র্ক এডুকেশনে ওটা আবশ্যিক থাকতো। কাজেই ঠিক বয়ঃসন্ধি পেরিয়েই পেয়ে গেলাম তাকে। বলাইবাহুল্য ততোদিনে আমাদের কৈশোর রজঃস্বলা হয়েছে। আর তাই মফস্সলের খেলাধুলোয় এসে গেছে লিঙ্গভেদের ঝোড়ো হাওয়া। সেই হাওয়ায় হু হু করে ঢুকে পড়ছে ফুটবল বনাম কাবাডি, ক্রিকেট বনাম ব্যাডমিন্টন, ব্লু ফিল্ম বনাম পিরিয়ডস। আমরা ঝগড়া করছি। কথা বলা বন্ধ করছি অথচ তাদের কথাই সবথেকে বেশি বলছি যাদের আমরা "দুচক্ষে দেখতে পারি না"! আমাদের সন্ধ্যা নামছে একদল কিশোরীর গোল হয়ে, হাততালি দিয়ে তালবদ্ধ ছড়ার মাধ্যমে---

"অলিম্পিকা সেম সেম সিস্টার।
বন্ধুগণ,
তোমরা কি ভাই
বলতে পারো
কয়েকটি
ফুলের নাম
যেমন ধরো
হাসনু হানা
বি কুইক"---
মা কাকিমা পিসি মাসিদের গলার স্বর---"আর কতোক্ষণ চলবে খেলা? মাঝরাত অবধি আড্ডা?"
এটা হতে পারে এডুকেশনাল খেলা। ঠিক এমনই আরেকটা খেলা ভীষণ আদরের ছিলো আমাদের স্কুলজীবনের অফ পিরিয়ডে। ম্যাপ ম্যাপ খেলা। চণ্ডীচরণের মানচিত্র বইগুলি ক্লাসে নিয়ে যাওয়া আবশ্যিক ছিলো আমাদের স্কুলে। ফলে মনে হোতো আসলে ব্যাগে নিয়ে নিয়েছি আমার পালতুলে দেওয়া, বাঁধন না মানা ডিঙিনৌকোটি। একদল কলম্বাস ভেসে পড়বো নতুনের অন্বেষণে, সুযোগ পেলেই। এও এক অভিযান বৈকি। ফার্স্ট হবার নয়, সবাই মিলে খুঁজতে থাকা এবং পেলে একটা নতুন কল্পনার নাম দেওয়ার।

নাম দিতে তখন আমরা বদ্ধপরিকর। নামপাতাপাতি খেলা, যেটাকে ছেড়ে এসেছি কয়েকবছর আগে, সেটাই যেন নতুন চেহারা নিলো এই সময় থেকে আবার। ভাইবোনবন্ধুদের নতুন নামে ডেকে ডেকে যেন আর আশ মেটে না। শিক্ষকরাও বাদ পড়েন না এই নেশা থেকে। এবং অবশেষে এলো আরেকটি খেলা---সম্পর্কের নাম দেওয়া। হ্যাঁ। ইতিমধ্যে প্রেম এসে গেছে আমাদের অনেকের জীবনেই এক নতুন খেলনার শিহরণ নিয়ে। অপেক্ষা, চিঠি লেখা, দুজনের নাম নিয়ে কাটাকুটি করে সম্পর্কটা কোন দিকে গড়াবে এই নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা এবং গবেষণা শুরু হচ্ছে একটু একটু করে। তবে সেটা তখনও "দেখা করা" নামক ভীষণ দুঃসাহসী অভিযানের চেহারা নিয়ে আসেনি বড়ো একটা। আর ছোঁয়া বা সিনেমা বা রেস্টুরেন্ট? ওরে বাবা! ওসব আমাদের জন্য নয়!

নৈর্ব্যক্তিক থাকতে যতোই চেষ্টা করিনা কেন, আমাদের মধ্যে আমিও তো থাকে। প্রবল তার অধিকারবোধ। তাই সে এই মুহূর্তে সজল চোখে নালিশ করে বসলো--"বললে না তো,আমার কথাটা একবারও"। অগত্যা একটা দুটো খেলার কথা বলতেই হবে যেগুলো একান্ত আমার।

একটা হলো একা একা গল্প করা খেলা। শুনলে মনে হবে অনেকটা ব্রাউনিং এর ড্রামাটিক মনোলোগ। আমি একজন অদৃশ্য বান্ধবীর সাথে শেয়ার করে যাচ্ছি আমার ইচ্ছাপত্রটি, যা আসলে কখনও ঘটেনি, অথচ আমার কাছে তা সদ্যঘটমান অতীত কিম্বা অদূরবর্তী ভবিষ্যত। কি ভীষণ রোমাঞ্চকর অথবা "গপ্পে গোরু গাছে ওঠা " টাইপ সেই সব পরিকল্পনা! যেমন ধরা যাক, আমার দক্ষিণ মেরূ যাত্রা অথবা আমার বিবাহ পরবর্তী পরিবারের রূপকথা অথবা কোনও বন্ধু বা আমার ভালোবাসার মানুষটি যে কিন্তু অনাগত অথবা বর্তমান বা অতীত বা ভবিষ্যতে আসতে পারে,তার সাথে হওয়া মান অভিমান, বা নিছক কোনও আড্ডা বা বিয়েবাড়ির পরিকল্পনা --এমনি আরো কতো কি যে! এইসব ড্রামাটিক মনোলোগ অধিকাংশ সময়েই খুব লজ্জা পেয়ে থামতো। একা একা পায়চারি করতে করতে হাসতে হাসতে কথা বলছি।হঠাৎ বাবার প্রবেশ---। তবে বাবা কোনও মূর্তিমান বিপদ না, বরং ঐ কল্পনার রাজ্যেরই আরেক কমরেড। শুধু দেখে মুচকি হেসে বলে উঠবে, "একা একা বকবক করছিস ফের!" অনন্ত প্রশ্রয় সেই হাসিতে।

বাবার কথা উঠতেই আরেকটা খেলার কথা মনে পড়ে গেলো। সেটা বাবা আর আমাদের দুই বোনের খেলা। প্যাঁক প্যাঁক করে হাসের মতো ইংরিজি বলা, এবং দৌড়ে গিয়ে ড্যানিয়েল জোন্সের প্রোনাউন্সিং ডিকশনারি দেখার অহেতুক প্রয়াস! এই খেলাটা আমাদের কারুর জ্বর হলেই হতো। বিশেষ করে বাবার, কারণ এক পৃথিবী কাজ সেরে নিজে অসুস্থ না হলে, আমাদের জন্য বাবার সময় থাকতো আর কোথায়!

কল্পনার প্রসঙ্গে আরেকটা খেলাও না বললে অন্যায় হবে। তা হোলো জ্যোৎস্নায় ভেজার খেলা। গোটা ছাদটাতে আমি একা। অনতি দূরে পথ। সেই পথ পেরিয়ে হাসপাতাল মাঠ। সেখানে কোনও এক স্বপ্নের নীলকমল,পাশে তার পক্ষীরাজ। মাঝে অনন্ত সময়। এবং নীরবতা। একটু একটু করে পালটে যাচ্ছে চারপাশ। রাস্তাটা সমুদ্র হয়ে যাচ্ছে। দূরে নিভু নিভু সিগারেট যেন এক একটা বাতিঘর। অখণ্ড বিরহ এবং অনন্ত সময়। আমি একটা সাদা পোশাকের নাম। আমি একটা দিগন্তরেখা ছুঁয়ে আসা হলুদ দ্বীপ। ভাসছি ভাসছি। চলে যাচ্ছি যে কোনও দুদিকে। অতীত ভবিষ্যত। হঠাৎ চমকে উঠলাম। কে আমি? আমার নাম ? আমার ঠিকানা? এটা কোন সময়? এই খেলারও একটা শেষ ছিলো বৈকি! বাবার কন্ঠস্বরে চোখের জল বা একলা হওয়ার ভয়বিহ্বলতা থেকে চমকে ওঠা---"কিরে, ফের দাঁড়ে ঝুলছিস?"

আমরা দাঁড়ে ঝুলতাম। মানে ছাদে। আমাদের ছাদকথা নিয়েই হয়তো এক হাজারটা মহাকাব্য লেখা হতে পারতো। আমরা জ্যোৎস্নার জলে স্নান করতাম। আমাদের এ সবই ছিলো খেলা। আমাদের খেলাঘর এর কোনও দেওয়াল ছিলো না। তাই আজও আকাশে চাঁদ এবং মননে মাধ্বী নিয়ে অন্যমনস্কতায় যখন ভাত লেগে যায় হাঁড়িটার তলায়, কিম্বা একপয়সা দু পয়সা কাচানো শাড়ির ফাঁকে লুকিয়ে রেখে ভুলে যাই এবং হঠাৎ লুকোচুরি খেলতে খেলতে শ্বাসরুদ্ধ করে বুঝতে পারি তেমন তেমন বাতাস পেলে আজও গায়ে কাঁটা দেয় অচিরেই তখন দ্বৈতকন্ঠে দুজনেই বলে উঠি---"এ আমাদের খেলনাবাটির সংসার"। এভাবেই কখন যে খেলা আর সংসার, খেলা আর গান, খেলা আর লেখাপড়া, খেলা আর প্রফেশন একাকার হয়ে যেতো, যায় এখনও টেরই পাইনা সেদিনও পেতাম যেমন। "কি খেলা যে খেলবো কখন/ভাবি বসে সেই কথাটাই"---এটাই ছিলো বোধহয় আমাদের অনন্ত ছোটবেলার যাত্রা শুরুর গল্প। সেই খেলা আজও চলছে নিরন্তর। তাই যখনই অমন কোনও দেওয়ালহীন মাঠ দেখি, অমন কোনও জ্যোৎস্নাভেজা ক্ষণ দেখি, অমন কোনও বাদলধারা মন দেখি, আমি একছুট্টে ফিরে যাই আবার আমার একলা হওয়া ড্রামাটিক মনোলোগগুলিকে জড়ো করে---কাল্পনিক স্বপনতরীর সেই সে নেয়ের সাথে, যার সাথে আমার অসীম খেলার সম্পর্ক।

ফেসবুক মন্তব্য