এক কন্যে রাঁধেন বাড়েন, এক কন্যে ...

মধুছন্দা মিত্র ঘোষ

কন্যেটির গেরস্তপোষ সংসারের এক ঘরে পা তো অন্য পা টি তার মেয়েবেলার স্মৃতিকাতরতায়। যেন দুই পৃথক সত্তা, পৃথক কন্যা। দুই কন্যার মধ্যে অদৃশ্য ফাটল। অথচ যা লাফ দিয়ে পেরোনোই যায়, যখন খুশি,ইচ্ছে মতো। এমন কিছুতো নয়, কোনও মায়াজালও নেই। তবু কখনও একাকী মনে হাজির হয় সেই কন্যা। ফেলে আসা মেয়েবেলা। খুব জমিয়ে ভাব করে সে।
এক কন্যার গেরস্থালী খুঁটিনাটি সামলানো। অন্য কন্যাটি তখন বালিকাবেলার এক নিশ্চিন্ত ভ্রমণে। উত্তর ২৪ পরগনায় পিতামহের ভিটেতে অ্যানুয়াল পরীক্ষার পর ছুটিতে বেড়াতে গিয়ে সমবয়সী স্থানীয় বালিকাদের সঙ্গে শিখে এলো ‘রস-কস-সিঙ্গারা-বুলবুল ি-মস্তক’ নামের এক অদ্ভুত খেলা। একটা শব্দের সঙ্গে অন্য শব্দের কোনও মিলবন্ধন নেই। আজগুবি সেই খেলায় মাতোয়ারা কয়েকটা বিকেল। বাড়ি ফিরে আওড়াতাম ওই পাঁচটি শব্দ। মায়ের সেকি বকুনি, “কোথা থেকে এইসব ছাইপাঁশ শিখে এসেছো?” মা নাক সিঁটকায়।
স্কুলে ‘রুমাল চোর’ খেলতে গিয়ে পিঠে এতবার ‘ধাপ্পা’ খেয়েছি, কহতব্য নয়। আমাদের স্কুলে খেলাধুলো সেভাবে না হলেও ছিল পি টি’র ক্লাস। স্কুলমাঠে আমাদের সুশৃঙ্খলভাবে করতে হতো। পিটি ম্যামের, “এক দো তিন চার – আগে বাড়... পাঁচ ছে – ডাইনা মুড়... সাত আট – বাঁয়ে মুড়... পিছে কদম-- ন দশ এগারা বারা...” এরকম আধঘণ্টা চলত। তারপরই, “সা ব ধা ন... বি শ্রা ম...”। আমরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচতাম। আবার প্রজাতন্ত্র ও স্বাধীনতাদিবসের কুচকাওয়াজে আমরা স্কুলছাত্রীরা পরিদর্শন করতাম, কখনও ব্রতচারীর পাঠ “কাইয়ে ধান খাইলো রে...” কখনও সাঁওতালি বা ঝুমুর নৃত্যে পরস্পর কোমর জড়াজড়ি করে, “ভাদরো আশ্বিনও মাসে ভ্রমর বসে কাঁচা বাঁশে”। আমরা যারা পুরুষের ভূমিকায়, তাদের আইব্রাও পেন্সিল দিয়ে গোঁফ ও জুলপি এঁকে দেওয়া হতো। অনাবিল মজা।
এমন সব মন জুড়ানো সোনালী শৈশবের হদিশ হাতরিয়ে তাৎক্ষণিক ডুবে যেতে হয় রোজনামচা জীবনের গতানুগতিকতায়। তবু এক কন্যার সঙ্গে অন্য কন্যাটির দেখা হয় যত্র তত্র। কখনও ঘরে, কখনও বাইরে। মেট্রো রেলের কামরায়, মিনিবাসে ড্রাইভারের খোপের বসার জায়গাটায়, অটোরিকশায়ে গায়ে গা ঘেঁষে বসে পরে সে কন্যে। তুতো ভাইবোনদের সঙ্গে কাগজ-পেন্সিলে ‘ফুল-ফল-দেশ-নাম’ খেলেছি, আবার আনতাকসারিও। স্কুলজীবনে বিকেলে বাড়ির বাইরে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার ব্যাপারে কিঞ্চিত বিধিনিষেধ ছিল। ওইসময় গানের রেওয়াজ নয়তো আঁকা প্র্যাকটিস। জানা হয়নি দরিয়াবান্দা, কুমিরচোর, বুড়িবসন্ত, গোল্লাছুট খেলাগুলো।তবু কখনও বাড়ির ছাতে, “হাতি ঘোড়া পালকি ... জয় কানাইয়া লাল কি” পরস্পর হাতে তালি ও নিজের দুহাতে তালি দিয়ে খেলতাম, তালি মিস হলেই আউট।খেলার আগে গুণতি করতাম “রাম দুই সাড়ে তিন, অমাবস্যা ঘোড়ার ডিম”। কী অদ্ভুত তাই না ? কিংবা “এলাটিং বেলাটিং সইলো ... কিসের খবর আইলো ... রাজামশাই একটি বালিকা চাইল...” ---- তখনও জ্ঞানপাপী মনে প্রশ্ন আসেনি, রাজামশাই কেন বালক চাইলেন না, ‘একটি বালিকা’কেই চাইলেন।
এ কন্যা তার নিজস্ব সংসারে রান্নাবাটি খেলে। অন্যটি ততক্ষণে ফিরে যায় নিপাট শৈশবে। হোমওয়ার্ক শেষে সাপলুডো খেলতে বসে যেই না সাপের মুখে অমনি ভ্যাঁ। আবার মইয়ে চড়ে উঠেই হাততালি দিয়ে কী খিলখিল হাসি। লুডোখেলায় বেজায় ‘চোট্টামি’ করেছি। বাবা মা ইচ্ছেকৃত হেরে আমার আহ্লাদি মুখ দেখতে জিতিয়ে দিতো। পরে একথা ভেবেই চোখে জল। ঘরকন্নার তদারকি করতে করতেই মন পিছিয়ে যায় কিশোরীবেলায়।আমার তখনকার যুবক বাবা ছুটির দুপুরে আমাকে নিয়ে ছাতে ঘুড়ি ওড়াতে যেতেন। আমার সহকর্মীর কাজ, কিছুটা দূরে এসে ঘুড়িটা দুহাতে উড়িয়ে দেওয়া। লাটাই বাবার হাতে। বাবার ঘুড়ি যদি প্রতিবেশীর উড়ন্ত ঘুড়ি কাটতে পেরেছে, চিল চিৎকারে “ভো ক্কা ট্টা...” বলে আমার সেকি উল্লাস ! বাবাদের অফিসার্স ক্লাবের গেটটোগেদারে ‘হাউসি’ খেলার রেওয়াজ ছিল। কী এক দৈববলে সেই গোলাপি-আকাশী-হলুদ রঙা নম্বর লেখা চিরকুট আমি মিলিয়ে ফেলতাম চটজলদি, আর প্রাইজ জুটে যেত। পরে আমি নিজেই বহু অনুষ্ঠানে এই ‘হাউজি’ খেলা পরিচালনা করেছি, নিজের নম্বর কই, মেলেনি। ফি শীত-সন্ধ্যায় ফাঁকা জমিতে নেট লাগিয়ে পাড়ার কাকুদের ব্যাডমিন্টন খেলার আয়োজন চলত। প্রথমে ছোটদের পালা। আমার নিজস্ব র‍্যাকেট, কর্কের বক্স থাকলে কী হবে, কর্ক থেঁতলে ফেলতাম খুব।
এক কন্যা অন্য কন্যার কাছে গচ্ছিত রাখে সেইসব যাপনকথা। সেইসব টুকরো আনন্দসুধা অথবা বিষাদের ঘ্রাণ। তারা পরস্পর পরস্পরের হয়। গলা জড়িয়ে হেসে ওঠে বা ফুঁপিয়ে কাঁদে। এ ওকে যতবারই নাম ধরে ডাকে, প্রতিধ্বনি ফিরে আসে।

ফেসবুক মন্তব্য