খেলা

পার্থ কর

একটা খেলা ছিলো খুব আমাদের। দু'টো দল হতো বুদ্ধিমতী, বুদ্ধিমান ও হাবাগবা মিশিয়ে। দু'দলে দু'জন ক'রে নেতা বা নেত্রী হতো.. তাদের বলা হতো রাজা বা রানী। একটা ফাঁকা জায়গায়, কমবেশি তিরিশ ফুট দূরত্বে দুদিকে দু'টো সমান্তরাল দাগ টেনে দু'দলের নিজেদের সীমানা চিহ্নিত করা হতো.. তারপর মুখোমুখি জায়গা নিয়ে লড়ায়ের পাঁয়তারা কষা শুরু করতাম।

সমান সংখ্যক সদস্য দুই দলেই... খেলার শুরুতে এক দলের রাজা ফুল-ফলের, বা বিভিন্ন আদরের নামে নিজদলের সবার গোপন নাম রাখে। নামেও কত আদর, কত পক্ষপাতিত্ব—
—না আমি গোলাপ হবো..
—না না, হবে না.. আমি মাধবী হবো..
সবচেয়ে ছোট্টটাকে নিয়ে বড় সমস্যা । তাকে না নিলেও হবে না, আবার সময়ে নিজের কোড-নাম ভুলে যাবে... অথবা যেখানে লুকিয়ে থাকার কথা, চুপ থাকার কথা— সেখানে সে হেসে বা কথা ব'লে ফ্যালে !
তখন তার আড়ালে বিপক্ষ দলের রাজা বা রানীকে চোখের ইশারায় বুঝিয়ে দেওয়া হলো 'ও দুধভাত'.. মানে ওর দোষত্রুটি, ভুলঠিক কিছুই জয়পরাজয়ের হিসেবের মধ্যে ধরা হবে না।
যাহোক—
এরপর শুরু হয় বুদ্ধির খেলা।
একজন ক্যাপ্টেন বিপক্ষ দলের যেকোনো একজনের চোখ হাত দিয়ে বন্ধ ক'রে ডাকতে থাকবে ‘আয় রে আমার মাধবী’, ‘আয় রে আমার পদ্ম সোনা'.. তখন সে নাম যার, সে অতি সন্তর্পণে এসে চোখচেপে ধরা খেলোয়াড়ের কপালে আঙুল দিয়ে মৃদু বা জোর টোকা দিয়ে নিজের জায়গায় ফিরে যাবে ।
এইখানেও কত কৌশল.. সবসময় চেষ্টা করা হবে, যথাসম্ভব বিপক্ষ দলের 'দুর্বল' ছেলে বা মেয়েটির চোখ চেপে ধরা, প্রথমদিকেই।
আর ডাকা হবে নিজের চালাক স্যাঙ্গাৎকে ।
তখন কেউ আসযাওয়ার সময় পায়ে অন্য কারও চলার শব্দ নকল করতো, কেউ কাশতো অন্যের মতো ক'রে..
তারপর..
কেউ জোরে ঠোকা দিতো, কেউ আলতো.. কেউ বিলি কেটে দিতো..সবই ভালোবাসামাফিক— এসময় কেউ ক্যাপ্টেনের কথা শুনতাম না ।
তারপর..
খেলোয়াড়ের ফিরে যাওয়া—
সবাই দাগের সীমানায় যেখানে উবু হয়ে বসে থাকবে মাথা নীচু ক'রে.. যাতে মুখের অভিব্যক্তি বিপক্ষের কাছে প্রকাশ না হয় ।
এখানেও কৌশল—
চোখ খুলে দেওয়ামাত্রেই খেলোয়াড় দেখতে পেতো সামনের বিপক্ষ দলের কেউ ছুটে গিয়ে ব'সে পড়ছে, অথবা ইতস্ততঃ এদিকওদিক সন্ত্রস্ত হয়ে তাকাতাকি করছে!
এগুলোই সর্বোচ্চ কৌশল ছিলো.. এখানেই হারজিত ঠিক হয়ে যেতো। যদি যার চোখ চেপে ধরা হয়েছিলো, সে একটু কম কৌশলী হয়, তবে সে তৎক্ষণাৎ ভুল ক'রে বসতো।
কিন্তু টার্গেট বুদ্ধিমতী/-মান হলে বুঝতে পারতো যে—
যে বসে পড়লো বা ছুটে গ্যালো..যেন এইমাত্র কপালে টোকা দিয়ে এখনোও গুছিয়ে বসতে পারেনি.. সে আসল কালপ্রিট নয়!
সে অন্তত তাকে সন্দেহের তালিকার বাইরে রাখতো।
এই কৌশলও বিপক্ষের বোকা ও বুদ্ধিমান সবার কাছে সহজ হয়ে গেলে, গেমপ্ল্যান পাল্টে যেতো।
তখন বুদ্ধি ক'রে আসল লোককে দিয়েই ভুল বোঝানোর কাজটি করা হতো, ফলে বিপক্ষ বোকা বনে যেতো পুরোপুরি। তারা আসল লোকটিকেই সবার আগে সন্দেহভাজন তালিকার বাইরে রেখে দিতো।
তারপর..
সে খুঁজতো..খুঁজতো...
কী খুঁজতো?
খুঁজতো মুখের রেখা..
খুঁজতো অভিব্যক্তি..
যদি কেউ প্রকাশ ক'রে ফ্যালে..
যদি কেউ গোপন ভালোবাসায় বুঝিয়ে দ্যায়..
আমিই সে.. ওরে আমিই সে..
হৃদয়ের সংগোপনের একচিলতে ভালোবাসা— আমিই সে...
তারপর..
সঠিক বলতে পারলে সে বা তার দলের রাজা, যার লাফ বেশি, সে সামনের দিকে একলাফ দিয়ে এগিয়ে যাবে, এবং সেই পর্যন্ত জমি সে পক্ষের দখলে চলে আসবে।
না পারলে যে টোকা দিয়েছে তার দল এগিয়ে যাবে একইরকম লাফ দিয়ে।
এবার পালা বিপক্ষের রাজার.. একই পদ্ধতি ।
এভাবে লাফ দিয়ে মধ্যবর্তী সীমানা অতিক্রম করে প্রতিপক্ষের জমি দখল না করা পর্যন্ত খেলা চলতে থাকবে—
তারপর..
ডাক চলবে,
আয়তো আমার কলকে রানী
আয়তো আমার গাঁদাফুল
আয়তো সোহাগ আমলকী...
তারপর একসময় দু'দল মুখোমুখি হয়ে যাবে এগোতে এগোতে ।
তারপর...
যে দল বেশী জায়গা দখল করবে, তারাই জয়ী ।
সফল দলের রাজা পদ্মাসন ক'রে বসবে আর প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়রা হাতের দোলায় পালকির মতো ক'রে তাকে সসম্মানে ওই সীমানা পার ক'রে বিজিতের সীমানায় পৌঁছে দেবে ।

বড্ডো বুদ্ধির খেলা ছিলো..মাথা খাটানোর জায়গা ছিলো.. জায়গা ছিলো আদর দেখানোর ..
ভালোবাসার
তারপর.
তারওপর....
এখন কেউ আর চোখ চেপে ধরে না
কেউ আর কপালে জোরে টোকা দেওয়ার রাজনির্দেশ পেয়েও আলতো অনামিকা বুলিয়ে ব'লে যেতো
আছে ভালোবাসা আছে
আছে.. দরদ আছে..
সেই অনামিকা নেই
কোন গভীর সুস্বপ্নে ডেকে উঠছি এখন
—আয়তো আমার গোলাপ কুঁড়ি..
—আয়তো আমার সন্ধ্যেবেলী
—আয়তো দেখি কলকেকুঁড়ি..
—আয়তো আমার জুঁইচামেলী..
একটা ঘোর, একটা অন্ধকার.. যেন সে কোন পূর্বজন্মের..
একটি আঙুল ছোঁয়ার অপেক্ষায়....

ফেসবুক মন্তব্য