আমাদের এঁটো খুরির আখ্যান

উত্তম বিশ্বাস

ছেলেবেলার স্মৃতি ঘেঁটে মাঝে মাঝেই পাতাল অবধি প্রবেশ করি। কিন্তু নাহ, সেই উনিশ শ পঁচাশি ছিয়াশির বেশি আর এগোতে পারিনা! তখনকার দিনে কোথাও কোনও বিয়ে-শাদি, অন্নপ্রাশন কিম্বা শ্রাদ্ধশান্তির মতো খাওয়া দাওয়ার অনুষ্ঠান হলে আমাদের কাছে হাওয়ায় খবর চলে আসত। আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে ওঁত পেতে পড়ে থাকতাম প্যাণ্ডেলের পাশের কোনও সারগর্তে কিম্বা কলপাড়ের কাছাকাছি। তখন আমরা নিতান্তই ছোট। তবু আমরা ধরেই নিতাম একটু সম্পন্ন ঘরের অনুষ্ঠান মানেই মাটির খুরি মাস্ট! অর্থাৎ নিমন্ত্রিত আত্মীয় কুটুম্বুদের জলযোগে আপ্যায়ন করার নতুন এক উপকরণ হিসাবে গ্রামবাংলায় সবে সবে মাটির খুরির প্রচলন শুরু হয়েছে। পোড়ামাটির পাত্রগুলো গ্লাস হিসাবে ব্যবহার করা হতো ঠিকই, তবে খুরিগুলো দেখতে ঠিক গ্লাসের মতো ছিল না। ওগুলোর আকৃতি ছিল অনেকটা ওলটানো মাইকের মতো। শেষপাতের দই চাটনি চেটে, পাতা ঠেলে উঠতে না উঠতেই অপেক্ষারত কুকুরগুলোর সাথে আমরাও ঝুপঝাপ করে নেমে পড়তাম। এঁটো পদ্মপাতা কিম্বা উচ্ছিষ্ট মোড়ানো কলাপাতা টিপে টিপে তুলে নিতাম আমাদের অতি আকাঙ্ক্ষার খেলার সামগ্রীটি। কোথাও কোথাও বড়দের নজর কাড়তে এঁটো ফ্যালা, জল দেওয়ার মতো দায়িত্বটুকু নিজেরাই কাঁধে তুলে নিতাম। তাইবলে কী শুধু খুরি কুড়িয়ে নিয়ে ঘরে উঠতাম? মোটেও না। আমরা তো ছোট, দুধভাত। আমাদের আবার নেমন্তন্ন লাগে নাকি! তখনকার দিনের অনুষ্ঠানবাড়ির অর্থটাই ছিল মা কাকীমাদের তত্ত্বাবধানে বড়মাপের এক মাঙ্গলিক ক্রিয়া! সেকারণে ওঁদের চোখগুলোও সদা সর্বদা জোনাকির মতো জ্বলত, “এই তোরা কাদের বাড়ির ছেলেমেয়ে রে? এ রাম! কুকুরে কামড়ে দেবে তো! গর্ত থেকে উঠে আয় বলছি। যা উঠোনে বিচলি পেতে বসে দুমুঠো খেয়ে নে!” ‘বিচলি পেতে বোস গিয়ে’ এই কথাটা কানে আসার সাথে সাথেই আমাদের বুকের ছাতিটা এত্তো চওড়া হয়ে যেত! কেননা তখনও বিচলি বস্তুটা সর্বসাধারণের আসন। যাইহোক ভরপেট খেয়েদেয়ে খুরিগুলো পরপর গেঁথে বুকের সাথে জাপটে ধরে আমরা আইঢাই করতে করতে যে যার বাড়ি ফিরতাম। খুরিগুলো বাড়ি এনে রোদে দিয়ে যতদিন পারতাম ওর খোলের দই আর শুক্তোর গন্ধ বুকভরে টেনে নিতাম। ওগুলো ঘরে এনে তার থেকে আবার অদ্দেক অদ্দেক ভাগ। বুনুদের খেলনাবাটির জন্যে অদ্দেক,... আর আমাদের মাইক বানানোর জন্যে অদ্দেক। তখন সবে মনসার ভাসান আর রামযাত্রার রেশ কাটিয়ে একটা দুটো বড় মাপের বাড়িতে কলের গান ভাড়া করতে শুরু করেছে। কিন্তু আমাদের গানের খিদে অনেক। নতুন কলের গান বলে কথা, একটুখানি শুনিয়েই থামিয়ে দিলে চলে! অর্থাৎ খুরির পেছনগুলো ফুটো করে আম গাছ থেকে পেয়ারা গাছে,... পেয়ারা গাছ থেকে বাতাবিলেবুর ডালে, বেঁধে বেঁধে আমরা আমাদের মতো করে মাইক বানাতাম। কিন্তু তার বানাতে তো দড়ি চাই। এতো দড়ি পাই কোথায়! আমরা ছুকছুক করতে করতে ছুট্টে যেতাম ঠাম্মার কোলের কাছে। ঠাম্মা দাওয়ায় তালপাতার চাটকোল পেতে তার ওপরে থাই আলগা করে বসে, পাট্টাকুর ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কোস্টা দিয়ে গরু বাঁধা দড়ি পাকাতো। আমরা ‘পাট্টাকুর’ থেকে দড়ি চেয়ে নিয়ে মাইকের তার বানাতাম। মাইক ফিটিং করতে গিয়ে নিচে নামার কথা মথায়ই আসত না। পেচ্ছাপ পায়খানা মাথায় উঠে যাবার উপক্রম হত। কখনো কখনো গাছের মাথা থেকেই চনচন করে ঝেড়ে দিতাম! যার মাথায় গিয়ে পড়ে পড়ুক আমার দোষ নেই! এখনো বেশ মনে আছে, মা থালায় ভাত মেখে গোল্লা পাকাতে পাকাতে নিচে দাঁড়িয়ে আমাকে ডাকছে, একইসাথে কাকের বাচ্চারও প্রশংসা করছে, “কাগারে বগারে হাম্মম্ম!”
এঁটো খুরিতে মাইক বানিয়ে দিনভর চলত ঘোষণা, “হ্যালো টেস্টিং, হ্যালো। ওয়ান টু থ্রি ফোর ফাইভ সিক্স সেভেন এইট নাইন জিরো হ্যালো!”
যারা গাছে চড়তে পারত না, তাদের মধ্যে কেউ কেউ নিচে কলার পাতা আর পাটকাঠি দিয়ে প্যাণ্ডেল বানিয়ে ওর তলায় দিনরাত এক করে সমানে ঘোষণা করতে থাকত, “যাত্রা যাত্রা যাত্রা! আর দেরি নয়। আর কাল বিলম্ব নয়। আজ ঠিক সন্ধ্যা সাতঘটিকায় মঞ্চস্থ হতে চলেছে অগ্রগামী অপেরার গ্রাম বাংলা তোলপাড় করা পালা, ‘পাগলা স্বামীর ঘরররররররররর!” এগুলো অবশ্য আমরা যাত্রাকমিটির প্রচার মাইক শুনে শুনে নকল করতাম।
হঠাৎ পাশের গাছ থেকে অন্য আরেকজন চেঁচিয়ে উঠত, “ও জেঠিমা, তোমাদের কুকড়োর বাচ্চা সব চিলে নিয়ে গেল! হ্যালো হ্যালো!”
শুধু কি গান আর ঘোষণার মধ্যেই আমাদের প্রতিভাটুকু সীমাবদ্ধ থাকত? ফাঁক পেলেই পাড়ার বুড়ো বুড়িদের পেছনে লাগতাম, “হালে নালে কচ্ছপে জল খালে! ঝুমার দাদু পুকুরে নেমে ছুচু করেছে!... সব দেখা গেল! হ্যালো হ্যালো হ্যালোওওওওও!”
আমাদের এহেন ফাজলামিতে মা কাকীরা লজ্জা পেয়ে ঘোমটার আড়াল থেকে আমাদের তিরস্কার করত, “ঝ্যাঁটা মার তোদের মুখে! ঝ্যাঁটা মার! হ্যাদে, বলছিস কী ওসব!”
যাইহোক, মাটির খুরিতে সেদিন যে গানগুলো সারাদিন ধরে বাজত তারমধ্যে অন্যতম চিল(cheel) বাজপাখির মতো শত্রুদের চৌকি দেওয়া, সেদ্ধধান উঠোনে শুকোতে দিয়ে হাঁসপাখি খ্যাদানো, .... একইসাথে ঈদের আজান, আগমনীর আনন্দ... সব সবকিছু কণ্ঠে ধারণ করে এঁটো খুরিতে মুখ রেখে প্রচার করতে করতে দিনগুলো যে কীভাবে মাথার ওপর দিয়ে উড়ে চলে যেত টেরই পেতাম না!

ফেসবুক মন্তব্য