সেইসব খেলা-মোড়া দিন

অজিতেশ নাগ

-এগাও আমার

-হেগাও আমার

-হেগাও আমার, ওগাও আমার

-ওগাও আমার

নাঃ, কোন সাঙ্কেতিক শব্দ নয়, ওগুলো আসলে কোলাব্যাঙের ভাষা। একটু অদ্ভুত শোনালেই এটাও ছিলো আমাদের বাচ্চাকালের বন্ধুবান্ধব মিলে নানান খেলাধুলোর একটা অংশ। তারপরে ধরো, সেই ঊষাকালে, দাদু কান ধরে উঠিয়ে দিতেন, মোরগ যে গলা উঁচু করে ডাকে, সে কী বলে? নন্দু ছিলো আমাদের মধ্যে তালেবর। সে একদিন মাথা-টাথা খাঁটিয়ে নিদান দিলো, ‘কোঁক্কোর কোওওওওওওও কোঁ = আমরা প্রত্যেকেই এক’। এই রকম আর কী! তারপরে ‘চেরা’ জোগাড় করে তাক করে ব্যাঙের পিঠে মারা। দেখতে পেয়ে ভুলুদা একদিন কষে ধমক। তাতেও কাজ হচ্ছে না দেখে একদিন আমাদেরকে পিট্টু খেলায় ডেকে নিলে। উফ! পিঠে বল লেগে সে কী টনটনানি। ভুলুদা বললে, তা’লে বুজলি ওদের কেমন লাগে? ব্যস। আমাদের খেলা বন্ধ হয়ে গেলো।

জলপাইগুড়ি তখন আধা টাউন। প্রচুর গাছগাছালি ছিলো। লোকের মন ছিলো উদার। কারও বাগানে গিয়ে চার-পাঁচটা আম, পেয়ারা, জামরুল ছিঁড়ে নিলে সেটা চুরি-পদবাচ্য হত না। প্রশস্ত উঠোনে রোদে দেওয়া ঠাকুমা-গ্রেডের কারও আচার, অবশ্যই না বলে, তুলে নিলে কেউ কিচ্ছুটি বলত না। দেখতে পেলে সেধে ডেকে নিয়ে হাতে তুলে দিতো আরও কিছুটা।

আর ছিলো ‘চ্যাগাড়ি’। সেটি হল শুকনো খসে পড়া নারকেল পাতায় আমরা কেউ একজন বসতাম, আর কোনও দুজন মাটির রাস্তার উপর দিয়ে ছ্যাড়ছেড়িয়ে সেই পাতার আগা ধরে টেনে নিয়ে চলত। বিনে পয়সায় গাড়ি চড়বার কী মজা! কী মজা! মাঝেমধ্যে উৎসাহের প্রাবল্যে চলমান ‘চ্যাগাড়ি’ থেকে গড়িয়ে পরে হাত-পা ছড়ে ফেলতাম না, তা নয়। উপায় ছিলো হাতের কাছেই। কিছুটা দুর্বাঘাস ছিঁড়ে উঃ আঃ করতে করতেই চেপে ধরা। ব্যস।

এইসব খেলার সবগুলোই ছিলো পুরুষতান্ত্রিক। তবে কিছু খেলা কো-এড-গ্রেডেরও ছিলো। যেমন ঝিম ঝিম। ক’জনের হাতের উপর আরেকজনে চিমটি দিয়ে ধরে ধরে নাচিয়ে নাচিয়ে ছড়া বলা এক সাথে ‘ঝিম ঝিম ঝিম, মামা মারল কৈ মাছ, তাও নিল চিলে, চিলের লগে পাইলাম না, গাইট্টা গুইট্টা খাইলাম না’। আরও ছিলো, এখন মনে পড়ছে না।

হা-ডু-ডু, ,ইচিংবিচিং, লাট্টু-লেত্তি, ডাং-গুলি এইসব তো ছিলোই, আর ছিলো মার্বেল। কাচের গুলি দিয়ে এই খেলা পরে দেখেছি কোলকাতা শহরে অলিগলিতে, আজকাল আর দেখি না। মার্বেলে আমি নিজেকে অত পরিপক্ক করে তুলতে পারিনি কোনওদিনই, তবে আমাদের মধ্যে মুকুল ছিলো মাষ্টারম্যান। ও এত ভালো খেলতো একদিন সবাই ঠিক করল, ওকে খেলায় নেওয়া হবে, তবে ওকে পা দিয়ে মারতে হবে, হাত নয়। মুকুল তাতেই রাজী। কী আশ্চর্য! ও যে পায়েতেও আমাদের হারাতে লাগলো। সেই মুকুল এখন শিকাগোতে। একবার দেশে ফিরলে ও’র ছেলেকে কয়েকটা মার্বেল দিয়েছিলাম। দেখি মার্বেলগুলোর দিকে মুকুল অপলকে চেয়ে আছে।

মার্বেলের মত আরেকটা শহুরে-ছাপ-পাওয়া খেলা ছিলো ঘুড়ি ওড়ানো। তবে লাটাই থাকতো বড়দের হাতে। আমাদের শুধু ঘুড়ি ধরে উপরের দিকে ছুঁড়ে দেওয়াতেই অধিকার ছিলো। তবে কখনও কখনও কেউ আমাদের হাতে লাটাই ছেড়ে সুতো সামলালে, পরপর চারদিন যেন মাটিতে আমাদের পা পড়তো না।

তবে খেলার নামে সারাদিন টইটই করলে কি দাদামশাই ছেড়ে কথা কইতেন? সে কান ধরে এমন টান, যে অবিলম্বে লম্বকর্ণ অথবা এক-কান-কাটা হয়ে রাস্তায় বেরোলে কী হতে পারে, সেই দুশ্চিন্তায় থাকতাম। তবে একটা উপায় ছিলো। আমাদের সেই আধা-শহরে পুকুর ছিলো খানকয়েক। একবার ডুব-দিয়েই-আসছি বললেও, সেই জলাশ্রয় ছেড়ে ঘণ্টাখানেকের আগে উঠতাম না। ফলে কানে জল ঢুকে ব্যথা। দাদামশাই কান ধরতে এলেই, ‘উফ, কানে কী ব্যাদনা’ বলে ছাড় পাওয়া যেত। তবে সবসময় যে ব্যথা থাকতোই তা তো নয়।

যাই হোক, দাদামশাইয়ের কান-ডলা অথবা দিদিমার ‘বাবা এলে বলে দিবো’ হুমকিতে আমরা কিছু ঘরোয়া খেলাও বেছে নিয়েছিলাম। যেমন চোর-পুলিশ। চার টুকরো কাগজ। একেকটিতে নম্বরসহ লেখা ‘চোর’, ‘পুলিশ’, ‘ডাকাত’ আর ‘বাবু’। মামুলি সেই কাগজগুলো নিয়েই কেটে যেতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কে চোর কে বাবু, সেটা নিয়ে অনেক সময় ঝগড়া বেঁধে যেতো। ছিলো ওপেন-টু-বায়োস্কোপ। ওপেন-টু-বায়োস্কোপ, নাইন টেন তেইশ কোপ, সুলতানা বিবিয়ানা, সাহেব-বাবুর বৈঠকখানা, সাহেব বলেছে যেতে পান সুপারি খেতে, পানের আগায় মরিচ বাটা, স্প্রিংয়ের চাবি আঁটা যার নাম মণিমালা, তাকে দিবো মুক্তার মালা।
এইভাবে খেলতে খেলতে একদিন এক কচিকলাপাতা সালোয়ার বলেছিলো, ‘কিছু বলবে?’। কী বলব? বোকার মত তাকিয়ে আমি। কিছুক্ষণ পরে জায়গাটা বিলকুল ফাঁকা। কেটে গেলো অনেক বছর। খেলাই ছিলো বোধহয়।

ফেসবুক মন্তব্য