বছরকার বাজনা

চয়ন ভৌমিক

১)
এই তাকানোর মাঝেই, মুগ্ধতা খাল কেটে ঘুরে গেছে সম্পর্কের দিকে। কে যে সানাই বাজায়? কে-ই বা ছিঁড়ে ফেলে জন্মান্তরের নাড়ি – সে-কথা নদীকে জিজ্ঞাসা করতে পারিনি আমি। শুধু দেখি সাদা মেঘের ভেলা চড়ে ঈশ্বর চলেছেন ছাতিম গাছের দিকে। আর আমি! এক উন্নাসিক শরৎ; বোকার মতো খালি, পথ হারিয়ে ফেলছি তোমার বুকের অন্ধগলিতে।

২)
রেললাইনের দু-পাশে কাশফুলের অযত্ন দিন, মার্কণ্ডেয় বেদ, অনুপম মাঠ। কী এক আশ্চর্য বিস্তারে নীল হয়ে যায় আজন্ম জানলা। এই গন্ধ, এই বর্ণ কোথা থেকে উড়ে এসে বিঁধে যায় হৃদপিন্ডের দক্ষিণ কক্ষে – এত কৌতূহল পকেটে রাখতে ইচ্ছা করে না আমার। বরং এসো টলটলে পুকুরে ঝুঁকে পড়া বিষণ্ণ ডালে জলফড়িং-এর কাটাকুটি খেলা দেখতে দেখতে আমরা ছোটো করে দিই বিকেল। আলসেমির কুয়াশা লিখি নিসর্গের ঘুমে।

৩)
খুলে পড়ছে সাময়িক সবুজ, পিতৃ-গৃহকোণ। পিছন ঘুরে, চাল ছুঁড়ে চলে আসা সংসারের ঘট, হেলায় রাখা আছে দূরে। এসব অদৃশ্যলিপি। বিসমিল্লার রেওয়াজি সানাই। একটু পরই রিপু ও রান্নাঘর পেঁচিয়ে ধরবে গলা। পুজো ও পানপাতা ছোঁয়ানো আদর নিভে যাবে গভীর রাতে। বরণের রাতে ফিকে হয়ে যাবে আগমনি গান।

৪)
এখন ঘুম ভাঙে না। নীলকন্ঠ পাখী ডাকে কী আর? কোনো ভোরের আজানের নীচে পড়ে থাকে হয়তো ভিজে শিউলির স্পর্শকাতর কমলা রোদ।
এখন ঘুম ভাঙে না একদম। কোনো এক মধ্যবিত্ত রেডিওতে মহালয়া বাজতেই থাকে। বধিরতা চেপে ধরে জোরে। দশমহাবিদ্যা অজ্ঞাত থেকে যায়। আমাদের জীবন ঘড়ির অভিশাপ যেন। কোলাহলপ্রিয় উৎসবে অভ্যস্ত। ভিড় ঠাসা জটিল ট্রাফিক পেরোতে কান্না পায় না অভ্যস্ত চাকার।

৫)
পুরোনো পুজোসংখ্যার নীচে চাপা পড়ে আছে অতীতের নিঃসঙ্গ দুপুর। মাঝে মাঝে অন্ধকার ঠেলে বেরিয়ে আসে সেসব গন্ধ। বাসি খিচুড়ির মত স্বাদ নিই আমি ওদের। অঞ্জলি শেষে শান্তি জল, নাম গোত্র লেখা ডালি, হিম সন্ধ্যার পরিক্রমা – এসবই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে লিখিত আছে ওখানে। আমি শ্বাস নিই বারবার। দূরে গান বেজে ওঠে – “ লম্বি জুদাই চার দিনোকা”। আমি টের পাই দূরত্বের একটি একক আলোকবর্ষ আর জীবন একটি খসে পড়া তারা যার আলো আমাদের চোখে এসে পৌঁছয়নি এখনো।

ফেসবুক মন্তব্য