গিলবার্ট হিল

পার্থ প্রতিম চট্টোপাধ্যায়



মুম্বাই, ভারতবর্ষের ব্যস্ততম শহর, প্রতিদিন জীবিকার জন্য ভারতের বিভিন্ন স্থান থেকে লোক এসে উপস্থিত হয় এই শহরে। ইতিমধ্যেই এই শহর এক ইঁট, কাঠ, কংক্রিটের জঙ্গলে পরিণত হয়েছে, কিন্তু, এর আনাচে কানাচেই লুকিয়ে আছে এক অন্য ইতিহাস। বেশ কিছুদিন আগের এক লেখায় এই অঞ্চলের গুহা এবং তার ২০০০ থেকে ২৫০০ বছর আগের ইতিহাস নিয়ে লিখেছিলাম। আর আজ লিখতে বসেছি এই শহরের আর এক অতি প্রাচীন ভূতাত্ত্বিক বিস্ময়ের কথা। মুম্বাইয়ের এক কোণে, কংক্রিটের জঙ্গলের মধ্যে লুকিয়ে আছে ৬ কোটি বছর আগের এক বিস্ময়কর সৃষ্টি। এই সৃষ্টির স্থপতি প্রকৃতি নিজে।

মুম্বাইয়ের আন্ধেরি রেল স্টেশনের পশ্চিম দিকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে, ভবন'স কলেজের থেকে প্রায় ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে এই ২০০ ফুট উচ্চতার অতি প্রাচীন বিস্ময়, "গিলবার্ট হিল"। কিন্তু কি এই গিলবার্ট হিল আর কি ভাবেই এর সৃষ্টি হয়েছিল? এর ইতিহাস জানতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে মানব সভ্যতার বিবর্তনের আগে, এখন থেকে প্রায় সাড়ে ছয় কোটি বছর আগে, গন্ডোয়ানা যুগে, যখন ভারতভূখণ্ড এশিয়া মহাদেশের সঙ্গে যুক্ত হয়নি। প্রায় সেই সময়েই ভারতের দাক্ষিণাত্যের মালভূমির প্রায় ৫,০০,০০০ বর্গ কিমি অঞ্চলের সৃষ্টি হয়েছিল আগ্নেয়গিরি নিঃসৃত লাভা থেকে। সাধারণত আগ্নেয়গিরি নিঃসৃত লাভা চতুর্দিকে ছড়িয়ে পরে আর ধীরে ধীরে তা জমে গিয়ে সৃষ্টি করে basalt পাথরের পাহাড়ের। গিলবার্ট হিলের সৃষ্টিও আগ্নেয়গিরি নিঃসৃত লাভা থেকে, কিন্তু এর সৃষ্টির ধরন কিছুটা অন্য প্রকার। এই ধরণের সৃষ্টিকে বলা হয় "laccolith”। laccolith পাহাড়ের ক্ষেত্রে লাভা আগ্নেয়গিরি থেকে সোজাসুজি ভাবে নিঃসৃত হয়ে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে জমে গিয়ে স্তম্ভাকৃতি এক টিলার সৃষ্টি হয়। এই ভাবেই সৃষ্টি হয়েছিল গিলবার্ট হিলের। সমগ্র পৃথিবীতে এই ধরনের সৃষ্টি বিরল, মাত্র তিনটি স্থানে এই laccolith পাহাড়ের দেখা পাওয়া যায়। দুটি আছে আমেরিকাতে, ক্যালিফোর্নিয়ায় Devil’s Postpile এবং উয়োমিংয়ে Devil’s Tower, আর তৃতীয়টি হলো ভারতের গিলবার্ট হিল। আমেরিকার বিশিষ্ট ভূতত্ববিদ G K Gilbert যিনি laccolith পাহাড় বা টিলার সৃষ্টির রহস্য নিয়ে গবেষণা করেন তাঁর নামে নামকরণ করা হয় ভারতের এই টিলার।






বর্তমানে গিলবার্ট হিলের উপর উঠলে দেখা যাবে এক অতি প্রাচীন গ্রামীণ দেবীর মন্দির। সিঁড়ি ভেঙ্গে উপরে উঠলে দেখা যায় এই মন্দিরটি। স্থানীয় মতে প্রায় ৫০০ – ৬০০ বছর আগে স্থাপিত হয় এই মন্দির। মন্দিরটিতে নিয়মিত পুজা অর্চনা হয়। গিলবার্ট হিলের উপরে উঠলে আন্ধেরি এবং সংলগ্ন অঞ্চলের অপূর্ব দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়।





এ সব সত্ত্বেও প্রকৃতির এই সৃষ্টিকে আমরা সঠিক ভাবে রক্ষা করে উঠতে পারিনি। আমেরিকার দুটি laccolith সৃষ্টির রক্ষণাবেক্ষণ হলেও গিলবার্ট হিলের সেই ভাবে কোন সংরক্ষণই হয় নি। গিলবার্ট হিলে গেলে দেখা যাবে ক্রমাগত পাথর খোঁড়ার ফলে অনেক ক্ষতি হয়েছে এই অতি প্রাচীন প্রাকৃতিক সৃষ্টির। যদিও ১৯৫২ সালে গিলবার্ট হিল স্বীকৃতি পায় ন্যাশনাল পার্ক হিসেবে, কিন্তু পাথর কেটে একে নষ্ট করার চেষ্টা বন্ধ হয়নি। ভূতত্ববিদদের ক্রমাগত প্রতিবাদের ফলে শেষে ২০০৭ সালে মুম্বাই মহানগর পালিকা, গিলবার্ট হিলকে “Grade II Heritage” হিশেবে ঘোষণা করেন। আর এর ফলে বন্ধ হয় শেষ পর্যন্ত পাথর খোঁড়া। কিন্তু ততদিনে সচেতনতার অভাবে অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে এই প্রাকৃতিক বিস্ময়ের।

প্রকৃতিকে ধংস করে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করার যে চেষ্টা চলছে সারা পৃথিবী জুড়ে তা অবিলম্বে বন্ধ হওয়া প্রয়োজন নাহলে বার বার আমাদের সম্মুখীন হতে হবে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের।

ফেসবুক মন্তব্য