সাঁওতাল ধর্মের জমসিম বিন্তি

ডঃ স্বপন সরেন

(এই ভারতীয় উপমহাদেশের আদিম জনগোষ্ঠীগুলির মধ্যে সংখ্যায়, তুলনামূলক প্রাগ্রসরতার নিরিখে সবচেয়ে এগিয়ে সম্ভবত সাঁওতাল জনগোষ্ঠী। ভাষাবিদ পল সিডওয়েলের মতে এই অস্ট্রালোএসিয়াটিক মানুষজন ইন্দোচীন হতে আজকের ভারতবর্ষের ওড়িশায় পদার্পণ করেন আনুমানিক চার হাজার বছর আগে।

বর্তমানে ভারতবর্ষের ঝাড়খন্ড ছাড়াও অসম, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার এবং ওড়িশায় এঁদের বসতি ছড়িয়ে আছে। অল্পসংখ্যক মানুষজনের বাস রয়েছে বাংলাদেশ, নেপাল, এবং ভূটানেও।

সিন্ধুসভ্যতার সমসাময়িক এই জনগোষ্ঠীর বর্ণময় অতীত ধরা আছে তাদের মৌখিক পরম্পরায় গ্রথিত পুরাণকথায়, যার নাম বিন্তি। লিপির ব্যবহার শুরু হবার পর তাদের কিছু কিছু লিপিবদ্ধ করা গিয়েছে। কিন্তু কালের নিয়মেই হয়তো কিছু কিছু পুরাণকথা ইতিমধ্যেই বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে।

তুলনামূলক ভাবে বলা যায়, আর্যদের বৈদিক সাহিত্য, যার অপর নাম শ্রুতি, সেও একদা কর্ণ এবং স্মৃতিনির্ভর ছিল। হয়তো সেই জন্যই তারও অংশবিশেষ এমন ভাবে লুপ্ত হয়ে গিয়েছে, বিভিন্ন আঞ্চলিক সংস্করণগুলি মিলিয়ে দেখেও সম্পূর্ণ পুনর্গঠন আজ প্রায় অসম্ভব।

ডঃ স্বপন সরেন বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য-ব্যবস্থায় উচ্চপদে অধিষ্ঠিত একজন ব্যস্ত পদাধিকারী। আমাদের বারংবার অনুরোধে কলম ধরেছেন, এবং ব্রতী হয়েছেন তাঁর স্মৃতি থেকে পুনরুদ্ধার করে সেইসব অমূল্য রতনকে এই বিবরণীর সূত্রে গেঁথে রাখতে।
)

এক

সারি ধরম (সত্য ধর্ম) হলো সাঁওতালদের ধর্ম। আর জম সিম বিন্তি হলো ধর্মের বচন যা পরবর্তী কালে বই এর আকার পেয়েছে। এতে আছে সমাজ সংস্কৃতি, ধর্ম কর্ম, জন্ম, নামকরন, বিবাহ ও মৃত্যুতে পালনীয় রীতি নীতি।

আছে বঙ্গা বুরু অর্থাৎ ঠাকুর দেবতার উৎপত্তি। আছে জীবন সৃষ্টির কথা, প্রথম মানব মানবী (পিলচু হাড়াম পিলচু বুড়ি) সৃষ্টি কথা, বংশ বিস্তার, ১২ টি পারসি বা গোত্র বিভাগ।


হাঁসদা, কিস্কু, হেমব্রম, সরেন, মান্ডি, মুর্মু, টুডু, বেশরা, বাস্কে, চোড়ে, পাওরিয়া ও ডডকা। গোত্র অনুযায়ী রীতি রেওয়াজ একই গোত্র এ বিবাহের বিধি নিষেধ। যেমন সরেন ছেলে সরেন মেয়েকে বিবাহ করতে পারবে না। প্রতি গোত্রের বাসস্থান ভাগ করা ছিল। যাদের গাড বা দেশ বলা যেতে পারে। কিস্কু - কয়ডা গাড, মুর্মু - চাম্পা গাড, হেমব্রম - খায়রি গাড, মান্ডি - বাদলি গাড, হাঁসদা - কুটাম পুরী গাড, টুডু - সিম গাড, সরেন - চাইয় বইহী গাড, বাস্কে - হারবা লায়ম গাড, বেশরা - বংশ রিয়্যা গাড, চোড়ে - জাঘিদে গাড, পাওয়রিয়া - বামা গাড, ডডকা - হলং গাড। কালের নিয়মে কেউ হলো ধনী। কিস্কুরা সবচেয়ে ধনী হওয়ার সুবাদে তারা হলো রাপাজ বা রাজা। সরেন হলো ওদের সেনাপতি, হেমব্রম হলো দেওয়ান। বশ্যতা স্বীকার করলো না মান্ডিরা, তাদের কর্মজোরে হলো ধনী, তাই বাঁধলো বিরোধ, সেই থেকে কিস্কুদের সাথে এখনও মান্ডিদের বৈবাহিকসম্পর্কের ও বিরোধ। দাঁশায়, সহারায়, বাহা অনুষ্ঠানের বিশদ বিবরণ।

সাঁওতাল সামাজিক ব্যবস্থার অনেক কিছুরই সূত্র এই জমসিম বিন্তি।


সৃষ্টির আদিকথা


এই ব্রহ্মান্ড সৃষ্টি কর্তা হলেন ঠাকুর। তিনি এই ব্রহ্মাণ্ড কে তিন ভাগ করেছিলেন। আকাশ পাতাল ও মর্ত্যভূমি। এই মর্ত্যভূমি ছিল নিথর ও অন্ধকার। পাতাল ছিল জলময়। এই মর্ত্যভূমির ঈশান কোণে ছিল লুগুবুরু আর ঘান্টাবাড়ে বলে দুটি স্থান। লুগুবুরুতে একটি বিশাল গহ্বর ছিল যা আকাশের সঙ্গে পাতালকে যুক্ত করেছিল। ওই সুড়ঙ্গ পথের মুখ ঢাকা ছিল এক বিশাল পাথরে। ওই পাথরটিকে বলা হয় "ধিরি গড় সিনি কাপাট"।


ঠাকুরজিউ মনস্থ করলেন এই মর্ত্যভূমিকে মনের মতো করে সাজাবেন। কিন্তু ভেবে দেখলেন এতো বড়ো কর্মকাণ্ড একক হাতে করা সম্ভব নয়, চাই তার সহযোগী। ঠাকুরজির এই মনোভাব এটা দেখায় যে সৃষ্টির দার্শনিকতার মধ্যে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরন এর উদ্ভব হয়েছিলো। ঠাকুরজির যেমন ভাবনা তেমন কাজ। তিনি বাম হাতের তর্জনীতে মর্ত্য ভূমিকে ধারন করে প্রচন্ড বেগে লাট্টুর মতো ঘোরাতে লাগলেন। সেই ঘূর্ণনে মর্ত্য ভূমি কেঁপে উঠলো, মৃদু মন্দ বাতাস পরিণত হলো প্রবল ঘূর্ণি ঝড়ে, সেই প্রবল ঘূর্ণি ঝড়ের মধ্যে ঠাকুরজি তার শক্তি কে বিভাজিত করতে লাগলেন, খুলে গেলো " ধিরি গড় সিনি কাপাট"। লুগুবুর তে ঠাকুরের শক্তি পরিণত হলো দেবগণে আর ঘান্টাবাড়ে থেকে উদ্ভূত হল দেবীরা। তারা এই মর্ত্য ভূমি যোগাযোগ করতো রশ্মি সুতোয় (তরে শুতাম) আর বিচরণ করতো এক বিশেষ ধরণের তার বাদ্য (বুয়াং ) এরঅগ্র ভাগ দিয়ে।
সেই উপাখ্যান এখন ও দাঁশায় এর গানে গানে নৃত্যরত সাঁওতাল পুরুষদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়:


"হায়রে হায়রে
হয় দ হয় লুগুবুরু রে হয় দ হয়
হয় দ হয় ঘা নটা বাড়ে রে হয় দ হয়।
হায়রে হায়রে
লুগুবুরু হয় দ হিনসিদে হিনসিদে
ঘা নটা বাড়ে হয় দ হালায়ে হালায়ে।
হায়রে হায়রে
লুগু বুরু রেদ বঙ্গা কড়া কিন
ঘা নটা বাড়ে রেদ বঙ্গা কুড়ি কিন।
হায়রে হায়রে
তরে শুতাম তেকো আর্গো রাকাপ আ
বুয়াং দান্টিচ তেকো তুন্ডাং বাড়ায়া।

অর্থাৎ


ঠাকুরজির সৃষ্টি কালে লুগুবুরু এবং ঘান্টাবাড়েতে উঠেছিলো প্রবল ঝড়, লুগুবুরুর ঝড় হালকা সহনীয় কিন্তু ঘান্টাবাড়ের ঝড় ছিল আগুন ঝরা। লুগুবুরতে উদ্ভূত হলো দেবগণ আর ঘান্টাবাড়েতে উদ্ভূত হলো দেবীগণ। রশ্মি সুতোয় আর বুয়াং এর আগায় আগায় এরা করত বিচরণ।

(ক্রমশঃ)

ফেসবুক মন্তব্য