মুন‌ওয়াক টু সানরাইজ

শর্মিষ্ঠা নাথ মণ্ডল



এ পথে সশরীরে হেঁটেছি মাত্র দুবার। আর মনে মনে? যেন জন্ম জন্মান্তর। হিমালয়ের প্রেমে যে পড়েছে সে তো বার বার আসবেই। উত্তরাখন্ডের হিমালয় যেন সত্যিই দেবভূমি। এত শুধু পাথরের খাড়া দেওয়াল নয়, যেন ভগবানের বাসস্থান। সুউচ্চ এই পাহাড়ের কাছে নিজের অস্তিত্ব তুচ্ছ মনে হয়। প্রথমবার শুধুই তীর্থ দর্শনের ইচ্ছায় চারধাম যাত্রা। পরের বার ভ্যালী অফ ফ্লাওয়ার, হেমকুন্ড সাহিব। তবুও আরও কত যে দেখার আছে হিমালয়ের অন্দরে কন্দরে! হিমালয়ের রূপ তো এক এক ঋতুতে এক এক রকম। উচ্চতাভেদে আবার তার রূপ পাল্টায়। ভারতের উত্তর থেকে উত্তর-পূর্বে বিস্তৃত এই গিরিশিরা। কিন্তু এক এক জায়গায় তার এক এক রকম চরিত্র। নেপাল, ভূটান, তিব্বত, চীন সব দেশেই হিমালয় রয়েছে অতন্দ্র পাহারায়। বিভিন্ন দেশের মানুষের রূপ, আদব কায়দা যেমন আলাদা, হিমালয়ের চরিত্রও তেমনই আলাদা।
কয়েক বছর আগের কথা 'মিলন মঞ্চ'-র কয়েকজন বয়স্ক বন্ধু আবদার করলেন তুঙ্গনাথ সহ আরও কয়েকটি তীর্থস্থান নিয়ে যেতে। দেখলাম ওদের না দেখা জায়গাগুলো আমাদেরও যাওয়া হয়ে ওঠেনি তাই সহজেই রাজি হয়ে গেলাম। ২০১৫-র সেপ্টেম্বর মাসের একটা দিন ঠিক হলো। স্থির হল ট্রেনেই যাব। রাজধানী এক্সপ্রেসে মাত্র আঠারো ঘন্টায় দিল্লী, আর সেখান থেকে কয়েক ঘন্টা জন শতাব্দীতে যাত্রা। হরিদ্বার তো আমাদের একদম ঘরবাড়ির মত চেনাজানা। পুরানো ওলিগলিও চেনা। তবে এবার আর হরিদ্বারের গঙ্গা আরতি দেখার সময় হলো না। সেদিন কোনও পুণ্য স্নান ছিল বলে রাস্তায় বেশ ভিড়। শয়ে শয়ে মানুষ গঙ্গা স্নান করে ফিরছে। কিন্তু এই ভিড়ে আমাদের গাড়ি বেশ আগেই ছেড়ে দিয়ে মালপত্র নিয়ে অনেকটা হেঁটে হোটেলে পৌঁছাতে হল। পরদিন সকালে আমাদের বেড়িয়ে পড়তে হবে পাহাড়ের দিকে। গাড়ি আসবে সকাল সাতটায়। তাই আজ পাশেই একটা হোটেলে রাতের খাবার সারা হলো। সেপ্টেম্বর মাস হলেও হরিদ্বারে বেশ গরম। মনে হচ্ছিল কখন পাহাড়ে উঠব। যথাসময়ে গাড়ি এলো। গঙ্গা পার হয়ে হৃষিকেশের রাস্তা। এক পাশে গঙ্গাও যেন আমাদের সাথেসাথে চলেছে। কত বড় বড় পাথরের চাঁই পড়ে আছে জলের মধ্যে তবু গঙ্গা অনন্ত কাল ধরে বয়ে চলেছে। এক পথে বাধা পেয়ে অন্য পথ খুঁজে নিয়েছে। কত ধুলো বালি পাথরের টুকরো বুকে নিয়েও সে স্রোতস্বিনী। রাজাজী ন্যাশানাল পার্কের মধ্যে দিয়ে লছমন ঝুলার পাশ দিয়ে আমরা এগিয়ে চললাম। এ পথে কত মন্দির আর কত শত মঠ। ঋষি অরবিন্দের লাইফ ডিভাইনের পাশ দিয়ে যেতে যেতে রিভার রাফ্টিং ক্লাব। আর একটু বাঁক নিতেই চোখে পড়ল বেশ কিছু উৎসাহী ছেলে মেয়ে গঙ্গায় রাফ্টিং করছে। যেতে না পারি তাবলে ওদের ছবি অন্তত তুলব না? তাই একটু থামতেই হলো। তারপর চললাম অলকানন্দার তীর ধরে। আগের চেয়ে অনেকটা ক্ষীণস্রোতা অলকানন্দা। গতবারের থেকে রাস্তাঘাট এক অনেক পাল্টে গেছে। আগ্রাসী দুচোখ দিয়ে খুঁজছি পুরানো চেনা রাস্তার বাঁক। ড্রাইভার বলল বন্যার পর অনেক কিছু পাল্টে গেছে। ওরা ভেবেছিল চারধাম যাত্রাই চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। কত মানুষের রুজি রোজগার জড়িয়ে আছে এই চার ধাম যাত্রা ঘিরে। এখন পরিবেশ রক্ষার জন্য আগের মত যেখানে সেখানে হোটেল আর নেই। দেবপ্রয়াগে একটা ছোট খাটো হোটেলে চা খাওয়ার বাহানায় থামা গেল। আসল উদ্দেশ্য আলকানন্দা আর মন্দাকিনীর মিলন দৃশ্য দেখা। দেখলাম এখন বেশ নিশ্চিন্তে চলেছে। কখন যে ভয়ঙ্কর রূপ ধরবে কেউ জানে না। চা খেয়ে ছবি তুলে আবার এগোনো। রুদ্রপ্রয়াগ পৌঁছনোর কিছু আগে এক নতুন দৃশ্য। বাঁ দিকে একটা নতুন দ্বীপের মত তৈরী হয়েছে। আর তাতে সারি সারি কাশফুলের সমারোহ। শুনলাম বন্যার পর এই দ্বীপটা আপনা আপনি তৈরী হয়েছে। হয়ত আর কদিন পরেই নতুন টুরিষ্ট স্পট ঘোষিত হবে। শরতের শুরুতে কাশ ফুল দেখে মনে পড়ে গেল পূজো আসছে। কিন্তু রুদ্রপ্রয়াগ এর সেই পুরানো পথ, পুরানো ঘাট, পুরানো ব্রীজ কিছুই নেই। এমন কত ছোট বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে কত ভূগোল যে পাল্টে যায়, কত ইতিহাস যে মুছে যায়! কষ্ট হলো মনে মনে। ভয়াবহ সেই বিপর্যয়ের পর এ পথে যে আবার তীর্থ যাত্রা শুরু হয়েছে সেটাই অনেক বড় কথা। আর পথের কী স্বর্গীয় দৃশ্য! হরিদ্বার থেকে শুরু করে সমস্ত গাড়োয়াল অঞ্চলের অর্থনৈতিক অবস্থা নির্ভর করে এই তীর্থস্থানের ওপর। যদিও বছরে ছ'মাস এই পথ বরফে ঢাকা থাকে। তখন আউলি ছাড়া সব কিছু জনসাধারণের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। শুধু আউলিতে তখন স্কীইং-র জন্য টু্রিজম চালু থাকে। ইন্ডো টিবেট বর্ডারে থাকে পুলিশ পাহারা।


এই সব ভাবতে ভাবতে চলেছি। বিকট শব্দ করে গাড়িটা চলতে চলতে হঠাৎ থেমে গেল। ভীষণ ঝাঁকুনি লাগল আমাদের, আতঙ্কে কথা বন্ধ। কী হল? নেমে দেখি গাড়ির চাকার অবস্থা খুব খারাপ। অগত্যা রাস্তায় দাঁড়াতে হলো। জায়গাটা একটু চেনা। একটা ছোট্ট চায়ের দোকান দেখে বললাম, এখানে চন্দ্রপুরীর গাড়োয়াল মন্ডল বিকাশ নিগমের গেষ্ট হাউস ছিল না? অলকানন্দার তীরে কি অপূর্ব ভিউ ছিল! দোকানি জানালো ২০১৩-র বন্যায় সব ধুয়ে মুছে গেছে। এখানে চাকা পাল্টানোর কোনও উপায় নেই। আরো জানালো গুপ্তকাশীর আগে টায়ারের কোনও দোকানও নেই। শুনে সবাই চমকে উঠলাম। গাড়ির যা অবস্থা তাতে টায়ার না বদলে আমাদের অত দূর গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে না। এদিকে গুপ্তকাশীর রাস্তা কিন্তু আমাদের রাস্তার উল্টো দিকে। গুপ্তকাশী তো কেদারনাথের দিকে আর আমরা যাবো চোপতার দিকে। সেখানে পৌঁছাতে তো রাত্রি হবেই। তবে অনভিপ্রেত ভাবে গুপ্তকাশীর মন্দির আবার দর্শন হয়ে যাবে। সেও বড় কম পাওয়া নয়। পড়ন্ত দুপুর প্রায় বিকেলের মুখে। এখন টুরিষ্ট বা তীর্থ যাত্রীদের তেমন ভিড় নেই। পাহাড়ের দুপাশে ছোট বড় গাছ। এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ের পথ দেখা যায়। ঐ খারাপ টায়ারকে কোনোরকমে চলনসই করে প্যাঁচ খেতে খেতে পার হচ্ছি। কোথাও প্রাণবন্ত পাহাড়ি ঝোরা পার হই। শব্দ করে পার হই পল্টুন ব্রীজ। এবং এভাবেই পৌঁছে গিয়েছিলাম গুপ্তকাশী। এখানে বেশ জমজমাট বাজার, বেশ কিছু দোকানপাট। আমাদের গাড়ি যখন টায়ার পাল্টানোর জন্য থামল, আমরা দুজন গুপ্তকাশীর মন্দিরের দিকে পা বাড়ালাম। গুপ্তকাশীর পৌরাণিক কাহিনি অনেকেরই নিশ্চয় জানা। পান্ডবদের দেখা দেবেন না বলে শিব এখানে লুকিয়ে ছিলেন। মন্দাকিনীর তীরে এই গুপ্তকাশী। এখানে পূর্বপুরুষের নামে শ্রাদ্ধ করা যায়। শিব মন্দিরের সামনে ছোট একটি পবিত্র কুন্ড আর তাতে অবিরাম দুটি ধারায় গঙ্গা আর যমুনার জলধারা বয়ে চলেছে। অনন্ত কাল ধরে পিতলের তৈরী মুখ দিয়ে ঝরঝর করে জল ঝরছে। একটি মুখ গরুর আর একটি হাতীর। মনটা কেমন যেন ভালো হয়ে গেল। হয়ত বা গুপ্তকাশী দর্শন কপালে ছিল বলেই গাড়িটা খারাপ হলো। মন্দির চত্বর থেকে বেরিয়ে এসে দেখি কেদারনাথ যাওয়া পথ নির্দেশ। যেন টানছে! কিন্তু এখন রেজিস্টেশন ছাড়া যাওয়া যায় না।
পাহাড়ি লোকজন বড় সরল। চিনি ছাড়া চা চাইলে চায়ের দাম কম নেয়। শহরের দোকানের মত স্পেশাল বলে বেশি দাম নেয় না। এক কাপ চা খেয়ে আবার গাড়িতে বসা গেল। দিনের আলো প্রায় নিবুনিবু। আকাশ একটু মেঘলা তাই গোধূলিতে রঙের খেলা নেই। রাস্তায় লোকজন পাওয়া মুশকিল। পথ হারালে অনেক ঘুরপাক খাওয়ার সম্ভাবনা। বিএসএনএল এর মোবাইল ছাড়া কিছুই চলে না। তাই জিপিএসও চলবে না। তবে পথে একটু অভিযান মন্দ কি! গাড়ির হেড লাইটে রাস্তা এগোচ্ছি। আর কোনও যানবাহন বা মানুষ নেই। সাঁ সাঁ করে কালো জঙ্গল পিছনে চলেছে। আজকের গন্তব্য উখীমঠ হয়ে সারি গ্রাম। উখীমঠেই শীতের ছ মাস কেদারনাথের পাল্কি এসে থাকে। এখানেই দেওয়ালীর পর থেকে অক্ষয় তৃতীয়া পর্যন্ত তাঁর পুজো হয়। উখীমঠেই উষা আর অনিরুদ্ধর বিয়ে হয়েছিল। সবই হয়ত পৌরাণিক কাহিনি তবে তা আজ ভারতবর্ষের আধ্যাত্মিকতার সাথে জড়িয়ে আছে। আর আধ্যাত্মিকতা ভারতবর্ষে অন্যতম বৈশিষ্ট্য। হিমালয় যেন সেই আধ্যাত্মিকতার আর এক নাম। প্রকৃতিই যে ঈশ্বর তা এখানে এলে বারবার মনে হয়। উখীমঠ দর্শন করে একটু ঘুরপাক খেতে খেতে অবশেষে সারি গ্রামে পৌঁছে গেলাম। সারাদিন অনেক ধকল গেছে। এবার খেয়ে নিয়ে ঘুম দিতেই হয়।
পরেরদিন দুপুরের খাওয়া সারতে একটু দেরি হলেও চোপতা যেতে কোনো অসুবিধা হবে বলে মনে হল না। ওখান থেকেই তুঙ্গনাথ আর চন্দ্রশিলা। জঙ্গলের মাঝ দিয়ে গাড়ি চলার পথ। এই অঞ্চল পাখিদেরও স্বর্গরাজ্য। চোপতা পৌঁছাতে পৌঁছাতে বিকেল শেষ হয়ে গেল। বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ঠান্ডাও বাড়তে লাগল। কোনও রকমে জিনিসপত্তর নিয়ে হোটেলে ফেরা। হোটেলটা প্রায় তুঙ্গনাথ যাবার তোরণ দ্বারের পাশেই। বেশ কিছু ট্রেকার নেমে আসছেন। বেশ কয়েকজন বিদেশি লোকজনের গ্রুপ দেখলাম। সবার গায়েই রেনকোট চাপানো। মুখে প্রশান্তির হাসি। প্রায় বারো হাজার ফুট উচ্চতায় তুঙ্গনাথ মন্দির। পঞ্চ কেদারেরই তৃতীয় কেদার। পৃথিবীতে এর চেয়ে বেশি উঁচুতে কোনও শিব মন্দির নেই। নিচে বয়ে চলেছে মন্দাকিনী আর অলকানন্দার ধারা। চোপতা থেকে চার কিলোমিটারের মত সোজা চড়াই পথ। প্রায় ছ'হাজার ফুট উচ্চতা চড়তে হবে।


ভোর ভোর ছোট্ট পিঠের ব্যগ নিয়ে বেরোলাম। গায়ে তখনও সোয়েটার, মাথায় টুপি। আমাদের সাথে তেমন কোনও অন্য যাত্রী নেই। পাহাড়ের ঘুম ভাঙছে একটু একটু করে। মেঘলা তাই সূর্য কিছু আগে উঠলেও আমাদের সঙ্গে চোখাচোখি হয়নি। তবে আমার এমন আবহাওয়া কিন্তু বেশ ভালো লাগে। সমতলে তো এমন আকাশ এমন বাতাস সবই দুর্লভ। একটু পরে দেখি আমাদের পিছু পিছু একপাল নরম তুলতুলে ভেড়ার পাল উঠে আসছে। আমরা ছবি তোলার জন্য দাঁড়াতেই সাথে পাহারাদার কুকুর একদম রেগে ঘেউ ঘেউ করে ওঠে। মেষপালকটি ধীরে সুস্থে আসছে. তার বুকে বাঁধা থলিতে দুটো বাচ্চা ভেড়া চোখ পিটপিট করে তাকাচ্ছে। খানিকটা ওপরে উঠতেই বাঁ দিকে চৌখাম্বার বরফ চূড়া কাছে আসতে লাগল। মনে হয় যেন অন্য আর এক জগত। দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ বুগিয়ালে ছোট ছোট ভেড়ারা পরমানন্দে ঘাস খাচ্ছে। তুঙ্গনাথের পথে উৎরাই নেই, শুধুই চড়াই। কখনও একদম সোজা, কখনও ঘুরে ঘুরে। সবার চলার গতি, বুকের দম সমান নয় তাই কেউ আগে, কেউ পরে হাঁটছি। মাঝে মাঝে ছবি তোলার বাহানায় আবার এক হচ্ছি। পথের ধারে চির পাইনের জঙ্গলের মধ্যে বেশ কিছু রডোডেনড্রনের গাছ। স্থানীয় ভাষায় একে গুরাস বলে। এখন এই ফুল ফোটার সময় নয়। ফুটলে সারা জঙ্গল জুড়ে আগুন লেগে যেত। মনে হয় প্রকৃতির সৌন্দর্য্য পরিবর্তনশীল বলেই এত আকর্ষণীয়। হিমালয় তার মধ্যে অন্যতম নিদর্শন। ভারতবর্ষে নানা মন্দির, নানা বিশ্বাসের তীর্থভূমি। তবু হিমালয়ের আনাচে কানাচে অতি প্রাচীন এই তীর্থস্থান গুলি প্রকৃতির কোলে বলেই হয়ত ভক্তি আর প্রকৃতি প্রেম মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।

উপরে উঠতে উঠতে গাছের উচ্চতা কমতে থাকে, পিছন ফিরে তাকালে বিশ্বাস হয় না যে এতটা ওপরে চলে এসেছি। মনে হয় জন্ম-জন্মান্তর থেকে যেন এই পথে হেঁটে চলেছি। পাহাড়কে বলি ভালো থেকো, গাছদের বলি ভালো থেকো, পথকে বলি এমনই থেকো। হঠাৎ একটা বাঁক ঘুরতেই মন্দিরের চূড়া নজরে এলো। আনন্দে চোখে জল এসে যায়। কোন অনাদি কাল থেকে যেন প্রতীক্ষায় ছিলাম। জুতো মোজা খুলে মূল মন্দিরে গেলাম। শনশন ঠান্ডা হাওয়া, আর ঠান্ডায় মাটিতে পা রাখা মুশকিল। দর্শন করলাম। কতকাল ধরে এই মন্দিরে স্বয়ম্ভূ এই শিবের পূজা হয়ে চলেছে। পৌরাণিক মতে সেই মহাভারতের কাল থেকে শিবের একটি রূপ হিসাবে নিত্য পূজা হয়ে চলেছে। আসল পিন্ডটি রূপার মুকুট দিয়ে ঢাকা থাকে। বছরে ছয় মাস মন্দির বরফে ঢাকা থাকে বলে কয়েক কিমি দূরে গ্রামের মধ্যে মক্কু মঠে তুঙ্গনাথের নিত্য পূজা হয়। কি মনোরম আর স্বর্গীয় পরিবেশ! দুপুরে হয়ে আসতে বরফের চূড়াকে জড়িয়ে ধরল মেঘ। মনে হচ্ছে আমরা কজন মাটির পৃথিবী থেকে অনেক দূরে অন্য এক জগতে। কি নিস্তব্ধ প্রকৃতি! অখন্ড শান্তি যেন চারিদিকে। অফ সিজিন বলে তীর্থযাত্রীও সীমিত। আমাদের সাথী কয়েকজন দর্শনের পর চোপতায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। রাতে ঠান্ডা আরও বাড়বে এই ভেবে তারা নীচে নেমে যেতে শুরু করলেন আর আমি আর আমার স্বামী, রুদ্র রাতে মন্দিরের গায়ে ধর্মশালায় থেকে গেলাম। উদ্দেশ্য ভোর রাতে চন্দ্রশিলা যাওয়া। ছোট্ট খাট পাতা ঘরে, থাকার অতি সাধারণ বন্দোবস্তো। লাইট মাঝে মাঝে থাকে। ঘরের সামনে দিয়েই চন্দ্রশিলা যাবার পথ চলে গেছে। হঠাৎ কিছু বিদেশি ট্রেকারের দল কলকল করে চলে গেল। কিন্তু এত বেলায় কি আর তেমন খোলা আকাশ পাবে? ওরা চলে গেলে আবার নিস্তব্ধতা। মেঘ খেলে যায় জানলার ধারে, বাতাসেরা কথা বলে ফিসফাস। আমি বসে মনে মনে কথা বলি, শুনছে হয়ত চরাচর। প্রকৃতিকে এমন একান্ত করে উপলব্ধি করার জন্যই বোধয় হিমালয়ের এমন সব তীর্থস্থান। ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামে পাহাড় জুড়ে। মন্দিরের ঘন্টাধ্বনি বেজে উঠল সন্ধ্যা আরতির জন্য। আমরাও পায়ে পায়ে মন্দিরে পৌঁছে গর্ভগৃহের একদম সামনে বসে অপরূপ আরতির দৃশ্য শুধু দেখলামই না, মনে প্রাণে অনুভব করলাম এক আধ্যাত্মিকতা। আশে পাশে কোনও খাবার হোটেল নেই। গ্রামের লোকেরাই নিজেদের ঘরে অল্প স্বল্প থাকা খাওয়ার ব্যবস্হা করেন। আমরা ওই রকম একজনের বাড়িতে উনুনের চারিদিকে গোল হয়ে বসে গরম গরম হাতে গড়া রুটি আর তরকারি খেলাম। সে যে কী অমৃত! আজও যেন মুখে লেগে আছে। হয়ত বা খিদেও তার একটা কারণ। টর্চ জ্বেলে কয়েকটা সিঁড়ি চড়ে আবার ঘরে এলাম। ঘরে ঢোকা যায় না। একরাশ জোৎস্নায় স্নান করছে বরফ চূড়া। রূপোর মত ঝকঝকে দূত্যি ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে। মনে হচ্ছে এখনি স্বর্গ থেকে পরীরা নেমে আসবে নাচ দেখাতে। মনে হয় অনন্তকাল চেয়ে থাকি এমন দৃশ্যের দিকে। গায়ে কাঁটা দেয় এমন স্বর্গীয় দৃশ্যের সাক্ষী হতে। জোৎস্না মাখা ঝকঝকে পাহাড়ের দিকে বেশীক্ষণ তাকানো যায় না, চোখ ধাঁধিয়ে যায়। কোথাও এতটুকু শব্দ নেই। তবুত্ত ঠান্ডায় আর বাইরে থাকা চলে না। একটু শুতেও হবে। রাত তিনটেতে এ্যালার্ম দেওয়া আছে। ভোর রাতে রওনা হব। চন্দ্রশিলায় সূর্যোদয় দেখতে যাবো। মনের ভেতর চাপা উত্তেজনা। প্রায় তিন কিলোমিটার ওপরে উঠতে হবে। পাহাড়ে অক্সিজেন একটু কম থাকে তায় বেশ ঠান্ডা। গভীর ঘুম হলো না। যথাসময়ে তৈরী হয়ে নিলাম। সাথে একটি লোকাল ছেলে গাইড হিসাবে যাবে। সে এসে দরজায় নক করল। আমরা তৈরীই ছিলাম। টর্চ আর জলের বোতল শুধু সাথে, আপাদমস্তক গরম জামাকাপড়ে মোড়া। দরজা খুলে দেখি ফটফটে জোৎস্নায় ধুয়ে যাচ্ছে চরাচর। আমরা যেন মহাপ্রস্থানের যাত্রী। চারিদিকে জনমানবশূন্য। এদিকে উচ্চতার জন্যে কোনও গাছপালা নেই। নিজের জুতো আর নিঃশ্বাসের শব্দ শুধু। ঠান্ডা হাওয়া কানের পাশ দিয়ে সিরসির করে বয়ে যাচ্ছে। আমরা চাঁদের আলোর পথযাত্রী এখন। কি স্নিগ্ধ সেই আলো। মনে হচ্ছে স্বর্গের দেবতারা যেন আমাদের আলো দেখাচ্ছেন। রুদ্র আমার থেকে অনেকটা আগে হাঁটছে, গাইড ছেলেটি মাঝে আর আমি পিছনে। একটা বাঁকের কাছে মনে হলো পাকদন্ডী বেয়ে চড়লে দুরত্ব একটু কমবে। সাহস করে পা বাড়ালাম। চাঁদও চলেছে আমাদের সাথে। দূরে তাকাতেই দেখলাম রুদ্র একদম উঁচু চূড়াটায় চড়ে চেঁচিয়ে আমায় ডাকল, আর একটু ওপরে চলে আসতে বলল। কয়েক মিনিট পরই আমিও পৌঁছালাম। আর সেই জনমানবশূন্য চরাচরে রয়েছে শুধু একটি ছোট্টো গঙ্গা মন্দির। মনে হলো আমরা যেন পৃথিবী ছেড়ে অনেক ওপরে অন্য কোনও জায়গায়। ধীরে ধীরে আকাশের রঙ পাল্টাতে শুরু করল। সে কোন চিত্রকর যার তুলির ছোঁয়ায় আকাশের ক্যানভাস এত তাড়াতাড়ি রঙ পাল্টাতে থাকল! চারপাশের সব পাহাড় একে একে সেই আলোতে স্নান করতে লাগল। আমরা তখন মুগ্ধ, বাকরুদ্ধ। প্রণাম জানালাম দেবভূমি হিমালয়কে। মুগ্ধতা কাটিয়ে সম্বিত ফিরতে মনে হল এই পদযাত্রা যেন মুনওয়াক টু সানরাইজ।

ফেসবুক মন্তব্য