অনিন্দ্য শাব-এর পর্চা

চন্দন ঘোষ

পাইনরিজ হোটেল ছাড়িয়ে গিফট হাউস বাঁদিকে রেখে ম্যালে ঢোকার মুখেই যে কাফেটা আছে, ওখানে অনিন্দ্যর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল আচমকা। এ ভাবে দার্জিলিং-এ এসে ওর সঙ্গে এতদিন বাদে দেখা হয়ে যাবে তা কল্পনাও করতে পারেনি সুমন। সবে ধোঁয়া ওঠা কফি আর স্টাফড ওমলেট নিয়ে বসেছে, দেখে কামানো মাথা আর ছুঁচলো ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি নিয়ে ঢুকছে সেই পনেরো বছর আগে কলেজে দেখা চেহারাটা। সুমনকে দেখে অনিন্দ্য দু হাত তুলে লাফিয়ে ওঠে সহজাত ভঙ্গিতে। "আররে, বস, তুই এখানে! শালা, কোথায় ডুব দিয়ে ছিলি।"
বলেই থপ করে বসে পড়ে ওর সামনের চেয়ারটায়।" তারপর বল, গুরু, চলছে-টলছে কেমন?" সুমন বলে, "চলছে আর কোথায় ভাই, শুধু টলছে। আর টলছে। একেবারে টলমল করছে।"

বাইরে অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে। ভরা আষাঢ়ে একা একা দার্জিলিং-এ ঢুঁ মারা, সাধারণত কোনো ভেতো ছা-পোষা বাঙালী করে না। তবে কিনা ছ'ফুটিয়া সুমন কোনো কালেই ভীতু ছিল না। ধস-ফস নিয়ে ও চিন্তাই করেনি কোনোদিন । বর্ষার দার্জিলিং ওর কাছে এক ফ্যাসিনেশন। ধোঁয়া-ওঠা কুয়াশাময় বাঁকগুলোর হাতছানি ওকে মোহগ্রস্ত করে রাখে। ম্যালের পেছন দিকের রাজভবনগামী রাস্তার ওপর খাদের ধারে এক নেপালী মহিলার ছোট্ট হোটেল হাইল্যান্ডার্স ইন-এ সাধারণত ওঠে সে। কখনো কখনো রাতভোর বৃষ্টির পর সকালে কাঞ্চনজঙ্ঘা যখন ঝলমল করে ওঠে, তখন সুমন কাচের বিরাট জানলাটার এপারে ছবি হয়ে দাঁড়িয়ে সেই ছবি দেখে।

"টলছে? তা ব্যাপারখানা কী বস? ভরা বিকেলেই টেনে বসে আছ নাকি?" অনিন্দ্যর রসিকতা গায় মাখে না সুমন। "গো-কোন"-এর ছোট্টো একটা প্যাকেট তুলে ধরে বলে, "জোলো দিনে জলের নেশা নয় বস, শুকনোই ভালো। কলকাতার সেরা জিনিস সঙ্গে আছে। টানবি নাকি?" দুই মাতালের যেমন দোস্তি জমে দ্রুত, তেমনি দুই গেঁজেলেরও। ক্রমে জানা গেল, অনিন্দ্যও বর্ষার দিনে অ্যাডভেঞ্চারের খোঁজেই দার্জিলিং-এ এসেছে। ও হোয়াইট ক্যাসেল হোটেলে উঠেছে। ওয়েবসাইটে পড়ে জেনেছে যে এই হোটেলটা নাকি ভুতুড়ে। রাত্তিরে নাকি সব ভুতুড়ে আওয়াজ-টাওয়াজ হয়। তাই ও একাই এই ভুতুড়ে বর্ষায় হোয়াইট ক্যাসেলে উঠেছে। জনশ্রুতি, এই হোটেলের এক মালিক নাকি এরই একটা ঘরে আত্মহত্যা করে। তারপর থেকেই এইসব ঘটছে গত বছর তিনেক ধরে।

সুমন একটা লম্বা টান দিয়ে বলে, "তা কাল রাতে কী কী ঘটল! দেখল-টেখলি কিছু?"
"তবে আর বলছি কী,বস! কাল রাত প্রায় একটায় হঠাৎ করিডোরে কিছু একটা টেনে নিয়ে যাবার শব্দে জেগে উঠে দরজা খুলে করিডোরে বেরিয়ে দেখি, একজন বুড়ো মানুষ একটা বস্তা টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আমি চেঁচিয়ে উঠি, "হু ইজ দেয়ার"। লোকটা থামে না। আমি ওর পিছনে পিছনে এগিয়ে যাই। চেঁচিয়ে উঠি, "এই, এই, রুকো, রুকো, হু আর ইউ!" লোকটা থমকায়, তারপর ঘুরে আমার দিকে ফিরে দাঁড়ায়। তার সেই গোঁফদাঁড়ির জঙ্গলের মধ্যে থেকে জ্বলজ্বল করতে থাকা চুণীর মতো লাল চোখদুটো ভোলা যায় না। তারপর আমি একটু এগিয়ে যেতেই লোকটা হঠাৎ যেন বালি হয়ে ঝুরঝুর করে ঝরে পড়তে পড়তে একেবারে মিলিয়েই গেল। কোন চিহ্নই নেই আর। আমি হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম সেই আলোছায়াময় করিডোরে। দ্যাখ, দ্যাখ, আমি এখনো শিউরে উঠছি বলতে গিয়ে।"

সুমন সব শুনে ফ্যাক ফ্যাক করে হেসে ওঠে। বলে, "গুরু, আজ তোর একটু বেশি নেশা হয়ে গেছে। না হলে এইসব বস্তাপচা গল্প ভাটাতিস না, শালা। এখনও কলেজের সেই ঢপানোর অভ্যেসটা গেল না। এইসব আষাঢ়ে গপ্পো দুহাজার আঠেরোর আষাঢ়ে আমাকে তুমি গেলাতে চাইছ, শালা। যাক অনেকদিন পর তোর সঙ্গে দেখা হয়ে ভালো লাগল। চল ওঠা যাক। বৃষ্টিটা একটু ধরেছে।" অনিন্দ্য যেন একটু গম্ভীর হয়ে গেছে। কিছু না বলে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো। তার চোখে একটা ক্ষোভের আগুন যেন জ্বলছে।

অনিন্দ্যকে ছেড়ে দিয়ে হাতের ছাতাটা খুলল সুমন। মাঝে মাঝে হঠাৎ হঠাৎ বৃষ্টি নামছে। ম্যালের মধ্যে দিয়ে হেঁটে ভানুভক্তের স্ট্যাচু বাঁদিকে রেখে সে ম্যালের পেছনের রাস্তাটা ধরল। সন্ধে নামছে। আলোছায়ার খেলা। এই রাস্তাটা একটু নির্জন। অনেকটা হাঁটতে হবে হাইল্যান্ডার্স ইনে পৌঁছতে। অনিন্দ্যর ঢপ-দেওয়া গল্পটা ভাবতে ভাবতে এগিয়ে চলেছে সুমন। কাল সকালেই পাহাড় থেকে নেমে যাবে সে।

টিপ টিপ বৃষ্টির মধ্যে উলটো দিক থেকে একটা লোক হেঁটে আসছে। লোকটা সরাসরি ওর দিকেই আসছে। সুমন থমকায়। লোকটা ওর সামনে এসে দাঁড়ায়। "রুকিয়ে শাব", নেপালী অ্যাকসেন্টে বলে সে। সুমন অলোছায়াতে ওর মুখের দিকে তাকায়। দাড়িগোঁফ ভরা উলোঝুলো মুখ। নাকটা কেমন নীল। কিন্তু নীল কেন? আলো-আঁধারিতে তার লাল চোখ চুনীর মতো চকচক করছে। এরা খুব দেশী মাল টানে। লোকটা বলে, "অনিন্দ্যশাব ইয়ে পর্চা আপকে লিয়ে ভেজে থে।" বৃষ্টির চাপ বেড়েছে। দমকা হাওয়া। সুমন আবার লোকটার দিকে তাকায়। একি! লোকটার নাক বৃষ্টির জলে গলে যাচ্ছে নাকি। লোকটা নোংরা দাঁত বার করে খিকখিক করে হাসছে। অস্বস্তি লাগছে সুমনের। সত্যিই নাকটা এতক্ষণে গলে নীল কাদার মতো ঝুলে পড়েছে। চুল, কান, চোখ,গাল, দাড়ি সব, সব একে একে গলে যাচ্ছে বৃষ্টির জলে। সুমনের পা আটকে গেছে মাটিতে। লোকটা গলতে গলতে চোখের সামনে একতাল নীলচে হলুদ কাদা হয়ে যাচ্ছে। শুধু এখনও চুণীর মতো লাল চোখদুটো গলেনি। আর চাপা হাসিটা এখনও শোনা যাচ্ছে। সুমনের কোনো অনুভূতি হচ্ছে না। শুধু তার কোনো কথা বেরোচ্ছে না মুখ থেকে। হাতের চিরকুটটা হালকা আলোয় মেলে ধরে সুমন।

কাগজে আবছা অক্ষরে লেখা, "তোকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছিল। তাই চলে এলাম। তবে আর দেখা হবে না। বাই... অনিন্দ্য"
সুমন চমকে তাকায় সামনের দিকে। কেউ নেই। শুধু রাস্তায় একটু নীলচে কাদাজল এখনো গড়িয়ে চলেছে খাদের দিকে।

ফেসবুক মন্তব্য