বদলাক নিজস্ব গতিতে...

অর্ঘ্য দত্ত



এবছর বর্ষায় শুধু মুম্বাই নয়, ভেসে গেছে সমস্ত দক্ষিণ মহারাষ্ট্র। গত পঞ্চাশ বছরে নাকি এমন বৃষ্টি হয়নি। পুনে, সাঙলি, সাতারা, কোলাপুর, মিরাজ, নাসিকে মানুষের দুর্ভোগ এখনো শেষ হয়নি। তাদের প্রতি জানাই আমাদের আন্তরিক সহানুভূতি।

এবারের বর্ষা সংখ্যার জন্য বোম্বেDuck-এর মেলবক্স‌ও ভেসে গেছে কবিতায়। ফেসবুকে আমাদের বন্ধু নয় এমন অনেক মানুষও কবিতা পাঠিয়েছেন। এটি অবশ্যই একটি খুশি হ‌ওয়ার মতো লক্ষণ। আমন্ত্রিত কবিদের লেখা ছাড়াও মেলে পাওয়া সেই দেড়শোর‌ও বেশি কবির কবিতার মধ্যে থেকে তিরিশ জনকে বেছে নিতে গিয়ে সিদ্ধার্থর সঙ্গে আমার ফোনে ম্যারাথন আলোচনা হয়েছে। একদিন নয়, দিনের পর দিন।
আলোচনা হয়েছে কারণ আমরা বুঝতে পারছি বম্বেDuck-এর শৈশবদশা কাটিয়ে এবার নিজস্ব একটা চরিত্র গড়ে তোলার সময় হয়েছে। একটা পত্রিকার চরিত্র গড়ে ওঠে তাতে ছাপা হ‌ওয়া লেখার বৈশিষ্ট্যেই। এবং লেখা বলতেও মূলত কবিতাই। কারণ পত্রিকায় কবিতাই তো সংখ্যাগুরু। আর এই কবিতা নিয়েই সিদ্ধার্থর সঙ্গে আমার রীতিমত তর্ক শুরু হয়ে যায়। হয় মতান্তর। আসলে কবিতা বাছার ক্ষেত্রে তার ঠিক কোন লক্ষণগুলো, কোন বৈশিষ্ট্যগুলোকে গুরুত্ব দেবো সেটা আমার নিজের কাছেই এখনো যথেষ্ট পরিষ্কার হয়ে ধরা পড়েনি। আমার নিজের ভেতরেই চলতে থাকে এক নিরন্তর দ্বন্দ্ব।
সম্পাদক হিসেবে আমার নিজের ভেতরে কবিতার ভালো মন্দ সম্বন্ধে একটা সুস্পষ্ট ধারণা গড়ে ওঠা উচিত, যে ধারণার ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠবে পত্রিকার সার্বিক চরিত্র। অথচ বুঝতে পারি আমি নিজেই যাচ্ছি একটা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে। অবশ্য কেই বা নয়?
যেহেতু, আমাদের কাছে পশ্চিমবঙ্গে ছাপা হ‌ওয়া অগুনতি ছোটো পত্রিকার কোনোটাই এসে পৌঁছায় না, তাই আমাদের পত্রিকার সম্পূর্ণ কাজটাই তো প্রায় ফেসবুকের ওপর নির্ভর করে। ফেসবুক থেকেই কবি-লেখক বেছে নেওয়া, ফেসবুকেই প্রচার, পাঠক‌ও ফেসবুকেই। তা আমি খুব মনোযোগ দিয়ে এই ফেসবুকেই লক্ষ্য করি কবিতা নিয়ে অনুপম মুখোপাধ্যায় কী বলছেন, কী বলছেন সব্যসাচী সান্যাল, হিন্দোল ভট্টাচার্য বা ঋজুরেখ চক্রবর্তী। মন দিয়ে পড়ি প্রিয় কবি অধ্যাপক উত্তম দত্তের লেখা প্রতিটি শব্দ। খেয়াল করি বিভাস রায়চৌধুরী, রাণা রায়চৌধুরী, যশোধরা রায়চৌধুরীর লেখা। পড়ি অন্য অনেক প্রবীন ও নবীন কবিদের‌ও লেখা ও মতামত। আর সে সব কিছুও তো এই ফেসবুকেই।
এখানে কবিতা নিয়ে এত রকমের আলাদা ভাবনার মুখোমুখি হ‌ই! সে সবের দ্বারা প্রভাবিতও হ‌ই! সবচেয়ে বেশি যে কথাটি শুনি তা হল আজকের কবিতাকে অন্য রকম হতে হবে। কী রকম?
মনে আছে অনুপম একবার আলোচনা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, "দেখা যাক আপনার জীবনে নিজের কবিতারুচি থাকে, না আমার খারাপ কবিতা..."। ও ঠিকই বলেছিল। বুঝতে পারি কবিতারুচি পাল্টাচ্ছে, কিন্তু কবিতার কাছে আমি যা চাই, যার জন্য কবিতার কাছে গিয়ে হাত পাতি তা ভেতর থেকে না বদলালে বাইরে থেকে রুচি কেন বদলাবে? কী করে বদলাবে। এবং এই বদলানোর গতিও তো ব্যক্তির সামগ্রিক যাপননির্ভর। তাই নয় কি?
যেমন আজ‌ই চোখে পড়ল, স্বপন রায়ের পোস্ট,
"মা
বলার পরে
শুধু বলেই যাচ্ছি

বলাগুলো পাথর

মা
ভেসে যাচ্ছে শুধু"

এই আন্তরিক সৎ উচ্চারণ আমার হৃদয়কে ছুঁয়ে যায় সঙ্গে সঙ্গে। কিন্তু একজন তরুণ কবির কবিতায় যখন পড়ি, "বোতামের মধ্যে দিয়ে গলে যাচ্ছে পাশবালিশ", এই পাশাপাশি রাখা পরিচিত শব্দগুলো আমাকে কিছুই বলে না।
তাহলে, কবিতাকে আমি বেছে নেব কিসের ভিত্তিতে? চমকে ওঠায় না মুগ্ধতায়? সহজ কোনো বোধকে জটিল করে বলায় নাকি জটিল বা গভীর কোন বোধের কথা সহজ করে বলায়? ধ্বনি ও তার সূক্ষ্ম প্রসাধনের সৌন্দর্যে নাকি তার সাদামাটা চলনে? তার দুর্বোধ্যতার অপার রহস্যে নাকি তার বোধগম্যতার সীমানার মধ্যেই আঁকা আলোছায়ার আলপনাটুকুতে?
জানি, টের পাই, এ আমার একার কথা নয়, কবিতার এই দুর্ভেদ্য কুয়াশার মধ্যে দিয়েই আমরা যে যার মতো বাঁক নিচ্ছি অথবা নিচ্ছি না। স্থির করে নিচ্ছি যার যার নিজস্ব অবস্থান।
আর আমার এই অবস্থান, বা বলা ভালো আমাদের, মানে আমার, সিদ্ধার্থের, অরিন্দমের এই অবস্থান অনুযায়ীই বদলাতে থাকবে বম্বেDuck-এর‌ও অবস্থান। তার বদলানোর থাকবে নিজস্ব গতি ও বাঁক। আমাদের অবস্থানেই নির্ণিত হবে বম্বেDuck-এর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য।

আশাকরি পাঠকরাও সঙ্গে থাকবেন। কারণ বম্বেDuck-এর পাঠকের সংখ্যা যে দিনদিন বাড়ছে তা বোঝার জন্য আমাদের আর গুগল অ্যানালেটিকের দ্বারস্থ হতে হয় না।

এ কথাগুলো যখন লিখছি তখন শহর জুড়ে, দেশজুড়ে চলছে আসন্ন স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের প্রস্তুতি। দেশে শান্তি বিরাজ করুক। সার্বভৌম ভারতের সার্বিক সুস্বাস্থ্য কামনা করি।

ফেসবুক মন্তব্য