ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট

সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়


রাত প্রায় সাড়ে বারোটা বাজল, রুমির এখনও ফেরার সময় হল না, ফোন আন-অ্যাভেলেব্‌ল বলছে, এত রাত পর্যন্ত মেয়েটা যে কী করে, কোথায় যায়, কিচ্ছু জানিয়ে যায় না। সরসী ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াল, শহরের ওপর ঘন কুয়াশা নামছে। রবিবারের রাত, ভোর হতে না হতেই বাঁধা মাইনের কেজো মানুষেরা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়বে। এসময় সাধারণত মাতাল বা বিষাদগ্রস্ত মানুষেরা রাস্তা দখল করে নেয়। নতুন মুম্বাই যখন গড়ে উঠছিল তখন সস্তায় পেয়ে এপার্টমেন্টটা কিনেছিল শঙ্কর, এখন ধরাছোঁয়ার বাইরে। উঠতি ধান্ধাবাজরা মহল্লাটা দখল করে নিয়েছে। দিনমানে তারা লোভের বেসাতিতে ব্যস্ত থাকে। রাত বাড়লেই নোনা হাওয়া লেগে সভ্যছতার প্রসাধন খসে পড়ে, বখে যাওয়া বেওয়ারিশ ছেলেরা উদ্দাম মোটরবাইক দাপিয়ে বেড়ায়। সরসীর ভয় করে, মনে কুচিন্তা আসে, মেয়েটা যে কেন বোঝে না! শঙ্কর বাড়ি ছেড়ে চলে যাবার পর থেকেই মেয়েটা দূরে সরে যেতে শুরু করেছিল। যেন ব্যাপারটার জন্যে সরসীই দায়ী। অথচ বাবার সঙ্গে যেতে চায়নি।
শঙ্কর চলে যাবার পর খুব ডিপ্রেসড ছিল ক’দিন, মা মেয়ে দুজনেই। কোথাও কিছু নেই, বেডসাইড টেবিলে রাখা কাঁচের ফুলদানিটা শঙ্করের হাত লেগে মেঝেয় পড়ে ভেঙ্গে গেল। সতেরো বছর আগে বিয়েতে পাওয়া, মফঃস্বলের মানুষ তখনও ফুলদানি, কবিতার বই হাতে করে বিয়ের নিমন্ত্রণ খেতে আসত। সরসী যত্ন করে ঘষে-মেজে রেখেছিল, অবরে-সবরে ঘরোয়া অনুষ্ঠান, বিবাহবার্ষিকীতে ফুল সাজাত। চেষ্টা করলে হয়ত ভাঙ্গা টুকরোগুলো আবার জুড়ে দেওয়া যেত, কিন্তু জোড়ার দাগ থেকে যেত, চোখে বাধত। সরসীর রুচি হয় নি। শঙ্করও যে চেষ্টা করেছিল, এমন নয়। দুজনের কেউই চায়নি তিক্ততা বাড়ুক। শঙ্কর নিজে থেকেই বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিল, মূল শহরের দিকে বাসা নিয়েছিল। ঠিকানাটা বাধ্য হয়ে জানতে হয়েছিল আইন মেনে ছাড়াছাড়ি করার জন্য, তাছাড়া সরসী কোনও যোগাযোগ রাখেনি, শঙ্করও না। এমনিতে অসুবিধে নেই, ভালো মন্দয় দিন কেটে যাচ্ছে, কিন্তু তারপর থেকে রুমির সঙ্গে সম্পর্কটা আর সহজ হল না।

ঘটনাটার পর থেকে নতুন করে আবার একটা সম্পর্ক তৈরী করতে সরসীর ভয় হয়, অবসাদও লাগে। এতদিনের পলিপড়া একটা সম্পর্কে যে ফাটল ধরতে পারে সেটা বিশ্বাস করতেই সময় লেগেছিল বেশ কিছুদিন। অফিসে, আত্মীয় পরিজনের সঙ্গে দৈনন্দিন ব্যবহারে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিল। এখন অনেকটা সামলে উঠেছে। প্রবীর সে সময় অনেক সাহায্য করেছিল। প্রবীরের সঙ্গে বন্ধুত্বটা আপাতত অফিস ক্যান্টিন বা মলের ফুডকোর্টেই সীমিত আছে, তার বেশি কিছু নয়। কিন্তু প্রবীর এগোতে চাইছে, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে জানতে চাইছে – বাধা কীসের? গতকাল সারাদিন মোবাইলটা বেজে গেছে, ধরেনি সরসী। দু-একবার দেখেছে প্রবীরের কল, রেখে দিয়েছে। অফিস থেকে কাজ এনেছিল, ভাল লাগছিল না, নিয়ে বসতে। রুমি বাড়ী ছিল না, সারাদিন বন্ধুদের সঙ্গে টো টো করে ঘোরে, সন্ধ্যেবেলা মোবাইলটা এনে দিল লিভিংরুম থেকে – মা প্রবীর আঙ্কেলের মেসেজ, মেসেঞ্জারে। হটাৎ ভাবল, রুমি নিশ্চয়ই প্রবীরের মেসেজটা দেখেছে। কী লিখেছে প্রবীর? দেখল - এমন কিছু না, সাধারণ কথা, ওর একটা ডেপুটেশান হতে পারে আমস্টারডাম অফিসে, সেই নিয়ে... তবু সাবধানের মার নেই, মেয়ে বড় হচ্ছে। রুমি ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল, “মম, নেক্সট মান্থে কলেজ থেকে গোয়া যাবার প্ল্যান হচ্ছে, আমি কিন্তু যাব বলে দিয়েছি।”
“কতদিনের জন্যে যাবি? কলেজ থেকে অরগানাইজ করছে?”
“তিন চার দিনের জন্যে...”
“ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্যুর? প্রোফেসররাও যাবে তো? আমরা ইঞ্জিনিয়ারিং করার সময় জলঢাকা হাইডেল প্রোজেক্ট দেখতে গিসলুম জানিস... খুব মজা হয়েছিল। সারাদিন ঘুরে ঘুরে প্ল্যান্ট দেখা, ফিরে এসে হুল্লোড়...”
রুমি কথা কেটে দিয়ে বলেছিল, “না, না, ছেলেমেয়েরা মিলে বেড়াতে যাব, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্যুর-ফ্যুর নয়।”
এই প্রজন্মটাকে ঠিক বুঝতে পারে না সরসী। ছেলেমেয়েরা মিলে বেড়াতে যাবে, কোনও অভিভাবক থাকবে না... বলেছিল, “হ্যাঁ বলার আগে আমাকে একবার জিজ্ঞেস করতে তো পারতিস?”
“সব কিছুতেই তোমার পারমিশান নিতে হবে নাকি?” রুমি গোঁসা করে নিজের ঘরের দরজা ভেজিয়ে বসেছিল। মায়ের সঙ্গে কথা বলেনি সারা সন্ধে। রাত্তিরে খাবার জন্যে ডাকতে গিয়ে দেখেছিল অঘোরে ঘুমোচ্ছে। ঘুমন্ত মুখটায় মায়া জড়ানো। গায়ে হাত দিয়ে নাড়া দিতে, হাত সরিয়ে দিয়েছিল, খেতে ওঠেনি। সরসী সরে এসেছিল, ভেবেছিল সময় সব ঠিক করে দেবে। আজ সকালে দু-পিস টোস্ট আর একটা ডিম সেদ্ধ খেয়ে বেরিয়ে গেছে, কোথায় যাচ্ছে, কী বৃত্তান্ত কিছু বলে যায়নি, তারপর তার আর কোনও খবর নেই। আবার একবার রুমিকে ফোন করার চেষ্টা করল সরসী। নাহ... নেটওয়ার্ক ক্ষেত্রকা বাহার...। মেয়েটা কোনও বন্ধু-বান্ধবের টেলিফোন নম্বরও দিতে চায় না, যে তাদের কাউকে ফোন করে খোঁজ নেবে। ফেসবুকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছিল একবার, রুমি একসেপ্ট করেনি। বরং বিরক্ত হয়েছিল, বলেছিল আমাদের ফ্রেন্ড সার্কেলে কী কথাবার্তা হয়, তুমি জেনে কী করবে? ইদানীং রুমির বন্ধুবৃত্তটাও বদলে গেছে, কলেজে পা রাখলে যা হয়। সরসীর ভয়ানক অসহায় লাগল, এখন যে কী করে, কোথায় যায়?
ছুটকিকে একটা ফোন করে দেখলে হয়। মায়ের সঙ্গে না হলেও বিপাশা মাসীর সঙ্গে রুমির খুব ভাব। সরসীর থেকে অনেকটা ছোট বিপাশা, বম্বে আইআইটি থেকে জিওসায়েন্সে পিএইচডি করছে, হোস্টেলে থাকে। খালি সময় পেলে চলে আসে, তখন রুমি মাসীর গায়ে গায়ে লেগে থাকে, গলা জড়িয়ে ঘুমোয়। একটা রিং হতেই ছুটকি ধরল, রাত জেগে পড়াশুনো করছিল বোধয়। শুনে-টুনে বলল, টেনসান করিস না, আমি দেখছি।
“কী দেখবি?”
“আমার কাছে রুমির দু-একজন বন্ধুর ফোন নম্বর আছে, খোঁজ নিয়ে জানাচ্ছি।”
সরসীর চোখে জল এল, কোনও বিপদ আপদ হল না তো? আজকাল যা হয়েছে, নিউজপেপার খুললেই... হঠাত মনে হল রুমি শঙ্করের কাছে যায়নি তো? শঙ্করের সঙ্গে কি রুমির যোগাযোগ আছে? শঙ্করের ফোন নম্বরটা পুরনো ফোনে সেভ করা ছিল, সেটা বিগড়োতে নতুন ফোনে আর তুলে আনেনি। ড্রয়ার হাঁটকে পুরনো ফোনটা খুঁজে বার করে চার্জে দিল। ব্যালকনি থেকে বিল্ডিঙের এনট্রান্সটা দেখা যায়, একটা বুড়ো ওয়াচম্যান চেয়ারে বসে ঢুলছে। একবার ভাবল নেমে গিয়ে দাঁড়াবে, তারপর মনে হল সেটা নিতান্তই বোকামি হয়ে যাবে, ছুটকি যদি ল্যান্ড লাইনে ফোন করে! ভয়ানক অস্থির লাগছে সরসীর। এক জায়গায় থিতু হয়ে বসতে পারছে না। কিচেনে ঢুকে এক কাপ চিনি ছাড়া কফি বানিয়ে আনল, কতক্ষণ রাত জাগতে হবে কে জানে? এক চুমুক দিয়ে সিঙ্কে ঢেলে দিয়ে এল, কিচ্ছু ভালো লাগছে না। মোবাইলটা হাতে নিয়ে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াল আবার।
একটা গাড়ি এসে দাঁড়াল গেটের সামনে, হাতের মোবাইলটা বাজছে, ছুটকির ফোন, “শোন দিদি, পার্থ বলে একটা ছেলে রুমিকে নিয়ে আসছে, তুই কিন্তু ওদের একদম বকাবকি করবি না...”
“কী হয়েছে রুমির?”
“তেমন কিছু না, তোকে বললে আবার দুশ্চিন্তা করবি... একটা ক্রাইসিসের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে বেচারা...”
“ক্রাইসিস? কীসের ক্রাইসিস? কী বলছিস হাবিজাবি?”
“শোন দিদি, মাথা ঠান্ডা কর... কাল তোর সঙ্গে কথা বলব।”
গাড়ি থেকে একটা ছেলে আর একটা মেয়ে নেমে বিল্ডিঙের গেটের দিকে আসছে। মেয়েটা হোঁচট খেয়ে পড়ে যাচ্ছিল... রুমি না? গেটের আলোগুলো খারাপ হয়ে গেছে, সোসাইটির গাফিলতিতে সারানো হয় না, অন্ধকার হয়ে আছে জায়গাটা, ছেলেটা ধরে ফেলল। হ্যাঁ রুমিই, টলোমলো পায়ে হেঁটে আসছে, ছেলেটা ওর হাত ধরে রেখেছে। দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলে দিল সরসী। লিফটের দরজা খোলার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রইল। লিফট লবির দূরত্বটুকু হেঁটে আসতেই রুমি টলে যাচ্ছিল। কাছে আসতেই রুমির নিশ্বাসে অ্যালকোহলের গন্ধ পেল সরসী।
পার্থ রুমিকে নিয়ে এসে সোফায় বসিয়ে দিল। চোখ চেয়ে থাকতে পারছে না রুমি, জুতো-সুদ্ধু পা তুলেই সোফায় কাত হয়ে শুল। অন্য সময় হলে সরসী বকাবকি করত। আজ চুপ করে রইল। ছেলেটা বলল, “আন্টি, আমি এখন চলি। আমার সেল নম্বরটা নিয়ে রাখুন, দরকার হলে ফোন করবেন।”
ছেলেটাকে দেখে মনে হচ্ছে সোবার, তবু সরসী জিজ্ঞেস করল, “তুমি ড্রাইভ করতে পারবে তো? নাহলে একটা ক্যাব ডেকে নাও।”
ছেলেটা হাসল, সরল নিষ্কলঙ্ক হাসি, বলল, “আমি ড্রিঙ্ক করি না আন্টি, রুমিও করে না, আজ জানি না কেন... বারণ করলেও শুনছিল না।”
ছেলেটা চলে যেতে সরসী রুমির জুতো খুলে রাখল, কপালে হাত রেখে বলল, “ওঠ রুমি, বিছানায় গিয়ে শো।”
রুমি উঠল, উঠেই ওয়াশরুমের দিকে দৌড়ল। পৌঁছোনোর আগেই বমি করে মেঝে ভাসাল, তারপর কমোডের ওপর উপুড় হল। সরসী তাড়াতাড়ি গিয়ে ধরল, কল খুলে ঘাড়ে মাথায় জল দিল। বমির দমকে রোগা শরীরটা কাঁপছে, কী করতে যে এই সব ছাই পাঁশ গিলে এসেছে, সরসীকে শাস্তি দেবে বলে? মুখ পরিষ্কার করে, হাতের মুঠোয় জল ধরে কুলকুচি করিয়ে, ধরে ধরে নিয়ে গিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল। ফ্যানটা ফুলস্পীডে করে দিয়ে এক গ্লাস জল নিয়ে এসে মেয়ের মুখের কাছে ধরল। রুমিকে গায়ে একটা হাল্কা চাদর টেনে দিয়ে ঝ্যাঁটা বালতি নিয়ে মেঝে সাফ করতে বসল। রাত দুপুরে ভোগান্তির একশেষ! কাল আর অফিস যাওয়া হবে না। সকালে উঠেই একটা ই-মেল করে দিতে হবে। হাত মুখ ধুয়ে রুমির ঘরে ঢুকল একবার, অঘোরে ঘুমোচ্ছে মেয়েটা, ঘুমের মধ্যেই ঠোঁট নড়ছে। পাশে বসে মাথায় হাত রাখতেই সরসীকে জড়িয়ে ধরল। সরসীও আর নিজের ঘরে ফিরে গেল না। মেয়েকে জড়িয়ে ধরে মেয়ের পাশে একচিলতে জায়গায় আড় হয়ে শুয়ে পড়ল।


একটা পায়রা জানলায় বসে পাখা ঝাপ্টাচ্ছিল, সরসী ঘুম ভেঙ্গে দেখল শার্শিতে রোদ উঠে গেছে। গায়ের ওপর থেকে মেয়ের হাত সরিয়ে উঠল। মাথাটা ভার হয়ে আছে। হাত মুখ ধুয়ে চায়ের জল বসাল, জানলার পর্দাগুলো টেনে সরিয়ে দিল, নিউজপেপারটা দরজা থেকে তুলে নিয়ে এল, নতুন একটা দিন আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠছে। বেশিক্ষণ নয়, ঘন্টাখানেকের মধ্যেই শহরটা ছুটতে শুরু করবে। আজ আর সরসী পায়ে পা মেলাবে না। আজ ছুটি, ছুটি শব্দটা শুনলেই মনটা কেমন খুশি খুশি হয়ে যায়। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে ছুটকিকে ফোন করল। ঘুম জড়ানো গলায় ওদিক থেকে ছুটকি বলল, “আঃ, দিদি, একটু ঘুমোতেও দিবি না?”
সরসী বলল, “অনেক ঘুমিয়েছিস, উঠে পড়, কলেজ যাবি না?”
“আজ সকালে ক্লাস নেই, লাঞ্চের পর ল্যাবে যাব, বল কী বলছিস... রুমি কী করছে?”
“ঘুমোচ্ছে... ওই জন্যেই এখন ফোন করলাম... বল কী বলছিলিস কাল রাতে?”
ছুটকি চুপ করে রইল খানিকক্ষণ। তারপর বলল, “সিরিয়াস কিছু নয়, এই বয়সে অনেকেই... আসলে শঙ্করদা চলে যাবার পর থেকেই শী বিকেম লিট্‌ল স্কেপটিক এবাউট লাইফ। চট করে কাউকে বিশ্বাস করতে পারে না। ভাবে সবাই ওকে ঠকাতে চাইছে। এমনকি তোর বন্ধু-বান্ধবদেরও সন্দেহের চোখে দেখে... গতকালই বলছিল প্রবীর না কে...”
সরসী উদবিগ্ন গলায় বলল, “তুই এত কথা কী করে জানলি? তোকে বলেছে? আমি তো কিছু বুঝতে পারিনি। সারাটা দিন বাইরে বাইরে ঘুরে বেড়ায়... বাড়িতে থাকলেও গুনে গুনে কথা বলে।”
ছুটকি হাসল, বলল, “কী করে জানলাম? খোঁড়াই আমার কাজ, খুঁড়তে খুঁড়তে... তবে আমার মনে হয় এটা একটা টেম্পোরারি ফেজ, কেটে যাবে... লাকিলি ওর ফ্রেন্ড সার্কেলটা ভালো।”
“হ্যাঁ, পার্থ ছেলেটাকে দেখে বেশ লাগল।”
“হি ইজ আ জেম অফ আ বয় দিদিভাই, রুমি একটু অ্যাডভেঞ্চারাস, ভালনারেব্‌ল, পার্থ ওকে সব সময় আগলে রাখে। ভাবিস না, সব ঠিক হয়ে যাবে।”
কবে যে সব ঠিক হয়ে যাবে! ফোন রেখে রুমির ঘরে উঁকি দিল সরসী। রাজকন্যার ঘুম ভেঙেছে। মাথার বালিশের পাশে রাখা মোবাইল তুলে খুটখাট শুরু হয়ে গেছে। সরসী গলা তুলে বলল, “রুমি উঠে পড়, আর কতক্ষণ শুয়ে থাকবি?”
রুমি “উম্‌... মা, উঠছি, আর একটু...” বলে আবার পাশ ফিরে শুল।
কখন যে বিছানা ছাড়বে মেয়েটা! যতক্ষণ না উঠছে জলখাবার বানিয়ে লাভ নেই, পড়ে পড়ে জুড়োবে। অফিসে একটা মেল করা দরকার। নাহলে সব হাঁ করে বসে থাকবে। সরসী ল্যাপটপ খুলে বসল, কালকের পর আর প্রবীর কোনো মেসেজ করেনি। ফোনও করেনি। বোধ হয় বুঝতে পেরেছে সরসী ইচ্ছে করেই উত্তর দিচ্ছে না। ব্রাউসারে চোখ রাখতেই অবাক হল। রুমি ফেসবুকে ফ্রেণ্ড-রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছে, মেসেঞ্জারে লিখেছে - মা, আমার বন্ধু হবে? কখন পাঠালো? কাল সন্ধেবেলাও দেখেনি। হঠাত কী মতিভ্রম হল? ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট একসেপ্ট করে রুমির দেওয়ালে চোখ রাখল সরসী, বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে হাজার ছবি, মুম্বাইয়ের আশে পাশে, সী বীচে, পাহাড়ে, ভাঙাচোরা কেল্লার উঠোনে ঝকঝকে কতগুলো হাসিমুখ। দেখলেই মন ভালো হয়ে যায়।
সরসীকে চমকে দিয়ে রুমি এসে পিছন থেকে সরসীর গলা জড়িয়ে ধরল, “সরি মম্‌! ফর দ্য লাস্ট নাইট...” কখন চোরা পায়ে উঠে এসেছে টের পায়নি। মেয়ের গালে গাল ঠেকল, আঃ, কী ঠাণ্ডা! ছদ্মকোপে বলল, “সর, আর আদিখ্যেতা করতে হবে না... ভাগ্যিস ছেলেটা সঙ্গে ছিল।”
রুমি ভুরু কুঁচকে বলল, “কে পার্থ? সঙ্গে থাকবে না তো কোথায় যাবে?”
সরসী হাসি চেপে বলল, “তা অবশ্য ঠিক...”
মা মেয়েতে বেশ ভাব হয়ে গেল। রুমিকে দেখে মনেই হচ্ছে না পুরো একদিন মায়ের সঙ্গে একটাও কথা বলেনি। ব্রেকফাস্ট টেবিলে বসে দুজনে ঠিক করল খেয়েদেয়ে মলে ঘুরতে যাবে, রুমিও আজ কলেজে ডুব মারবে, বিপাশা মাসীকে ডেকে নিলে কেমন হয়... একসঙ্গে লাঞ্চ করা যাবে, পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা এমন সোনা সোনা দিনটাকে হেলাফেলায় যেতে দেওয়া যায় না। রুমি আজ কথা বলার মুডে আছে। পাহাড়ি নদীর মত কলকল করে কথা বলছে। কোনো কথাটাই শেষ করছে না। ওলট-পালট পাথর ডিঙিয়ে একটা গল্প থেকে অন্য গল্পে চলে যাচ্ছে।
সরসী আচমকা জিজ্ঞেস করল, “রুমি, বাবাকে মিস করিস?”
রুমি থমকাল, একবার জানলার বাইরে তাকাল, তারপর বলল, “নট রিয়েলি... ছাড়ো না, আজ না আমরা... থাই খাব। মলের ফুড কোর্টে একটা ‘ইয়ো থাই’ বলে রেস্তোরাঁ খুলেছে, খুব ভালো ইয়েলো কারি বানায়, পার্থরা গিয়েছিল... অনিকেতের বার্থ-ডে পার্টি ছিল।”
“তুই যাসনি?”
“আমি সেদিন বিপাশা মাসীর সঙ্গে মুভি দেখতে গেলাম না!”
“ছুটকিকে ফোন করে দেখ, আসতে পারবে কিনা।”
“দাঁড়াও দেখি...”
বিপাশা জানালো ওর একটা সাবমিশান আছে, আসা মুশকিল। ব্রেকফাস্টের পর টুক টাক কাজ সারছিল সরসী, রুমি বলল, “আমি চট করে পার্লার থেকে আই-ব্রাওজ করিয়ে আসি।”
সরসী বলল, “পার্লারে গেলেই তুই দেরি করবি।”
“ না না প্রমিস... আধ ঘন্টায় ফিরছি।”


প্রন ইয়েলো কারী আর নাসি গোরেং-এর অর্ডার দিয়ে দু-জনে পাশাপাশি আয়েশ করে বসল। একটু আগেও নেহা না কাকে দেখে রুমির মুখটা রাগে গনগন করছিল। নেহা নামের সেই মেয়েটা একটা লাফাঙ্গা টাইপের ছেলের সঙ্গে গায়ে গা লাগিয়ে ঘুরছিল। রুমি নিঃশ্বাসের নিচে একটা খারাপ গালাগালি দিয়েছিল মেয়েটাকে উদ্দেশ করে। সরসী ধমক লাগিয়েছিল, “আঃ, রুমি, ভালো করে চিনিস না, জানিস না, কী হচ্ছে?”
রুমি বলেছিল, “চিনি না আবার, কোচিং ক্লাসে আসে তো... জান না মা, রোজ একটা নতুন ছেলের সঙ্গে ঘোরে, ঘাড় ভেঙে রেস্তোরাঁয় খায়, দামী দামী জিনিষ কেনে। ছেলেগুলোও পাঁঠা, আ-তু-তু করে ডাকলেই পিছনে লাইন লাগায়।”
সরসী কথা ঘোরানোর জন্যে বলেছিল, “বাদ দে, তোদের গোয়া ট্রিপের কী হল? কে কে যাচ্ছে, পার্থ যাবে?”
রুমি ঠোঁট বেঁকিয়ে বলেছিল, “তোমার মনে হচ্ছে আমার চেয়েও পার্থর ওপর বেশি কনফি?”
সরসী হেসেছিল, “তা আর বলতে?”
রুমি নিস্তেজ গলায় জানিয়েছিল, ট্রিপ ক্যান্সেল্ড। সব বড়দের এক রা... কেউ বাড়ির থেকে পারমিশান পাচ্ছে না, “তোমাদের একটা বড় সমস্যা, আমাদের জেনেরাশানটার ওপর ভরসা রাখতে পার না।”
সরসী সে কথার জবাব না দিয়ে বলেছিল, “শপার্সে সেল লেগেছে, চল যাই। আসা হয় না...”
মা মেয়ে দুজনে মিলে আশ মিটিয়ে বাজার করেছিল, দুটো টী-শার্ট নিলে তিন নম্বরটা ফ্রী, পাঁচ হাজার টাকার ওপর বাজার হলে এক হাজার টাকার গিফট কুপন। বিল মেটানোর সময় সরসী বলেছিল, “ব্লু-টী’টা নিলি না, পছন্দ করলি যে...”
রুমি বলেছিল, “বড্ড ডিপ নেক... তার বদলে এই জিনসের জ্যাকেটটা নিলাম।”
সরসীর কোমরে আজকাল একটা ব্যাথা হচ্ছে, বেশি হাঁটা চলা করলে কোমর ছাড়িয়ে পা বেয়ে নামতে থাকে, বলেছিল, “চল, গিয়ে কোথাও বসি।”
তারপর দুজনে ‘ইয়ো থাই’... বসতে না বসতে বিপাশার ফোন এল, “কী রে দিদিভাই, দু-জনে খুব মস্তি করছিস! আমি বাদ পড়ে গেলাম।”
সরসী বলল, “সত্যি রে, এই ডে-আউটটা অনেকদিন ডিউ ছিল... তুই এলে আরো মজা হত।”
বিপাশা বলল, “খুব মিস করলাম। রুমিকে একবার দে তো।”
বিপাশা ওধার থেকে কী বলল কে জানে, সরসী দেখল রুমির মুখটা থমথমে হয়ে গেল। মেয়েটা এত মুডি, এই খিলখিল করে হাসছে তো এই আবার রাগ করে কথা বন্ধ করে দিল। রাগ পড়তেও সময় লাগে না। দু-মিনিট পরে এসে গলা জড়িয়ে সোহাগ করবে।
ফোন রেখে দেবার পর সরসী জিজ্ঞেস করল, “কী হল রে?”
রুমি জবাব দিল না, মাথা নিচু করে বসে রইল কিছুক্ষণ। যখন মুখ তুলল, চোখে টল টল করছে জল, বলল, “মা, আমি একটা খারাপ কাজ করে ফেলেছি, তোমায় বলিনি। বিপাশা মাসী বলল তোমায় জানাতে।”
সরসী শঙ্কিত হল, বলল, “কী করেছিস?”
“পরশু দিন তোমার ফোন থেকে প্রবীর আঙ্কেলের কতগুলো মেসেজ ডিলিট করে দিয়েছিলাম। বিলিভ মি, খুব বাজে বাজে কথা লেখা ছিল...”
সরসী চমকে উঠল, “সেকী?”
রুমি ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল, “মা, প্রবীর আঙ্কল ইজ নট গুড, হি ইজ আ পারভার্ট... তুমি ওর সঙ্গে ফ্রেন্ডশিপ কোরো না... প্লীজ...”
সরসী মেয়েকে কাছে টানল, “এই রুমি, কাঁদছিস কেন? চুপ কর... আবার দেখো, বোকার মত কাঁদে। আমার দিকে তাকা... শোন, প্রবীরের সঙ্গে আমার তেমন কোনো রিলেশান নেই। জাস্ট এন একোয়েন্টেন্স...”
“তোমাকে ওই রকম মেসেজ করবে কেন? হাও ডেয়ার হি...!”
“আগে তো কোনোদিন করেনি, এনিওয়েজ আ’ইল টেল হিম নট টু... স্ট্রিক্টলি... শোন, কাঁদিস না, লোকে দেখছে...”
রুমি চোখ মুছে সুস্থির হয়ে বসল। মনে হল লুকনো কথা বলে ফেলে রুমি অশান্তির হাত থেকে রেহাই পেয়েছে। আসলে একবার কেঁদে ফেলতে পারলে মাথার ভার নেমে যায়। মনে হয় চারদিকের পৃথিবীটা বেশ আলো আলো, মানুষজন হাসিখুশি। হঠাত করে আদ্দিকালের পচা জোকস মনে পড়ে যায়, পেট খিদেয় চন চন করে ওঠে। ওয়েটার খাবার সার্ভ করে দিয়ে গেল, রুমি গব গব করে খেতে খেতে বলল, “আর একটা আইটেম অর্ডার করব।”
সরসী চুপ করে মেয়ের খাওয়া দেখছিল, মাঝে-মধ্যে দু-এক চামচ মুখে তুলছিল, বলল, “কর না... একটা ফিশ বল না হয়...”
“না, চিকেন...”
“আচ্ছা, তাই বল।”
দিনটা এত ভালো যাবে সরসী ভাবতেও পারেনি। খেয়ে দেয়ে মাল্টিপ্লেক্সে একটা সিনেমা দেখতে ঢুকল দু-জনে। সিনেমা দেখতে দেখতে এসির ঠাণ্ডায় সরসীর চোখ লেগে আসছিল। গত রাতের অনিয়ম শোধ নিচ্ছিল। রুমির খোঁচা খেয়ে আবার নড়ে চড়ে বসল। সিনেমা দেখে বেরিয়ে সরসী বলল, “দহি-পাপড়ি চাট খাবি রুমি?”
রুমি এক পায়ে খাড়া। চাট খেয়ে রুমির ঝাল লেগে গেল। উলুস-উলুস করে জিভে ঝোল টানতে টানতে চকোলেট ডোনাট আর ফ্রুট জ্যুস আনতে দৌড়োল। সন্ধে গড়াতেই দুই সখীর অপরাধবোধের ঘন্টি বেজে উঠল। সরসী বলল, “আজ অনেক হাবিজাবি খাওয়া হয়েছে, রাতের খাওয়া বাতিল।”
রুমি বলল, “আমারও...”
বাড়ি ফিরে রুমি বাইরের জামা কাপড় না ছেড়েই বিছানার ওপর ধপাস করে শুয়ে পড়ল। সরসীর হাজার ডাকাডাকিতেও উঠল না। শেষে সরসী হাল ছেড়ে শুতে গেল। কাল অফিস, সকালে বেরনো। চোখে মুখে জল দিয়ে, আলগা রাত পোশাক চড়িয়ে বালিশে মাথা রাখতেই চোখ জুড়ে ঘুম এল। এক চটকা দিয়ে আবার ভেঙে গেল। ঘরের আলোটা নেভানো হয়নি। একটা অস্বস্তি... যে মেসেজগুলো রুমি ডিলিট করে দিয়েছিল তাতে কী লিখেছিল প্রবীর? কী এমন বাজে কথা লিখেছিল? আগে দু-একবার ইয়ার্কির ছলে আলগা কথা বলেছে, সরসী প্রশ্রয় দেয়নি। অবশ্য না জানলেও কিছু যায় আসে না। এমনিতেও সম্পর্কটার মুখে নুন-ডলা দিতে হতই। তবু একটা কৌতূহল। মেসেজগুলো যদি রুমি রেখেই দিত কার কী ক্ষতি হত? প্রবীরকে কিছু বলতে হলেও তো মেসেজগুলো দেখাতে হত। ঘুমটা চটে গেছে, মাথার বালিশের পাশ থেকে মোবাইল ফোন উঠিয়ে মেসেজ চেক করল সরসী। কোনো আনরেড মেসেজ নেই। প্রবীর অফলাইন। আঙুল দিয়ে স্ক্রিন টেনে আপডেট করল। প্রবীর যদি সরসীর নামের পাশে সবুজ আলো দেখে কিছু বলতে চায়! একবার, দুবার, তিনবার... আপডেট করতেই থাকল, যতক্ষণ না আঙুল ব্যথা করে, যতক্ষণ না ঘুমের ভারে হাত থেকে মোবাইলটা খসে পড়ে।

ফেসবুক মন্তব্য