বনমোরগ

উত্তম বিশ্বাস

ইন্দ্রচূড় ওয়াচটাওয়ারের ওপর থেকে বেশ কয়েকদিন ধরে বাইনোকুলারে বনের গতিবিধির দিকে নজর রাখছেন রমণীমোহন। উনি ফরেস্ট রেঞ্জার অফিসার। গড়িয়ে পড়া পাইনবনের কোলে উনার সুসজ্জিত বাংলো। বনের গভীর থেকে মাঝে মাঝে একটা ডাক এসে ওঁকে অস্থির করে দেয়। বিশেষত বর্ষা বাদলের রাত্রে ঘন মেঘের কালি মেখে পাহাড়ের কোলে অরণ্যানী যখন একা একা প্রলুব্ধ জোনাকির মালা গাঁথে, তখন উনি আহার নিদ্রা ভুলে একগাছি সরু সুতো নিয়ে মোড়ায় বসে বসে গিঁট দিতে থাকেন। কোনও কোনও দিন আলো হাতে এগিয়ে আসে ভীম রাও। সে রমণীমোহনের সেবক। খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে সেও সোৎসাহে জিজ্ঞাসা করে, “বাবু, এতো রাতে জেগে জেগে ফাঁস বানাচ্ছেন কী ব্যাপার?”

অফিসার আপন কাজে মগ্ন থেকেই ভীমকে বলেন, “রাত হলে কোনও শব্দ পাস?” ভীম যেন কিছুই বুঝল না। সে ঘুম জড়ানো চোখ দুটিকে আচ্ছা করে রগড়ানোর জন্যে আরও একটু অবসর চাইল। মুহূর্তের মধ্যে গুড়ুম গুড়ুম করে মেঘ ডেকে উঠল। সেই সাথে কুহকিনী সেই ডাক। রমণীমোহন আবার অস্থির হয়ে উঠলেন, “কী রে, শুনতে পেলি কিছু?”

-“হ্যাঁ বাবু, রাতে খুব বারিষ হবে মনে হচ্ছে। গেটের কাছে আর দুটো আগুনের মশাল জ্বেলে দিই? হাতির পাল আজ পাহাড় কাঁধে নিয়ে নামবে মনে হচ্ছে!”

-“আর আজ যদি একপাল গন্ধ শুকর নিয়ে ডাগর নেমে আসে? আমি প্রায়শই ওয়াচটাওয়ার থেকে দেখতে পাই, একটি ঝকঝকে তামার কলস গড়িয়ে গড়িয়ে নিচে নামছে! —ওটাই কি তোর বৌ ভীম?” ভীম নিজের ব্যস্ততায় ফিরে যাছিল। তার আগেই রমণীমোহন খপ করে ওর হাতখানি ধরে বললেন, “রাত আর কতটুকুই বা বাকি। আর শুয়ে কাজ নেই। আমার সাথে চল।” কথাটায় কেমন যেন মুগ্ধতার আঠা মাখানো। তাই কোনোরকম বায়নাক্কা দেখানোর আগেই ভীম আজ মন্ত্রচালিতের মতো রমণীবাবুকে অনুসরণ করে এগিয়ে চলল।

এখন রাত হলেই ডাগরের কথা মনে পড়ে। ডাগর ভীমের স্ত্রী। মাত্র মাস খানেক আগে বিয়া হয়েছে ওদের। কিন্তু ভীম তো রমণী বাবুর নাইট অফিসার। যখন তখন বৌএর কাছে যেতে চাইলে তিনি ওকে ছাড়বেন কেন? সোফার অদূরে একটি টুল টেনে নিয়ে বসে বসে গল্প শোনে ভীম। অফিসার কড়া কফিতে চুমুক দিতে দিতে বলে চলেন, “মেঘের সাথে যে ওদের এই বিষয়টার কী সম্পর্ক আছে আমি আজও উদ্ধার করতে পারলাম না।”

-“কোন বিষয়টা বাবু?” রমণী এমন বোকা বোকা প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করলেন না। খোলা জানলার ফাঁক দিয়ে যেন সেই পেতে রাখা ফাঁসটার কথা কল্পনা করতে লাগলেন। কিন্তু পরক্ষণেই আবার বলে উঠলেন, “কী অদ্ভুত তাই না! একজন নেচে নেচে অস্থির হয়ে কামপরাগ ছিটিয়ে দেবে, আর অন্যজন সেটা খুটে খুটে খাবে! শুধু যে খাবে তাই নয়, সে গর্ভবতীও হবে!” ভীম সঙ্কোচে শামুক হতে থাকে। এবার অফিসার উৎসাহ জাগিয়ে জিজ্ঞাসা করেন, “কী রে, ডাগর যদি কোনোদিন বলে, আজ সারারাত নাচ করে দেখাও। পারবি?”
-“সত্যি কথা বলতে কী বাবু, আমার ওসব ভাল্লাগে না।” এতক্ষণ এই কথাটিই যেন শুনবার জন্যে উদগ্রীব ছিলেন রমণী বাবু। উনি তড়াগ করে উঠে গেলেন ভেতরের ঘরে। পুরনো শিশি-কৌটো উলটে কীসব শেকড়বাকড় গুড়ো করা এক চামচ আয়ুর্বেদিক চূর্ণ এনে বললেন, “নে হাঁ কর তো দেখি।”

-“এহ! কী এটা? ক্যামন কষ।”

-“হাহাহা। আগে ঢোকটা গেল তো। তারপর এর জাদু দেখবি। এটা আমি নিজের হাতে বানিয়েছি। এর নাম দিয়েছি রতিরজত চূর্ণ।”

এরপর মিনিট দশেক পর থেকে আবার সেই ভিজে কলাপের গল্প প্রথম থেকে শুরু করলেন, “কী যেন ভাল্লাগে না বলছিলি? কী ভাল্লাগে ভীম?—এবার বল কী ভাল্লাগে তোর?”

ভীম পোড়লাগা পাথরের পুতুলের মতো চুপ করে রইল। এবার কিন্তু রমণীমোহন সত্যি সত্যি ঘাবড়ে গেলেন। লক্ষ্য করলেন, ভীমের চোখ থেকেও যেন আগুন ঠিকরে বেরোচ্ছে। আর তরল লাভার মতো রগ বেয়ে দরদরিয়ে ঘাম ঝরে পড়ছে। চোখমুখের এমন অভিব্যক্তি যেন এখুনি মানুষ খুন করতে পারলে হয় ভালো! হঠাৎ ভীম পাইনকাঠের টুলটাকে লাথি দিয়ে উঠে দাঁড়াল, “আমি মোকান যাব সাহাব। কিছু তাজা মাংস আমার এখুনি দরকার!”

-“ইউরেকা!” যেন কোনও এক অলিখিত আবিষ্কারের আনন্দে রমণীবাবু লাফিয়ে উঠলেন। এবার উনি ভীমের ঘাড়ে আলত সুড়সুড়ি দিয়ে শান্ত করার কৌশল নিয়ে বললেন, “তুইও যাতে সন্তুষ্ট হোস, অলরেডি সে ব্যবস্থাও আমি করে রেখেছি। কালই শহর থেকে এটা আনিয়েছি। এবার বল, আর না করবি না নিশ্চই? এই নে। দেখিস এটা যেন আবার আমার পেটে চালিয়ে দিস না!” পেতলের হাতলওয়ালা একখানি ভারি ছোরা ওর হাতে দিলেন। সাহেবের হাতে এমন ধারালো অস্ত্র দেখে ভীমের চোখদুটো কাচের গুলির মতো ছিটকে বেরনোর উপক্রম হল।

এ মহল্লায় মোরগ বাং দিলে তবেই ফর্সা হয়। এখানকার গাছ প্রাণী সবারই সেই একই বিশ্বাস। কিন্তু সেদিন বনমোরগ বাং দেওয়ার আগেই রমণী আর ভীম ভিন্ন ভিন্ন পথ অনুসরণ করে যে যার বাসার দিকে ছুটলেন। ডাগর উঁচু গাছের ডালে মাচা বেঁধে একা একা থাকে। আজ ভীম একমুঠো সজারুর কাটা হাতে নিয়ে তড়াগ করে লাফিয়ে উঠল। কাঁটাগুলো ডাগরের খোঁপায় পুঁতে দিয়েই ওর ঠোঁট কামড়ে ধরল। ভীমের মধ্যে ভয়ঙ্কর এক দানবকে দেখতে পেল ডাগর। সে মাচা থেকে ঝাঁপ দিয়ে বনের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল। ভীমও পেছন পেছন ছুটল। কিন্তু পেল না।

ইদানীং সাহেব বাংলোতেই ভীমের পাকাপাকি বাস। সে আর মাচার মকানে শুতে যায় যায় না। কেননা সেখানে ডাগর নেই। কৌতূহলীরা কেউ ব্যথা জাগিয়ে জানতে চাইলে, ভীমও দীর্ঘশ্বাস চাপা দিয়ে বলে, “ওই যে চিতায় নিল। এই দেখো আমার পাঁজরেও নখের দাগ!” কিন্তু বয়স্কদের সাথে এমন সপাট মস্কারা করতে পারে না ভীম। সে কিছু বানিয়ে কিছু সহানুভূতি মাখিয়ে বলে, “বাপঘর গেল। পাহাড়ের ওই উলটো ঢালে। অভিমানে আছে। আজদিন যাক। কাইল নিশ্চই লিয়ে আসব।”

কিন্তু আজদিন আর আসে না। ভীমের জীবনে শুধুমাত্র রাতই আসে। সেও এখন সরু সুতোয় গিঁট দিয়ে ফাঁস বানাতে পারে। আজকাল সেও মনে মনে আপন ভাষায় কত শত ময়ূর ময়ূরীর কলাপগাথা রচনা করে রমণীমোহনকে অবাক করে দেয়। কিন্তু হলে কী হবে, সেইসাথে ওর উপদ্রবও বেড়েছে শতগুন। দিনের বেলা ডিউটি আওয়ারে চড়চড়িয়ে ওয়াচটাওয়ারে উঠে পড়বে। বাইনোকুলারে হাত দেবে। লেন্স ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পাহাড় জঙ্গল টি-গার্ডেন সব তন্ন তন্ন করে উল্টেভেজে দেখে, বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলে তবে সেখান থেকে বিদায় নেবে। তবে কী কাউকে খোঁজে ভীম? কেউ হয়ত মজা মেরে বলতে চেষ্টা করেন, টি-বোর্ডের পেছনে যে সরু উৎরাই আছে, ওখানে দেখলাম একটা মেয়ে লুকের খোবলানো গতর পড়ে আছে। এই বয়েস বেশি না বড়ো জোর আঠারো উনি--!”

ভীম ওসব কথাক্যাচালদের ধমকি দিয়ে থামিয়ে দিয়ে বলে, “শোন বোকাচোদা, আমার ডাগর না এককালে চিতাবাঘের চাম দাঁত দিয়ে ছাড়াত!”

রাত হলে এখন আর ভীমকে পীড়াপীড়ি করা লাগে না। চাকুতে শান দিয়ে রমণীর সামনে এসে দাঁড়ায়, “বাবু, আর একচামচ হবে?” রমণী বুঝতে পারেন ভীম কী চাইছে। উনি চূর্ণটুকু দিয়েই তৎক্ষণাৎ নিরাপদ দুরত্ব নিয়ে সরে দাঁড়ান। ভীম যেন কামাতুর দৃষ্টিতে অফিসারের চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞাসা করে, “বাবু, এইবার বলুন তো আপনার ভাল্লাগে ওই ডাক?”

রমণী বাবু হতচকিত হয়ে জিজ্ঞাসা করেন, “কীসের ডাক ভীম?”

ভীম চুপ করে থাকে। কিছুক্ষণ পরেই আবার জিজ্ঞাসা করে, “হাহাহা কী আবার মুরগা! শহরে কী আপনারাও মাচায় থাকেন বাবু?” কথাটায় কোথায় যেন একটুখানি হেমলক মাখানো আছে। রমণীবাবু আর ভীমকে উত্যক্ত করলেন না। পিঠে হাত বুলিয়ে একপ্রকার ছেলেভুলানোর মতো করে জঙ্গলে ঠেলে পাঠালেন, “যা ভীম। সত্যি বলছি আজ আমারও খুব মাংস খেতে ইচ্ছে করছে। মরাল মুরগা যা পাস মেরে নিয়ে আয়। দুজনে জমিয়ে খাব।”

ভীম যেন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারে না। মনে মনে ভাবে,“বাবুর মাথার ঠিক আছে তো?” এবার সে সত্যি সত্যি সিরিয়াস হবার ভঙ্গি করে বলে উঠল, “আর আজ যদি আপনার পাতা ফাঁদে অন্য ময়ূর পড়ে?”

রমণীবাবু কথাটায় যতটা সম্ভব তুলো বেঁধে দিতে চাইলেন,“এ ফরেস্টে আদৌ ময়ূর আছে কিনা তুইও তো বলতে পারিসনি। আর ফাঁদের কথা বলছিস? ওই দেখ, সুতোগুলো সব পুড়িয়ে দিয়েছি।”

এবার ভীম আরও ভারি গলায় জানতে চাইল, “তাহলে বৃষ্টির রাতে কীসের ডাক শোনেন?”

-“আগে তাজা মাংস তো আন। আগুনের পাশে বসে আজ নতুন একখান ফাঁস বানাতে শেখাব তোকে।”

অনেকক্ষণ হল মালকোঁচা মেরে বেরিয়ে গেছে ভীম। রমণী মল্লার রাগে গুনগুন স্বরে গাইছেন, “প্রিয় আবে আয়ো রে! গির গ্যায়া চাঁদ। আয়ো আঁধি। প্রিয় আবে তুম শাম রে। শাম রে। শাম রে।”

কিন্তু কী মনে হতেই ঘরে ঢুকে শিশি কাঁচিয়ে দুচামচ রতিরজত চূর্ণ জলের সাথে গুলে খেয়ে নিলেন। এতদিন কেবল ডিউটি শেষে বনবাদাড় ঘেঁটে নিজের খেয়ালে আবিষ্কার করে গেছেন, কিন্তু নিজের কায়ম চূর্ণ নিজের ওপরে প্রয়োগ করার সাহস দেখাতে পারেনি। ভীমের বলিষ্ঠতা ওর উগ্র চাহনি, বুনো শুকরের মতো প্রবৃত্তি তাড়না দেখে রমণী যারপরনায় পুলকিত হয়ে উঠলেন। চূর্ণটুকু গলাধঃকরণ করার পর বাইরে এসে বেশ খানিকটা সময় বৃষ্টির ধারাজলে ভিজলেন। পাহাড়ি বর্ষা। অল্পতেই কাঁপন ধরিয়ে দেয়। ঘরে এসে আগুন জ্বাললেন। ঢকঢক করে একাই একটা বিয়ারের বোতল খালি করলেন। বৃষ্টির ছাট লেগে ওঁর হৃদয়জুড়ে মুহূর্তে মুহূর্তে কী অপূর্ব সব অনুভূতির অঙ্কুর উত্থিত হতে লাগল। ঘর নেই-- পরিচিত বন্ধু বান্ধব নেই... স্ত্রী নেই... পুত্র-কন্যা নেই — স্বজন সোহাগ নেই। আছে কেবল ভীমরাও – ওয়াচটাওয়ার... জঙ্গল হাতির পাল... আর দুর্জ্ঞেয় সেই নিশিডাক। এতদিন যে শহরটাকে হৃদয়মধ্যে ছুটিযাপনের একটুকরো আশ্রয় হিসাবে এঁকে রেখেছিলেন, সেটাও যেন এই মুহূর্তে মুছে যাওয়া মরীচিকার মতো মনে হতে লাগল। এরপর সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে হাঁক পাড়লেন, “ভীম্মম্মম্মম্মম!”

রাত তখন দুটো কিম্বা আড়াইটে হবে। ভীম যেন কাছাকাছিই ছিল। এমন একটা আস্কারাসূচক ডাকের জন্যে সে যেন মুখিয়ে ছিল। রক্তাক্ত অবস্থায় ভীম বাংলোর কাছে এসে হাঁক দিল, “বাবু, আছি তো। দরজা খোলেন।”

রমণীমোহন পাল্লা ঠেলে বাইরে আসতেই ওঁর পায়ের কাছে দড়াম করে একটা দেহ ফেলে দিল। রমণী আঁতকে উঠলেন, “এ কী! কাকে হত্যা করেছ ভীম?”

-“বাবু, এটা একটা মাগী শুকোর! জঙ্গলের ত্রাস। পাঁচ পাঁচটা কাঠ-মাফিয়ার কলিজা খেয়েছে ও।”

-“কী বললি!”

-“হ্যাঁ সাহেব, গেল মাসে পাইন কাঠের জঙ্গলে যে বডিটা পড়ে ছিল, আপনি তো পুলিশের খাতায় চিতার গল্প ফাঁদলেন। কিন্তু আমি জানি আসল ঘাতক কে!”

-“কী বললি, তুই সব জানিস?”

-“বিশ্বাস হয় না? গতবছর ছোট সাহেবকে সজারুর মাংস বলে যেটা খাওয়ালেন সেটাও কি মিথ্যে?”

ভয়ে রমণী ভেতরে ভেতরে ভীষণভাবে গুটিয়ে গেলেন। বিশেষত এ ফরেস্টের উনি হেড অফিসার। একবার যদি কোনোপ্রকার প্রমাণিত হয়ে যায় যে তাঁর মদতেই এসব হত্যালীলা সংগঠিত হচ্ছে, তাহলে কপালে কোন কোন সাজা অপেক্ষা করছে মুহূর্তের মধ্যে সেসব ছবি নিজের স্ক্যানে এঁকে নিয়ে ওঁর হাড় হিম হয়ে এল! রক্তে ভেসে যেতে লাগল বনবাংলোর মোজাইক করা মেঝে। পশুর দেহটা তখনও সমস্ত শিরা উপশিরা মুচড়িয়ে চারপা ছুড়ে ছটক মারছিল। মনে হল সেইসাথে ভীমও তার ধ্বস্ত শরীর নিয়ে থরথরিয়ে কাঁপছে।

-“ওখান থেকে তুই এক পা’ও নড়বিনে। আমি আসছি। দাঁড়াবি বলছি।”

কাঁধের ওপরে একটুকরো কাপড় ফেলে লকার থেকে বন্দুক বার করলেন। কার্তুজ ভরতে ভরতে বাইরে এসে দেখলেন ভীম সেখানে নেই। মুহূর্তে অনেকপ্রকার দুশ্চিন্তা মাথার মধ্যে একসাথে দলা পাকিয়ে গেল। কিন্তু বেশি ভাবারও সময় নেই। একটু পরেই মোরগ বাং দেবে। চারিদিক ফর্সা হয়ে আসলে সর্বনাশ! তার আগেই যা করার করতে হবে। এবার উনি একাই বিরাট এক দৈত্যাকার দেহ টানতে টানতে রক্ত ছড়াতে ছড়াতে বনের গভীরে ঢুকে গেলেন। বিরক্তি ও বিকট গন্ধের সাথে ভেতরের নাড়ি যেন একেবারে উলটে আসতে লাগল। একে নেশা করেছেন। তার ওপর নাভিমূলে কীসব শেকড়বাকড় পড়েছে! টাল খেয়ে খেয়ে উল্টোপাল্টা পা ফেলতে লাগলেন। কিন্তু উনার মস্তিষ্ক তখনো অদ্ভুতভাবে সজাগ। এ অবস্থায়ও মাথার ভেতরে একটাই চিন্তা, “যে করেই হোক একটা গর্ত আমাকে খুঁজে বার করতেই হবে।”

জলেধোয়া আবীরের টিপের মতো আকাশে তখন একটুখানি চাঁদের উপস্থিতি। শুকরটি শুইয়ে রেখে, ভাবরার জন্যে আরও একটুখানি সময় নিলেন রমণীবাবু। কোন রুটে গেলে সহজেই হাতিমারা গর্ত পাওয়া যেতে পারে। অথচ হাতিমারা গর্ত আদৌ থাকা সম্ভব কিনা এ নিয়ে তিনি নিজেও সন্দিহান ছিলেন। কিন্তু ভীমের মুখে এসব গল্প তিনি বহুবার শুনেছেন। আরও খানিকটা অগ্রসর হতেই ভীমের কথাই সত্যি হল। ওয়েস্ট সেকশানের শেষাশেষি বেশ কিছু ছোটবড় গর্তের দাগ দেখলেন তিনি। এবার তিনি মরিয়া হয়ে পুরু চটের মতো ভিজে ভিজে পাতা ঠেলতে লাগলেন। কিন্তু হায় এ কী অঘটন ঘটল! অন্ধকারে ডালপাতার ফাঁক দিয়ে কেউ যেন পা ধরে টানল? ব্যাপারটা বুঝে উঠবার আগেই এবার তিনি শুকর সহ এক গভীর গর্তে পড়ে গেলেন।

-“হাঁ ঈশ্বর! এখানে এমনভাবে মৃত্যুকূপ কে খনন করে রাখল?”

এরও চেয়ে যেটা আতঙ্কের, গর্তের মধ্যে প্রেতাত্মার মতো হাউমাউ করে ককিয়ে উঠল এক ক্ষীণস্বরা বামাকণ্ঠ। এরপর ওখান থেকে যে সংলাপগুলো উত্থিত হচ্ছিল, তা কিছুটা এইরকম, “আমার শুকরটাকে এভাবে হত্যা করলে? এই তো আমার শুকোর। এতদিন এর দয়ায় আমি বেঁচে আছি।”

রমণীবাবুর নেশা তখন কর্পূর হয়ে উড়তে শুরু করেছে, “সামান্য একটা শুকর তোমাকে কীভাবে দয়া করল? তুমি কে? কে তুমি?”

অর্ধমৃত শরীরটা যেন সোজা হয়ে দাঁড়াবার মরিয়া চেষ্টা করল। কিন্তু পারল না। যতবারই চেষ্টা করল, ততবারই অন্ধকার গর্তের মধ্যে টাল খেয়ে পড়ে যেতে লাগল। এবার সে ওই অবস্থায় মরিয়া হয়ে বলে উঠল “আমি? আমি।”

-“আমি মানে? প্রেত না মানব? নাম নেই কোনও? আমি কে?”

-“আমি ডাগর! এই তো ওর থ্যাবড়া মুখ। যেটা দিয়ে ঠেলে আনা বনের বীজ, বিষ্ঠা খেয়ে আমি বেঁচে আছি। ক্যানো আমার শুকোরটাকে তুমি এভাবে...!” শেষ কথাটি অসম্পূর্ণই রয়ে গেল। তার আগেই সে গর্তের গহীনে রমণীমোহনের কোলেই লুটিয়ে পড়ল।

এবার উনি আর্তনাদের চেয়ে আরো আশঙ্কা জাগিয়ে ডাকলেন, “ভীম রাওওওওও!”

পরদিন রাত পোহানোর আগেই রমণীবাবু গ্রেপ্তার হলেন। বন্যপ্রাণী হত্যা, নারী নির্যাতন, চোরাচালান সহ তাঁর ওপর একাধিক ধারা প্রয়োগ করা হল। সাক্ষী একমাত্র সেইইই ভীম রাও। প্রথম যেদিন ওকে আদালতে সাক্ষী দেওয়ার জন্যে শমন পাঠানো হয়েছিল, সেদিনই ও অনেকগুলো সুতোর ফাঁস আর পুরনো শিশি-বোতল, দেখিয়ে বিচারপতিকে বলেছিল, “হুজুর, রোজ রাতে বাবু এইসব খেয়ে অসভ্যতামিগুলো করেন। আমাকেও খাইয়েছেন। আমি জানোয়ার হয়ে গেছি। সত্যি বলছি, আমিও আগে মানুষের মতো ছিলাম। বিশ্বাস না হলে এর থেকে একচামচ মুখে দিয়ে দেখুন আপনিও...! জঙ্গলের কোথায় কোথায় গর্ত আছে, আমি সব জানি হুজুর। তাই তো ভাবি, আমার ডাগর মাচা থেকে সেই যে একখান ঝাঁপ দিল। এইবার বুঝলাম আস্ত একটা মেয়েলোক চোখের পলকে অদৃশ্য হয়ে গেল কী করে!”

ইন্দ্রচূড় ওয়াচটাওয়ারে এখন নতুন ফরেস্ট অফিসার। রমণীবাবু যে বাংলোয় থাকতেন রাতের অন্ধকারে সেটা অবশ্য কারা যেন ভেঙে গুড়িয়ে দিয়ে গেছে। নতুন আফিসার এসেই অনেকগুলো পদক্ষেপ গ্রহন করেছেন। নরম রুমালে বাইনোকুলারের কাঁচ মুছে নিয়ে জঙ্গলের গভীর থেকে আরও গভীরে কেবলই চক্রাকারে ঘোরাতে থাকেন। জঙ্গল একপ্রকার নিস্তব্ধ। তবে হাতির পালের তাণ্ডবলীলার খবর পেলে মাঝে মাঝে কুনকি পাঠিয়ে এসব উৎপাতকে কিছুটা হলেও ঠেকিয়ে রাখার চেষ্টা করেন। পুরনো গর্তগেড়ে দেখলেও সাথে সাথে তার তলা পর্যন্ত খুড়ে ফ্যালার নির্দেশ দেন। ইদানীং পাহাড় ভেঙে প্লাবন নামলেও ছোটখাট বনমোরগ ছাড়া তেমন কোনও শব্দ শোনা যায় না। তবে রাতের বনপ্রহরীদের মুখে মুখে প্রায়শই একটি কথা ফিসফাস ভেসে আসে, “ডাগর যে গাছে মাচা বেঁধে বাস করত, তার নিচে একটি কৃষ্ণকায় দানব আকাশে মেঘ দেখলেই নাকি সারা শরীরে লতাপাতার সাথে ময়ূরের পেখম পেঁচিয়ে, কান্নার চেয়ে আরও কর্কশ শব্দ করে করে প্রলয় নাচ নাচে।”

ফেসবুক মন্তব্য