অন্দরের দুগ্গা

মেঘনা রায়

শেষ বেলার বৃষ্টি দুলে দুলে মুখস্থ করছে, “এসেছে শরৎ হিমের পরশ লেগেছে হাওয়ার পরে…”
আমি বেশ ছোট স্কুলেই পড়ি, এই আশ্বিন মাসের পুজোর ছুটিতে আমাদের কোলকাতার মানিকতলার বাড়িতে আমার শ্রীচরণ রাখতাম। তখন দূরাভাষের বনেদিয়ানা ছিল না, কিন্তু কী করে যেন আমার শাগরেদ ছোড়দিটিও এসে নাম লিখিয়ে ফেলত দলে। আমাদের সব ভাই বোনদের কাছে মানিকতলার বাড়িটা ছিল অফুরন্ত খাজানার এক অলিখিত ভান্ডার। আমার ঠামা তার আশি বছর বয়স পর্যন্ত প্রাণপণে সেই বাড়ি আগলিয়ে রেখেছিলেন। লক্ষী পুজোর নাড়ু, নাড়কেলের তৈরি আচারমাথা, খইয়ের উপড়া, শীতের মরশুমে হাতে করা বড়ি, নতুন পাটালিগুড়ের চসীর পায়েস, ইত্যাদি উপচে পড়া সুখ দিয়ে। সেই সব সুখের সুবাস এখনও যেন ঘিরে রাখে আমায়। তাই এই বাড়ির প্রতি এক দুর্নিবার আকর্ষণ যা চোরা স্রোতের মতো এখনো মনের মধ্যে ঘাই মারে। এই বাড়ির পিসি কাকুর হাত ধরেই আমার উত্তর কোলকাতা চিনতে শেখা। এই বাড়ির অন্য়তম বাসিন্দা আমার ছোট পিসির হাত ধরেই হেদুয়াতে জলকেলি দেখা থেকে শুরু করে, বিশাল টানা রিক্সা চড়া, সিমলেতে বিবেকানন্দের বাড়ি দেখা। সেই দেখাকে স্টার থিয়েটার থেকে পরেশনাথের মন্দির হয়ে পায়ে পায়ে কলেজ স্ট্রিটের কফি হাউজের থেকে কফি খাইয়ে সোজা নিয়ে গিয়েছিল কোলকাতা বুক ফেয়ারে।
সেই কোলকাতার আত্মাকে তখন যেন দিব্যিে ছুঁয়ে দেখা যেত। আমার ছোটবেলা, শুধু ছোটবেলাই বা বলি কী করে? আমার জীবনের আধখানার সাথেও পরজীবীর মতো জড়িয়ে আছে মানিকতলার বাড়ি আর উত্তর কোলকাতার দুর্গা পুজোর স্মৃতি। আজ মধ্য বয়সে ঝাঁপি খুলে মাঝে মধ্যে দেখি, যত্ন করে ধুলো ঝেড়ে আবার ঝাঁপিতে রেখে দি।
আগমনীর উৎসবের শুরু থেকে বিদায়ের করিশমায় তখনও থিম পুজো আগ্ৰাসী থাবা বসাতে পারে নি। আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু অবশ্যই ছিল মা দুর্গা। আহিরিটোলা, কলেজ স্কোয়ার, বাগবাজারের বনেদি পুজোর পাশে আমাদের গলির পুজোর ত্রিনয়নী এসে যেন সারা বছরের জীবনমুখী গল্প শোনাত।
চতুর্থীর সন্ধ্যায় বাড়ির মনুকাকু, হঠাৎই বোমা ফাটালো, আমাদের রায়চৌধুরী বাড়ির একটা যে প্রেস্টিজ আছে, সেটার কথা কেউ মনেই রাখছে না। পাড়ার প্যােন্ডেলের কুঁচির কাজ চলছে আর আমরা এখনও হাত গুটিয়ে বসে আছি! বলাই বাহুল্য সেই বোমার স্প্লিন্টারটা যেন আমার আর পিসির গায়েই বিঁধল বেশি। আমার এই শ্যা মাঙ্গী ছোট পিসির আঁকার হাতটা অসাধারণ ছিল। কী করে যে এবড়ো খেবড়ো লাইন টেনে গোটা আঁকার বিষয়টার সাথে সমঝোতা করে ফেলতে পারত অবাক হবার মতো। আর গত বছর আমাদের স্কুলের ড্রইং টিচার অনুপ স্য র আমার সারা বছরের করা ১০ টা কার্ডই নিয়ে নিয়েছেন, তাই আমি ও আঁকার দলেই পড়ি, ঘাড় ত্যাড়া করে মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল কিছু করলেই হয়! ব্যা স বেনী দুলিয়ে ছোট পিসি পোস্টার কালারের রঙের খোঁজে গেল, কারণ এই পিসি শাড়ি, পাঞ্জাবি, টেবল ক্লথ, ল্যা ম্প শেড হাতের কাছে পেলেই ফেব্রিক করতে শুরু করে দিত। তাই ছোট পিসিকে বেশ কনফিডেন্টই মনে হল। মনুকাকু গেল মানিক তলার বাজারে চারকোল কিনতে, আমি আমার ৪৮ শেডের প্যামস্টেল কালারের বক্স দিয়ে, বোনের ২৪ কালারেরটাও দিলাম, চ্যা লেঞ্জটাতো নিয়েই ফেলেছি।
সিঁড়ি দিয়ে বাড়ির দোতলা থেকে তিন তলায় উঠতে সামনের দিকে যে রঙচটা দেয়ালটাতে চোখ রোজ ধাক্কা খায় সেটাই আজ চালচিত্র হয়ে উঠুক। দেড় মানুষ সমান উঁচু আর প্রমাণ সাইজের আড়াই মানুষ সমান চওড়া একটা ভার্টিক্যাল জমি যার বাঁ দিকটা বেশি উজ্জ্বল। কারণ প্রতিদিন পূর্বমুখী প্রভাতী আলো এসে একটা বেশ জিওমেট্রিক্যােল নক্সা তৈরি করে। সেই দেয়ালের সামনে বধ্যসভূমির গ্ল্যাোডিয়েটরের মতো কাকু পিসি দাঁড়িয়ে আর তার পেছনে আমরা সবাই। আমার ধবধবে ফর্সা রঙের ঠামা তার মিহি গলায় বললেন, কী লো তরা দেয়ালের সামনে সবকটা খাড়ায় আসস্ ক্যা্ন? ন'দি পিসি রকম সকম বুঝে দু কাপ চা ধরিয়ে দিয়ে গেল কাকু আর পিসি কে। আমার জেঠু স্বয়ং ফটিক চৌধুরী নিজে বার দুয়েক পায়চারি করে দেখে ব্যা পারটা বোঝার চেষ্টা করে গেছেন।
একটু পরেই দেয়ালের মাঝ বরাবর একটা হাল্কা লম্বা লাইন পড়ল ঘ_অ_স। তারও পর আরও দু চারটৈ লাইন কিছুটা মাপে ছোট দূরে দূরে। পিসি বলল দাঁড়িয়ে যাবে মনে হচ্ছে, লম্বা টুলের ওপর বসে পিসি তার খেল শুরু করেছে বেণী সামলে, আমি তার হেল্পার। উঁচু জায়গায় মনু কাকু হাত লাগাচ্ছে। কিছুক্ষণ দেখার পরই আমার স্বল্প বুদ্ধিতে মনে হল‍ রঙে কম পড়বে, ছোট পিসির কোনো হুঁশ নেই বলেই মনে হল। ছুট্টে গেলাম পাশের বিন্তিদের বাড়ি, ওকে পটিয়ে জামার কোচড়ে করে বেশ কিছু পরিমাণ প্যা স্টেল আর চকও এনে ফেললাম। কিন্তু আরো একটু হলুদ রঙ লাগবে। পিসির একাগ্ৰতা দেখার মতো, এত্ত বছর পর এখনো মনের আয়নায় ছায়া ফেলে আছে।
দখল করে নেওয়া দেওয়ালে ছবির কাঠামো প্রায় তৈরি। সিধে লাইনের উপর আঁকা বাঁকা রেখায় ত্রি-নেত্র, অস্ত্র, বস্ত্রের, অবয়ব, পাঁচ দু-গুনে দশ হাতের রেডিয়াল বিস্তার স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, অদ্ভুত এক ঘোর, আশ্চর্য এক আচ্ছন্নতা, ছোট রা ঘুমিয়ে পড়েছে। আর আমি তো আঁকার দলে আবার কোয়ার্ডিনেটারের কাজ ও করছি। রাত বারোটা নাগাদ দীর্ঘ ডায়গনাল রেখা পড়ল দুর্গার অস্বচ্ছ কিন্তু জটিল বিন্যা সের ওপর দিয়ে "ত্রিশূল"। চক, পেন্সিল, চারকোল স্কেচ করতে করতে ফুরিয়ে এলো প্রায়, কিছু লেগে থাকল দেয়ালে, বাকিটা আঙ্গুলে, মাথার চুলে, চোখের পাতায় আর দেয়াল যেখানে মেঝেতে এসে থেমেছে সেখানে, মাইক্রফাইন দানা দিয়ে তৈরি বেস লাইন হয়ে। এর মধ্যে কেউ কেউ এসে দেখে গেছে পঞ্চমীর রাতের আ্যানডভেঞ্চার। ঠামা বলে গেল, কী লো? কাল কিন্তু ষষ্ঠী, বোধন! ব্যাস, ঠিক যেন ওর্য়ানি়ং বেল দিল। ঝম করে কারেন্ট চলে গেল, জীবনে কোনো দিন দেখিনি মানিকতলায় কারেন্ট অফ হয়েছে, নিয়তি, এলো মোমবাতি। পিসি লম্বা কাকুকে বলল মুখের কাছে ধর তো, মনুদা, অ্যাই নথটা কোন দিকে? ডান না বাঁ? সাজুনি হয়েও আমার কেমন গুলিয়ে গেল, ঠাকুর তো! তাই না! দাঁড়াও ছুট্টে পাড়ার প্যা ন্ডেল থেকে দেখে এসে হাঁপিয়ে বললাম মায়ের মুখের ডান দিকে। হলুদ রঙ একদমই শেষ, রান্নার হলুদের সাথে ফেভিকল মিশিয়ে মনুকাকু জমিয়ে দিলো ব্যাাপারটা| ইতিমধ্যে কারেন্টও চলে এল। এবার সাদা চকের গুঁড়ো জল আর আলতার টাচে মিশ্রণটা স্ট্রবেরি আইসক্রিম এর মতো দেখাচ্ছে। ব্রাশ দিয়ে নয়, পিসি বলল তুলোয় ভিজিয়ে সাবধানে এপ্লাই কর, ঠিকমতো ভরাট, হওয়া চাই। ধন্যে হয়ে গেলাম, চার্জ বুঝে নিলাম ওই ছোপানো কাজের। ততক্ষনে দুর্গা দাঁড়িয়ে গেছে, কিন্তু তরল রঙ আর নেই। স্পট লাল এরিয়াতে লিপস্টিক চাপা দেওয়া হলো। যাবতীয় শুকনো রঙের শেষ মলিকিউল কে নিংড়ে অস্ত্র, পুষ্প, শঙ্খের টোন আর টেক্সচারকে আক্রমণ করে গেল পিসি আর কাকু মিলে, জাস্ট ফিনিশিং... কতক্ষণ, কত রাত পর্যন্ত করেছিল এই বয়সে তা আর খেয়াল নেই। রক্তাক্ত মহিষাসুর আর কার্তিকের আল্ট্রা মেরিন ময়ূরের সামনে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
ঘুম ঠিক ভাঙেনি চোখ পিট পিট করে দেখি পূর্ব দিক থেকে আসা সেই স্বর্গীয় আলো নির্ভুল ভাবে জিওমেট্রিক্যাপল নক্সা এঁকেছে আমাদের তৈরি মা দুর্গার মুখের ওপর। আচ্ছন্নতা কাটছিল আমার ধীরে ধীরে, চোখ মেলে দেখি বড়মুখ ওয়ালা মধ্যিদখানে ফাঁকা দুই টবে মা দুর্গার দু-পাশে ধবধবে সাদা কাশফুল সাজাচ্ছেন আমার মা, আর বিশাল গাছা পঞ্চপ্রদীপ তৈরি করছে আমার বুড়ি ঠামা। পরে শুনেছিলাম চিরকাল নীরবে থাকা আমার বাবা আগের দিন শিয়ালদার বাজার থেকে কিনে এনেছেন এই কাশ ফুল, মন টা খুশি হয়ে গেল, মনে মনে। ধড়মড়িয়ে উঠে বসে দেখি শুরু হয়ে গেছে পুজো, আমার রঙ মাখা ধুলো মাখা শরীর যতটা জায়গা নিয়েছিল সেইটুকু জায়গা বাঁচিয়ে চারপাশে পুজোর সব আয়োজন, ফুলের পাপড়ি, প্রদীপের গন্ধ, অগুরু, আর ঢাকের বাদ্যি , ভিড় করে পুজো র সব কিছু... আমার বাড়ির অন্দরের পুজো।

ফেসবুক মন্তব্য