ফাদার ললারের গল্প

পল্লব কুমার চ্যাটার্জী

রাঁচীর সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের খ্রীশ্চান অধ্যাপকদের মধ্যে ১৯৭৪-৭৬ সালে চারজন আমাদের সবচেয়ে প্রভাবিত করেছিলেন। তাঁরা হলেন জীবিতকালে কিংবদন্তী-সম হিন্দী ও সংস্কৃত ভাষায় সুপণ্ডিত ডা: কামিল বুলকে, ইংরেজীর বিভাগাধ্যক্ষ ফাদার জি পি ললার, তৎকালীন প্রিন্সিপাল ফাদার ওয়াল্টার প্রূস্ট আর ফিজিক্সের অধ্যাপক ফাদার সি ডি'ব্রাওয়ার। এই মুহূর্তে একজনের কথাই বলতে পারি, তিনি জন্মসূত্রে আইরিশ ফাদার ললার। ওঁর মধ্যে আমরা চার্ল্স এন্ড্রুজ বা ডেভিড হেয়ারের মত একজন উদার-হৃদয় ছাত্রদরদী ব্যক্তিত্বকে পেয়েছিলাম।

তখন তিনি প্রায় ৯৭। একটি মোপেড চালিয়ে সমস্ত রাঁচি চষে বেড়ান আর আদিবাসী-অধ্যুষিত জেলার গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে ঘুরে কুসংস্কারের ভূত ভাগান। মাঝে মাঝে আমাদের ইংরেজি টিউটোরিয়াল ক্লাশ নেন, যার উদ্দেশ্য হল কোর্স শেষ করা নয়(তার জন্যে তো প্রফেসার বগলা চক্রবর্তী, কুজুর আর প্রাণনাথ পণ্ডিত আছেনই), বরং একটি বিদেশী ভাষা থেকে আমাদের ভয়ের ভূত ভাগানো। এর পরে যেটুকু সময় থাকে তিনি ইংলিশ লাইব্রেরিতেই বসে কাটান। হয়ত এই কারণেই আমাদের ইংলিশ লাইব্রেরি থেকে বই নিয়ে পড়া প্রায় বাধ্যতামূলক ছিল, তা না হলে ফাদার ললার খুবই চটে যেতেন। আমি বাংলা-হিন্দী পড়ে এসেছি, ইংরেজিতে যথারীতি কাঁচা। তা হলেও প্রথম দিকে লাইব্রেরি গিয়ে দু-একটা বই ইস্যু করিয়ে নিয়ে এসেছি।
একদিন ওখানে বইয়ের লিস্টে দেখি একটা চেনা নাম- ওয়াশিংটন আর্ভিং-এর লেখা রিপ ভ্যান উইংকেল। বইটা নিয়ে এসে পড়ার পর একদিন ওটা আমার হোস্টেলের রুম থেকে চুরি যায়। আমি এবার ভয়ে আর ইংরেজি লাইব্রেরি যেতে পারছি না, ফাদার মারাত্মক বকবেন, ফাইন করবেন-পয়সা কোথায় যে ফাইন দেব?
তবু একদিন যেতে হল। ফাদার আমার কথা শুনে গম্ভীর হয়ে আমার নামের ইস্যুর লিস্ট দেখতে লাগলেন। 'ছ'মাসে চারটে বই মোটে? টিউটোরিয়ালের ক্লাস আছে এখন, চল সেখানে কথা হবে।' আমি ভয়ে ভয়ে বেরিয়ে ক্লাসরুমের দিকে পা বাড়ালাম।

ফাদার ললারের ক্লাসে আসার আগে তাঁর পড়ানোর কায়দা নিয়ে দুটো কথা না বলে নিলে আমার এই প্রসঙ্গের কোনও মানেই থাকে না। তাই বরং চলে আসা যাক তাঁর ট্যুটোরিয়ালের এক ক্লাসরুমে, তিনি পড়াচ্ছেন ওয়ার্ডসোয়ার্থের সলিটারি রীপার।
- 'Behold her' কথাটার মানে কে বলতে পারবে।
- 'See her, father' একজন বলে উঠল।
- তাহলে তো 'সী' লিখলেই চলত, নয় কি? এত কষ্ট করে 'বিহোল্ড' লেখার কি প্রয়োজন ছিল?
সেদিন জানলাম, রোমান্টিসিজমের অমর কবি উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ স্কটল্যাণ্ডের হাইল্যাণ্ড অঞ্চল দিয়ে যেতে যেতে একটি মেয়েকে ফসল কাটতে কাটতে আপন মনে গাইতে দেখে তাঁকে দু-চোখ দিয়ে ধরে রাখতে চেয়েছিলেন। 
- আচ্ছা তোমরা রোম্যান্টিক কথাটার অর্থ জান? ফাদার হঠাৎ প্রশ্ন করলেন।
- ক্রিয়েটিভ আর্ট, কালচার, সাহিত্য আর সঙ্গীত মিলেমিশে ১৭ থেকে ১৯ শতকের এলিটরা ইয়ুরোপে একটা বৈপ্লবিক যুগ নিয়ে এসেছিলেন বলে শুনেছি। আমার মনে হয় সেটাই রোম্যান্টিসিজম, তাই না?- একটি চশমা পরা মেয়ে উত্তর দিল।
- তোমার কথার প্রতিবাদ করছি না, ইয়ং লেডি! তবে ওয়ার্ডসোয়ার্থের রোম্যান্টিক দুনিয়া মূলতঃ মানুষ আর প্রকৃতিকে নিয়ে। তিনি সরলমনে কোথাও প্রকৃতির পার্সনিফিকেশন করেছেন আবার কোথাও বা মানুষের তুলনা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে করেছেন, যেমন- 'I wandered lonely as a cloud'।
এরপর প্রসঙ্গ ধরে চলে আসত হাওয়ার দোলায় নেচে চলা প্রান্তরব্যাপী ফুটে থাকা ড্যাফোডিল বা কখনও রামধনুর সৌন্দর্য দেখে নেচে ওঠা কবির হৃদয়-
"Getting and spending we lay waste our powers, 
Little we see in Nature that is ours."

পরে জেনেছি যে এই Wordsworth এর কবিতার সূত্র ধরে নরেন্দ্রনাথ দক্ষিনেশ্বরের পরমহংসের কথা প্রথম শুনেছিলেন। Wordsworth এর নাকি সমাধি হত। ছাত্ররা সমাধি আর অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মধ্যে তফাৎ বুঝছে না। তখন প্রিন্সিপাল সাহেব পরামর্শ দিলেন তোমরা দক্ষিণেশ্বর গিয়ে পরমহংসকে দেখে এস।
খুবই সম্ভব। Wordsworth এর কবিতা পড়াতে পড়াতে ফাদার ললার নিজেই প্রায় সমাধির কাছাকাছি পৌঁছে যেতেন তো উনি নিজে হতেন না কি? রামকৃষ্ণদেব আকাশে উড্ডীয়মান বলাকার সারি দেখে সমাধিস্থ হয়েছেন একদা, তাহলে এই কথাগুলিও কি তূরীয় অবস্থায় না পৌঁছে কেউ লিখতে পারত?-
''The innocent brightness of a new-born day is lovely yet; 
The Clouds that gather round the setting sun 
Do take a sober colouring from an eye 
That hath kept watch o'er man's mortality;'' (Ode: Intimations of Immortality). 

তবে ওয়ার্ডসোয়ার্থ কিন্তু বাহ্য চেতনা হারাননি, তার প্রমাণ মাঝে মাঝে কর্তব্যবোধ জেগে ওঠা না কি কর্তব্যের শৃঙ্খলে বন্দীদশা থেকে ছটফট করে ওঠা-
''Stern Daughter of the Voice of God! 
O Duty! if that name thou love, 
Who art a light to guide, a rod 
To check the erring, and reprove;'' (Ode to Duty)

এখানে আবার আমাদের রবি ঠাকুরের কবিতা স্মরণীয়-
"রে মোহিনী, রে নিষ্ঠুরা, ওরে রক্তলোভাতুরা 
কঠোর স্বামিনী, 
দিন মোর দিনু তোরে— শেষ নিতে চাস হ’রে 
আমার যামিনী?" (অশেষ)


(দুই)
‘......ওরে, দাঁড়া দাঁড়া। প্রকৃতিকে উপভোগ করার জন্যে সত্তর বছরের জীবনটাও যেন বড় কম- কে বলেছিলেন বল ত?’ আবার আমরা ফিরে এলাম সেন্ট জেভিয়ার্সের ইংলিশ ট্যুটোরিয়াল ক্লাশে।
‘কে জানে? একটি কুড়ি বছর বয়সী কিশোর কবির উপলব্ধি’, ফাদার নিজের মনেই যেন বললেন-
"Now, of my threescore years and ten,
Twenty will not come again,
And take from seventy springs a score,
It only leaves me fifty more.
And since to look at things in bloom
Fifty springs are little room..."
‘হাউসম্যানের কবিতা, দি চেরী ট্রী। কাল পড়াব। আমার বয়স সাতানব্বই হয়ে গেল, এখনও কত কি দেখতে বাকি।‘
'হায়, জীবন এত ছোট ক্যানে!'

পরের দিন যথারীতি ফাদার ললারের ট্যুটোরিয়াল ক্লাসে এসেছি। ফাদার দেখি আগে থেকেই ক্লাসরুমে এসে ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে কী যেন করছেন। তারপর একটু সরে দাঁড়াতেই আমরা চমৎকৃত, দেখি হালকা আসমানী পশ্চাৎপটের ওপর দক্ষ হাতে আঁকা হয়েছে থোকা থোকা সাদা ফুলে শোভিত একটি চেরী গাছ। ফুলগুলোতে একটা হাল্কা গোলাপী আভা জানিনা কিভাবে এনেছেন তিনি, নাকি তা শুধু আমাদের কল্পনা! গাছভর্তি ফুল, তাছাড়া মাটিতে ঝরে পড়ে আছে আরো কত, বিষণ্ণতার প্রতিমূর্তি যেন।
- ওয়েল, আমার প্রিয় বন্ধুরা, আমি চেরী গাছের উদ্দেশ্যে লেখা হাউসম্যানের এই কবিতাটি পড়াব না, কারণ পড়ানোটা আমার ঠিক আসে না। শুধু তোমরা বল, এই ছবিটা দেখে কী মনে হচ্ছে তোমাদের?
- ছবিটা খুব সুন্দর আর খুব রিয়েল, আমি অনেক কষ্ট করে বললাম।
- আর কিছু?
- It is showing life in one hand and death in the other, কারণ কিছু ফুল ফুটে আছে আর কিছু ঝরে পড়েছে, প্রদীপ জানাল।
এবার মনে হয় হয় ফাদার একটু খুশী হলেন।
- ঠিক বলেছ। খুব সুন্দর ফুল, চীনদেশে একে নারী আর সৌন্দর্যের প্রতীক মনে করা হয়। তবে তার সঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে যে এই ফুলের আয়ু খুবই কম, মাত্র দুই থেকে তিন সপ্তাহ। জাপানে এই ফুলকে বলা হয় সাকুরা, সৌন্দর্য, আয়ুর স্বল্পতা, গৌরবময় মৃত্যু- সৈনিকের যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যু, যাকে তারা 'বুশিদো' (The way of the warrior) বলে আর হল পুনর্জন্মের সিম্বল- সব একসাথে। না, আর কিছু বলব না, বেশী বোঝালে আবার তোমাদের নিজেদের চিন্তাধারাটা তৈরি হয়ে উঠবে না। এই বলে ফাদার বোর্ডের উপর একটা কথা লিখলেন ইংরেজি অক্ষরে- 'Carpe diem' (seize the day)। তারপর ছাত্রদের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন- হাউসম্যান তেয়াত্তর বছর বেঁচেছিলেন, কিন্তু নিজেকে কোনদিন কবি বলে মনে করেননি, তাই তাঁর কবিতা বিশ্বের লোক বহুদিন পরে জানতে পেরেছে। আমি জানিনা তিনি এই কাজটা ভাল করেছিলেন কিনা- বলে কারো কাছে কোন উত্তরের প্রত্যাশা না করে ফাদার ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেলেন ক্লাসরুম থেকে।
A.E. Housman-এর বহুদিন পরে, তারাশঙ্কর তাঁর কবি উপন্যাসের নিতাই কবিয়ালকে দিয়ে একই কথা বলিয়েছেন-
'ভালবেসে সাধ মিটিল না এ জীবনে,
হায়, জীবন এত ছোট কেনে?'
লাটিন ফ্রেজ Carpe diem-এর অর্থ পরে জেনেছিলাম- get everything you can out of today, because you may not be here tomorrow." 
কী আশ্চর্য, কয়েকবছর আগে করণ জোহরের হিন্দি ছবিতে ঠিক একইরকম একটা গান শুনলাম।
‘হর ঘড়ি বদল রহী হ্যায় রূপ জিন্দগী
ছাঁও হ্যায় কহীঁ কহীঁ ইয়ে ধূপ জিন্দগী,
হর পল ইয়হাঁ জী ভর জিও
জো হ্যায় সমাঁ, কল হো না হো।‘

(তিন)
বলতে শুরু করেছিলাম বই হারানোর শাস্তির কথা, কিসের থেকে কোন কথায় চলে এলাম! এখন তো আবার রীতিমত সন্দেহ হচ্ছে এত কথা তখন ফাদার ললার বলেছিলেন কিনা। আমি আজ বুঝি সব বানিয়ে বানিয়ে লিখছি; হয়তো বা ফাদারের আত্মা তাঁর না বলা বাণী আমার হাত দিয়ে লিখিয়ে যাচ্ছেন। যাই হোক, তাঁর পড়ানোর কথা বলেছি, এবার না পড়ানোর প্রসঙ্গে আসি।
সেদিনকার টিউটোরিয়ালে ওয়াল্টার ডি লা মেয়ারের কবিতা 'মার্থা' পড়ানোর কথা। উনি হঠাৎ আমাদের সবাইকে অবাক করে দিয়ে বললেন- 'আচ্ছা তোমাদের কি মনে হয় না যে মেয়ারের এই কবিতাতে বিষয়বস্তু অতি সরল, বোঝার কিছুই নেই; তাহলে এটাকে ইন্টারমিডিয়েটের কোর্সে কেন রাখা হল?' ভেবে দেখলাম, সত্যি তো, একটি মেয়ে গল্প বলে চলেছে আর কয়েকটি শিশু তাকে ঘিরে বসে শুনছে, এর মধ্যে কী এমন গভীরত্ব আছে যে আমাদিগকে আজ পড়তে হচ্ছে?
- ঠিক আছে, আর ভাবতে হবে না। আমি পড়ছি, তোমরা শুনে যাও শুধু, তাহলেই বুঝতে পারবে। বললেন বটে, কিন্তু না পড়ে তিনি বোর্ডের দিকে এগিয়ে গেলেন। তারপর কয়েকটি দক্ষ আঁচড়ে দ্রুত ফুটিয়ে তুললেন একটি ছবি। একটি যুবতী মেয়ে কিছু গাছের ছায়ায় দুই হাত দিয়ে হাঁটু মুড়ে বসে, আর কয়েকটি বাচ্চা ছেলেমেয়ে তাকে ঘিরে শুয়ে-বসে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে- বোঝাই যাচ্ছে যে গল্পবলার আসর চলছে। 'এই হল মার্থা, আর এই শিশুদের মধ্যে একজন হল ওয়াল্টার নিজেই- তার মানে এটা বোধ করি তাঁর বাল্যের স্মৃতিচারণ। হয়ত এরই মাঝে নিহিত আছে মেয়ারের কবি হয়ে ওঠার প্রেরণাটুকু। এটা তো তাহলে তাঁর জীবনদর্শনের একটা অঙ্গ, তাই নয় কি?' 

কিন্তু কবি তাঁর নিজের দর্শন পাঠকের মনের মধ্যে সঞ্চারিত করবেন কেন? তাঁর কাজ হল পাঠকের সঙ্গে একাত্ম হয়ে নিজের আনন্দের, অভিজ্ঞতার, সুখ-দু:খের ভাগ দেওয়া। তা কি তিনি করেছেন? 'Poetry, good or bad, depends for it's very life on the hospitable readers, as tinder awaits the spark'- এই কথাটা স্বয়ং মেয়ারের (ছোট গল্প ‘The Green Room’)। কিন্তু আমার বন্ধুরা, কবি যদি নিজের ভাবনা, নিজের দর্শনকে অন্যের মনের মাঝে সঞ্চারিত না করেন তবে তিনি তাঁর আনন্দ-বেদনার অনুভূতি পাঠককে বোঝাবেন কি করে?
আমরা আর কী বলব। মেয়ার যে তাঁর উদ্দেশ্যে একশোভাগ সফল তার প্রমাণ তো আমাদের চোখের সামনে- ঐ ছবি। ফাদার একটা কথা বলেছিলেন- picturesque। আমার চোখের সামনে তখন ভাসছে অন্য একটা ছবি, রবীন্দ্রনাথের একটা গান-
"চোখের উপরে মেঘ ভেসে যায়,
উড়ে উড়ে যায় পাখি,
সারা দিন ধরে বকুলের ফুল
ঝরে পড়ে থাকি থাকি।"
একটি মেয়ে জানলার পাশে বসে আনমনে কী যেন ভেবে চলেছে। হাতের উপরে রেখেছে সে তার মাথাখানি, 'কোলে ফুল পড়ে রয়েছে সে যে ভুলে গেছে মালা গাঁথা'। গান তো নয়, একটা নিখুঁত ছবি! কী বলব একে বাংলায়, চিত্রানুগ না চিত্রকল্প?

আর মেয়ারের লেখা Silver ? জ্যোৎস্না রাত্রে বনের দৃশ্য, যেন গলিত রজতধারায় স্নান করে চলেছে সমস্ত গাছপালা, বন্যপ্রাণী, নিখিল বিশ্ব।
Slowly, silently, now the moon
Walks the night in her silver shoon;
This way, and that, she peers, and sees
Silver fruit upon silver trees;

কলম আর কালি দিয়ে এর চেয়ে ভাল ছবি আঁকা যায় নাকি!


(চার)
নয় নয় করেও অনেক জ্ঞান দিয়ে ফেললাম। ফাদার ললার কিন্তু একদম জ্ঞান দিতেন না। ওঁর প্রশ্ন করার ধরণ শুনলে মনে হত, কোথায় যেন আটকে গেছেন, কিছুতেই বুঝতে পারছেন না, কেউ একটু সাহায্য করলে ভাল হত। এর পর আর কে উৎসাহিত না হয়ে থাকতে পারে?
সেদিনও ঠিক তাই হল। আমাকে দেখে উনি যেন হঠাৎই মনে পড়েছে এভাবে বললেন-'আচ্ছা রেজিস্টারে দেখলাম তুমি সেদিন রিপ ভ্যান উইঙ্কেল বইটা নিয়েছিলে। বইটা কি নিয়ে একটু বলতে পার?'
- ফাদার, গল্পে আছে রিপ ভ্যান নামে এক ভদ্রলোক নিউইয়র্কের কাছে একটা পাহাড়ে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। সে ঘুম তাঁর ভাঙে ঠিক কুড়ি বছর পরে।
- আচ্ছা, আর কে পড়েছে বইটা? 
- আমি পড়েছি, ফাদার, প্রিয়তোষ হাত তুলল।
- আর কেউ?
- আমি গল্পটা ছোট করে পড়েছিলাম, আমাদের নাইনের rapid-এ ছিল- প্রদীপ হাত তুলল। ওদের নেতারহাট স্কুলে অনেক বই পড়ানো হত যা আমাদের জানা থাকতো না।
- আচ্ছা, টোয়েন্টি ইয়ারস্‌ ঘুমিয়েছিল- এটা কি সত্যি হতে পারে? কেমন গল্প এটা?
এবার ওই চশমা পরা মেয়েটি উঠে দাঁড়াল। এতদিনে ওর সঙ্গে আমাদের আলাপ হয়েছে-লাবণ্যা, পঞ্জাবী-কন্যা। 'ফাদার, আমি বলি?'
- হ্যাঁ, নিশ্চয় বলবে। দেখছনা, আমরা কেউ পারছি না।
- আসলে গল্পটা একটা রূপক- ডায়নামিক মেটাফর বলা যেতে পারে। ওই কুড়ি বছরের মধ্যে আমেরিকান বিপ্লব ঘটে গেছিল। ১৭৬৫ থেকে ১৭৮৩ সালের মধ্যে হয়েছিল আমেরিকার স্বাধীনতার লড়াই। আমেরিকা স্বাধীন হয়েছে ১৭৭৪ সালে, রিপ ভ্যান তখনও ঘুমিয়ে।
- বা:, সুন্দর বলেছ তো! এসব কি বইতে লেখা আছে?
- না ফাদার, বোধহয় নেই। 
- তাইত! তাহলে কথাটা কিভাবে জানা গেল? প্রিয়তোষ জান?
- ফাদার, বাড়িতে ফিরে এসে রিপ দেখল ছবিটা বদলে গেছে- প্রিয় বলে।
আমি তাই শুনে উৎসাহিত হয়ে বললাম, 'ইয়েস ফাদার, কিং জর্জ থার্ডের ছবিটা নেই, তার বদলে এসেছেন জর্জ ওয়াশিংটন'।
- তাহলে 'The Sketch Book of Geoffrey Crayon, Gent' বইটা কোথায় গেল? কে কে বলতে পারবে?
প্রদীপ আর লাবণ্যা হাত তুলল।
- ঠিক আছে, তবে আমি যা জানি বলি, ফাদার বললেন। ওই বইটার কথা প্রিফেসে ছিল, দু:খের বিষয়, আমাদের লাইব্রেরিতে রাখা কপিতে সেই পাতাটাই ছিল না, তাই সে বইটা যারা পড়েছে তাদের এই প্রিফেসের কথা না জানাটাই স্বাভাবিক।

আমি গল্পটা দাদুর কাছে শুনেছিলাম তখন আমি ক্লাস সিক্সে। আমেরিকান বিপ্লব বা ডায়নামিক মেটাফর না বুঝলেও গল্পের মজাটা উপভোগ করেছিলাম।
সেদিন ফাদার এই গল্পের সাথে হল্যান্ডের সম্পর্কের কথাও কিছুটা বলেছিলেম, তার সঙ্গে আমেরিকার ইতিহাসের কিছুটা যোগ আছে। আসলে হল্যাণ্ডের গল্প না হলেও এতে একটু ডাচ ছোঁয়া আছে। রিপ ভ্যান উইঙ্কেল ছিলেন একজন ডাচ আমেরিকান, আর সেই হিসেবে আনুগত্য ছিল রয়াল ব্রিটেনের প্রতি। ইতিহাস-মতে ডাচেরা আমেরিকায় আসতে শুরু করে ১৬১৩ সাল নাগাদ, সুরিনামে গড়ে তোলে 'নিউ আমস্টার্ডাম' নামে ডাচ কলোনী। ১৬৬৭তে ব্রেডা চুক্তি অনুসারে তৎকালীন বৃটিশ রাজার দাক্ষিণ্যে ওরা পায় নিউ নেদারল্যান্ড নামে একটি প্রদেশ, যা পরে ভেঙে 'নিউ ইয়র্ক' আর নিউ জার্সি' নামে দুটি রাজ্যের সৃষ্টি হয়। তার মানে নিউ ইয়র্ক অঞ্চলটা মূলত: ডাচ কলোনীই ছিল এক কালে।

কিন্তু মনে গেঁথে ছিল ওই ঘুমিয়ে পড়বার অংশটুকুই৷ পরে জেনেছি ভ্যান বা Van নামে ডাচ শব্দটা জার্মান ফন বা Von-এরই প্রকারান্তর, যার এটা থাকে, সে রাজবংশের লোক, অথবা হয়তো রাজার দেওয়া খেতাব পেয়েছে৷ তার পর থেকে ওই Von শব্দটা তার পদবীর সঙ্গে জুড়ে যায় পুরুষানুক্রমে৷ 

পরদিন ফাদার আমাকে লাইব্রেরিতে ডেকে পাঠালেন। 'চোর ধরা পড়েছে- সে নিজে এসে বই ফেরৎ দিয়ে গেছে', বলে ফাদার আমাকে একত্রে চার-চারটে বই গছিয়ে দিলেন।
- কম বই পড়ার শাস্তি! এগুলো সময়ে পড়ে ফেরৎ দিতে হবে। আর যেন চুরি না হয়।
বলা বাহুল্য, আমরা বুঝলেও ফাদার নিজে একবারও বই-চোরের নামটা প্রকাশ্যে আনেন নি।

ফেসবুক মন্তব্য