ক্রিকেট

মৃগাঙ্ক মজুমদার

ক্রিকেট ভালো লাগে না একদমই অর্ণবের তাই চারপাশের আদিখ্যেতা দেখে বিরক্তি চেপে ধরে মনের ভিতর তাও চুপ করেই থাকে। অর্ণবের ডেস্ক জুড়ে ব্যাডমিন্টন, টেনিস আর ফুটবলের লেজেন্ডদে ছবিতে ভর্তি কিন্তু ক্রিকেটের কাউকে পাওয়া যাবে না। অফিসের সবাই অবাকই হয় দেখে, কিন্তু কিছু বলতে পারে না। বললেই এমন খ্যাঁক করে ওঠে অর্ণব যে বাকি সব চুপ করে যায়। যদিও অর্ণব জানে ওর সামনে না হলেও পিছনে ওকে নিয়ে বেশ কথা হয়। বিশেষ করে ক্রিকেট ম্যাচ চলাকালীন। এইসব আইপিএল, ওয়ান ডে, টি টোয়েন্টি শুরু হলেই সবার কাজ থেকে মন উড়ে টিভির স্ক্রীন বা মোবাইলের দিকে চোখ ঘুরতে থাকে। কিছু না হলে হোয়াটসঅ্যাপে খবর আসতে থাকে।

অর্ণব সেই সময় নিজের কেবিনে বসে একের পর এক সেলস রিপোর্ট খুলে দেখতে থাকে আর নতুন প্রেজেন্টেশনের কথা ভাবে। ধাপে ধাপে অনেকগুলো সিঁড়ি পেরিয়ে আজ ম্যানেজিং ডিরেক্টর এশিয়া প্যাসিফিক হয়েছে এক বহুজাতিক সংস্থার। আজকাল স্যুটকেসে ভরা থাকে জীবন। হয় এয়ারপোর্ট লাউঞ্জ, নয় হোটেলের ঘর তার জীবনের প্রায় সত্তরভাগ সময় এভাবে কেটে যায় আর বাকিটুকুর কুড়ি শতাংশ এই কেবিনে বসে। বাড়ি ফেরার ইচ্ছে থাকে না বেশিরভাগ সময়ে অথচ মুম্বাই, দিল্লী, কলকাতা জুড়ে গোটা সাতেক বাড়ি কিনে রেখেছে, কিছুটা ওই ইনভেস্টমেন্ট বাকি এমনি অবকাশের জন্য। এবারের সিঙ্গাপুরের ইভেন্ট টা খুব ভাইটাল। এটাতে সাকসেস এলে ওর ভাগে ইয়োরোপ টাও পড়তে পারে। আবার বাইরে আওয়াজ টা ভেসে এলো
“সিক্সার”
তিন মিনিট পর আবার।

এবারে কেবিন থেকে বেরিয়ে এলো। ওকে দেখেই একটা কিউবিকলে জমা ভিড় নিমেষে হালকা হয়ে গেল।
“হোপলেস”, বিরক্ত হয়ে আবার ঢুকে গেল অর্ণব।

মাথার চুলে নুন মরিচ, গোঁফেও হালকা সাদা, কিন্তু পেটানো লম্বা চেহারার কাছে সব ম্লান। সুযোগ পেলে এখনো টেনিস র‍্যাকেট নিয়ে নেমে পড়ে আর তা না হলে ফুটবল পায়ে মাঠে। দুপায়ে শটের জোর দেখে সবাই অবাক হয়ে যায়। তিপান্ন পেরিয়েছে তাও দমে ঘাটতি নেই।

খাওয়াতেও বিধি নিষেধ নেই, প্রায় সবই খায়। কিন্তু ক্রিকেটের নাম শুনলেই পুরো কামড়ে খেতে আসে যেন।

“যাঃ আউট”

আবার শুরু করেছে। স্লাইডের দিকে মন দেবার চেষ্টা করতে করতে মনটা স্লাইড করে গেল দশ বছর পিছনে -

ক্রিকেট কিট সহ ছেলেটা স্লাইড করে ট্রেনের তলায় চলে গেল প্র্যাকটিস থেকে ফেরার পথে। কিছুতেই গাড়িতে যেতে চাইত না। ওইটুকু ছেলে বলত, “স্ট্রাগল না করলে সাকসেস বোঝা যায় না বাবা।“

ক্রিকেটের কিট টাই বোঝা হয়ে টেনে নিয়ে গেল চাকার তলায়।

অর্ণব ল্যাপটপ বন্ধ করে, কেবিনের লাইটটা নিভিয়ে চোখ বুজল।

বাইরে তখন তুমুল বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
এই দেশে মনসুন এল।

ফেসবুক মন্তব্য