আপেল

পিয়ালী মজুমদার

(১)
অসহ্য একটা 'পজ'। রিল ঘুরতে ঘুরতে থেমে গেছে আচমকা। নিকষ কালো স্ক্রিন। দুর্বোধ্য চরিত্ররা স্থিরচিত্রের মতো নানা ভঙ্গিমায় আটকা পড়ে আছে আমার মাথার অলিতে-গলিতে। বের হতে চাইছে। পারছে না। তাদের হাঁটা-চলার শব্দ। হাসি-কান্না। চিৎকার।
বিন বিন। বিন বিন।
কাঁটা ফুটছে যেন সর্বক্ষণ। উফ্!

মাথাটা দু-হাতে চেপে ধরে এগিয়ে গেলাম জানালার দিকে। গোলাপি লেসের সুদৃশ্য পর্দা। স্থির। একটানে সরিয়ে দিতেই আরও বড়ো একটা স্লেট রঙের পর্দা চোখের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল সাথে সাথে। মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে দু-হাত নাড়লাম মুখের সামনে। নাহ। পরদাটা একইভাবে থমকে আছে। একগুঁয়ে, জেদি মেয়ের মতো। আবছায়া। আমার চারদিকের স্পেসটার দখল নিচ্ছে ধীরে ধীরে। অসহায়ভাবে বসে পড়লাম। এত ধূসরতা ভালো লাগে না আমার। পর্দার ওইপারে, দূরে, পাহাড়টাও যেন সর্বাঙ্গে ছাই মেখে ধ্যানে বসেছে। সমস্ত দৃশ্যমানতার ওপর দুর্নিবার ছায়া ফেলে বর্ষা ঢুকেছে শহরে, পাহাড়তলিতে।
শার্সিতে চুমুর দাগ। বৃষ্টির। ইচ্ছা হল মুছে দিই। কিন্তু মুছতে গেলে জানালা খুলতে হবে আবার। থাক। দাগের আড়াল সরে গেলেই তো খুলে যাবে ক্ষতমুখ।
মুখ ঘুরিয়ে ডরোথিকে দেখলাম একবার। ঘুমোচ্ছে। গুটিসুটি। রাতের গভীরে ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ। জড়ানো, অস্পষ্ট কথা। আমি শুনেছি। কাকে যেন বলছিল ফোনে। আমাকে নিয়েই হয়তো।
খুব কষ্ট হচ্ছে ওর জন্য। পায়ের কাছ থেকে চাদরটা টেনে গায়ে জড়িয়ে দিলাম। ঘুমোক।
আমার গলা শুকিয়ে কাঠ। ডাইনিং টেবিল থেকে জলের জাগটা নিতে গিয়ে চোখে পড়ল ছুরিটা। পাতলা, ধারালো আপেল কাটার ছুরি। দেখামাত্র শরীর শিরশির করে উঠল। ধনুকের ছিলার মতো টানটান হয়ে উঠছে স্নায়ুতন্ত্র। হ্যাঁ, এই জিনিসই পারে, এই মুহূর্তে সাময়িক শান্তি দিতে। গোটাকয়েক আপেল চাই আমার। এক্ষুনি। ক্ষিপ্র ছুরিচালনায় ফালা ফালা করে কেটে ফেলতে হবে সব। দ্রুত। খুব দ্রুত। যতক্ষণ না আমার হাত কেটে রক্ত ঝরে। যতক্ষণ না আমার দু-চোখ বেয়ে রক্ত ঝরে। তুমুল রক্তস্রোতে ভিজে যায় খন্ড খন্ড আপেল। না হলে মুক্তি নেই ওই নাছোড়বান্দা প্রেতিনীদের থেকে, যারা ক্রমাগত আছাড়িপিছাড়ি করছে আমার মাথার ভেতর। জোরে জোরে ঘন্টা বাজাচ্ছে। ঢং ঢং ঢং।
আহ্! মাথার ভেতরটা ফেটে যাচ্ছে আমার।
কিন্তু আপেল কই? ফলের ঝুড়ি শূন্য। পাগলের মতো দৌড়ে বেড়াচ্ছি এ ঘর, ও ঘর। কোত্থাও একটা আধখাওয়া আপেল পর্যন্ত নেই!

(২)
লুকিয়ে বেরিয়ে পড়লাম কটেজ থেকে। শহর থেকে কিছু দূরে, নিরিবিলি প্রকৃতির মাঝে ছোট্ট পাহাড়ি টিলা। তার কৌণিক ঢালে দেড়তলা কাঠের বাড়ি- 'উদযাপন'। ডরোথি আর আমার যৌথ যাপনের ঠিকানা। কত দিনের, মনে নেই! খুব সন্তর্পণে দরজাটা বন্ধ করলাম, যাতে সে টের না পায়। আনমনে ডাকবাক্স হাতড়ালাম। প্রায়ই হাতড়াই। এমনিই। অভ্যাসে। আজ হাতে কিছু ঠেকল। চিঠি এসেছে! যেন গতজন্ম থেকে বিরল কোনো ফুলের গন্ধ হঠাৎ উড়ে এসে ছুঁয়ে দিল আমায়। প্রশান্ত-র চিঠি। কে প্রশান্ত? কয়েক মিনিট চোখ বন্ধ করে মনে করার চেষ্টা করলাম। পড়ল না মনে। বুকপকেটে চিঠিটা গুঁজে নেমে এলাম ঢাল বেয়ে। পাকদন্ডী পথ সর্পিল স্রোতের মতো মিশেছে গিয়ে মূল রাস্তায়। পিচ্ছিল, ঢালু রাস্তা। অন্যমনস্ক হলেই গড়িয়ে সোজা খাদে। এখন বৃষ্টি নেই। মেঘের দল উড়ে বেড়াচ্ছে চারপাশে। স্লেট রঙের পর্দাটা আরো স্পষ্ট হয়ে দুলছে চোখের সামনে। হাতড়ে হাতড়ে এগোচ্ছি। ফুলের টুকরি কাঁধে নেপালি বউটি আমায় পাশ কাটিয়ে তরতর করে নেমে গেল নিচে।
- বাজার যাচ্ছ নাকি?
হাঁক পাড়লাম তার উদ্দেশ্যে।
- জি সাহিব।
চুপচাপ তাকে অনুসরণ করতে লাগলাম।

পাহাড় যেখানে সমতলে মিশেছে, তার এক নিরালা প্রান্তে চওড়া পাথুরে চাতাল। পসরা সাজিয়ে বসেছে দোকানিরা। গরীব দেহাতি মানুষজন। মৃদু গুঞ্জন উঠেছে বাতাসে। তবু আজ খানিক বেসুরেই বাজছে সব। বর্ষার জন্য ক্রেতা- বিক্রেতা দুইই বেশ কম। চোখ পড়ল ফর্সা, রোগা নেপালি বালিকাটির দিকে। তার সামনে মাঝারি আকারের ঝুড়ি। সতেজ, টুকটুকে লাল আপেলে ভর্তি। আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল চকচকে ছুরির ফলা। বিন্দুমাত্র দরদাম না করে কিনে নিলাম দুই ডজন আপেল। বালিকা যেমন অবাক, তেমনই খুশি। এই দুর্যোগের দিনে এমন ক্রেতা সে আশাই করেনি।

টিপটিপ বৃষ্টি শুরু হয়েছে অনেকক্ষণ। আমার কোনো বর্ষাতি নেই। ছাতা আছে। সঙ্গে আনিনি। আসলে ছাতা কিংবা বর্ষাতি কোনো কিছু আনার কথাই মনে পড়েনি আমার। বৃষ্টির তেজ বাড়ছে ক্রমশ। আকাশটা কে যেন ঘন কালো চাদরে ঢেকে দিয়েছে। অজস্র বৃষ্টির ফলা তাদের আজন্মকালীন অপমানের শোধ নিতে সম্মিলিতভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছে আমার ওপর। ধুয়ে নিয়ে যাচ্ছে তোড়ে। ভেতরের যত পাপ, কলুষ, অন্ধকার। টেনে হিঁচড়ে উলঙ্গ করে দিচ্ছে আমায়। এলোমেলো হাঁটছি। অন্ধের মতো। এখন আর স্লেট রঙের পর্দা নেই, পুরো কালো কাপড়ে কেউ বেঁধে দিয়েছে আমার চোখ।
মাথার ভেতর ঢাউস একটা ঘড়ি। পেন্ডুলাম। দুলছে। দ্রুত।

সজোরে ধাক্কা লাগল ডানপাশে। মুখ থুবড়ে পড়লাম। মনে হয় একটা সাইকেল। আপেলের থলি ছিটকে বেরিয়ে যেতে সম্বিত ফিরল আমার। সর্বনাশ! আমার আপেল! জলের তোড়ে গড়িয়ে যাচ্ছে খাদের দিকে। কোনোক্রমে উঠে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটলাম আপেলের পিছু পিছু।
ঝাঁপিয়ে পড়ে তুলতে যাচ্ছি... মরিয়া হয়ে... খাদের একেবারে কিনারে... ওই তো আপেলটা... পড়ে যাচ্ছে...
পেছন থেকে কে যেন হ্যাঁচকা টান মারল আমার হাত ধরে। ব্যথার জায়গায়। যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠলাম।

- মরার খুব শখ বুঝি?

চমকে উঠে তাকিয়েছি। সাথে সাথে টের পেলাম আমার শরীরে আর কোনও বৃষ্টি লেগে নেই। কেবল আমায় ঘিরে প্রলাপের মতো ঝরছে তারা অঝোরে। ছুঁতে না পারার নিষ্ফল আক্রোশে।
মাথার ওপর ছাতা ধরেছে সে। উজ্জ্বল কমলা রঙের ছাতা।
নলিনী!

(৩)
নরম হলুদ আলোয় মাখামাখি চতুর্দিক। মিষ্টি সুরেলা বাতাস টুংটাং শব্দে দোল খাচ্ছে। এই ঘরের ভেতর ঢুকলে বোঝার উপায় নেই বাইরে দিন না রাত্রি। একপাশ দিয়ে ছোট্ট ঘোরানো কাঠের সিঁড়ি উঠে গেছে ওপরে, একটা রেলিংঘেরা বারান্দায়। আমি জানি, ওটা লাইব্রেরি। এই বাড়িতে নলিনীর সবচেয়ে প্রিয় জায়গা।
দেওয়ালের একাংশ জুড়ে ধ্যানগম্ভীর বুদ্ধের শয়ানমূর্তি। অয়েল অন ক্যানভাস। ছবির নিচে ক্যাবিনেটের ওপর নানা আকারের সুদৃশ্য মোমবাতি সাজানো। নলিনী একটা একটা করে পরপর তিনটে মোম জ্বালিয়ে দিয়ে এসে বসল আমার মুখোমুখি। ঠোঁটে হালকা হাসির আভাস। গাঢ় মেরুন লিপস্টিক। আর কোনো প্রসাধন নেই। পিচ রঙের গাউনে ওকে মানিয়েছে খুব। আমার পরনে এখন ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি। প্রাথমিক চিকিৎসার পর খানিক সুস্থ। মনোযোগ দিয়ে দেখছি দুজন দুজনকে। যেন এই দেখাটুকু ছাড়া পৃথিবীতে আমাদের আর কোনো কাজ নেই। কয়েক মুহূর্ত কাটল। নাকি কয়েক যুগ! মোম গলতে শুরু করেছে। সুগন্ধ ছড়িয়ে।
দুজনের মাঝখানে একটা গোলাকৃতি টেবিল। গ্রানাইট পাথরের। টেবিলের ওপরে দামি ক্রিস্টালের পাত্র। ঝিকমিক করছে হীরের মতো। আরো বেশি ঝিকমিক করছে তার মধ্যে রাখা কয়েকটা গাঢ় লাল আপেল! আমার মাথা ঝিমঝিম করে উঠল। ঘোরলাগা চোখে দেখছি আপেলগুলোকে। মসৃন, মেদুর, লালাভ দ্যুতিময় ইশারা! আমার দৃষ্টি অনুসরণ করে নলিনী একটা আপেল তুলে নিল। সঙ্গে সঙ্গে একটা বাদামি ঘোড়া তীব্রবেগে ছুটে গেল আমার মস্তিষ্ক ফুঁড়ে। লাগামছাড়া। ক্ষিপ্র।
পেন্ডুলাম দুলতে শুরু করেছে। আবার।
ফর্সা, সরু, রহস্যময় আঙুল। ধীরে ধীরে আপেল কাটছে নলিনী। ওর হাত থেকে ছুরিটা ছিনিয়ে নিতে ইচ্ছা করছে আমার। পারছি না। শরীরটা যেন পাথরের মতো ভারি। কেবল মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখছি ওই আঙুলের ছন্দময় চলন। একটা একটা করে টুকরো কাটছে নলিনী, আর তুলে ধরছে আমার মুখের সামনে। সুর ভাঁজছে গুনগুন। খুব চেনা কোনো গান। মনে পড়ছে না কথাগুলো। পোষমানা শ্বাপদের মতো, নির্বাক, ওর হাত থেকে আমি মুখে ভরে নিচ্ছি খন্ড খন্ড আপেলের স্বাদ।
মাথার ভেতরটা ক্রমশ হালকা। শরীরও। ঘোড়াটা দাঁড়িয়ে পড়েছে কোথাও। ক্লান্ত। পেন্ডুলামের গতি আস্তে আস্তে কমে আসছে। বাঁক নিচ্ছে। সূর্যাস্তের নিভু আলোর মতো।
হঠাৎ চিঠির কথা মনে পড়ল। লেপ্টে আছে আমার ভেজা শার্টের বুকপকেটে । কে যেন লিখেছে! গমরঙের ন্যাতানো খামের ওপর অক্ষরগুলি ঝাপসা। সাবধানে ছিঁড়লাম। ভেতরে মিহি প্লাস্টিকের আবরণের ভেতর অক্ষত চিঠি। বুঝলাম বর্ষাদিন বলেই এমন ব্যবস্থা। চিঠিটি খুলে মেলে ধরলাম টেবিলে। নলিনী ঝুঁকে পড়ল,
- কার চিঠি?
- জানি না। প্রশান্ত বলে একজন লিখেছে।
- প্রশান্ত সরকার! কবি বন্ধু তোমার। মনে নেই?
আমি শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম নলিনীর দিকে।
নলিনীও আমার মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর মৃদু স্বরে পড়তে শুরু করল...

"আর সেদিনের পর একটাই ছাতার তলায়
দেখা হয়, আমাদের
ঘন হয়ে ওঠা শ্বাস, কিংবা বুকের বিবিধ
যে যেমন জ্যামিতিক স্তরে বাঁধা থাকে, থাক...
এমন দুর্দিনে ছাতার প্রয়োজন পড়ে কদাচিৎ
অথচ দূরত্ব বাড়তে বাড়তে
কখন বরফ জমে, সম্পর্কের অভিঘাতে, ঠুংরি--
সাময়িক, বিন্দু বিন্দু জল সাবালক...
ছাতার কথা বলতে বলতে
কখনো বর্ষাকাল ফিরে আসে, কখনো...
আশ্বিনের তলায় চলে যাচ্ছে মাঠ
ভুলে যাচ্ছি, ঝড়জলরোদে
একটা বলয়...
শুধু অনুসরণ করে যাচ্ছে, আমাদের।"

(ছাতাসংক্রান্ত- প্রশান্ত সরকার)

- আমাদের নলিনী? এই কবিতাটা কি আমাদের?
কোনো উত্তর নেই। ঠোঁটে হাসিটুকু লেগে আছে কেবল। দুই চোখে জল!
- এখন বাড়ি ফিরে যাও সুহাস। ডরোথি অপেক্ষা করছে।

বৃষ্টির ভেতর নেমে এলাম পথে। ধূসর দৃশ্যপট। ইতস্তত সবুজের মায়া। মাঝে এক মাথা উজ্জ্বল আলো ছড়িয়ে আমি হাঁটছি। কমলা রঙের আলো। ছাতাটা উড়িয়ে দিলাম আকাশে। অজস্র বৃষ্টিছাঁট আশ্লেষে জড়িয়ে ধরল আমায়। বুকপকেটে প্রশান্তর কবিতা। ভিজে যাচ্ছে। মুছে যাচ্ছে। ফুরিয়ে যেতে যেতে ফিসফিসিয়ে বলছে,
" এমন দুর্দিনে ছাতার প্রয়োজন পড়ে কদাচিৎ..."

ফেসবুক মন্তব্য