'মিলনমঞ্চ': শ্রী রুদ্র মণ্ডল এবং শ্রীমতী শর্মিষ্ঠা নাথ মণ্ডল

অর্ঘ্য দত্ত



এক সাধারণ বাঙালি দম্পতির বর্গিদের দেশে বসে নিজেদের ছেড়ে আসা শিকড়কে সঞ্জীবিত রাখার এক নিরলস অসাধারণ উদ্যোগের নাম হলো 'মিলনমঞ্চ'। না, শুধুমাত্র নিজেদের শিকড়টুকু নয়, মুম্বাইয়ে এমন সংস্কৃতিমনস্ক বাঙালি কম‌ই আছেন যারা কখনও না কখনও মিলনমঞ্চের ছায়ায় এসে দুদণ্ড জুড়িয়ে যাননি। অথচ, ঐ দম্পতি, রুদ্র মণ্ডল ও শর্মিষ্ঠা নাথ মণ্ডলের কতটুকুই বা ক্ষমতা! এটা তো আর সত্যিই কোনও মঞ্চ নয়। নয় কোনো সংঘ, অ্যাসোসিয়েশন, ক্লাব বা সমিতি। চাঁদা নেই, সরকারি-বেসরকারি আর্থিক সাহায্য নেই, জমায়েতের জন্য বিশাল কোনো দরদালান‌ও নেই। আছে শুধু বাঙালি ও তার সংস্কৃতির প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা, দুই কামরার মাঝারি মাপের ফ্লাটের এক দুশো স্কয়ার ফুটের বসার ঘর, সদিচ্ছা এবং অক্লান্ত পরিশ্রম করার ক্ষমতা। 'যদি হ‌ও সুজন, তেঁতুল পাতায় ন'জন' কথাটিকে মূলমন্ত্র করে, এমনকি ব্যক্তিগত শোয়ার ঘরেও শ্রোতাদের বসার ব্যবস্থা করে, প্রায়শই মিলনমঞ হয়ে ওঠে আগ্রহী দর্শক-শ্রোতাদের মিলনক্ষেত্র। গত প্রায় দু'যুগে কে আসেননি সেই মঞ্চে! স্থানীয় খ্যাত-অখ্যাত শিল্পী-সাহিত্যিকরা ছাড়াও, কলকাতা থেকে আসা সস্ত্রীক সুনীল গাঙ্গুলী, শোভা সেন, তাপস সেন, বিভাস চক্রবর্তী, মলয় রায়চৌধুরী, সুবোধ সরকার, জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়, পার্থ ঘোষ, গৌরী ঘোষ, বিনায়ক বন্দোপাধ্যায় এবং এমনি আরো অনেকেই।

বম্বেDuck-এর এই সংখ্যার 'আমচি মুম্বাই' বিভাগে পাঠকদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব 'মিলন মঞ্চ' ওরফে রুদ্র-শর্মিষ্ঠার।





কবে এবং কীভাবে শুরু হয়েছিল মিলনমঞ্চ?

রুদ্র: কলেজে পড়ার সময় বা যখন সবে চাকরি পেয়েছি তখন থেকেই আমার শখ ছিল বারবার বেড়িয়ে পড়া। দেশের নানান প্রান্তে। বিশেষ করে নানান পাহাড়ে। সঙ্গে থাকতো সাধারণ ক্যামেরা। ফিরে এসে সেইসব পাহাড়ের সাদা কালো ফটো মাকে দেখালে মা বিরক্ত হয়ে বলতেন, কী দেখতে পাহাড়ে যাস বারবার? আমার ভয় করে। তবুও তিনি আমাকে নিরুৎসাহিত করতে পারেননি। আমি তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করতাম যে এইসব বেড়ানো শুধুই মজা নয়, এর মধ্যে আমি পাই এক অনির্বচনীয় আনন্দ, অভিযানের এক উত্তেজনা। আসলে আমি তো সাধারণ ভ্রমণবিলাসীদের মত শুধু ছুটি কাটাতে যেতাম না, আমাকে টানতো প্রত্যেকটি পাহাড়ের নিজস্ব সৌন্দর্যের সঙ্গে সঙ্গে তাদের গোপন রূপ যা সাধারণ চোখে ধরা পড়ে না। আমি খুঁজতাম সেখানকার লুকিয়ে থাকা ইতিহাস, স্থানীয় আদিবাসীদের সংস্কৃতি ও সংস্কার। আর যত পারতাম ছবি তুলে রাখতাম। এরপর মুম্বাই চলে আসি চাকরি নিয়ে। একদিন সেইসব ছবি দেখে আইপিটিএ-র সঙ্গে যুক্ত, বিহার নাট্য একাদেমির সদস্য এক পরিচিত ভদ্রলোক আমাকে বললেন, বাঃ, তুমিতো ভালো ছবি তোলো! ফটোগ্রাফি শেখো না কেন? তিনিই উদ্যোগী হয়ে মুম্বাইয়ের জেজে স্কুল অফ আর্টস থেকে ভর্তির ফর্ম ও প্রসপেক্টাস নিয়ে এলেন। ভর্তি হয়ে গেলাম।

সেখানে ক্লাস করতে গেলে আমাকে বলা হয়েছিল বেশি করে নামী শিল্পীদের ছবি দেখতে, গ্যালারিতে গিয়ে নিয়মিত চিত্রপ্রদর্শনী দেখতে। ফটোগ্রাফি শিখতে গিয়ে শিল্পীদের হাতে আঁকা ছবি দেখতে বলাতে প্রথমে অবাক হলেও পরে এই দুই শিল্পের মধ্যের নিবিড় সম্পর্ক বুঝতে শিখলাম। ছবির কম্পোজিশন, তাতে আলো আঁধারের ব্যবহার বুঝতে শেখা আমার ফটোগ্রাফির শিক্ষাকে সম্পূর্ণ করল। এবং এরই সঙ্গে সঙ্গে শিল্পের অন্যান্য শাখাগুলির প্রতিও আগ্রহী করে তুললো।

এরপর বাড়িতেই ফটোগ্রাফির উপযোগী কিছু কিছু লাইট লাগালাম। স্টুডিওর মতো নিজে ব্যবহার করব বলে। তখন ঘুরে ঘুরে নানান অনুষ্ঠান দেখতাম, আর্ট এক্সিবিশন দেখতাম। বিভিন্ন গুণী মানুষের সংস্পর্শে আসতাম। কিন্তু যখনই ভালো কিছু দেখতাম, ভালো কিছু শুনতাম মনে হতো আমার পরিচিত সবাই সঙ্গে যদি এই আনন্দটুকু শেয়ার করে নিতে পারতাম! সে সময়েই ধরো কলকাতা থেকে কোনও গুণী মানুষ মুম্বাই এসেছেন, তাঁকে অনুরোধ করতাম আমার বসার ঘরে স্থানীয় মানুষদের জমায়েতে কিছুটা সময় কাটিয়ে যাওয়ার জন্য। কথা বলার জন্য। অনেকেই রাজি হয়ে যেতেন। আমি আমার পরিচিত আগ্রহী বন্ধুবান্ধবদের আমন্ত্রণ জানাতাম, এবং এইভাবেই শুরু হল মিলনমঞ্চের যাত্রা।

শর্মিষ্ঠা: যদিও আমি তখন ছিলাম না, কিন্তু ওর সেই পাগলামির গল্প শুনেছি। ওই যে বলল না, ফটোগ্রাফির উপযোগী লাইট লাগিয়েছিল বসার ঘরে, সেইসব লাইটকেই কী করে অনুষ্ঠানের সময় ব্যবহার করা যায় সে সব নিয়ে ওর ভাবনা শুরু হয়ে যায় তখন থেকেই। সত্যি বলতে শুধু আলোই নয় তারপর থেকে রুদ্রর সাধনাই হয়ে দাঁড়িয়েছে কী করে এই ঘরের প্রতিটি ফার্নিচার, প্রতিটি আলো, প্রতি স্কোয়ারফুট জায়গাকে মাল্টিপারপাস ইউজের উপযুক্ত করে তোলা যায়। এই এক‌ই ঘর কখনও স্টুডিও, কখনও আর্ট গ্যালারি, কখনও অডিটোরিয়ামের কাজ করছে। এখানে এমনকি নাচ, নাটক, গান, আবৃত্তি, আলোচনা সব‌ ধরনের অনুষ্ঠান‌ই বিভিন্ন সময়ে বন্ধুরা উপভোগ করেছে।



এত দীর্ঘদিন ধরে এই যে পরিশ্রম ও অর্থদণ্ড, ক্লান্তি লাগে না? প্রেরণার উৎস কী?

রুদ্র: না, না ক্লান্তির কোনও প্রশ্নই আসে না। একথা ঠিক যে আমাদের বয়স বাড়ছে, পরিশ্রম করার ক্ষমতা স্বাভাবিক ভাবেই কমছে। কখনও কখনও অনুষ্ঠানের শেষে একটা অডিটোরিয়ামের মতো করে সাজানো ঘরকে আবার প্রতিদিনকার ব্যবহার উপযোগী বসার ঘর করে তুলতে সত্যি কষ্ট‌ও হয়। কিন্তু এত মানুষের ভালোবাসা, আশীর্বাদ সে সব কষ্ট ভুলিয়ে দেয়।

শর্মিষ্ঠা: কত জরুরি কাজ স্থগিত রাখতে হয়। কত সামাজিক অনুষ্ঠানে যেতে পারি না, মিলনমঞ্চের অনুষ্ঠান থাকলে। কিন্তু আফসোস করি না। যখন আমাদের এই সাধারণ ঘরে গুণী মানুষের পায়ের ধুলো পড়ে, যখন এই ঘরে বসে অনেক মানুষ তাদের কথা শোনে, গান শোনে, তারা আনন্দ পায় তখন আমাদের সব কষ্ট যেন সার্থক হয়ে ওঠে। সব থেকে ভালোলাগে যখন দেখি যে সব শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব এখানে একবার এসেছেন, তারা ফিরে যাওয়ার পরেও মিলনমঞ্চের কথা মনে রাখেন। অন্যদের কাছে আমাদের এই উদ্যোগের প্রশংসা করেন। যখন তাঁরা আবার মিলনমঞ্চে আসার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। প্রবাদপ্রতিম সংগীতশিল্পী জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায় তো মৃত্যুর কিছুদিন আগেই দ্বিতীয়বার অনুষ্ঠান করে গিয়েছিলেন এই মিলনমঞ্চে।



কখনও কোনো বিরূপতার মুখোমুখি হতে হয়েছে?

রুদ্র: না না। কখনও না। যখন বসার জায়গা বড় করব বলে একটা শোয়ার ঘরের দেওয়াল ভেঙে ফেললাম, তখন দু-এক জন শুভাকাঙ্খী হয়তো আমাকে বিরত করতে চেয়েছিলেন, তবে সে আমার‌ই ভালো ভেবে। বিরোধিতা বা বিরূপতার মুখোমুখি হতে হয়নি, বরং বন্ধুদের সহায়তাই পেয়েছি এবং তাই আজ মিলনমঞ্চ শুধু আমাদের দুজনের নয়, অনেকের হয়ে উঠতে পেরেছে।



মিলনমঞ্চ মানেই আজকাল ভ্রমণ‌ও।

রুদ্র: ঐ যে শুরুতেই বলেছিলাম ভ্রমণের একটা নেশা আমার রক্তে ছিল‌ই। আগে একা ঘুরতে যেতাম, তারপর দুজনে, এখন যাই দল বেঁধে। আসলে মিলনমঞ্চের ভ্রমণ তো শুধুই ভ্রমণ নয়, যেখানেই যাই আমরা যেন একটা 'মোবাইল এ্যামবাসাডার অফ বেঙ্গল' হয়ে উঠি। সে দেশের মধ্যে‌ই হোক বা ইজিপ্টের মতো বিদেশেই হোক। আমরা জায়গার সঙ্গে সঙ্গে সেখানকার সংস্কৃতির সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্যও উপভোগ করার চেষ্টা করি। তাদের সামনেও আমাদের সদস্যরা তুলে ধরার চেষ্টা করে আমাদের সংস্কৃতি।

শর্মিষ্ঠা: আমরা মনে করি আমাদের মতো এমন বৈচিত্র্যময় দেশ পৃথিবীতে কম‌ই আছে। এক জীবনে এই দেশ দেখে শেষ করা সহজসাধ্য নয়। তাই আমরা চাই খুব বৈজ্ঞানিকভাবে পরিকল্পনা করে, জোন ভাগ করে এমন ভাবে ঘুরতে যাতে কম সময়ে কম খরচে বেশি জায়গা ঘোরা যায়। শুধু পরিচিত, জনপ্রিয় ট্যুরিস্ট স্পটগুলো নয়, বরং অপরিচিত বা কম পরিচিত অথচ ঐতিহাসিক বা ভৌগোলিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ জায়গাগুলোও রাখতে চাই আমাদের ভ্রমণ পরিকল্পনায়। এবং অনেকে মিলে গেলে আনন্দ ও খরচ দুইই ভাগ করে নেওয়া যায়। তাছাড়া, একলা যেতে সাহস পান না এমন অনেক বয়স্ক মানুষের‌ও বেড়ানোর সখ মেটে মিলনমঞ্চের মাধ্যমে।



এ তো খুবই ভালো উদ্যোগ। মিলনমঞ্চের ভবিষ্যত নিয়ে কোনও ভাবনা চিন্তা?

রুদ্র: দেখো, ইচ্ছে তো অনেক কিছুই আছে। তবে আমি মনে করি মিলনমঞ্চ এখন নিজেই একটি সজীব সত্তা, যে নিজের মতো করেই তার ভবিষ্যৎ যাত্রা পথ ঠিক করবে।

শর্মিষ্ঠা: আমাদের যতদিন সক্ষমতা আছে, ততদিন অন্তত মিলনমঞ্চ‌ও থাকবে। অল্প বয়স্ক বন্ধুদের সাহায্য পেলে একটা অনুষ্ঠানের আয়োজনের সঙ্গে যে কায়িক শ্রম জড়িয়ে থাকে তা সামলানো সহজ হয়ে ওঠে। এবং বন্ধুদের পাইও পাশে। কাজেই যতদিন মানুষ চাইবে, মিলনমঞ্চ‌ও ততদিনই থাকবে।

তাকিয়েছিলাম এই দম্পতির মুখের দিকে। যে মুখ অনেক মানুষের ভালোবাসার আলোয় উজ্জ্বল। মনেমনে কুর্ণিশ করলাম এদের অদম্য প্রাণশক্তিকে। অনেককে নিয়ে চলার এই ইতিবাচক মনভঙ্গীকে।

ফেসবুক মন্তব্য