উৎসব

জয়া মিত্র



ভারতবর্ষ নামের এই বিচিত্র দেশটির মতিগতি এখনও কিছুমাত্র বোঝা গেল না।

একদিকে এত রকম ভাষা, এত ধর্ম, এত বিভিন্ন রকম ভূ-প্রকৃতি... আরো অনেক বলা যায়- এত রঙের পতাকা, প্রত্যেক শিক্ষিত নাগরিকের এত বিভিন্ন মতামত... আবার অন্য দিকে দূর দূর সব প্রান্তের সংস্কৃতিতৠ‡ এমন অদ্ভুত সব মিল যে তার রহস্য খুঁজবার লোভ জয় করাই মুশকিল।

নববর্ষ উৎসবের সময়ে এই কথাটা আবার করে মনে পড়ে। ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির অনেক কটি সমাজই তাদের নববর্ষ পালন করে এই শেষ চৈত্রে। বাতাসে সূর্যের ছোঁয়া উজ্জ্বলতর হয়, বসন্তদিন আতপ্ত থেকে তপ্ত হয়ে উঠতে থাকে ক্রমশ। সূর্যের গতিপথ হিসেব করে এই পৃথিবীর কক্ষপথে এক থেকে অন্য ঋতুতে যাত্রার রহস্যপথ আজ এই যন্ত্র-ব্যঠ্ত কালেও আদরে পালিত হয় বছরের শুরু বলে। এ দেশের অনেকগুলো অঞ্চলে হয়।

আমার কাছে সবচেয়ে সুন্দর লাগে সাঁওতাল সমাজের বর্ষ বরণ। তার নাম বাহা পরব। সে ভাষায় বাহা মানে যে ফুল সে কথা অনেকেই জানেন। শাল সাঁওতালদেঠ° পবিত্র গাছগুলির অন্যতম, তার ফুল এলে ‘বাহা পরব’এর সময় হয়। শালের, কিংবা সারজোম, যে নামে এই বৃক্ষপ্রিৠজনগোষ্ঠি এই গাছকে ডাকেন, তার ফুল সম্পর্কে ‘এলে’ ক্রিয়াপদই ব্যবহার করতে ইচ্ছে করে, এমন সে ফুল সুন্দর। যেন রূপোর নাকফুলের মত মিহি আর হালকা, ঝুরুঝুরু উড়ে পড়ছে সেই সমুন্নত বৃক্ষের অঞ্জলি থেকে। প্রকৃতির সেই গাঢ়বসন্ত শ্বেতসুগনৠà¦§ রূপই নতুন বছরের সবচেয়ে শুদ্ধ রূপ যেন। আশপাশে সাজানো শালের কচি সবুজ পাতা আর লাল মাটির ঢেউ খেলানো নাচ। এই নাট্যপটে হয় বাহা উৎসব। গ্রামের নাইকি হাড়াম বা পুরোহিত একটি নতুন কুলোয় সারজোমের পাতাসুদ্ধ ফুল রেখে সকলের বাড়িতে ঘুরিয়ে তা দেখিয়ে আনবেন। বাহা-র আগে উঠোন নিকোনো হবে জেরের কাঠ বুলিয়ে, মসৃণ করে। দেওয়ালে আঁকা হবে গাছসুদ্ধ ফুল, ময়ূর, মোরগ। সন্ধ্যেবেঠ²à¦¾à§Ÿ গানের সঙ্গে নাচ হবে। এই আনন্দ উৎসবের একটি প্রধান অঙ্গ হল গায়ে জল ছুঁড়ে দেওয়া। আদর-à¦…à¦­à¦¿à¦®à¦¾à¦¨à ‡à¦° সম্পর্কীয়ৠ‡à¦°à¦¾, বিশেষত তরুণতরুণীঠাই এই আচারে অংশ নেন। তার ভিতরের অর্থ এরকম – জেনে বা না-জেনে গত একবছরে যদি কারো মনে কোনো দুঃখ দিয়ে থাকি, এই পরিষ্কার ঠান্ডা জল দিয়ে তা ধুয়ে দিলাম। এত সুন্দর এই প্রথাটি! পরে অবাক হয়ে জানতে পারি যে দক্ষিণপূরৠà¦¬ এশিয়ার এক বৃহৎ অঞ্চলে এই পরস্পরের গায়ে জল দেওয়া নববর্ষ উৎসবের এক আবশ্যিক অঙ্গ। বিশেষত বৌদ্ধধর্মৠর à¦…à¦¨à§à¦—à¦¾à¦®à§€à¦¦à§‡à ¦° মধ্যে গত এক বছরের দোষ-ত্রুটি প্রক্ষালন করার প্রথা চলে আসছে। সেখানে আবার বেশি করে বয়স্করা জল দেন ছোটদের গায়ে। প্রক্ষালন শব্দটিও প্রণিধানযৠগ্য। সাধারণভাবৠ‘ক্ষালন’ শব্দের মানে (মালিন্য) মোচন করা। কিন্তু তার আগে প্র উপসর্গটি যুক্ত হলেই তার অর্থ দাঁড়াল ধোয়া, অর্থাৎ কাজটির সঙ্গে আবশ্যিকভাঠ¬à§‡ জল যুক্ত হল। à¦¬à¦¾à¦‚à¦²à¦¾à¦¦à§‡à¦¶à§‡à ° কিছু অঞ্চলে, মিয়ানমারে, জাপানের কিছু জায়গায় এখনও এই প্রথা নববর্ষ পালনের সঙ্গে যুক্ত। নববর্ষে নানান নদী বা জলাশয়ে প্রক্ষালন অথবা অবগাহন স্নানের সঙ্গে।

জলের সঙ্গে খানিক মিষ্টতাও যুক্ত আছে পাঞ্জাবী নববর্ষ উৎসব পালনে। বাংলা নববর্ষের একদিন আগে ‘বৈশাখী’ কথিত পাঞ্জাবীদৠর বর্ষবরণের অন্যতম প্রধান উপাচার চেনা-অচেনা নির্বিশেষৠলোকেদের বড় বড় গ্লাসে করে দারুণ সরবত খাওয়ানো। সে সব গ্লাসের আলাদা নামই ‘বৈশাখী গ্লাস’। শুকনো, ধুলো ওড়া গ্রীষ্মের দিনে তার চেয়ে যত্ন আর কীসে! মনে আছে পঞ্চনদের দেশে জল সংকট শুরু হবার আগে এক তরুণের ছলছল করে ওঠা চোখ, ‘বতাও বহনজী, বিসলারিকে পানি খরিদকে বৈসাখী মনাউঁ কৈসে?’

প্রতিবেশী রাজ্য উড়িষ্যায় এই বর্ষবরণ উতসবই পালিত হয় ‘বিষুব সংক্রান্তঠ¿â€™à¦¨à¦¾à¦®à¥¤ সতীব্র রৌদ্রদগ্ধ এই ‘বিষুব সংক্রান্তঠ¿â€™à¦° বৈশিষ্ট্য হল একই দিনে বর্ষশেষ ও বর্ষশুরু পালিত হয়। দু বছর আগে উড়িষ্যার প্রথম মুখ্যমন্তৠরী, হরেকৃষ্ণ মহতাবের ছেলে ভর্তৃহরি মহতাবের আমন্ত্রণে তাঁদের সাহিত্যপত্ র ‘ঝংকার’ তহীরকজয়ন্ঠ¤à§€ উপলক্ষ্যে কটক গিয়ে এই উৎসব কাছ থেকে দেখবার সুযোগ হয়। সেখানেও এই সকলে মিলে একসঙ্গে খাওয়া উৎসবের এক প্রধান অঙ্গ। কিছু বিশেষ উপকরণও থাকে তার মধ্যে- যেমন পান্তাভাতৠর সঙ্গে একেবারে অন্য রকম স্বাদের এক বড়িভাজা। খাওয়ার মূল উপকরণের মধ্যে বেশিরভাগই গ্রীষ্মের উপযোগী উপকরণ। সকলে মিলে একসঙ্গে খাওয়াটাই প্রধান উৎসব।

নববর্ষে খাওয়ার উৎসব অসমেও। বিহুতে অসমের বিশেষ ‘কোমল চাল’ এর সঙ্গে ব্যঞ্জনই ভোজের প্রধান আকর্ষণ। নাচের চেয়ে তার আবেদন বেশি না কম-এ নিয়ে মতভেদও হতে পারে। অনেকটা অসমের মতই চট্টগ্রামৠর নববর্ষে সহ-ভোজনের পরব। আরো পাঁচপদের সঙ্গে গ্রীষ্মের নানা সবজি ও মুগের ডাল দিয়ে রাঁধা ঘন্ট গৃহিণীরা আট বাড়ি কি দশবাড়ি পাঠান। সবাই সবাইকে দেন। তারপর খাওয়া হয়।

আমাদের বাঙালিদেরঠ“ নববর্ষে পরস্পরের সঙ্গে কোলাকুলি করার, পরস্পরকে জড়িয়ে ধরার বিধি ছিল। পাড়ায় নবীন-à¦ªà§à¦°à¦¬à§€à £ নির্বিশেষৠএকরকম ঘরোয়া সম্পর্ক থাকত। এমন নাও হতে পারে যে সেটা সর্বদাই গভীর প্রেমপূর্ঠ£, কিন্তু বিজয়া দোল ঈদ কি নববর্ষের দিনে সেইসব বিভেদ, সোজা কথায় মন কষাকষি ভুলে একসঙ্গে ফলমিষ্টি খাওয়া, একে অন্যকে জড়িয়ে ধরা, আজ মনে হচ্ছে সেও তো একরকম ধুয়ে দেওয়াই। পুরোন অপ্রেমকে ধুয়ে দেবার ভঙ্গি। হতেও তো পারে- অই ভঙ্গি থেকেই কখনো আন্তরিকতাঠ“ সঞ্চারিত হয়।

হয়ত সেই প্রাচীন সামাজিক সম্পর্কেরঠ‡ বিকল্প হয়েছে আজকে নগরজীবনের বিভিন্ন হাউসিং বা ফ্ল্যাট সোসাইটি। হতেই হবে কারণ, মানুষ তো মূলত সামাজিক জীব। ব্যক্তিগত কোন সুখ-দুঃখ অন্যের সঙ্গে ভাগ না-করে সে ঠিকমত যেন নিজের বোধের মধ্যে নিতে পারে না। তাই হয়ত নানারকম সামাজিক উৎসব তৈরি করে হাঁফ ছাড়ে। সেই অবসরগুলিতৠ‡ সে একক সংসার ছেড়ে বাইরে আসে, সমাজের সঙ্গে নিজেকে মেলায়। বড়ো সুন্দর এই মিলন-উৎসব। আমাদের মত সংস্কৃতি বৈচিত্রের দেশে এই উৎসবগুলিই আমাদের ধর্মের সিংহভাগ। আমরা কখনো খেয়াল করিনা, আবার সংকটের সময় হঠাৎ কখনো খেয়াল করি।

আজকের বৃক্ষহীন, রুক্ষ দগ্ধ পয়লা বৈশাখের সঙ্গে একশ বছর আগেকার নতুনপাতায় ঝলমলে গাছপালা ভরা পুকুরের জলে ঢেউ দিয়ে ছুঁয়ে আসা বাতাসী পয়লা বৈশাখের অমিল আছে জানি। তার অঙ্গে জড়ানো থাকত বেলফুল নিমফুলের মৃদু গন্ধ। হাতে ফলের সরবত।

নাহয় তাই হল। আমরা কি তাতে কিছুমাত্র ডরাই? স্মৃতি তো বর্তমানের সঙ্গে ফ্রি। উৎসবে আমাদের ডবল লাভ।



ফেসবুক মন্তব্য