মনচাদরের গিঁট

অঞ্জনা চট্টোপাধ্যায়



শীতের দিনের সব্জির স্বাদই আলাদা। কড়াইশুঁটির কচুরিগুলো ভাজতে ভাজতে ভাবি। গতকাল সন্ধেবেলা পুরটা করে রেখেছিলাম, নক হলে সকালবেলায় খুব চাপ পড়ে। সকালের ওষুধটা খেয়ে টেবিলে একবার বসলে আর এক মিনিট দেরি সয় না মার, সঙ্গে সঙ্গে খাবার চাই! নইলেই মেজাজটা বিগড়ে যাবে।
মুখ ধুয়ে চুল আঁচড়ে ফিটফাট হয়ে টেবিলে এসে বসে মা। জল আর ওষুধ সামনেই রাখা ছিল, খেয়ে নেয়। আর ঠিক তখনই নতুন আলুর কষা দমের পাশে ছোট্ট দুটো গরম কচুরি সাজানো প্লেটখানা মার সামনে রাখি। মার মুখে হাসির বদলে বিষাদ। ইস, মিথ্যে এত খাটা!
মনকে দমতে দিই না। ওমা, মিথ্যে আবার কি? কেউ খেলে তো আনন্দ! কেন, তোমার খেতে ইচ্ছে করছে না?
বিস্বাদ মুখে মা বলে, কী দরকার ছিল? ওই পাউরুটিতেই হয়ে যেত!
এই চলছে কিছুদিন ধরে। নিজের প্রতি প্রবল অবহেলা, সবকিছুতে বিরাগ। আগে কত উৎসাহ নিয়ে খেত, মুখে খুশি ঝলকাত, ইদানিং কী যে হয়েছে, একেবারে হিমেল হয়ে থাকে। কি করলে যে মার এই অবসাদটা কাটবে!
মা খুঁটে খুঁটে খায়। ভয় হয় বুঝি একটা কচুরি তুলে রাখে কিন্তু নাঃ, টুকটুক করে দুটোই খেয়ে নেয়! ধূমায়িত চায়ের কাপটা দেখে সামান্য হাসি ফোটে। যাক, হাসি মানে মন ভালো, মানে শরীরও ভালো। খবরকাগজটা হাতে ধরিয়ে ফের রান্নাঘরে ঢুকি। আজ পুঁইশাকের চচ্চড়ি হবে সবরকম সব্জি দিয়ে। আর বাঁধাকপির তরকারি। বাঁধাকপি আর আলু কেটে প্রেশারে সিদ্ধ করে রেখেছি। নইলে মা খেতে পারে না। মার পছন্দের অড়হড় ডালও আনিয়ে রেখেছি কাল। আচ্ছা অড়হড় ডালে কী ফোড়ণ দেয়? কতদিন রাঁধা হয়নি, ভুলে গেছি। ফোড়ণের কথাটা মাকে জিগেস করতে ছুটি।
ও মা! ঘরে গিয়ে দেখি মা বালিশের তলায় আথালপাথাল কি খুঁজছে। কি হলো মা, কি খুঁজছো? মা ঠান্ডা চোখে আমার দিকে তাকায়। আমার ব্যাগটা এখানে ছিল, গেলো কোথায়?
-ব্যাগ? কোন ব্যাগ?
মার দুচোখে তীব্র ধিক্কার। কোন্ ব্যাগ? তুমি কিছু জানো না?
আমি তো অবাক! মানে? আমি কি করে জানবো?
মা তখনো খুঁজে যাচ্ছে। বিছানা ছেড়ে এবার আলমারি খুলে ঘাঁটতে থাকে। কাঁধের আঁচলটা খসে পড়েছে, দুচোখ ভর্তি রাগ, এলোপাথাড়ি হাটকাচ্ছে, এটা টানতে ওটা পড়ছে, কোনও খেয়াল নেই।
আমি বিমূঢ়় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। মার হলো কি হঠাৎ?
-কি ছিল ব্যাগে?
-আমার টাকাগুলো সব নিয়ে নিলি?
এবার আমি হেসে ফেলি। কী যে বলো তুমি! তোমার কোন টাকা?
মা স্তম্ভিত বেদনায় তাকিয়ে থাকে। বিশ্বাস হারানোর বেদনা। কোন টাকা? কিছু জানো না? দাঁড়িয়ে হাসছো?
আমি কি বলবো ভেবে পাই না।
-এ ঘরে আর আসবে না, আমার আলমারিতে হাত দেবে না তুমি!
দ্রুত ওঘর থেকে সরে আসি । মনের মধ্যে বিপর্যয়, ভেতরটায় সুনামির তোলপাড়। চোর? এত বড় অপবাদ দিল মা আমাকে? ছি ছি ছি। চোখ ঠেলে জল আসে। বুকভাঙা দুঃখ বোধহয় একেই বলে! গুম হয়ে খাটের ওপর বসে থাকি । অনেকক্ষণ। একসময় ধীরে ধীরে সেন্টিমেন্টের ভূতটা মাথা থেকে নামে। নিজের নির্বুদ্ধিতায় নিজেকেই গাল পাড়ি। ওঘরে গিয়ে দেখি মা এলোমেলো বিছানায় চোখ বুজে শুয়ে। আমাকে দেখামাত্র ফের গজগজানি শুরু হয়ে যায়। একথা সেকথা বলে ভুলিয়েভালিয়ে তাকে তুলি, মাথা ধোয়াই, খাওয়াই, ওষুধ দিই, এক সময় সে ঘুমিয়েও পড়ে। এবার শুরু হয় ডাক্তারের খোঁজ। আর খোঁজ করতে গিয়ে পেয়ে যাই আমাদেরই এক বন্ধুকে, বর্তমানে নামকরা সাইকিয়াট্রিস্ট। ফোন, অ্যাপয়েন্টমেন্ট, মাকে নিয়ে দেখানো, টেস্ট ইত্যাদি শেষে বন্ধুবর রায় দিল, ডেমেনশিয়া। যেটা এ বয়সে স্বাভাবিক। এ রোগের প্রথম লক্ষণই হলো প্যারানয়া, ক্ষতি হওয়ার অলীক ভয়। তারই প্রকাশ সন্দেহ আর চুরির আশঙ্কায়। দীর্ঘ জীবনের মনচাদর জুড়ে অজস্র সূতোর গিঁট! মস্তিষ্কের কোষ যত শুকোতে থাকে, অবদমিত সেইসব গিঁট তত আত্মপ্রকাশ করতে থাকে। তাই এর চিকিৎসায় শুধু ওষুধ না, সঙ্গে চাই ধৈর্য আর মমতার শুশ্রূষা।
ধীরে ধীরে আবার মা শান্ত প্রকৃতিস্থ। তবু ভয় কাটে না। কে জানে, যদি আবার ওইরকম ভারসাম্য হারায়?
সেদিন দীপালি ছুটি নিয়েছে, কাচা জামাকাপড়গুলো পাট করে মার আলমারিতে তুলতে গিয়েও থেমে যাই।
- তোমার আলমারিটা একটু খুলব মা?
মা কাগজ থেকে মাথা তুলে অবাক হয়ে তাকায়। ওমা, এতে জিগ্গেসের কি আছে?
-না মানে...যদি তোমার ব্যাগ-ট্যাগ কিছু....
মা বলে, ব্যাগ? আমার আবার ব্যাগ কোথায়? যত্তো সব পাগোল!

ফেসবুক মন্তব্য