মিথ্যে নয় সত্যি নয়, মুক্তিপ্রকাশ রায়, ঘাট, কাকস্নান নিষিদ্ধ ২০১২

সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়

পড়া শুরু করলে নামিয়ে রাখা মুশকিল, যাকে বলে unputdownable। মুক্তির সঙ্গে এবারের বইমেলায় আলাপ হতে "ভালবাসাসহ" বইটা হাতে দিয়েছিল। আমি খুব দ্রুত পড়তে পারি না, তাও কলকাতা থেকে উড়ে মুম্বাইয়ের জমি ছোঁয়ার আগেই একুশখানা গল্প পড়ে ফেলেছিলাম। এখানে বলে রাখা ভালো পড়ার ব্যাপারে আমি বেশ খুঁতখুঁতে (শৌখিন/ নাক উঁচু), পত্র পত্রিকায় ছাপা অধিকাংশ গল্পই এক দেড় প্যারাগ্রাফের বেশি পড়তে পারি না। স্বর্গের সিঁড়ি ভাঙাচোরা হলে আমার সেখানে যেতেও আপত্তি থাকে। মৃদু মন্দ হাওয়া দেবে, সিঁড়ির দুধারে জুঁই লতা হেলবে দুলবে, জুবি ডুবি জুবি ডুবি পাম্পারা জুবি ডুবি প্যারাম্পা... তবেই না উত্তরন সার্থক। প্রতিটি গল্পেই চাপা হিউমার, চোখা উইট চাখতে চাখতে শেষ পাতে যখন মধুরেণ সমাপয়েৎ হবে বলে আশা করে বসে আছি, তখনই কোনো না কোনো বিপর্যয়! অথবা বলা যায়, নতুন তিন-ধারি ব্লেডে দাড়ি কামানোর মতো, মাখনের মতো কামিয়ে মুখ ধুয়ে দেখলে থুতনির নিচে অনবধানের চেরা দাগ থেকে রক্ত বিন্দু ফুটে উঠল।

তবে এই উইট আসলে শাঁখের করাত, দু-দিকেই কাটে, “যাদের ‘লালন’ খরচ ‘ফকির’ করে দেবার মত” ব্লগে বা আড্ডায় চলে, সিরিয়াস ছোট গল্পে দেখলে আমার অন্তত একটু অস্বস্তি হয়। বস্তুত আমার মনে হয়েছে গল্পগুলি বেশ অনেক দিন ধরে রচনা করা হয়েছে। প্রথম দিকের গল্পগুলির ওপর ব্লগের প্রভাব চোখে পড়ে। সেই তুলনায় শেষ দিকে ভাষ্য বেশি পরিণত। গল্পগুলি কি রচনার সময়ের ক্রমানুসারে সাজানো?

পড়তে পড়তে পার্ট-টাইম টিচার মানব ও তার সুখ দুঃখের ভাগীদার হয়ে পড়েছিলাম। তবে মনে হচ্ছিল গল্পগুলিতে উপস্থাপনার জন্য যতটা সময় দেওয়া হয়েছে, জাল গোটানোর সময় ততটা সময় দেওয়া হয়নি। বেশ কিছু গল্প আমার মনে হয়েছে হঠাৎ করে শেষ হয়ে গেল। দৈর্ঘ্যে এবং যথাযথ পরিসমাপ্তিতে ঘাটতি রয়ে গেল। নদীর মতো অনিবার্য্য মোহনার দিকে গড়িয়ে যেতে পারল না। খানিকটা অতৃপ্তি রয়ে গেল। যেমন উচ্ছেদ গল্পে রাস্তার কুকুর গুলির ফিরে না আসায় প্রোটাগনিস্টের মন খারাপের কারণটা বুঝতে পাঠককে যথেষ্ট পরিশ্রম করতে হয়। আর একটু প্রাঞ্জলতা কাম্য ছিল।

ভালো লেগেছে শোক, পিঁপড়ে, পঙ্কজবাবুর অপসংস্কৃতি, সলমন খানের গেঞ্জি, অভিযোজন, মেসোমশাইয়ের নতুন ফ্ল্যাট, মানবের শেষ টিউশন, সাঁইবাবা...। ভালো লাগেনি, জন্মদিন, একটু মোটা দাগের রসিকতা মনে হয়েছে... গল্পটি মানবের প্রকৃত জীবনবোধে শেষ হলে ভালো লাগত। বোধের অভাব নেই কিন্তু যথাযথ জায়গায় খুঁজে না পেয়ে সামান্য হতাশ লাগে। বলাই বাহুল্য ভালো লাগেনির থেকে ভালো লেগেছের সংখ্যা অনেক বেশি। আজকের ধূসর সময়ে "মিথ্যে নয় সত্যি নয়" মন ভালো করার অব্যর্থ ওষুধ।

ফেসবুক মন্তব্য