ডার্করুম

দীপঙ্কর মুখোপাধ্যায়



সকালে ঘুম ভাঙার পর ময়ূর দেখল পাতলা চাদরের তলায় সে সম্পূর্ণ নগ্ন। যে ঘরে তার ঘুম ভেঙেছে সেটিকে কোনও তারকা হোটেলের স্যুইট বলেই মনে হয়। নাইটল্যাম্পের মৃদু আলোয় স্বপ্নবৎ চারপাশ। এসি চলছে। জানালায় ভারী পর্দা। সময় ঠাহর হয় না। বেডসাইড টেবিলের ওপর রাখা তার সেলফোন, ওয়ালেট। সেলফোনের বোতাম টিপল ময়ূর। সাতটা বেজে পঁয়ত্রিশ মিনিট চুয়াল্লিশ সেকেন্ড। এএম। আটটা মিস্‌ড-কল জমে আছে। তার মধ্যে একটি মিস্টার বর্মণের, বিল্লুর একটা, বাকি ছটাই সোহিনীর।
গত রাতে মিস্টার বর্মণের বার্থ-ডে পার্টি ছিল। ঘনিষ্ঠ কয়কজন সাংবাদিককে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন তিনি। তাঁদের মধ্যে এক জন ময়ূর গোস্বামী।
সোহিনী বলেছিল, দেখিস, মাল টেনে বেহুঁশ হয়ে যাস না। মিস্টার বর্মণকে তো তুই চিনিস। হাইলি ইনফ্লুয়েনশল। হি মাস্ট নট বি অফেন্ডেড!
ময়ূর কাঁধ ঝাকিয়ে বলেছিল, কী ভাবিস বল তো আমায়?
সোহিনী বলেছিল, এত বড় রিয়েল এস্টেটের ব্যবসা যাঁর, নিজের জন্মদিনে তিনি নিশ্চয়ই দিশি মদ খাওয়াবেন না। শেরি, শ্যপাঁ, স্কচের ফোয়ারা ছুটবে। তাই বলছিলাম, একটু সামলে থাকিস। সুযোগ বারবার আসে না, রিমেমবার!
ময়ূর মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে বলেছিল, গরিব সাংবাদিক হতে পারি, কিন্তু হাভাতে নই। এত দিন ঘর করেও সেটা বুঝলি না? আই নো মাই জব।
এর পরেই স্ত্রী’র গভীর চুম্বনে ভেসে গিয়েছিল ময়ূর। ছ’বছরের দাম্পত্য জীবন হলেও, সোহিনীর চুম্বনের তীব্রতা এতটুকুও কমেনি। বউয়ের প্রতিটি চুম্বনই আজও একইরকম উপভোগ্য।
এতক্ষণে ময়ূর শব্দটা শুনতে পেল। ঘরের লাগোয়া বাথরুমে কেউ স্নান করছে। তার মানে এই স্যুইটে সে একা রাত্রি কাটায়নি। চাদরের তলায় নিজের নগ্ন শরীরের কথা মনে পড়ল। তবে কি...
অন্ধকার ঘরে খেলা শুরু হয়েছে। খেলার নাম ডার্করুম। ঘরের বাইরে থাকবে একজন। অন্ধকার ঘরের আসবাবের মধ্যে লুকিয়ে থাকবে অন্যরা। বাইরের খেলুড়ে ঘরে ঢুকবে। অন্ধকার হাতড়িয়ে এক-একজনকে খুঁজে নিয়ে সঠিক নামে চিহ্নিত করবে। এটাই খেলার দস্তুর। ভুল হলেই ফের খাটান দিতে হবে।
সেদিন বিকেল থেকে বৃষ্টি শুরু হল। প্রথমটায় ঝিরঝির, তার পর মুষলধারায়। সেই বৃষ্টির মধ্যেই অনুসূয়াকাকীমা এলেন মেয়েকে নিয়ে। কয়েক মাস হল ময়ূরদের পাড়ায় ভাড়া এসেছেন। ময়ূরের মায়ের সঙ্গে কী ভাবে যেন আলাপ। সেই সূত্রেই এসেছেন মেয়ের জন্মদিনের নেমন্তন্ন করতে।
বন্ধুদের সঙ্গে ময়ূর ক্যারম খেলছিল বারান্দায়। অনুসূয়াকাকীমার মেয়ে এসে দাঁড়াল।
-তোর নাম কী?
-পৃথা।
-কোন ক্লাশে পড়িস?
-ফাইভ।
-ক্যারম খেলতে পারিস?
-উম্‌হুঁ।
আইডিয়াটা ছিল প্রীতমের। আচ্ছা, ডার্করুম খেললে কেমন হয়? সবাই লুফে নিয়েছিল প্রস্তাব। এমন বৃষ্টির দিনে ডার্করুমই জমবে ভালো।
একটা সাদা তোয়ালে মাত্র গায়ে জড়ানো। ভেজা চুল বেয়ে জল গড়াচ্ছে কপালে, গালে, ঠোঁটে, চিবুকে...ময়ূর কোনও রকমে বলার চেষ্টা করল, আপনি...মানে...কাল রাতে...
ভদ্রমহিলা শব্দ করে হেসে উঠতে গিয়ে জিব কাটলেন, এই রে, স্যার!
ময়ূর বিস্মিতভাবে বলল, স্যার?
ভদ্রমহিলা বললেন, হ্যাঁ, মিস্টার বর্মণও রয়েছেন এই স্যুইটে। পাশের ঘরে। এখন তিনি ঘুমোচ্ছেন।
ময়ূর বলল, আমি কিছু বুঝতে পারছি না। প্লিজ, একটু বুঝিয়ে বলুন। আমার সব কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে। আপনি কে? দয়া করে হেঁয়ালি করবেন না। আমি খুবই ডিস্টার্বড!
ভদ্রমহিলা জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা, আপনার অন্ধকার কেমন লাগে?
ময়ূর বলল, এই প্রশ্ন আসছে কোত্থেকে? আপনার কথার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছি না। আমি এখানে কেন? কীভাবে এলাম?
ভদ্রমহিলা বললেন, অন্ধকার আপনার ভালো লাগে না, মিস্টার গোস্বামী?
-দেখুন, এই পরিস্থিতিতে এই ধরণের হেঁয়ালি ঠিক নিতে পারছি না। আমি কোথায়, আগে সেটা বলুন। গতকালের পার্টিতে কী হয়েছিল? রাতে বাড়ি ফিরিনি, বাড়ির লোক নিশ্চয়ই খুব উদ্বিগ্ন, চিন্তিত।
এবার শরীর ঝাঁকিয়ে হেসে উঠলেন সদ্যস্নাত মহিলা। তাঁর বেতস শরীর জড়িয়ে থাকা তোয়ালে কিছুটা আগলা হয়েছে, বুকের বিভাজিকা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ময়ূর বলল, আপনি কে?
ভদ্রমহিলা ম্লান হাসলেন, জানতাম চিনতে পারবেন না। নেশাও তো হয়েছিল খুব। ভয় নেই। আমি কারুকে কিছু বলব না।
ময়ূর রাগতভাবে বলল, কী বলবেন? আমি কী এমন গর্হিত কাজ করেছি?
ভদ্রমহিলা ঘনিষ্ট হয়ে বসলেন। শরীরে জড়ানো তোয়ালে প্রায় খুলে গিয়েছে। বললেন, এখনও চিনতে পারছেন না? এই দেখুন আমার স্তন, এই আমার নাভি, এই আমার যোনিরোম...আমি মিস্টার বর্মণের এসকর্ট। সব চেয়ে দড় এসকর্ট। কারণ মিস্টার বর্মণ আমাকে ভালোবাসেন। আমাকে তাঁর মিস্ট্রেসও বলতে পারেন। আমার সব কথা তিনি শোনেন, সব আবদার রাখেন।
তুমুল বৃষ্টির শব্দ, ঝোড়ো হাওয়ার শো-শো আওয়াজ, ঘরের ভিতরে স্যাঁতস্যাঁতে অনুভূতি। একটি কিশোরী, যাকে ময়ূর ঠিক চেনে না, কিছুক্ষণ আগে যার সঙ্গে পরিচয় হয়েছে, তার ছোট্টো শরীরে শরীর লেপটে রয়েছে ঘরের আসবাবের ঘন অন্ধকারে। কয়েক মুহূর্ত যেন মহাকাল। মেয়েটির সদ্য ফোটা স্তনের আভাস পাচ্ছে ময়ূর, লো-কাট স্কার্টে নগ্ন ঊরুর আভাস...সব কেমন গোলমাল হয়ে যাচ্ছে...
ময়ূর বলল, আপনি সত্যিই সুন্দরী, অপরূপাও বলা চলে।
ভদ্রমহিলা হেসে বললেন, মনে পড়েছে তাহলে?
-কী মনে পড়বে?
-অন্ধকারেরও কি কোনও আলো থাকে, মিস্টার গোস্বামী?
ময়ূর বলল, কী বলছেন, কিচ্ছু বোধগম্য হচ্ছে না।
-এক বার স্পর্শ করে দেখুন, সব মনে পড়ে যাবে। দাঁড়ান, আগে ঘরের আলোটা নিভিয়ে দিই।
আদিম বৃষ্টির শব্দ। সময় যেন পাথরের মতো স্থবির। ক্রমশই ময়ূর তলিয়ে যেতে থাকে গভীরতর এক অন্ধকারে।
সেলফোনে বিঠোফেন। সোহিনী ফোন করেছে। বিল্লুকে আজই জানাতে হবে নিউটাউনের কোন ফ্লোরের ফ্ল্যাট তারা নেবে। মিস্টার বর্মণের প্রোজেক্ট। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, ময়ূর গোস্বামী যেমন চাইছেন, তাই-ই যেন দেওয়া হয়। ফোন বেজে যাচ্ছে...

ফেসবুক মন্তব্য