চাঁদে ঘর

সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়



পাপড়ি আমায় ছেড়ে পালিয়ে গেল। আমি রাতের বেলা মুদিখানার দোকান বন্ধ করে ঘরে ফিরে দেখি খাবার টেবিলে আমড়ার আচারের শিশি চাপা দেওয়া একখানা চিঠি – আমি চললুম। খোঁজার চেষ্টা কোরো না। লাভ নাই। দৈনিক কাগজে বিজ্ঞাপন দেবো ভেবেছিলুম – পাপড়ি ফিরিয়া আইস। তোমার আদরের মেনি বিড়ালটি অত্যন্ত কাতর হইয়াছে। বাড়ির বাকি সকলেও নিদারুণ মনঃকষ্টে আছে। ইতি তোমার হতভাগ্য স্বামী। সকালে খবরে কাগজ দিয়ে যায় – প্রতাপ, ষ্টেশনে বই-পত্তরের স্টল আছে। তাকে জিজ্ঞেস করছিলুম, কেমন খরচাপাতি হবে বিজ্ঞাপন দিতে। সে বললে, ‘ও নন্দদা, বিজ্ঞাপন দিয়ে কী করবে? বৌদিকে তো দেখলুম হরেন কম্পাউন্ডারের সঙ্গে ট্রেনে উঠতে।’ হরেন সাহা-ডাক্তারের ডিস্পেন্সারিতে কাজ করত। ওষুধ ইঞ্জেকশান লাগাত। খোঁজ নিয়ে দেখলাম সে হপ্তা খানেক হল কাজ ছেড়ে দিয়েছে। সত্যিই তো! যে নিজের ইচ্ছেয় চলে যায় সে কি আর ফেরে? কে না জানে, আমার মত সাদামাটা লোকের সঙ্গে পাপড়িকে একদম মানাত না। কোনও না কোনও দিন ছাড়াছাড়ি হতই। অবশ্য ছেলেপুলে, পিছটান নাই। এ এক রকম ভালই হয়েছে। এই ব্যবস্থায় অন্তত খোরপোষের সমস্যা নাই।

সারা সপ্তাহ দোকানে বসা। বেস্পতি বার করে দোকান বন্ধ রাখি। পাপড়ি থাকতে দুপুর বেলা শোবার জো ছিল না। খাওয়া দাওয়ার পর তাকে নিয়ে শারুক খান, সলোমন খানের সিনেমা দেখতে যেতে হত। সিনেমা দেখে বেরিয়ে ফুচকা, দহি-পাপড়ি চাট খেয়ে সাইকেল রিক্সায় বাড়ি ফিরতাম। দুজনে গা-ঘেঁষাঘেঁষি করে বসতাম। হু হু হাওয়ায় পাপড়ির আঁচল উড়ত। রিক্সাওয়ালা প্যাডেলে পায়ের চাপ দিয়ে বলত, ‘সাম্লে বসেন মা জননী।’ হুট বলতে দু-একটা সাজ গোজ, শখের সামগ্রীর বায়না ছিল। অবরে সবরে সোনার গহনা, ভারিভুরি কিছু নয়, কানের বালি, দু-চার গাছা চুড়ি। তাছাড়াও এদিক সেদিক ঘোরাঘুরি, হাতে মিষ্টির বাকসো নিয়ে আত্মীয় বাড়ি যাতায়াত, খরচ লেগেই থাকত। সে পয়সাটা বেঁচে যায়। মাস গেলে বলতে নেই হাতে কিছু থাকছে এখন।

ব্যাঙ্কে টাকা পচিয়ে কী লাভ? নিজের বলতে তিন কুলে কেউ নাই। খাবে কে? প্লট কেটে বিক্রি হচ্ছিল। সস্তায় পাওয়া গেল। কাগজে বিজ্ঞাপন দেখে কিনেই ফেললুম। চাঁদে সাড়ে চার কাঠা জমি। পূব দক্ষিণ খোলা। হাতে কাগজপত্র পেয়ে চূণীবাবুকে ধরলাম। রোজ বিকেলে পাঁউরুটি কিনতে আসেন। মস্ত সিবিল ইঞ্জিনিয়র নাকি। বললাম, ‘বাড়ি বানাব স্যার। একখান প্ল্যান রেডি করে দিতে হবে।’ শুনে টুনে বললেন, ‘বৌ বাচ্চা নেই, এখন না হয় একতলা অব্দি তুলিস, পরে দরকার হলে...।’ বললাম, ‘না, স্যার, তুললে একদম দোতলা...।’ চূণীবাবু হেসে বললেন, ‘আচ্ছা! আচ্ছা! পয়সা দিবি তো? আর প্ল্যান পাস করানোর দায়িত্ব কিন্তু তোর।’

পূর্ণিমার দিন রাতের বেলা ছাদে উঠেছিলুম। মস্ত বড় চাঁদ উঠেছে। তার বাঁ ধার করে ছোট্ট ফুটকি মতন জায়গাটা। দেখেই চিনলুম। ওইখানে দোতলা কোঠা বাড়ী। সামনে লাল ইটের পাঁচিল ঘেরা বাগান। চূণীবাবু বেশ খেলিয়ে বানিয়েছেন। খোলা বারান্দায় এসে দাঁড়ালে অপরূপ দৃশ্য। অন্ধকার আকাশে নীল বর্ণ পৃথিবী। জ্যোৎস্নার আলোয় চাঁদের পাহাড়, পর্বত, অনন্ত গহ্বর ভেসে যাচ্ছে। দু-একটা তারা খসে পড়ছে এদিক ওদিক। শুধু একটু নিরালা, এই যা।

চাঁদে ঘর বানালেও কি পাপড়ি ফিরে আসবে না? কে জানে?

ফেসবুক মন্তব্য