মাতৃভক্তি

সুজন ভট্টাচার্য



বৃন্দাবনের মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করছে। এত আয়োজন তাহলে বৃথা হয়ে যাবে! হে মা কালী, বাঁচাও মা! তুমি আছ বলেই না বৃন্দাবন আছে। তুমি না থাকলে আজ ওকে পুছতো কে? যখন আশপাশে কেউ ওর সাথে কথা বলার সাহস রাখত না, তোমার ভরসাতেই বৃন্দাবন অটল থেকেছে। যাই ঘটুক না কেন, মঙ্গলবারে চক্কোত্তিপাড়ার মন্দিরে তোমার পুজোয় কামাই দেয় নি। তারপর দিন যখন ফিরল, তোমার মাথায় রুপোর মুকুট গড়ে দিতেও কসুর করে নি। আর আজ এ কী খেলা খেলো তুমি বৃন্দাবনের সাথে! দুঃখে বৃন্দাবনের চোখ দিয়ে জল পড়তে থাকে।
চোখের জল অবশ্য পড়তেই পারে। ভাগ্যমন্তপুরের দিনবদলের ইতিহাস যারা জানে, বৃন্দাবনকে চোখের জল ফেলতে দেখলে তারা কেউই অবাক হবে না। আহা রে, কত সাধ্যসাধনার পর বেচারা খানিকটা মাটি ফিরে পেয়েছে। পোড়া দেশগাঁয়ে বাপঠাকুদ্দার জমিজিরেত থাক বা না থাক, চাড্ডি করেকম্মে খেতে হলে একটা জিনিস লাগবেই লাগবে। সে হল পার্টি। হালচাষা যেমন গরুর লেজ বেঁকিয়ে জমি এফালওফাল করে, তেমনি কপালের জমিতে হাল দিতে হলে পার্টির লেজে মোচড় দিতেই হবে। কিন্তু গরুর লেজের সাথে পার্টির লেজের একটা মস্তবড় ফারাক আছে। যে জানে, সে জানে। আর যার জানা নেই, যে সাতজম্ম তপস্যা করলেও টের পাবে না।
লেজে মোচড় দিতে হলে গরুকে আগে হালে জুততে হয়। কিন্তু পার্টির লেজ পাকড়াতে হলে নিজেকেই আগে জুততে হবে পার্টির লাঙলে। তারপর জুতসই মওকা পেলে ফালাফালি শুরু করে দেবে। কিন্তু পার্টির লাঙলে নিজের কাঁধ ফিট করা খুব সহজ কম্ম নয় যে চাইলেই হয়ে গেল। সব্বাই জানে, সাধ করে যে এসে হাত কচলে বলছে, আমারে লাঙলে জোতো গো, সে আসলে একটা ধান্দা নিয়েই এসেছে। সে অবশ্য জীবশরীর থাকলে কামনাবাসনা থাকবেই। বড় বড় মহাপুরুষরা সেসব বলে গেছেন। তাতে দোষের কিছু নেই। মুশকিল হলো, ধান্দার বহরটা কতখানি, সেটা তৎক্ষণাৎ মেপে ফেলবে কে? যার সামনে হাত কচলানি চলছে, তারও তো খানিক পাওনাগণ্ডা আছে। এখন নতুন আমদানি যে সেখানেও একদিন থাবা বসাবে না, তার গ্যারান্টি কোথায়? কাজেই আগে তাকে তুষ্ট করতে হয়, ভরসা যোগাতে হয় যে তোমার প্রণামির থালায় আমার নজর নেই গো। সে অবশ্য পুজোগণ্ডার বাঁধা চক্কর। ঠাকুরের প্রসাদ পেতে হলে আগে তো পুরুতের পেট ভরাতেই হবে।
বৃন্দাবন মানে বৃন্দাবন নস্করের অবশ্য পার্টির খাতায় নাম তোলাটা হয়েছিল ঘটনাচক্রে। ধীরেন চক্কোত্তি নিজে থেকে ডেকে এনে ওকে পার্টির লাঙলে জুতে দিয়েছিলেন। সেই সময়ে গ্রামের ডাকসাইটে নেতা ছিলেন ধীরেন চক্কোত্তি। নেতা মানে নেতা। যেমন দশাসই চেহারা, তেমনি মেজাজ। আবার একইসঙ্গে পঞ্চায়েতের প্রধানও। তার নামে বাঘেগরুতে এক ঘাটে জল খেয়ে নিত নির্বিবাদে। বৃন্দাবনের বাপ ছিল নেহাতই ছোট চাষী। বিঘে দুয়েক জমিতে হাল চষেই তার আর সময় জুটত না অন্য কোন দিকে তাকানোর। জমির আবার বায়নাক্কা অনেক। এই সে ফসলের শাড়ি বেছোচ্ছে তো এই গেল গেল রব তুলে দিল বাড়তি জল চলে এল বলে। না, হারাধন নস্কর নেহাত দায়ে না পড়লে বৃন্দাবনকে মাঠের কাজে ডাকত না। ফলত গাঁয়ের মাঠঘাটে দলবল জুটিয়ে গাছে বা পুকুরে চুপিসারে হানাবাজির অবসর তার জুটে যেত। জানত সব্বাই; কিন্তু একবারও বৃন্দাবন বা তার সঙ্গীদের হাতেনাতে ধরা যায় নি।
ঐ যে বলে না, তুমি যাও বঙ্গে, কপাল যায় সঙ্গে! বৃন্দাবনের হলো ঠিক তাই। সেদিন ওরা স্কিম করেছিল হাজারী আড্যির আঁখক্ষেতে হামলা করবে। না না, আঁখের লিকলিকে শরীরে তখনো রস জমতে পারেনি। চিবোলে মনে হবে করলার মতই কিছু একটা। হামলাটা স্রেফ হামলার জন্যই। বলা ভালো আড্যিকে একটু টাইট দেওয়া। দিনপাঁচেক আগে আড্যিদের পুকুরে ছিপ ফেলে কয়েকটা মাঝারি সাইজের কাতলা তুলে ফেলেছিল বলে রাজ্যের লোকের মাঝখানে ওদের বাপের শ্রাদ্ধ করেছিল হাজারী আড্যি। তখনই ওরা স্কিম করে ফেলেছিল কয়েকদিনের মধ্যেই আড্যির বাচ্চার আঁখের ক্ষেতের শ্রাদ্ধ করে দেবে।
সন্ধে একটু জাঁকিয়ে নামতেই ওরা ঘুরপথে চলে এসেছিল আড্যির আঁখক্ষেতের সামনে। ঠাণ্ডা হাওয়ায় আঁখের পাতায় শনশন আওয়াজ হচ্ছে। কিন্তু সেটাকে ছাপিয়েই কয়েকজনের গলা আবছাআবছা কানে চলে এল। লোকগুলোকে দেখা যাচ্ছে না। দানা শব্দটা কানে আসতেই বৃন্দাবন চমকে উঠল। নির্ঘাৎ ডাকাত।
“তোরা আড়ালে থেকি খেয়াল রাখ। আমি একছুটে লোকজন ডেকে আনি”। বৃন্দাবন উর্ধশ্বাসে দৌড় লাগায়। যাবে আর কোথায় এক সেই ধীরেন চক্কোত্তির ডেরা ছাড়া? ধীরেন চক্কোত্তি তখন পার্টির দুচারজনের সঙ্গে বসে শলাপরামর্শ করছিলেন। বৃন্দাবনকে অমন পাগলের মতো দৌড়ে আসতে দেখে অবাক হয়ে বললেন “তোর আবার হলোডা কী?”
“জ্যাঠা, শিগগির চলেন। আড্যিদের আঁখক্ষেতি ডাকাত জড়ো হয়েছে।”
ডাকাত শুনেই শোরগোল পড়ে গেল। ধীরেন চক্কোত্তিও লাফঝাঁপ শুরু করে দিলেন। মিনিট দশেকের মধ্যেই শখানেক লোক নিয়ে বৃন্দাবন চলল আঁখক্ষেতের দিকে। মুশকিল হলো, বৃন্দাবন বা অন্যদের সঙ্গে তাল রাখতে না পেরে ধীরেন চক্কোত্তি ক্রমশ পিছিয়ে পড়লেন। ডাকাত যখন পাকড়াও হলো, স্বভাবতই লিডার তখন বৃন্দাবন। অবশ্য ধীরেন চক্কোত্তি না আসা পর্যন্ত।
সব ঝামেলা মিটে গেলে ধীরেন চক্কোত্তিই বৃন্দাবনের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কাল সন্ধেবেলা একবার পঞ্চায়েত অফিসে আসিসখনে।”
সেই হুকুম অগ্রাহ্য করার সাহস ভাগ্যমন্তপুরের লোকজনের নেই। তাই সময়মতো বৃন্দাবনও গুটিগুটি পায়ে হাজির হলো।
“এয়েচিস? বেশ। একটুখানি বোস। হাতের কাজ সেরে নে তোর সাথে কথা বলচি।”
অফিসটা ফাঁকা হতেই ধীরেন চক্কোত্তি ওর দিকে তাকিয়ে বললেন, “কাছে আয়।” ধীরেনবাবু ওর দিকে তাকিয়ে খানিকক্ষণ চুপ করে রইলেন। পুরু কাচের পিছনের চোখদুটো দেখলেও মনের ভাব বোঝার কোন উপায় নেই। কাঁহাতক এই অত্যাচার সহ্য করা যায়! বৃন্দাবন ঘাড় নামিয়ে নেয়।
“কাল যা করিছিস, খুব খুশি হয়েছি। তোদের মতো ছেলেপুলে থাকতি আবার আমাদের নামতি হয় নাকি?” ধীরেনবাবু চশমার কাচ মোছেন। বৃন্দাবনের খানিকটা লজ্জাই লাগে। তাই ও মাথাটা নিচু করে নেয়।
“তা, তোরা হঠাৎ আঁখক্ষেতে কী করতে গেছিলি?” ধীরেনবাবু এবার কড়া চোখে তাকান।
বৃন্দাবন মাথা নিচু করে বসে থাকে। ধীরেন চক্কোত্তি গুরুগম্ভীর গলায় বলেন, “লোকজন বলছে, তোরা নাকি গাঁয়ের মধ্যে দিনরাত নানান কুকর্ম করি বেড়াস? চ্যাংড়াগুলো সব নাকি তোর কথাতেই ওঠবস করে?”
ততক্ষণে বৃন্দাবনের বুক কাঁপতে শুরু করেছে। ধীরেনবাবুর কথা ভাঁজ তো সুবিধের মনে হচ্ছে না। ওরা আবার কুকর্ম কী করল? আমজাম চুরিকে আবার কুকর্ম বলে নাকি? অবশ্য কোন শাস্তরে সেই বিধান দেওয়া আছে, তারই বা সন্ধান ও পাবে কোথায়?
“ইস্কুলে গেছিলি কোনদিন? কাগজপত্তর পড়ি দেখতি পারিস? নাকি সেটারেও গোমাংস করি রাখিছিস?”
“নাইন অবধি পড়িছিলাম জ্যাঠা। তারপর আর টানতি পারি নাই।” বৃন্দাবন মাথা নিচু করেই উত্তর দেয়।
‘বেশ বেশ, তালিই হবে।”
কী যে হবে বুঝতে না পেরে বৃন্দাবন বেশ ঘাবড়ে যায়। ধীরেনবাবুই বলতে শুরু করেন, “ওইসব অপগণ্ডগিরি না করি চাড্ডি ভালো কাজ তো করতি পারিস। তোর স্যাঙাৎ আছে কজন?”
“তপন, হরি, মিনাজুল, গণেশ ...” বৃন্দাবন আঙুলে গুনতে শুরু করে।
“থাক থাক। যে কজন আছে, তাদের নে যুবর কাজে লেগি পড়। এইখানে এখনো যুব করা হয় নাই।”
যুবর কাজটা যে ঠিক কী, বৃন্দাবন আন্দাজ করতে পারেনি। ওর মুখ দেখেই ধীরেন চক্কোত্তি সেটা বুঝে ফেলেন। তাই হাসতে হাসতে বলেন, “তোর বয়েসি চ্যাংড়াদের সব আমাদের দিকি টেনি আনতে হবে, সেই কাজ। যা, কাল পুলিনের সঙ্গি দেখা করি নিস।”
ব্যাস, সেই হলো শুরু। তারপর আর দেখতে হলো না। ভাগ্যবন্তপুরের জলমাটির গুণে বৃন্দাবনের কপাল যেন চড়চড় করে চওড়া হতে শুরু করে দিল। আসলে যে কোনও কারণেই হোক, ধীরেন চক্কোত্তি ওকে সবসময় আগলে আগলে রাখতেন। তার আশীর্বাদেই চার বছরের মধ্যে হরিদাস মাখালির মাটির ভিটে পাকা হয়ে গেল। সমিতির কন্ট্রাকটারি তো তার হাত ধরেই। বৃন্দাবনের ঘরে ধীরেন চক্কোত্তির ইয়া বড় একখানা ছবি বাঁধানো আছে। রোজ নিজের হাতে ও মালা চড়ায় তাতে। তবে পালাবদল হবার পরে বাইরের ঘর থেকে সেই ছবি সরে গেছে শোবার ঘরে, এই যা।
পালাবদলের পরে কিছুদিন অবশ্য ওর হালুয়া টাইট হয়ে গিয়েছিল। আসলে ওর গায়ে মার্কাটা বেশ ভালোভাবেই বসে গিয়েছিল তো। মিলের ধুতির উপর যে মার্কা থাকে, তাই শালা উঠতে কদ্দিন সময় নেয়; আর এ তো হলো মানুষের গায়ের মার্কা। কত লোকের তো জম্মে জম্মেও ওঠে না। সেই সময়ই চক্কোত্তিপাড়ার কালীবাড়িতে ওর যাতায়াতের শুরু। গাঁয়ের মধ্যে তখন প্রায় একঘরে। পুরনো স্যাঙাতরাও অনেকে দেখলে মুখ ঘুরিয়ে চলে যায়। টেন্ডার নেই, হাতের টানাটানিও শুরু হয়ে গেল। বৃন্দাবনের মাথার ঠিক নেই। শুধু মায়ের ভরসাতেই ও মুখ বুজে পড়ে ছিল। ভক্তি থাকলে যে মা ঠিক মুখ তুলে চান, সেই প্রমাণটাও হাতেকলমে পেয়ে গেল তিন বছরের মধ্যে। সে ছিল কালীপুজোর ঠিক আগের দিনের রাত।
কালীপুজো এলে ভক্তরা চাড্ডি কারণ পান তো করবেই। মা যার ন্যাংটা হয়ে পাগলপারা দৌড়য়, তাকে আর সামলায় কে? পালাবদলের পরে তখন সুবোধ বিশ্বাসের খুব রমরমা। তো সে এসেছিল মায়ের পুজোর আয়োজন দেখতে। নিমাই পুরুতের ছোটমেয়েটা কী কারণে মন্দিরে হাজির ছিল। মায়ের নামে তখন সুবোধের দুনিয়া টলমল করছে। মেয়েটা যখন চলে যাচ্ছে, “জয় মা” বলে হুঙ্কার দিয়ে তার উপর আছড়ে পড়ল। সে এক কেলেংকারির একশেষ। বৃন্দাবনের ইচ্ছে করছিল রামদার এক কোপে ব্যাটাকে বলি চড়িয়ে দেয়। উহু, সে হলো কথার কথা। সংসারের ক্ষমতা যার হাতে, তাকে আবার বলি দেওয়া যায় নাকি?
মেয়েটা হাইমাই করতে শুরু করে দিয়েছিল। নেহাত রাত বলে লোকজন নেই। বৃন্দাবনই বুঝিয়েসুঝিয়ে সুবোধকে ঠাণ্ডা করল। আর সুবোধ যাতে শুনতে পায় এমনভাবেই মেয়েটাকে ধমক লাগাল, “এত রাতে কি ফষ্টিনষ্টি করতি বেরোয়েছিলি নাকি? খবরদার, কাকপক্ষী যেন টেরটি না পায়।” মেয়েটা মুখে কাপড়চাপা দিয়ে চলে যেতেই মাটিতে থাবড়া মেরে বসে থাকা সুবোধের হাত ধরে বলল, “চলো দাদা, তোমারে ঘরে দে আসি।”
বেগের মুখে লাগাম পড়ে যাওয়ার ফলে সুবোধের তখন বাই খানিকটা নেমেছে। লজ্জালজ্জা মুখে বলল, “তুই না থাকলি আজ একটা অপঘাত হয়ি যেত বেন্দা।”
“ও ছাড়ো। মেয়েটাই বদ। নাহলি এত রাত্তিরি বাইরি করে কী?”
সুবোধ বৃন্দাবনের হাত চেপে ধরে, “বেন্দা, পাঁচকান হলি আমার আত্মহত্যা করা ছাড়া পথ থাকবেনি। তোর বৌদিরে তো চিনিস। আমারে জ্যান্ত খেয়ি ফেলবেনে।”
“আমি থাকতি তোমার কোনও দুশ্চিন্তা নাই দাদা। শুধু একটা কাজ করতি হবে। তুমি ভেন গাঁয়ের একটা বামুনের ছেলের সন্ধান করি রাখো। আমি নিমাই পুরুতরে বলি দেব, সুবোধদা তোমার মেয়ের জন্য পাত্তর খুঁজি এনেছে।”
“হঠাৎ পাত্তর কেন?” সুবোধের মাথাটা তখনো বোধহয় পুরোটা সাফা হয়নি।
“ও দাদা, বিয়ের উদযোগ হলি কেউ আর বলে সুবোধ বিশ্বাস আমার উপর চাপতি এয়েছিল?”
সুবোধ দুই কানে হাত দিয়ে বলল, “অমন বলিসনি বেন্দা।”
বৃন্দাবন ওর দুহাত চেপে ধরে বলল, “আমি বলি নাই দাদা। আর কোনও শালা যাতে বলতি না পারে তার ইস্কিম করি দিলাম। তোমার একটা মানসম্মান আছে কিনা!”
ব্যাস। ভাইফোঁটা পেরোতে না পেরোতেই কৃতজ্ঞ সুবোধ বিশ্বাস ওকে ডেকে জাতে তুলে নিল। সমিতির টেন্ডার থেকে শুরু করে ওরও গায়ের জামাবদল সব সারা হয়ে গেল। আর দু বছরের মধ্যে সেই চাড়া এখন লকলকে লাউডগা, ঘরের চাল পুরো ছেয়ে ফেলেছে। এখন সুবোধ বিশ্বাসও ওকে সমঝে চলে। টাউনের লোকজনাও বৃন্দাবনকে ভালই চিনে ফেলেছে বলে কথা।
মায়ের মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে সেই বৃন্দাবনকে কাঁদতে দেখে ভোলবদলের পরে বৃন্দাবনের প্রধান সহচর হয়ে ওঠা নিমাই চুপিচুপি অনিলের কানেকানে বলে, “দেখিছিস, বেন্দা মা’রে কেমুন ভালবাসে! অমুন মাত্তিরিভক্তি না থাকলি কি আর কপাল এমুন ফিরতি পারে!” নিমাইয়ের একবার শখ জেগেছিল বেন্দার চোখের জল মুছিয়ে দেয়। কিন্তু ইদানীং বেন্দার মুখটা যেন খাটালের গদি হয়ে উঠেছে। অবশ্য খ্যামতা হাতে এলে, মুখ আপনা থেকেই জেগে ওঠে। এ তো আবার হারিয়ে ফেলা ক্ষমতা বলে কথা। সমরদারও কি কম মুখ ছিল নাকি! ল্যাং খাবার পর আবার বেশ নরম পড়েছে এখন। সে একদিন বেন্দাও নরম পড়বে। তদ্দিনে নিমাইয়ের কি আর এই হাল থাকবে নাকি! নিমাই দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
“দাদা, পুজোর সামগগিরী কি মণ্ডপেই রেখি দেব?” দোকান সেরে ভোলা এসে দাঁত কেলিয়ে দাঁড়িয়েছে। বৃন্দাবনের ইচ্ছে হলো দাঁতের পাটি ভেঙে হাতে ধরিয়ে দেয়। তারপর নিজেকে সামলে নেয়। ও ব্যাটা তো বেড়িয়ে পড়েছিল সেই ভোরের লোকালে। ও আর জানবে কোত্থথেকে! “যা, রেখি দে”, বলে বৃন্দাবন আবার বাড়ির ভিতরে হাঁটা লাগায়, কি হলো আরেকবার খবর নেবার জন্য। কয়েক পা গিয়েই ও থমকে যায়। একটা সন্দেহ ওর মাথায় চাড়া দিয়ে ওঠে। আচ্ছা, এসব চক্কোত্তিপাড়ার কালীর খেলা নয় তো!
সন্দেহ হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এতবছর ধরে বৃন্দাবন চক্কোত্তিপাড়ার কালীবাড়িতেই হপ্তার পুজোর পাশাপাশি বছরের পুজোও দিয়ে আসছে। একে লোকাল পাওয়ার এসেছে হাতে; তার ওপর এতবড় মাপের একটা টেন্ডার পেয়ে যাওয়া। বৃন্দাবন তখনি মানত করে ফেলে এবার থেকে বাড়িতেই কালীপুজো করবে। তখন তো মাথায় আসেনি যে কালীদের মধ্যেও দলবাজি থাকতে পারে। চক্কোত্তিপাড়ার পুরোনো কালী যে তার বাড়ির নতুন কালীকে প্যাঁচে ফেলার জন্য পিছন থেকে ছুরি মারতে পারে, এটা মাথায় আসেনি। পঞ্চায়েত ইলেকশনের অভিজ্ঞতাটা আগেই ভেবে দেখলে ভালো হত, বৃন্দাবন ভাবে। নাঃ, একবার ঘুরেই আসতে হবে।
কাউকে কিছু না বলেই বৃন্দাবন হনহন করে আবার বাইরের দিকে হাঁটা লাগায়। নাঃ, অন্তরে ব্যাগ্রতা থাকলে কেউ কি এমন চালে হাটতে পারে? চক্কোত্তিপাড়ার কালী বেশ সেয়ানা। দেখলেই বুঝতে পারবে। অগত্যা বৃন্দাবন দৌড় লাগায়।
মিনিটতিনেক দৌড়ে বৃন্দাবন চক্কোত্তিপাড়ার কালীমন্দিরে এসে পৌঁছোয়। পুজোর যোগাড়যন্তর হচ্ছে ফি-বছরের মতই। বৃন্দাবনকে দেখে বাকিরা সরে যায়। বৃন্দাবন সোজা এসে কালীপ্রতিমার সামনে দাঁড়ায়। মাটিতে শুয়ে প্রণাম করে; ওভাবেই বলে, “আর পরীক্ষে নিও নি মা, তোমার পুজোই তো কত্তিছি। এই তিনটে দিন সব সামলি দাও মাগো; সামনের বার বাড়িতিও যেমন হবে, তোমার এখানিও দেব। নিশ্চিত।” মানতটা তিনবার উচ্চারণ করে পাকা করে ফেলার পর বৃন্দাবন উঠে পড়ে। আবার বাড়ির দিকে হাঁটা লাগায়।
দালানে ঢোকার আগেই কান্নার শব্দটা কানে এসে হানা দিল। বৃন্দাবনের পা যেন গাছের শিকড়ের মত স্থাণু হয়ে গেল। নিঘঘাত! ওকে দেখেই ছোটবোন শেফালী হাউহাউ করে কেঁদে উঠল, “ও দাদারে, এতুক্ষণ কোথায় ছিলি রে! মা যে চলি গেল রে! একবার দেখতিও পেলিনেরে।” বৃন্দাবনের মাথাটা ভোভো করে ঘুরতে থাকে। এত খচ্চাপাতি, এত আয়োজন সব বৃথা গেল! মানত মিথ্যে হয়ে গেল! লোকে হাসবে না ওর বাড়াবাড়ি নিয়ে!
খানিকক্ষণ চুপ করে থাকার পর বৃন্দাবন আচমকা চেঁচিয়ে উঠল, “আর মরার সময় পেলেনি মা! দুটোদিন থাকলি কি মুখি চুনকালি পড়ি যেত! এমুন শত্তুতা তো লোকে শয়তানের সঙ্গিও করে না।” পাথরের মত মূর্তিটার চোখ দিয়ে দরদর করে জল পড়তে শুরু করেছে। নিমাই পাশে দাঁড়ানো অনিলের পেটে খোঁচা দিয়ে বলল, “মাত্তিরিভক্তি কারে বলে, এগবার দেখি যা!”

ফেসবুক মন্তব্য