প্রপঞ্চ

সন্দীপ রায়



এত ভোরবেলায়, তাও শীতের দিনে, ওঠা মোটেই অভ্যেস নেই ঋকের। ঘড়িতে পাঁচটায় অ্যালার্ম দেওয়া ছিল, এ-পাশ ও-পাশ করতে করতে ও আরও কুড়ি মিনিট কাটিয়ে দিল। তারপর শুরু হল লাফালাফি। আমার সেভিং সেট কই, গরম জল করেছো, জামাকাপড় বের করে দাও ইত্যাদি।
মুন্না অবশ্য ঠিক পাঁচটাতেই উঠে পড়েছে। সত্যি বলতে কি ওর সারারাত ঘুমই হয়নি। ঋকটা যে কি করে ভোঁস ভোঁস করে ওরকম ঘুমোতে পারল, ভেবে আশ্চর্যই হয় মুন্না।
এস.এম.এস.-টা কাল সন্ধ্যেবেলায় ঋকের মোবাইলে ঢুকেছে। তখন ও অফিস ফেরৎ রাস্তায়। ঘরে ঢুকেই ও বলল – মুন্না, এস.এম.এস.-টা পড়ো। প্রপঞ্চ থেকে ডেকেছে!
প্রপঞ্চ! মুন্নার মুখে কথা সরলো না। ফোনটা হাতে নিয়ে ও ভ্যাবলার মতো দাঁড়িয়ে ছিল।
মুন্নারই উৎসাহে ঋক প্রপঞ্চতে নাম এন্ট্রি করেছিল। কিন্তু লটারিতে যে সত্যি সত্যি ওর নাম উঠে যাবে সেটা ঋক তো নয়ই, মুন্নাও ভাবতে পারে নি। আর ইউ জোকিং ঋক? মুন্নার প্রশ্নের উত্তরে ঋক বলল – দ্যাখো না বাবা এস.এম.এস.-টা পড়ে, জোক কি না বুঝতে পারবে।
ঋক সময় নষ্ট না করে শু-র‍্যাকের কাছে পৌঁছে গেল। বসে গেল জুতোর ওপর বুরুশ ঘসতে। ওকি! ওকি! মুন্না হাঁ হাঁ করে ওঠে, ওই শার্ট-প্যান্ট পরেই জুতো পালিশ করতে বসে পড়লে!
কালকে তো নতুন সেট লাগবে – ঋক যুক্তি দেয়।
মুন্না একটু ধাতস্থ হয়ে বলে – তাহলে গতবারের জামাইষষ্ঠীরটা পরো। ওটা তো ভাঙলেই না!
প্রপঞ্চ টি.ভি.-র একটা রিয়েলিটি শো। এখানে শুধু সংসারী পুরুষমানুষরাই খেলতে পারেন। অনুষ্ঠানটার ট্যাগলাইন ঋক মুখস্থ বলতে পারে – প্রপঞ্চ – পাঁচ মিনিটে একলাখ – পাওয়ার্ড বাই সিওর সাইন বডি লোশন।
মুন্না তাড়া দিল – খালি পেটে বেরোবে না। একটু মোটা করে কফি করে দিচ্ছি, দুটো বিস্‌কিট দিয়ে খেয়ে যাও।
ঋক দেখল, প্রস্তাবটা মন্দ নয়। সকালবেলা ভারমুক্ত হয়ে বেরোনো যাবে। ও শুধু বলল চট্‌পট! সাড়ে ছ’টার লোকালটা না পেলে ওদের ওখানে নটার মধ্যে ঢোকা যাবে না।
পাঁচটা ফেজে খেলতে হবে গেমটা। প্রবেশ, প্রকাশ, প্রতিষ্ঠা, প্রয়োজন আর প্রশান্তি, এই পাঁচটা ‘প্র’ মিলে অনুষ্ঠানটার নাম হয়ে প্রপঞ্চ। প্রতি ফেজে কুড়ি হাজার টাকা আর এক মিনিট সময় বরাদ্দ। এক মিনিটের মধ্যে তোমায় ঐ কুড়ি হাজার টাকা খরচ করতে হবে। কোনো ফেজে টাকা বেঁচে গেলে টাকাটা পরের ফেজে ব্যবহার করতে পারো। কিন্তু লাষ্ট ফেজে গিয়ে পুরো টাকাটাই কনজিউম করতে হবে। টাকা বেঁচে গেলে তুমি আউট হয়ে গেলে। আর ঠিকঠাক ব্যবহার করতে পারলে পুরো এক লাখ টাকাটাই তোমার! তিন-চারজন মিলে ধরতে হয় এরকম একটা লম্বা চওড়া চেক্‌ প্রতিযোগীর হাতে দেওয়া হবে। ঋক মুন্নার কাছে জানতে চেয়েছিল ফেরার সময় টানা ট্যাক্সি নিয়ে নেব?
মুন্না টয়লেটের দরজায় টোকা দিল – তোমার হল? সাড়ে ছ’টার লোকাল তোমার জন্য দাঁড়িয়ে থাকবে? ঋক ফ্ল্যাশ টেনে দিল। পাঁচটা ‘প্র’-ই ভেসে গেল আপাতত।
ন’টার মধ্যে পৌঁছতে বলা হয়েছিল। ঋক পৌঁছে গেল আটটা চল্লিশ নাগাদ। ও আশা করেছিল, অনেক লোকজন, হই-হই ব্যাপার। সেরকম কিছু নয়। হয়ত এখনও কেউ আসে নি। একজোড়া দম্পতি একটা ঘরে আগে থাকতেই বসে। ঋকও সেই ঘরে গিয়ে বসল।
এটা ছেলেদের খেলা। পুরুষ মানুষটি সঙ্গে বউ নিয়ে এসেছে। ঋক বলেছিল মুন্নাকে আসতে। মুন্না বলেছিল – মাথা খারাপ! শো চলাকালীন সেবার সোফা ছেড়ে উঠেছিলাম বলে কি হয়েছিল মনে নেই!
মনে আবার নেই! সেবার একটা গানের কম্পিটিশনে কিউট একটা মেয়ের জন্য মুন্না অনেকগুলো এস.এম.এস. করে সাপোর্ট দিয়েছিল। মেয়েটাও টপাটপ টপাটপ একেকটা হার্ডল পেরিয়ে ফাইন্যালে পৌঁছেছিল, ফাইন্যালের দিন ওদের একটা নেমন্তন্ন ছিল, বন্ধুর বাড়িতে ফাইন্যালটা দেখতে হয়েছিল – এমন কপাল, ফাইন্যালে মেয়েটা হেরে গেল। মুন্না বলল – দেখলে তো! আমার ওই সিঙ্গল সোফা কৌচটা কত পয়া! ওটায় বসে দেখলে মেয়েটা জিততই।
এবার ঋক তাই বলল – আরে আজ তো শ্যুটিং! তুমি টেলিকাস্টের দিন ঐ সোফায় বোসো।
হ্যাঁ, তোমার যেমন বুদ্ধি! মুন্না মাথায় আঙুল ঠেকিয়ে বলেছিল – ততদিনে তো রেজাল্ট যা হওয়ার হয়েই যাবে। আমি সকাল ন’টা থেকে ওই সোফাতে বসেই কাজটাজগুলো সারব। শ্যুটিং শেষ হলে তুমি ফোন করে দিও।
পৌনে দশটা নাগাদ ঋক ফোন করে মুন্নাকে জানিয়ে দিল – এখনও শ্যুটিং শুরু হতে ঘন্টাখানেক লাগবে। তুমি সোফা থেকে উঠে পড়ো।

হাজার ওয়াটের আলোর মধ্যে পড়ে ঋক একটু কুঁকড়ে গেল। কি করতে হবে, ওকে মোটামুটি বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই অনুষ্ঠানের সঞ্চালক একজন সেলিব্রিটি। ওনার জন্যই শো’টা এত জনপ্রিয় হয়েছে। ওঁর এত কাছাকাছি আসতে পেরে ঋক রীতিমতো রোমাঞ্চিত। টি.ভি.-র পর্দায় যেমন লাগে, সামনাসামনি মোটেও তেমন নয়। বেশ গম্ভীর। এরকমটাই হওয়ার কথা। অতো বড়ো মাপের একজন মানুষ, ঋকের মতো একজনকে পাত্তা দেবেনই বা কেন! তবে অনুষ্ঠান শুরু হলেই তিনি অন্য মানুষ। ঋককে তিনি প্রায় রাজকীয় সমাদর করে মঞ্চে নিয়ে এলেন, অর্থাৎ খেলার প্রথম পর্ব শুরু – ঋকের ‘প্রবেশ’ হল।
হঠাৎ ঋকের মুখের সামনে ভেসে এলো বাবার মুখ। বাবা বলতেন – তোমাকে অনেক বড় হতে হবে বাবা। আমি জানি তুমি পারবে, তোমার হবে। পাঁচজন লোক তোমায় দেখে তারিফ করবে। অতো আলোর মধ্যে বাবাকে ঠিক ঠিক ধরতে পারল না ঋক। বাবাকে ধরবার জন্য একটু অন্ধকারের অবকাশ দরকার ছিল ঋকের। সেটা সম্ভব হল না। ঋক ঠিক করল, বাবাকে অনুষ্ঠানটা দেখার জন্য ফোন করবে ও।
ওর হাতে একতাড়া নোট ধরিয়ে দেওয়া হল। সব দু’হাজারের নোট। ঋক দর্শকদের দিকে বাও করেই সঞ্চালকমশাইকে দুটো দু’হাজার ধরিয়ে দিল। এটা মুন্নার বুদ্ধি।
কাল খাবার টেবিলে বসে মুন্না বলছিল – এই ‘প্রবেশ’ পার্টটাই সবচেয়ে টাফ্‌। এখানে তুমি তো শুধু এন্ট্রি নিলে। কোনো অ্যাক্টিভিটি নেই।

খরচ করার স্কোপ কোথায়? বরং যিনি তোমাকে নিয়ে আসছেন মঞ্চে, তাকেই দুটো দু’হাজার ‘টিপ্‌স’ হিসেবে দিয়ে দাও।
বুদ্ধিটা শুনে ঋক বেশ হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল। যিনি একটা অনুষ্ঠান পরিচালনা করছেন, তাকেই ঘুষ দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু করা! অবাক লাগলেও এটা যে তারিফ করার মতো বাপার, তা গ্যালারির দর্শকদের হাততালিতেই বোঝা গেল। ষোল হাজার উদ্বৃত্ত নিয়ে ঋক ঢুকল দ্বিতীয় পর্বে – প্রকাশ।
এক মিনিট সময় আর ষোলো যোগ কুড়ি – মোট ছত্রিশ হাজার টাকা আছে নিজেকে প্রকাশ করার জন্য। পর্দা সরিয়ে দ্বিতীয় পর্বে প্রবেশ করার পর ঋক দেখল, অনেকে অপেক্ষা করছেন নানা কিসিমের সার্টিফিকেট নিয়ে। দীর্ঘ দিন ধরে খেলাটা দেখার সুবাদে ঋক জানে, একেবারে ছোট থেকে শুরু না করে দ্রুত যত বড় বড় সার্টিফিকেট কিনে নেওয়া যাবে, তত বেশি দাম পড়বে, টাকাও ফুরোবে জলদি। ঋক করলও তাই। মাষ্টার্স, ডক্টরেট, এল. এল. ব., এম.বি.এ. – কেনার পর ঋক দেখল তাড়াহুড়োয় মাধ্যমিকেরটাই কেনা হয়ে ওঠে নি! যাক্‌ গে যাক্‌। পয়সাটা তো খরচ করা গেল! এই কুড়ি তো গেলই, আগের উদ্বৃত্তটাও বেরিয়ে গেল অবেকটা। তৃপ্তি নিয়ে ঋক ‘প্রতিষ্ঠা’ পর্বে ঢুকতে পারল।
আগে দেখার জন্য ঋকের জানা ছিল, প্রতিষ্ঠার সিঁড়ির মুখে একটা হিংস্র কুকুর থাকে। বিস্কুট দিয়ে তাকে শান্ত করে প্রতিষ্ঠার পথ ধরতে হয়। বিস্কুটসহ শান্ত করার আরও নানা কিছু পাওয়া যায়। অতএব একটা মানসিক প্রস্তুতি ছিলই। কিন্তু পর্দা সরিয়েই ঋক ধাক্কা খেল। প্রতিষ্ঠার দরজায় একটা বাঘ দাঁড়িয়ে। ঋক ঘাবড়ে গেল। রিয়েলিট শো-এর বাঘ কি বিস্কুট খায়? ও কাঁপতে কাঁপতে একটা বিস্কুট অফার করল। বাঘটা হুঙ্কার দিয়ে ঋকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইল। পুরো গ্যালারি স্তব্ধ! সঞ্চালক স্থির। মরিয়া ঋক পাল্টা আক্রমণ করে বসল। কাগজের বাঘ ফর্দাফাই হয়ে গেল। এরপর সিঁড়ির প্রতিটি ধাপে টাকা করচ করতে করতে ঋক শীর্ষে পৌঁছতে পারল।
‘প্রয়োজন’ মানে জীবনকে চালিয়ে নিয়ে যাবার জন্য যা যা দরকার, তা তোমাকে এক মিনিটের মধ্যে কিনে নিতে হবে। ঋক এই অংশে ঢুকে একটা বিগ-শপার নিয়ে তার মধ্যে নানা ধরণের জিনিসপত্র ঢোকাতে লাগল ও সেই অনুযায়ী দাম মেটাতে থাকল। কিন্তু সময় মাত্র এক মিনিট! তাই কিলো-পাঁচেক চাল কিনেও ও ফেরৎ দিয়ে ব্যাগ ফাঁকা করে দুটো দামী মোবাইল সেট তলল, খরচ অনেকটা বাড়ানো গেল। একটা দামী মদের বোতল তুলতে ঋকের হাত কেঁপে গেল। অবশ্য বোতলটা হাত থেকে পড়ে গিয়ে ওর লাভই হল, কেন না ওটার দাম ধরা হয়ে গেছে। ঋক বাড়ি থেকে ভেবে এসেছিল কি কি জিনিস ওর ব্যাগে ভরবে। কিন্তু টিভির পর্দার যেদিকটায় ও সাফারি স্যুটের কাপড় দেখেছিল, আজ দেখল সেখানে ডালের বড়ি রয়েছে। ঋক শেষ কুড়ি সেকেন্ডে যা পারল খামচে খামচা তুলতে লাগল। হাঁপাতে হাঁপাতে ও কোনোমতে এই পর্বটা পার করলো।
এবারে প্রশান্তি। এই পটে একজন একজন নানাধরণের পরিকল্পনা করতে পারে কিভাবে অর্থ খরচ করে জীবনে প্রশান্তি ফিরে আসতে পারে।
খানিকটা ধন্দে পড়ল ঋক, প্রশান্তি বলতে কার প্রশান্তি? ঋক পাশটাশ করে একটা চাকরিতে ঢুকেছে, এটাই কি ওর প্রশান্তি? নাকি এটা ওর মা-বাবার প্রশান্তি? মূলতঃ মায়ের জেদেই মা বা বাবা – কেউই ওর কাছে এসে থাকতে পারেন না, একথা ঋক, মুন্না দু’জনেই বলে। একমাত্র সন্তানকে দূরে রেখে, দেশের বাড়িতে থেকে যাওয়াটাই তবে ওদের প্রশান্তি?
মুন্নাকে যদি অ্যাবরশনটা না করাতে হতো তবেই কি ওদের জীবনে প্রশান্তি আসত?
ঋক সবচেয়ে বর যে ঝামেলায় পড়ে গেল, তা হল, এই প্রোগ্রামটা ও নিয়মিত দেখলেও ‘প্রশান্তি’ বিষয়টাকে নিয়ে ও কোনোদিন ভাবেই নি। যাই হোক্‌, ঋক প্রথমে একটা বৃদ্ধাশ্রম খুলবে বলল, তারপর সেটা কেটে নিজেদের জন্য আরেকটা বৃদ্ধাশ্রমের পরিকল্পনা লেখালো। ওদের এলাকায় একটা নতুন পুকুর কাটবে ভাবল, তারপর সেটা বাতিল করে একটা বোজানো পুকুর পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা করল। এক মিনিটের মধ্যে খুব বেশি পরিকল্পনা করতে পারল না ঋক, কিন্তু সময় শেষে ডিজিট্যাল স্কোরবোর্ডে দেখা গেল, বরাদ্দ এক লাখেরও বেশি খরচ করে ফেলেছে ঋক। কখন যে ও নেগেটিভের ঘরে ঢুকে পড়েছে, তা জানতেই পারে নি। সঞ্চালক ঘোষণা করলেন – আজকের প্রতিযোগী ঋক মজুমদার এই প্রপঞ্চ প্রতিযোগিতার প্রথম প্রতিযোগী, যিনি একজন ঋণগ্রহীতা। সঞ্চালক ঋকের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করে বললেন – নেভার মাইন্ড। ইট ইজ অলসো অ্যান অ্যাচিভমেন্ট! ‘প্রশান্তি’ পর্ব শেষ হল।

বেশি রাত্রে মুন্না বলছিল, কি মরতে যে জনে জনে মেসেজ, হোয়াটস অ্যাপ করতে গেলাম, তোমার শ্যুটিং আছে বলে।
ঋক সান্ত্বনার সুরে বলল – অতো ভেঙে পড়ছ কেন, সবটাই তো ভার্চুয়াল, প্রপঞ্চ!

ফেসবুক মন্তব্য