পাত সঞ্চারণ

উত্তম বিশ্বাস



কোকিলটা কোথা থেকে তাড়া খেয়ে এসেছে কে জানে! হয়ত কোনও এক সময় বিসমিল্লা সাহেব ওকে খাঁচা খুলে ভাগিয়ে দিয়েছিলেন, পথ ভুলে এসেছে এইখানে। আজকাল ওর কাতর বিলাপে রোজ যেভাবে সন্ধ্যা নামছে,--শহরও যে সুখে নেই, তা ওর শীর্ণ পাঁজরের স্বরলিপি শুনলে খানিকটা হলেও অনুমান করে নেওয়া যায়। খুঁটিতে খুঁটিতে সাজানো শহরের এল-ইডি জোনাকি, এরাও আজকাল চোখ নিংড়ে কিছু একটা গোপন করে চেয়ে থাকে দূর-- দূরে অন্ধ গলির দিকে। একটি জলের গাড়ি দিনে দুবার আসে। নিয়ম করে ঝারি খুলে মুছে দিয়ে যাচ্ছে পানের পিক, ষাঁড়ের গোবর, আর অবাঞ্ছিত পদাতিকের পদচিহ্ন। আর ঠিক এমন সান্ধ্য মুহূর্তে একটি ছ্যাকরা গাড়িতে উঠতি বয়েসের এক সরু মোচ ওয়ালা বিলাসী যুবক জরির টুপি, সিল্কের কুর্তা পাঞ্জাবি পরে পাক মেরে যাচ্ছে অভুক্ত অনাহারক্লিষ্ট তরুণ তরুণীদের সভাস্থল ঘিরে। তখনো কাঁচা পাকা কেশের মাঝ বয়সী স্বেচ্ছাসেবী ডাক্তার কোনও এক অচৈতন্য তরুণীর হাতের শিরা টিপে টিপে ভাবতে চেষ্টা করছেন আদৌ এর দ্বারা পঞ্চম পানিপথের যুদ্ধটা সম্পন্ন করা সম্ভব হবে কিনা! কিম্বা ওয়ারেসের পাউচ কাটতে কাটতে কোনও এক অখ্যাত গায়ক গিটার বাজিয়ে হঠাৎ আবেগে গলা আছড়িয়ে গাইতে শুরু করল,-
এটাই যদি খেতে হবে প্রিয় সিলেবাসে সুরা রাখাই যেত।
তুমিও খেতে আমিও খেতাম প্রথম থেকেই সফেদ ফ্যানা
কিন্তু কী জানো,-- মধুর লোভে অনেকটা মাস অনেক বছর
এমনি এমনি কেটেই গেছে। আয়নাজুড়ে ব্রণের ক্ষত
এখন দেখি রঙিন জলে উটকো যত টালবাহানা!
একটু একটু করে রাতের পায়া ভারি হয়। মিইয়ে আসা তুলসী মঞ্চের ধারানীর মতো টুপটুপ করে স্যালাইনের ফোঁটা পড়ে। মাথার পাশে খড়খড় করে উড়তে থাকে প্ল্যাকার্ড আর ফোল্ড করে রাখা ফেস্টুন। একসময় কপালের ঘাম মুছে চোখেমুখে হতাশা জাগিয়ে বিদায় নেন মানবাধিকার কর্মী সহ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কর্তা ব্যক্তিগণ। অশক্ত শরীর নিয়ে তখনো কেউ উদোম আকাশের নীচে, কেউ তাঁবুর তলায় মৃগী রুগীর মতো দাঁতে দাঁত ভেঙে সময় অতিবাহিত করার চেষ্টা করতে থাকে। একবার দুবার শিশুর পীড়াদায়ক কান্নার রোল ভেসে আসে। খানিক খানিক লাইভ চ্যাটের আলো নেভে আর জ্বলে। কখনো সখনো ময়লা বেডসীটের তলা থেকে ভেসে আসে অবদমিত আত্মরতির ক্ষুধার্ত ক্লিশে শীৎকার। আর ঠিক এই সময় গুবরে পোকার মতো পেট নিয়ে এদের চারপাশে ঘুরঘুর করে একটি অর্ধ উন্মাদ পথচারী। এর কাজ হল ওয়ারেসের প্যাকেট, স্যালাইনের বোতল, ওষুধের মোড়ক যা কিছু পাবে,--সব কুড়িয়ে নিয়ে পেট পুঁটলিতে পুরে নেওয়া। ক্রমে ক্রমে রাতের পলকে নেশাড়ু আতর লাগে। সেই ছ্যাকরা গাড়িটি আবার আসে। তবে তখন সেই সরু গোঁফের আয়েসি ছোকড়াটি আসে না। তখন ওতে বসে থাকে ডানাকাটা পরীর চেয়ে আরও অপরূপা এক ইরানী যুবতী। হাতে বেলকুঁড়ির মালা, আর এক হাতে আতর অথবা গোলাপজলের মতো সরু শিশি। মেয়েটি যখন আসে, ঘোড়ার খুরে বাঁধা থাকে রাজস্থানী ছাঁচের কাঁচা চাঁদনীর নূপুর। অদ্ভুত এক নিক্কন ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে শহরের ফুটপাথ। ঠংঠং ঝম ঝম ঝুম ঝুম রুনুঝুনু তালে তালে মেয়েটি একটি করে বেলকুঁড়ির মালা ছুড়ে মারে আর আতর ছেটাতে ছেটাতে এগিয়ে যায় শহরের অন্য প্রান্তে, যেদিকে বাহারী বাংলো, রিসোর্ট, বজরা, বাগিচা আছে, -- সেইদিকে। শহরের চোখ ছাপিয়ে হড়পার মতো নেমে আসে ঘুম। এমনসময় নরম পায়ে স্বর্গ থেকে নেমে আসেন চিত্রগুপ্ত। হাতে মেরিট লিস্ট। রোল ওয়াইজ এক এক করে ডাকেন, আর চোখে মুখে জলের ঝাপটা দিয়ে জাগান, “তুমি সপ্তর্ষি? রোল দ্বাদশ দ্বিত্বে বাহাত্তর?”
--“ইয়েস স্যার।” সপ্তর্ষি শুয়ে শুয়ে সম্ভাষণ জানায়।
--“সোজা হয়ে বসো। উঁহু, আরও সোজা।” সপ্তর্ষি সোজা হয়ে বসতে চেষ্টা করে। কিন্তু পারল না। ঘেটি ভেঙে গড়িয়ে পড়ল সেইই চিত্রগুপ্তের কোলের ওপর।
--“আপেল খাবে? এটা এখানকার না। স্বর্গের।”
--“না স্যার।”
--“চাকরিটা কার জন্যে চাইছ? তাঁকে বাঁচাতে হবে তো না কি?” ঝরঝর করে ঝরে পড়ে অশ্রু। চিত্রগুপ্ত চোখ মুছিয়ে পরম মমতায় আবারো জিজ্ঞাসা করলেন, “বাবা কী করেন?”
--“স্যার চাষি। আমাদের চাষবাস আছে।”
--“তাহলে তুমি এখানে এসে শুয়ে পড়লে কোন যুক্তিতে? বাবা লাঙল দেবেন, বাবা কোদাল কোপাবেন, বিষ দেবেন, ফুল ছোঁয়াবেন, আগাছা ভাঙবেন, গোবর সার ছেটাবেন—আর তোমরা বসে বসে খাবে এই তো? – সবই ঠিক আছে। কিন্তু উনি মারা গেলে ওই জমিটা কী হবে ভেবে দেখেছ?”
--“স্যার জমি জায়গাতে এখন আর লাভ নেই।”
--“তাহলে আমরা খাব কী? শুধু কি লাভটাই দেখবে? সত্যি করে বলো তো তুমি একদিনও কি জমির আলে গিয়ে দাঁড়িয়েছ?”
--“হ্যাঁ স্যার, আমিও--!”
--“মিথ্যে বল না। খাতা খুলে দেখাই তাহলে? খুব ছোটবেলায় মায়ের হাতধরে দুদিন জমির আলে গ্যাছো। আর এও রেকর্ড আছে, সেদিন তুমি তোমার বাবার পান্তাভাতের গামলাতে ধুলো ছুড়ে মেরেছিলে। আর বড় হয়ে মাত্র দুদিন গ্যাছো।–একদিন নিজের সম্পদ চিহ্নিত করতে,--অন্যদিন পাকা ফসল বিক্রির টাকায় কেনা নতুন মোবাইলে সর্ষেফুলের সাথে সেলফি তুলতে। কি ঠিক বলছি তো?” সপ্তর্ষি আবার ঢুলে পড়ল। ওকে শুইয়ে রেখে পাশের জনকে গায়ে ধাক্কা দিয়ে জাগালেন, “ওঠো। তুমি রণজয়?”
--“ইয়েস স্যার!”
--“তোমার সাবজেক্ট?”
--“স্যার, ফিলোসফিতে এম-ফিল।”
--“কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ কত সনের কত তারিখে শুরু হয়েছিল বলতে পারবে?”
--“স্যার এসব তো—আমি ঠিক জানিনে।”
--“যুদ্ধ জানো না, অথচ যুদ্ধ ক্ষেত্রে যাবার জন্যে পণ করে পড়ে আছ!—এটা তো ঠিক না।” ঘুমের ঘোরে চিত্রগুপ্তের কথাগুলো অশ্রদ্ধার মতো শুনছিল রণজয়। এবার অভিমানে মুখ ফিরিয়ে নেবার আগে চিত্রগুপ্ত ওর চিবুক উঁচু করে বললেন, “মনে করো তুমি যেখানে জয়েন করলে সেখানে তোমার সহকর্মীরা কেউ শকুনি, কেউ ধৃতরাষ্ট্র, কেউ বা অর্জুন যুধিষ্ঠির। তোমাকে ভালোবেসে ওরা একদিন গভীর অরণ্যে নিয়ে গিয়ে বললেন আচ্ছা, তুমি মনে করো আজ তুমি একলা একলব্য। এই যে সবজান্তা সমাজটাকে দেখছ,--এটাই ভেবে নাও তোমার গুরু দ্রোণাচার্য। তোমার গুরুদক্ষিণা বাবদ হাত পা কেটে নেওয়া হল, অথবা পিঠের শিরদাঁড়াটি,-- তুমি কী করবে?” রণজয় চুপ করে রইল।
--“কিম্বা মনে করো, অল্প দিনেই তুমি খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠলে। ওরা একদিন জাস্ট মজা করে বললেন, আজ তোমার সারা গায়ে আলপিন পুঁতে দিয়ে নতুন একখানি বাইবেল লিখবেন। -- আদৌ তুমি কি খ্রিষ্টের সহিষ্ণুতায় বিশ্বাসী?”
--“স্যার আমি তো পড়াব!”
--“কাদের পড়াবে? কে তোমার পড়া শোনার জন্যে মুখিয়ে আছে বলে মনে কর? আচ্ছা বলো, তোমাদের পেশা কী?”
--“স্যার, আমরা কর্মকার।”
--“চাকা পোড়াতে পার?”
রণজয়ের মুখে কথা নেই।
--“আচ্ছা বেশ। কাজ জান না, কাজের ভান করতে জান নিশ্চই? -- একখান গরুর গাড়ির চাকা এনে দিই? কর্ণের অভিনয় করে দ্যাখাও। -- পারবে?”
রণজয় চুপ করে রইল।
--“বোকা ছেলে! শিথানে সেলফোন না রেখে এখখানি হাতুড়ি নিয়েও যদি শুতে,-- বুঝতাম জীবন থেকে অন্তত কিছু নিতে পেরেছ!—যাদের পথ চেয়ে পড়ে আছ, সেই শিল্পীরাও কিন্তু ক্রিয়েটিভিটি ছাড়া অন্য কাউকেই সেইভাবে একসেপ্ট করেন না।”
উনি অনশনকারীদের আর কাউকে জাগালেন না। এরপর ডাকলেন, “সম্ভাবনাআআআআআ!”
ঢাউস একটা পেট নিয়ে থপথপ করে পা ফেলে চিত্রগুপ্তের সামনে এসে দাঁড়াল সেই অর্ধ উন্মাদ মহিলাটি। চিত্রগুপ্তের খাতায় ওর আসল নাম সম্ভাবনা সরকার। চিত্রগুপ্তের ডাক শুনলেই ওর ময়লা চুলের জট থেকে উকুনগুলো নেমে যায়। আর ও তখন কানের কাছে একটা গন্ধরাজ ফুল গুঁজে দিয়ে হেসে হেসে দারুণ কথা বলে।
--“আজ কী কী কুড়িয়েছিস দ্যাখা।”
--“স্যার, একগাদা হাবিজাবি স্লোগান আর কীসব ইস্তেহার ছিল। ওই গিটার ওয়ালা ছোকরাগুলো লিখেছিল। সব পুড়িয়ে দিয়েছি। আর কিছু আছে নাম ধাম সাকিম ঠিকানা--!”
--“এখনো পর্যন্ত এখানে কারা কারা শুয়েছে জানিস?”
--“কারা আবার? ভুনাওয়ালীর ছেলে থেকে শুরু করে জেলে, মালো, তাঁতি, হাঁড়ি, শুঁড়ি—সবই তো দেখছি লাট খেয়ে পড়ে আছে।”
--“বাবুদের ছেলে মেয়েরা আসছে না? দেখলি নে?”
--“আসছে। দু এক ঘণ্টা ঘুরঘুর করছে। হাততালি দিয়ে ফাজলামো মারছে, সেলফি উঠোচ্ছে, তারপর দু এক পিস ছুড়ি ছেমড়ি নিয়ে ফুটে পড়ছে।”
--“ঠিক আছে। এক কাজ কর, ওদের তাঁবুর কাগজটা একটু গুটিয়ে দে। আমি স্বর্গে যাব। সাইলেন্সার দিয়ে যেভাবে আগুন বেরুচ্ছে,--ধরেপুড়ে না যায়!”
--“স্যার, আমার কথাটা মনে আছে তো?”
বুড়ো চিত্রগুপ্ত সম্ভাবনার চোখে চোখ রেখে দপ করে জ্বলে ওঠেন। তারপর একশিশি আতর দিয়ে বললেন তোর গায়ে বড্ড গন্ধ রে! নে আগে মাখ, তারপর দেখছি কী করা যায়।” সম্ভাবনা আতরের শিশিটি ছুড়ে ফেলে দিল। কেননা এর গন্ধটা ওর কাছে অতি পরিচিত। একইসাথে সে মুখ ভেংচে জানিয়েও দিল, “রোজ রাতে ওই ইরানী ছুড়ি এসব ছিটিয়ে ফুর্তি মেরে বেড়াচ্ছে। আমি বেশ্যে খাতায় নাম লেখাতে চাই নে, আমাকে আয়ার কাজটি পাকা করে দেন!”
চিত্রগুপ্ত বঁড়শিবিদ্ধ বকের মতো খ্যাঁকখ্যাঁক করে হেসে উঠলেন, “তুই তো একটা কাগজ কুড়ুনি। একটা পাগলী। কাদের আয়া হতে চাস তুই?”
সম্ভাবনা পাকানো বটের ঝুরির মতো চুলগুলি পিঠের ওপর খেলিয়ে চিত্রগুপ্তের হাতখানি ধরে হিড়িহিড় করে টানতে টানতে ঢুকল অন্য আর একটা তাঁবুর নীচে। সেখানে সারে সারে শুয়ে আছে প্রায় ছ’ সাতটি শিশু। প্রত্যেকের গড় বয়স বারো তেরো। দ্যাখা মাত্রই বুড়ো চিত্রগুপ্তের বুকের মধ্যে মোচড় মেরে উঠল, “কী সব্বোনাশ! এরা কারা? কাদের বাচ্চা চুরি করে এনেছিস?”
--“চুরি করব ক্যানো? এসব বাবুদের বাচ্চা। অনশন শেখাতে এখানে রেখে গেছে। আমি তো বিস্কুট পাউরুটি যা পাচ্ছি ওদের খাইয়ে দিচ্ছি। কী করব বলেন দিকিনি।-- কী কান্নাটাই না কাঁদছে বাচ্চাগুলো! আমি বললাম আয় আইচক্রিম খাবি। ওদের মধ্যে একজন চোখ মোটামোটা করে বলল, ‘না পিসিমণি, বাপি শুনলে খুব রাগ করবে!”
--“ইস বকলেই হল? অনশন অনুষ্ঠানে এসে নেতা নেত্রীরা চুপিচুপি কতকিছু খেয়ে ফাঁক করে দিল! তাতে যদি কিছু পাপ না হয়,-- তোদেরও কিছু হবে না! কিন্তু কিছুতেই ওরা আমাকে বিশ্বাস করতে চাইল না। বাধ্যহয়ে অন্য ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে।”
কথাটা শুনে চিত্রগুপ্ত যেন আকাশ থেকে পড়লেন, “কী বললি, বাবুদের বাচ্চারা অনশন শিখছে?”
--“হুম। আসছেন আর চুপচাপ ওদের বেবিকে এটা ওটা বলে বসিয়ে রেখে সরে পড়ছেন। তবে হ্যাঁ, ওই যারা শুয়ে চিঁচিঁ করছে, ওদের জন্যে কেউ কেউ অবশ্য মনসাতলায় দুধকলা দেওয়ার মতো একটা দুটো বিস্কুটের প্যাকেট ওরাল স্যালাইন এসব করুণা করে রেখেও যাচ্ছে!”
—“কী সব্বোনেশে কথা!—বলিস কী রে?”
--“বলি সব্বোনাশের দেখেছেনটা কী? এই তো সবে শুরু। গতকাল মিডিয়াপাড়া থেকে দলবল নিয়ে নারদ মুনি এসেছিল। খুব করে তড়পেছেন এই ছ্যামড়াগুলোকে। বললেন জায়গা ছাড়। অনেকদিন একটা জায়গা ব্লক করা বেআইনি। এখানে সামনের শুক্কুর বার থেকে অন্য অনশন শুরু হবে। আর তা যদি না ছাড়িস রাতের অন্ধকারে তোদের তাঁবু জ্বালিয়ে দেব। দেখি তখন কে নেভায়!”
--“এর মধ্যে নারদ ঢুকে পড়ল কবে?”
--“উরিব্বাস! ওরই তো এখন বাজার! বিজ্ঞের মতো ক্যামন সেদিন বলল, প্রতিভা কী কারো কম আছে? তোরা যদি এইভাবে সব স্কুল কলেজ অফিস কাছারিতে ঢুকে পড়িস শহরের বেকার ছেলেমেয়েগুলো কোথায় যাবে শুনি? ভালো চাস তো মানে মানে গ্রামে ফিরে যা। জমি জাগা সামলা গিয়ে। না হলে মাথায় ঢেঁকির বাড়ি দিয়ে গুড়ো করে দেব বলে দিলাম!”
ক্ষিপ্ত অনশনকারীদের মধ্য থেকে উত্তপ্ত উল্কা ছুটে এল, “আমরা অন্যায় দাবী নিয়ে এখানে কেউ বসে নেই। আমাদের মেরিট লিস্ট দ্যাখানো হোক। আমাদের যোগ্যতা নিয়ে এভাবে ছিনিমিনি খেলতে পারেন না সরকার।”
--“নারদও কি কম ঝানু মাল মনে করেছেন? সেও এবার এক এক করে উপমা টেনে টেনে বলতে লাগলেন, “এই একে দ্যাখ। এর বাপ এককালে মস্ত বড় মন্দিরের পূজারী ছিলেন। বেদ বেদান্ত উপনিষদ এদের কন্ঠস্থ। কিন্তু কালের নিয়মে এ এখন কী কাজ করে দিন গুজরান করে জানিস? গতমাসে ওর ছোটভাই সেফটি ট্যাংকে নেমে আর ওঠেনি। এবার একে দ্যাখ। এরা একসময় ইয়োরোপীয়দেরও দলামোচড়া করে দেওয়ার যোগ্যতা রাখত। রাজ্যপাট এদের রক্তে। কিন্তু ওই যে কীসব সংবিধানের আইন ফাইনের ফাঁদে পড়ে এঁরাও এখন ফুটপাথে কয়লা পুড়িয়ে চাউমিন ভাজে। তাছাড়া তোদের মতো বেঙ্গলি মিডিয়ামে পড়া ছেলেমেয়েগুলোকে নিয়েই যত অশান্তির কারণ! এরা না পারবে কর্পোরেট হাউস পরিচালনা করতে, না পারবে ফরেনে যেতে, না পারবে মঙ্গলে পাড়ি দিতে। ডাক্তার কবিরাজের কথা ছেড়েই দিলাম। কলসেন্টারে বসে দরকারে দুয়েক লাইন বিদেশী বাক্য বিনিময় করবে তাও পারবে না।-- এমন কী ক্ষিদে পেলে গলা ছেড়ে কাঁদতেও এদের চরম কুণ্ঠা! অর্থাৎ যতটা পারা যায় পুশিং ড্যাশিং করে যাকে যেখানে পার গছিয়ে দাও,-- এটাই আমাদের রাষ্ট্রের পলিসি!”
আবার হল্লা ওঠে, “তাই বলে এইভাবে টাকার বিনিময়ে অপগণ্ড অপদার্থ ছেলেগুলোকে সুজোগ করে দেওয়া!-- ছিঃ!”
--“তোমাদের স্কুল কলেজ অফিস কাছারিগুলিতে কয়জন পদার্থ আছে শুনি? ফাঁক ফোঁকর দিয়ে কি কম ঢুকেছে? একখান চালুনি এনে যদি দ্যাখা যায়,-- তাহলে দেখবি দু একজন বাদে অধিকাংশই ফাঁকিবাজ অথবা অকম্মার ঢেঁকি। কেউ বাপ-কাকার নাম ভাঙিয়ে অথবা কেউ পার্টির লেজুড় ধরে এক একটা চেয়ার দখল করে বছরের পর বছর ধরে বহাল তবিয়তে করে কম্মে খাচ্ছে। অর্থাৎ মেরিট লিস্টের বড়াই আমাকে দেখিও না। তাছাড়া এই যে লেখাপড়ার বড়াই করছিস, এঁরাই তো তোদের হাঁ করতে শিখিয়েছে। এদের জন্যেই আজ তোরা এদ্দুর অবধি পৌঁছাতে পেরেছিস। এবার তোরা তোদের নিজের মুখে স্বীকার কর,-- আজ অবধি তোরা কয়জনকে চাষ আবাদ করা, মাছ ধরা, হাল-জোয়াল পোড়ানো, হাঁড়ি কলসি বানানো শিখিয়েছিস? অথচ উৎপাত করার বেলায়?—এক্কেবারে ওস্তাদ!”
নারদের এমন কুযুক্তিতে অন্যপক্ষ তুমুল হল্লাচিল্লা করে হাতে তালি দিয়ে শহর জাগিয়ে তুলতে লাগল। অপর দিকে অনশনকারী ছেলেমেয়েদের চোখেমুখে দিনকে দিন কে যেন অদৃশ্য কাজললতা থেকে গাঢ় কালি লেপে দিতে লাগল। ঘুমে কাতর হয়ে আসছিল সম্ভাবনার চোখের পাতাজোড়া। তবু সে তার শেষ অভিজ্ঞতার কথাটা শেয়ার না করে শুতে যাবে না, “তবে নারদ উড়ে যেতে যেতে একটি কথা বলে গেলেন, “ওরে তোরা আমার ভুল বুঝিস না। দেখ এই যে ঢেঁকিখানি নিয়ে আমি স্বর্গে গিয়ে বড়াই করি বটে। কিন্তু ওখানে আমার মা কাকী আত্মীয় পাড়া-পড়শি সবাই থাকেন। ওরাও চাল কোটেন, ধান ভানেন, কুঁড়ো ঝাড়েন, ধুলো মাখেন,--এতে তাঁদের জাত যায় না রে!”
এসব জ্ঞানগব্বির কথা চিত্রগুপ্ত আর শুনতে চাইলেন না। তিনি ফিরে যাবার জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এমন সময় পাঁচ নং তাঁবুর তলা থেকে বিশ্রীরকম গোঙানির আওয়াজ শুনে উদবিগ্ন হয়ে উঠলেন, “কে কাঁদছে রে? দেখো তো সম্ভবনা।” সম্ভাবনা কোনোরকম কৌতুহল না দেখিয়ে নোংরা ডাস্টবিনের পাশে শোবার তোড়জোড় করতে লাগল। আবার আকাশ বিদীর্ণ করা শব্দ। শহর তখন এক্কেবারে শুনসান। চিত্রগুপ্ত পা টিপে টিপে এগিয়ে এলেন। দেখলেন একটি মেয়ে কালো প্লাস্টিকের ওপর শুয়ে ঝলসানো সাপের মতো আড়মোড়া ভাঙছে। দুপাশে দুজন পুরুষ জাগা। একজন রুমাল পেঁচিয়ে ওর হাতদুটো বাঁধবার চেষ্টা করছে, অন্যজন পা দুটো মাটির সাথে আচ্ছা করে চেপে ধরে বসে আছে। চিত্রগুপ্ত আতঙ্কে চিৎকার করে উঠলেন, “সম্ভাবনাআআআআআআআআআ!” সম্ভাবনা পেছনেই দাঁড়িয়ে ছিল। সে মিহিস্বরে বলল, “ওর বাচ্চা হবে বোধহয়।”
--“যা গিয়ে ধর।”
--“ফাউ গতর আর ভাঙছি না। ওই যে বললাম, আয়ার চাকরিটা না দিলে---! মরুক ছুড়ি।”
--“এসব বলে নাকি? যা দেখ তো কোথাও একখান অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যায় কি না।”
--“এখন ইলেকশানের শহর। সি-আর-পি-এফ এ ছেয়ে আছে। মেয়ে মদ্দ যাকে পাবে তার পেছনেই গরম নল ঢুকিয়ে দেবে।” চিত্রগুপ্ত ঠাস করে ওর গালে এক চড় কষিয়ে দিতেই ওর কানের কাছে গোঁজা গন্ধরাজ ফুলটি খসে গেল। আর অমনি সাথে সাথেই পূর্বের মতো উন্মাদ আচরণ শুরু করে দিল, “হেঁই ক্যালানি চিতু, ফোঁপরদালালি আমার কাছে মারাতি আসবিনে। গাঁড় ভেঙে দেব চুতিয়ার বাচ্চা চুতিয়া!” পলক পড়ার আগেই অনেকখানি আগুন উগরে দিয়ে চিত্রগুপ্তের আকাশযান অদৃশ্য হয়ে গেল।
টুপ টুপ করে কালো তাঁবুর ওপরে শিশির ফোঁটাগুলি ঝরে পড়ে। পথচারী ফুটপাথবাসীরা বিতশ্রদ্ধ হয়ে হয়ত গুনতে থাকে এই অশৈলের ধারাপাত, “উনিশ—কুড়ি—একুশ—বাইশ ।– উটকো এ যাতনা আর কদ্দিন বাপু!” ভোর হবার সাথে সাথেই বিবর্ণ হতে থাকে শহরের ফুটপাথবাসীদের স্বপ্ন সুখ রাতের আরাম বিলাস, -- সব-- সব। কেননা একটার পর একটা স্লাব আসছে আর উৎপাত বাঁধাচ্ছে। খোলা ফুটে শুয়ে তারা না করতে পারছে একটু সেক্স, না বসতে পারছে হাতপা মেলে,-- না পাচ্ছে শহরের করুণা, -- যেন কোথাকার কোনও এক অদৃশ্য উপদ্রব এসে ভেঙে দিয়ে যাচ্ছে শহরের সহজিয়া বাস্তুতন্ত্র। আর একটু বাদেই জলের গাড়ি আসবে। লোহার শাটারগুলি উঠবার আগে প্লাস্টিক পেতে বসে পড়বে ফুলআলী মাসী। গঙ্গার জল আসবে ভোঁতা থ্যাবড়ামুখো পাইপে। ওর নল চেপে ধরে অনেকক্ষণ অণ্ডকোষ কচলাবে বিহারি ঠ্যালাচালক। মাসী বসে বসে দেখবে আর হাসবে। পাশের চায়ের দোকানে কয়লার বুক চিরে ধোঁয়ার কুণ্ডূলী উঠবে, ডেকচিতে দুধ উতলাবে। ধোঁয়া ওঠা চা’ এনে ঠ্যালাচালক পিয়ার সিং দরাজ গলায় ডাকবে, “লে মসি খা লো। আজ বহত বড়িয়া গরমি হ্যাঁয়। কৌন কৌন ফুন চুনা আজ?” কিছুক্ষণ পরেই হয়ত দামী গাড়ি থেকে নেমে মধ্যবয়সী মাড়োয়ারি দশ আঙুলে একগাদা আংটি নিয়ে জোড়হাত করে মাসীকে নমস্কার জানিয়ে ফুল চাইবে। দামের অধিক দুদশ টাকা বেশি দিয়ে দয়া দেখাবে। কী কপালটাই না এদের। একটা দুটো করে জবা কুঁড়ির মুখ ফাটবে। সরু সরু রোদের চেকনাই ছুঁয়ে দূর দূরে ছড়িয়ে পড়বে বাকি বেলকুঁড়ি রজনীগন্ধার সুবাস। অনশনকারীরা একে একে জাগবে। এদের এক জনেরও পেটে অবশ্য মল নেই। কারো বা মূত্রথলি হয়ে আছে পাতলা ফলুইমাছের পটকার মতো!-- তবু আজন্ম অভ্যাসে কেউ কেউ সুলভ সৌচালয় খুঁজে অস্থির হয়ে পড়বে। কেউবা চেয়ে চেয়ে দেখবে শহরের নির্মম ঔদাসীন্য। কেউ বা অবাক চোখে উপলব্ধি করার চেষ্টা করবে শহরের সুচারু আত্মীয়তা—ঠ্যালাওয়ালা ট্যাক্সিচালক ভুনাওয়ালা ফুলওয়ালী এদের প্রতি মানুষের কী অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও মমত্ববোধ। এদের আগে আগে বাচ্চারাও উঠে পড়বে। বাসী চোখ কচলে চায়ের দোকানের সামনে এসে দাঁড়ালে, আগন্তুক পথচারীর পক্ষ থেকে এগিয়ে আসবে সেঁকা পাউরুটি, গরম দুধ। কেউ কেউ হয়ত আফসোস উড়িয়ে বলে উঠবেন, “খারাপ তো লাগেই। আমাদের ঘরের ছেলেমেয়েদের কথাটাই বা কজন ভাবছে শুনি?”
টেবিলের অন্য প্রান্ত থেকে ছুটে আসবে বিরূপ আস্ফালন, “সমর্থনের কথা মুখে আনাই উচিত না। আজ যান, পাশে দাঁড়ান,--তারপর দুদিন বাদে ওদের ফুটানি দেখলে পায়ের নখ থেকে মাথা অবধি রিরি করে জ্বলে উঠবে!”
তপ্ত বাদানুবাদের সাথে টক্কর দিয়ে চড়চড়িয়ে রোদ বাড়তে থাকে। ট্রাফিক সার্জেন্টকে ডাব খেতে দিয়ে ধারালো দা হাতে কিছুক্ষণের জন্যে রাস্তার দায়িত্ব সামলান বাহাদুর ডাবওয়ালা। কী অসম্ভব আত্মীয়তায় বাঁধা এ শহর। কেবলমাত্র ভুখাপেটে পড়ে থাকা বেকার যুবক যুবতীদের দিকে ফিরেও তাকায় না কেউ। ভিশান ঝাপসা হয়ে আসে,-- মিডিয়া আসে না। অধীর আগ্রহে চেয়ে থাকতে থাকতে সবুজ সতেজ চোখগুলি চচ্চড়ি হয়ে গেলেও, লেখক শিল্পী সংগঠনের তেমন কোনও বটবৃক্ষের ছায়া মেলে না। শুধুমাত্র অবজ্ঞা আর অবহেলার চলমান চোখগুলো ব্যাস্তসমস্ত হয়ে পাশ কাটিয়ে সরে সরে যায়! হঠাৎ হঠাৎ হল্লার মতো আতঙ্ক জাগিয়ে ছুটে আসে অ্যাম্বুলেন্স। মুহূর্তের মধ্যে মুখের স্লোগান বদলে যায় কান্নায়! সম্ভাবনা সরকার শ্মশানকালীর মতো হাহা করে হেসে ওঠে, “মরবে! মরবে! শালার জাতেরা সব এক এক করে মরবার জন্যে লাইনে এসেছে!”
শহরের সাইরেন হয়ে ভোর ভোর কোকিলটা আপন গরজেই জেগে ওঠে। পোষা পুলিশগুলো নিয়ম করে লাঠিচার্জ করে যান। ছোটছোট ছেলেমেয়েরা ভয় পেয়ে ছুটে যায় সম্ভাবনার কাছে। সম্ভাবনা ওদের কোলের মধ্যে আগলে রেখে অভয় দেয়, “চুপ, তোদের কোনও ভয় নেই।” মুহূর্তের মধ্যে যৌবনের কান্না, কৈশরের কান্না, বাবুপাড়ার ছেলেমেয়েদের কানা কোকিলের কান্না সবকিছু একসাথে তালগোল পাকিয়ে যায়। হঠাৎ চোখে পড়ে আম্বুলেন্সের পিছু পিছু ছুটছেন বাবুপাড়ার কিছু ভদ্রলোক, যারা তাঁদের বাচ্চাকে বসিয়ে রেখে অদূরে গা ঢাকা দিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। তাঁরাও উদবিগ্ন হয়ে কাউণ্ট করতে থাকেন তাঁদের ঘরের বেবিগুলো। ময়লা ফেলা গাড়ি আসে। ছোঁ মেরে কেড়ে নেয় ডাস্টবিনের পাশে রাখা সম্ভাবনার সঞ্চিত সম্পদ। সেও ঢাউস একটা পেট নিয়ে ছুটতে থাকে মাদী শূকরের মতো, “আবে এ রুখ। হারাম কা মাল লাগতা হ্যাঁয় কেয়া? ইয়ে ম্যাইনে পরিসানি সে মজুত কী! আবে এ লুটেরা কা বাচ্চে লুটেরা! আগার নেহি বাপস লোটা তো, ফির আগ লাগা দুংগি!”
হাজার হর্নে কেউ কারো কথা শোনে না। কেবলমাত্র মাজাঘষা রাজপথ জুড়ে সীতার অলংকারের মতো ময়লাফেলা গাড়ি থেকে একটা একটা করে খসে পড়তে থাকে ওয়ারেসের পাউচ, শুকনো স্যালাইনের বোতল আর বিষাক্ত সূচ সিরিঞ্জ!

ফেসবুক মন্তব্য

Copyrights © 2016 All Rights Reserved by বম্বেDuck and the Authors
Website maintained by SristiSukh CMS
kusumarghya@yahoo.com