রাঙিয়ে দিয়ে যাও

পার্থ প্রতিম চট্টোপাধ্যায়



ভারতের অন্যতম প্রধান উৎসব হোলির প্রানকেন্দ্র হল ব্রজভূমি। ব্রজভুমি অর্থাৎ, বৃন্দাবন, মথুরা, বারসানা, নন্দগ্রাম ও তার আশেপাশের অঞ্চলে দোল পূর্ণিমা বা ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমার বেশ কিছুদিন আগে থেকেই শুরু হয়ে যায় হোলির উৎসব। এই উৎসবের শুরু হয় লাড্ডুমার্ হোলি দিয়ে। কথিত আছে কৃষ্ণ এবং তাঁর সহচরদের উৎপাতে অতিষ্ট হয়ে রাধারানী এবং গোপিনীরা দোল পূর্ণিমার আগের নবমীতে রাধারানীর গ্রাম বারসানাতে হোলি খেলতে আসার আমন্ত্রন পাঠান কৃষ্ণের বাসস্থল নন্দগ্রামে। কৃষ্ণ আমন্ত্রণে সম্মতি জানালে বারসনাতে অষ্টমীর দিন খুশিতে লাড্ডু বিতরণ হয়। সেই প্রাচীন রীতি মেনে আজও ব্রজের হোলির প্রধান উৎসব শুরু হয় বারসানার রাধারানীর মন্দির থেকে লাড্ডু বিতরন বা লাড্ডু হোলি দিয়ে। পরেরদিন অর্থাৎ নবমীর দিন নন্দগ্রামবাসীরা দল বেঁধে বারসানা যান হোলি খেলতে। এইদিন রাধা এবং তাঁর সখীরা তাঁদের লাঠি নিয়ে তাড়া করেন আর কৃষ্ণ সখারা চামড়া দ্বারা নির্মিত ঢাল ব্যবহার করেন এই লাঠির আঘাত থেকে নিজেদের বাঁচাতে। হোলির এই বিশেষ উৎসবটি “লাঠমার্ হোলি” নাম পরিচিত। আজও প্রতি বছর প্রথমে বারসানা ও তার পরের দিন নন্দগ্রামে এই লাঠমার হোলি পালিত হয়। আর তার পরের দিন অর্থাৎ ফাল্গুন মাসের শুক্লা একাদশীর দিন থেকে ব্রজের অন্যান্য স্থানে শুরু হয় হোলির উৎসব। দেশ বিদেশ থেকে লক্ষাধিক লোক এই সময় ব্রজভূমিতে এসে উপস্থিত হন এই হোলি দেখতে।



অনেকের মতো, আমার ও, বহুদিনের ইচ্ছে ছিল ব্রজের এই অভূতপূর্ব হোলির আনন্দ অনুভব করা আর অবশ্যই, উৎসবের কিছু মুহুর্তের ছবি তোলার। সুযোগটা হয়ে গেলো এই বছর, যখন কোলকাতার বন্ধু নীলাদ্রি জানালো ওদের ফোটোগ্রাফি ক্লাব "মোহনা" ব্রজের হোলির ছবি তোলার জন্য যাচ্ছে। মুম্বাই থেকে আমি, রুদ্রদা এবং অনন্ত যোগ দিলাম ওদের সঙ্গে। প্ল্যান অনুযায়ী আমরা সবাই বৃন্দাবন পৌঁছোলাম ১৪ই মার্চ, ঠিক দোল পূর্ণিমার এক সপ্তাহ আগে। নীলাদ্রি এর আগে কয়েকবার এসেছে ব্রজের এই রঙের উৎসবের ছবি তুলতে। তাই সন্ধ্যে নাগাদ আমারা সবাই বসলাম ওর সঙ্গে, ওর আগের অভিজ্ঞতা জানার জন্য। এই ধরনের “Photography Tour” এ আগে থেকে তৈরি হওয়া খুব দরকার। তাড়াতাড়ি রাতের খাওয়া শেষ করে যে যার ঘরে ফিরে শুরু হলো “cling film” দিয়ে ক্যামেরা প্যাকিং এর কাজ, যাতে রঙের ছবি তোলার সময় ক্যামেরার কোনো ক্ষতি না হয়।


রাধারানী মন্দির


পরদিন সকাল সকাল সবাই বেরিয়ে পড়লাম বারসানার উদ্দেশ্যে, লাঠমার হোলির ছবি তুলতে। বৃন্দাবনের থেকে বারসানা প্রায় ৪৫ কিমি দূরে, পৌছতে বেশ সময় লাগল। ভারতে, বারসনাতেই কেবলমাত্র রাধারানীর মন্দির রয়েছে, অন্য সব মন্দিরে “রাধা-কৃষ্ণের” যুগল মূর্তি দেখা যায়। প্রায় দুশোর বেশি সিঁড়ি পেরিয়ে মন্দিরটির ভিতরে পৌঁছে এক অভুতপূর্ব দৃশ্যের মুখোমুখি হলাম সবাই। চতুর্দিকে রঙের মেলা, আকাশে উড়ছে আবির, সবাই ঢোল বাজিয়ে নাচ গান করছে, আর মুখে "রাধে-রাধে" ধ্বনি। এক অদ্ভুত আনন্দে মন ভরে উঠলো। বেশ কিছুটা সময় লাগলো ঘোর কাটতে, তারপর শুরু হলো ছবি তোলা। বুঝতে শুরু করলাম খুব সোজা নয় এই উৎসবের ছবি তোলা, সময় লাগলো পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে। কিছুক্ষন মন্দির ও আশেপাশের ছবি তুলে নেমে এলাম রঙ্গিলা গলিতে, এখানে বিকাল সাড়ে ৪টা নাগাদ শুরু হবে "লাঠমার হোলি"। প্রায় দু ঘণ্টা আগে একটি ছোটো মন্দিরের বাইরে জায়গা করে নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম আমরা কয়েকজন লাঠমারের ছবি তোলার জন্য। সাড়ে তিনটের পর নন্দগ্রামের গোপরা এসে পৌঁছতে শুরু করলো বারসানাতে। প্রথমে রাধারানী মন্দিরের দর্শন করে কৃষ্ণসখাদের দল এসে পৌঁছতে লাগলো রঙ্গিলা গলিতে, যেখানে গোপিনীরা লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে আছে তাঁদের অভ্যর্থনা করার জন্য। শুরু হলো লাঠমার, গোপিনীরা লাঠি নিয়ে তাড়া করতে লাগলো আর কৃষ্ণসখারা সেই লাঠির মার থেকে নিজেদের বাঁচানোর চেষ্টা করতে লাগলো। এর মধ্যেই প্রায় কয়েক হাজার লোক জড়ো হয়েছে এই ছোট্ট রঙ্গিলা গলিটিতে, অনেক চেষ্টায় তুলতে পারলাম লাঠমার হোলির কিছু ছবি। খুব আনন্দে কাটল সারাদিন। সন্ধ্যে নামার পর শুরু হলো হোটেলে ফেরার পালা। পরদিন, অর্থাৎ ১৬ তারিখ সকালে আবার বেরোতে হবে নন্দগ্রামের উদ্দেশ্যে।


লাঠমারের জন্য অপেক্ষা



লাঠমার


১৬ তারিখ সকাল বেলা বেরিয়ে প্রায় সাড়ে দশটা নাগাদ আমরা এসে পৌঁছোলাম নন্দগ্রামের "শ্রী যশোদা নন্দজী" মন্দিরে। ততক্ষনে মন্দির প্রাঙ্গনে শুরু হয়ে গেছে রঙের উৎসব। আমরা সবাই উঠে এলেম দোতলার অলিন্দে, যাতে উপর থেকে এই উৎসবের ছবি তুলতে পারি। নিচে চলছে আবির খেলা আর কীর্তনের সঙ্গে নৃত্য। কিছুক্ষন পর আর থাকতে পারলাম না উপরে, এক অমোঘ আকর্ষণে নিচে নেমে এলাম ভিড়ের মধ্যেই। ছবি তোলার সঙ্গে সঙ্গে মিশে যেতে থাকলাম রঙের এই অভূতপূর্ব উদযাপনের সঙ্গে। কখন যেন, ছবি তোলার সাথে সাথে ভিড়ের সঙ্গে মিশে, নাচের তালে পা মিলিয়ে ও দিয়েছিলাম। অভাবনীয় এক আনন্দে মন ভরে যাচ্ছিলো। ছবি কতটা তুলতে পারলাম তা জানি না, কিন্তু এই রঙের উৎসবে যোগ দিতে পেরে নিজেকে ভাগ্যবান মনে হচ্ছিলো। বৃন্দাবনে, হোটেলের ঘরে ফিরে এলাম প্রায় রাত ১১ টার পর।


শ্রী যশোদা নন্দজী মন্দিরের প্রধান দ্বার













পরদিন ১৭ তারিখ আমাদের বিকেলে ফিরতে হবে, ঠিক করলাম সকাল বেলা বেরিয়ে আমরা যাবো বৃন্দাবনের "বাঁকে বিহারী" মন্দিরে, সেদিন যেখানে থেকে শুরু হবে বৃন্দাবনের রঙের উৎসব।


বাঁকে বিহারী মন্দির প্রাঙ্গন




সকালে উঠে বেরিয়ে পড়লাম "বাঁকে বিহারী"র দিকে, কৃষ্ণ ভক্তদের ভিড়ের সঙ্গে মিশে, প্রবেশ করলাম মন্দিরে। তিল ধারণের জায়গা নেই মন্দিরের ভিতরে, বিভিন্ন দিক থেকে উড়ে আসছে আবির। মন্দির থেকে পিচকারি দিয়ে ভক্তদের গায়ে রং দেওয়া হচ্ছে। কিছুক্ষন বাঁকে বিহারীর ভিতরে দাঁড়িয়ে, বেরিয়ে পড়লাম পিছনের দরজা দিয়ে। এসে পরলাম অন্য আর এক রাস্তায়, যেখান দিয়ে হেঁটে চলেছে দলে দলে লোক। জানা গেলো এঁরা হাঁটছেন বৃন্দাবন পরিক্রমাতে যোগ দিয়ে। এই পরিক্রমাতে প্রায় ১১ কিমি রাস্তা হাঁটতে হয়। আমরাও প্রায় কিছুক্ষন জনস্রোতে মিশে অনুভব করার চেষ্টা করলাম পরিক্রমার আনন্দ।



হোটেলে ফিরে এলাম প্রায় দুপুর ১২টা নাগাদ, এবার ফেরার জন্য তৈরী হওয়ার পালা। বেলা ৩টা নাগাদ বেরিয়ে পড়লাম ফেরার পথ ধরতে, সঙ্গে নিয়ে এলাম এক অবর্ণনীয় অনুভূতি।

ফেরার পথে কানে বাজতে লাগলো প্রচলিত বাংলা কীর্তনের পদ –
"জয়, রাধে রাধে, গোবিন্দ বলো"




(লেখার সঙ্গে ব্যবহৃত ছবি লেখকের তোলা।)

ফেসবুক মন্তব্য