কালীচরণের চিঠি

সঙ্গীতা দাশগুপ্ত রায়



কালীচরণের চাকরীর চিঠিটা ছিল পয়া।  ওটা আসার কিছু পরেই পাড়ার ছাগি নারায়নী রেলে কাটা পড়তে পড়তে বেঁচে যায়।  নরহরিকাকা  বহুকাল ধরে নিজের কপালে হাত রেখে জ্বর আছে বুঝে ভাত খায়না। সেও সেদিন কপাল ছুঁয়ে হাঁক দেয় "আজ দুটো ভাত দিও।"
চিঠিটা এল এগারোই আর পনেরোতে কালীর মা-র চোখে পড়ে পাতকোর পাশে ভাঙ্গা ইঁটের গাদার পেঁপে গাছটায় ফুল এসেছে। এদ্দিন ওটা মদ্দা গাছ জেনে এসেছে সবাই। ভাতের ফ্যান, মাছের জল কিছুই ওটাকে পোয়াতি করতে পারেনি। এতেও শেষ নয়।  ওই এক চিঠি এল আর তারপরপরই দুটি সাদা ফুল, আহা! 
কালীর পিসি ভুলি, যাকে দেখতে এসেছে অন্ততঃ শ'খানেক পাত্রপক্ষ, সেই ভুলিকে এক দেখাতেই পছন্দ করে ফেলল কাছের গাঁয়ের গোপু সাহার পিসি। মাকে বলল বাগান থেকে দুব্বো আনুন, লক্ষ্মীর ঝাঁপির ধান আর এট্টু শ্বেত চন্নন দিন, একেবারে আশীব্বাদ সেরে যাই।    
সব কিছু মিলিয়ে দেখে মা ঠাকুমা রায় দেয় এসব ওই চিঠিখানা এসে ত্থেকেই ঘটছে। সব ওই চিঠির পয়েই।
তা সে  পয় খানিক আশেপাশের বাড়ির গায়েও লাগল বুঝি। তন্ময় পুলি আর বাচ্চু পারুইদের মাঝের পেয়ারাগাছটা নিয়ে নিত্যি বচসা। পুলিরা বলে ওদের বাড়ির মেয়েটা দুপুরে কষ্টি পেয়ারা খেয়ে ছিবড়ে  ফেলেছিল গলিতে।  গাছ সেই ছিবড়ের বীজের। অতএব পেয়ারা যা হবে সব পুলিদের। পারুইরা বলে ওদের বাড়ির ছেলে বলের অভাবে পেয়ারা নিয়ে খেলছিল ছাদে। হাত ফসকে পেয়ারা পড়ে গলিতে এবং অচিরেই গাছ গজায়। পেয়ারা অতএব পারুইয়ের প্রাপ্য।  তা চিঠি আসার দিন তিনেকের মধ্যে সেই গাছ কেমন আগাপাশতলা কালো হয়ে শুকিয়ে গেল। শুনে মনে হবে আহা, ভরন্ত গাছ মরল! তবে পাড়ার লোকেরা বলল আহ, শান্তি। ও আপদকে নিয়ে ঝগড়ায় তিষ্ঠোনো যেত না এদ্দিন।    

কালী অবশ্য চিঠি এসে ইস্তক  মনমরা। সরকারি চাকরি ওদের তিন পুরুষে কেউ করেনি।  মালিকের মুখনাড়া খেয়ে, পাঁচ বছরে একবার মাইনে বাড়িয়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তৈরি করা সংসার ওদের। সেখানে পায়ের ওপর পা তুলে চেয়ারে বসে  পান চিবিয়ে রোজগার করে বাড়ি ফিরে বাপকাকার সামনে দাঁড়াবে কি করে কালীচরণ! 
মা বললে "খোকা, ও চাকরিকে না করিস নি। চিঠির পয়েই এত কিছু, ও চিঠিকে অগ্রাহ্যি করলে ভগবানের কোপে পড়তে হবে।"   
ঠাকুমা বললে "দাদু, চাকরী পেয়েছ যখন তখন জানবে ঠাকুর  তোমাকে কোনো ভাল কাজের জন্য পাঠিয়েছেন। তাঁকে উপেক্ষা কোরো না।" 
অবশেষে কালীকে শুভদিনে সকালে ভাতের পাতে দই খেয়ে আকাশনীল শার্ট আর বেজি ধূসর প্যান্ট পরে চিঠিটি নিয়ে বেরোনোর জন্য তৈরি হতেই হয়। খেয়ে উঠে ঠাকুরের আসন থেকে ফ্রেমে আটকানো চিঠিটি বার করতে গিয়ে ইতিমধ্যে কালীর হাত কেটে যায় অল্প। মা ঠাকুমা তাড়াতাড়ি নীল ফুল একখানা ফ্রেমের ওপর ফেলে  বলে "এই হল জাগ্রত দেবদেবীর লক্ষণ। শুভ কাজে রক্তদর্শন করে নিলেন কেমন।"
কালীর বাপ হরিচরণ জীবনে প্রথম  সেদিন মালিকের ঘাড়ধাক্কার পরোয়া না করে ছেলের জন্য অপেক্ষা করছিল। সে ঝটিতি কাটার ওপর এক চিমটে চিনি ফেলে কালীকে তাড়া দিল "জলদি চল বাবা। সরকার হলেন মা বাপ। তাঁর ঠেঙে চাকর হওয়া যে সে কথা তো নয় রে বাপু! সরকার কিন্তু আমাদের বাজোরিয়াসায়েবের থেকেও অনেক কড়া মানুষ।"

যে চিঠি  ঘরে থাকলে মরা গাঙে বান আসি আসি করে সে চিঠি পকেটে নিয়ে যাত্রা সুখের তো হবেই। কালীচরণ আর হরিচরণ বাড়ি থেকে দশপা হেঁটেই ভ্যান পেয়ে গেল আর কী কপাল, ভ্যানে ছাগল মুরগি কিচ্ছু না, দুটো বউ আর ছোট একটা ছেলে বসে কেবল। চট জলদি দুজনে  স্টেশনে পৌঁছে দেখে  দাঁড়িয়ে আছে ডাউন লাইনের লোকাল যা কিনা কুড়ি মিনিট আগেই চলে যাওয়ার কথা। দেখ না দেখ একটা কামরা দেখে উঠতেই মুখোমুখি জানলার ধারে বসা দুটো ছেলে আড়মোড়া ভেঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে বলল ধুস, আর বসে কাজ নেই। একখানা তো মাত্র স্টেশন আর। চল বাইরে দেখি টোটো ফোটো পাই কিনা। অতএব কালীচরণের প্রথম দিন অফিস যাওয়ার যাত্রাটি পয়া চিঠির কল্যাণেই আরামদায়ক হল বটে।  

সরকারী দপ্তর মানেই  বিশাল হা দুয়োর দে দুয়োর বাড়ি। এ তলা সে সিঁড়ি ওই বাঁক সেই করিডোর পেরিয়ে কালীচরণ যখন আদিবাবুর কাছে পৌঁছল আদিনাথ সাঁতরা তখন ছোট একখানা বই খুলে বিড়বিড় করে কি সব বলছেন চোখ বন্ধ করে। সামনের চেয়ারটিতে একখানা বহুব্যবহৃত ছেঁড়া ব্যাগ। কালী এদিক ওদিক তাকিয়ে অপেক্ষা করে আদিবাবুর বিড়বিড়ানি শেষ হওয়ার।  ইতিমধ্যে একটি ছেলে হাতকাটা গেঞ্জি আর ঝুলঝুলে প্যান্ট পরে চা দিতে দিতে আসছিল সব টেবিলে। কালীকে দেখে চোখের ইশারায় জিজ্ঞেস করল ওঁর কাছে? 
কালী ঘাড় নাড়তে  মুচকি হাসলে  "একঘন্টা পরে এসো। সবে দুগ্‌গা চলছে।" 
কালী অবাক হয়। মানে? 
"মানে দুগ্‌গা নাম চলছে। এর পর গণেশ, নারায়ণ, শ্রীহরি সব আছে। কি দরকার? ঠিকানা বদল?"
কালীচরণ খুশি খুশি মুখে পকেট থেকে চিঠিটা বার করে -  না, আমার চাকরির চিঠি।  এখানে দেখা করতে বলেছে। নিচে বলে দিল আদিনাথ সাঁতরা, ছাব্বিশ নম্বর টেবিল মাথার ওপর কড়িকাঠে ফ্যানের শিক... তাইতেই...
ছেলেটার এত কথা শোনার সময় নেই। পরের টেবিলের দিকে যেতে যেতে ছুঁড়ে দিল "তাইলে আর কী। ডাইরে থাক।"
তা দাঁড়িয়ে প্রায় ছিলই কালী ঘন্টাখানেক। আদিবাবু অদ্ভুত এক একাগ্রতায় চোখ বুঁজে জপ করেই চলেছেন।  এদিকে সামনে কাপে সর ভেসে ফ্যানের হাওয়ায় কেমন সরে সরে যেতে লাগল। কালী আর কিছু না পেয়ে  দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ট্রেন থেকে দেখা কাকতাড়ুয়াদের কথা, পানিফল তোলা বাচ্চাদের কথা, মায়ের ঠাকুরঘরের কোণে নকুলদানা হ্যাংলা টিকটিকিটার কথা ভাবতে ভাবতে কালচে চায়ের সরের দিকে তাকিয়ে ধ্যান করছিল হঠাৎ হলঘরের অন্যদিক থেকে কিছু লোক দৌড়ে এদিকে আসছে দেখে চমকে তাকাতেই হল। লোকগুলো টেবিলে ধাক্কা খেয়ে হোঁচট খেয়ে সাপ সাপ বলে চেঁচাতে চেঁচাতে  আসছিল। সেই শুনে আদিবাবুও এবার লাফিয়ে উঠলেন - সাপ? কোথায়? কই? অ্যাঁ? আরে কোথায় সাপ? 
মিনিট খানেকের মধ্যে কিছু লোক সামনের চেয়ারে উঠে পড়ে। কেউ কেউ দৌড়ে কিছুটা বাইরের দিকে এসেও আবার ঝুঁকে দেখার চেষ্টা করছে। অথচ সাপটা যে কোথায় কেউ জানেনা।
সোরগোলের মধ্যে বোঝা গেল ভেতরে একটা আলমারি ভর্তি ফাইলের মাঝে সাপটা শুয়ে আছে।   
কালীর একটু অবাক লাগে। ওদের বাড়ির আশেপাশে আকছার সাপ দেখা যায়। লোকালয়ের কাছে যত সাপ আসে বেশিরভাগই দাঁড়াশ কী ঢ্যামনা। একটা গোটা অফিস সুদ্ধ লোক সেই নিয়ে তোলপাড় তুলে দিয়েছে দেখে সে হেসেই ফেলে তারপর ধীরে পায়ে এগিয়ে যায় অন্ধকার ঘুপচিমত কোণটার দিকে।  

মানুষের নামকরণ এক হয় জন্মের কালে আর এক হয় কর্মের কারণে। কালীচরণের দপ্তরে ওর নাম হয়ে গেল হেলেকালী। কারণ সেদিন ওই আলমারির ভেতরে গুটিয়ে শুয়ে থাকা হেলে সাপটিকে অবলীলায় হাতে তুলে নিয়ে অফিসের হল পেরিয়ে সিঁড়ির সামনে নিয়ে গিয়ে কালীচরণ সব ভুলে আকাশে কথা ছুঁড়ছিল,  "ভয় পাবেন না... বিষ নেই... একটা বালতি আনুন... বন দপ্তরকে খবর দিন... ভয়ের কিছু নেই... নির্বিষ সাপ।"  
ঘন্টাখানেকের মধ্যে সেকশন ইনচার্জের  কাছে মৌখিক মেমো পেশ হল কার্বলিক অ্যাসিড কিনে আনানোর আর চাকরীতে নিয়োগের আগেই কালীচরণের নাম হয়ে গেল হেলেকালী।  প্রথমে কেউ একজন বোধহয় জিজ্ঞেস করেছিল আপনার নাম কি? নামটি কিভাবে মুখে মুখে পালটে গেল কে জানে। কিছুক্ষণ পরে, কালীচরণ যখন তালেগোলে সেই ছাব্বিশ নম্বর টেবিলটার কাছে পৌঁছতে যাবে তখনি একজন এসে ধরল "আপনি কি হেলেকালী? আদিবাবুর কাছে এসেছিলেন? উনি ডাকছেন আপনাকে।" 
যাক! হাঁফ ছেড়ে কালীচরণ লোকটির পিছু পিছু আদিবাবুর টেবিলে পৌঁছয়।  
"কী কাজে এসেছিলেন মশায়? আমার টেবিলের সামনেই তো দাঁড়িয়ে ছিলেন, না?" আদিবাবুর টেবিলে তখনও সেই সর পড়া চায়ের কাপ। ওদিক থেকে চোখ সরিয়ে কালীচরণ  পকেট থেকে চিঠিখানা বার করে সামনে ধরতেই আদিবাবু মুখটা বিকৃত করলেন "অঃ আমার কাছে কেন? বিকাশবাবুর কাছে যান। আপনার কাজ ওঁর ডিপার্ট্মেন্টে।"
হাজার খুঁজেও বিকাশবাবুকে পাওয়া গেল না। তিনি মেয়ের বিয়ের কাজে ব্যস্ত। অফিসে তেমন এসে উঠতে পারছেন না। যদিও বা আসেন তো দেড় ঘন্টায় চার ঘন্টার কাজ সালটে বেরিয়ে যান। তবে আসেন সেদিনই যেদিন ফাইলের গিঁট খোলার বায়না থাকে। এসব  খবর কালীচরণকে দিল ভ্যাংচা। সরকারী অফিসের নিয়ম মেনে ততক্ষনে বেশিরভাগ টেবিলেই কে কবে কোথায় কেমন সাপ দেখেছে, সাপের কামড় খেতে খেতে বেঁচেছে এই সব গল্প চলছে। হতাশ কালীচরণ পায়ে পায়ে নিচে এসে সিঁড়ির মুখটায় বসে পড়েছিল। ভ্যাংচা পিছন থেকে টোকা মারল "চা খাবেন নাকি? পাঁচ টাকা কাপ।" পকেটে মায়ের দেওয়া কুড়ি টাকার দুটো নোট। সকালে ভাত খেয়েই বেরিয়েছে। এক কাপ চা খাওয়া যেতেই পারে। বিকাশ বাবু না এলে তো বোঝাও যাচ্ছে না কালীচরণের ভাগ্যে কি আছে।   
"চল, হুই গাছতলে বসি। আমিও বেরেক নিমু।" বলে ছেলেটা কালীচরণকে বাইরে গাছের নিচের ছায়া ছায়া জায়গাটা দেখায়।   
এক খুরি চা কালীচরণকে দিয়ে পকেট ঝেড়ে একটা ভাঙ্গা বিস্কুট বার করে বাড়িয়ে ধরে "খাবা? আমার নিজের ভাগের।"
কালীচরণ হেসে ফেলে - তোর দোকান কোথায়?
ছেলেটা ভারি ব্যাজার মুখে তাকায় - আমার দোকান কোদ্দিয়ে হবে। সামসুলের দোকান। আমি কাজ করি। আমাকে সাপ ধরা শেকাবে?
ও হরি! তাই এত খাতির। চা খাবে বিস্কুট খাবে... 
হেসে ফেলে কালীচরণ। সাপ ধরা শেখাতে তো সাপ লাগবে। কোথায় পাবি সাপ?
কথায় কথায় নাম জানা যায় - ভ্যাংচা। এই একটাই নাম। একদিন বড় হয়ে মস্ত বড় চায়ের দোকান দেবে। নাম দেবে ভ্যাংচা টি স্টল। সেখানে বিনে পয়সায় রাস্তার কুকুরদের জন্য বিস্কুট খাওয়ার ব্যবস্থা থাকবে। কালীচরণ বোঝে এই অফিসবাড়ির সব টেবিলের সব বাবুর খবর ভ্যাংচার নখদর্পনে। 
"বিকাশবাবুর হাতে চুলকুনি আছে।" ফিকফিক করে হাসে ভ্যাংচা।
তুই কী করে জানলি এত কথা?
বা রে! কোন পাটি ভাঁড়ের চা খায় আর কোন পাটি কাগজের কাপে চা খায় সব তো বিকাশবাবুই বলে দেয় আমাকে। কাগজের কাপে চা খেলে বাবু আমার থেকে কাপটা নিয়ে তার ওপর একটা নম্বর লিখে তারপর তাতে চা ঢেলে দিতে বলে।  বলে ওটা চুলকুনির ওষুধের দাম - 
কালীচরণ বুকের চিঠিটায় হাত ছোঁয়ায়। মা বলে চিঠিখানা পয়া। সে চিঠি এমন ঘুষের দপ্তরে এনে ফেলল কেন কে জানে? 

তিন চারদিন অফিসে যাওয়া আর আসাই সার হয় কালীচরণের। অবশ্য একেবারে বৃথা যায় আসা যাওয়া তা বলা যাবে না। দ্বিতীয়দিন ও মায়ের দেওয়া টিফিনের রুটি তরকারির ভাগ দেয় ভ্যাংচাকে। ভ্যাংচা দশ মিনিটের "বেরেকে" বসে খেতে খেতে সামসুল চাচার গল্প করে। কীভাবে প্ল্যাটফর্ম থেকে চাচা ওকে তুলে এনেছিল, কীভাবে  শুকনো নেশা ছাড়ানোর জন্য  মেরে মেরে কালশিটে ফেলে দিয়েছিল গায়ে... এসব। এ ছাড়া আর একটা জিনিস খুব মজার লাগে। একতলায় কেউ তেমন খেয়াল না করলেও দোতলায় আদিবাবুর আশেপাশের টেবিলের লোকজন কালীচরণকে দেখেই হাঁক দেয় "আরে হেলেকালী যে! আজও তো বিকাশ দা আসেনি হে! বাড়ি যাও কাল এসো।"
চারদিনের দিন আদিবাবু নিজেই হাঁক দিলেন "এই যে বাপু, তোমার জয়েনিং ডেট তো চাদ্দিন পেরিয়ে গেল! এদিকে ফর্ম্যাল জয়েনিং না হলে তোমার নাম তোলা যাচ্ছে না রেজিস্টারে। এরিয়ার হয়ে যাবে তো হে!"
কালীচরণ কৃতজ্ঞতায় অল্প হাসে "আজ্ঞে আসছি তো রোজই। বিকাশবাবু কতদিনের ছুটিতে আছেন কেউ তো বলছে না। উনি না এলে আর কারুর কাছে..."
আদিবাবু ভুরু কুঁচকে একটু বুঝি ভাবেন। তারপর  মাথা নাড়েন  "আচ্ছা কাল এসো, দেখি  কী করা যায়।"

কাজে যোগ যখন দিতেই পারছে না তখন তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরাই ভাল। ট্রেনে বসার যায়গা তবু পাওয়া যায়। ভ্যাংচার বেরেকও তো মাত্র দশ মিনিটের। বসে থেকে কেবল সময় নষ্ট। আদিবাবুর থেকে আশ্বাস পেয়ে কালীচরণ দুপুর দুপুর বাড়ি ফিরে যায়। পরের দিন সকাল বেলায় দপ্তরে পৌঁছে দেখে হই হই কান্ড। সবাই উত্তেজিত হয়ে কথা বলছে। কালীচরণ পায়ে পায়ে আদিবাবুর ছাব্বিশ নম্বর টেবিলের সামনে গিয়েই দাঁড়ায়। আদিবাবুও বোধহয় আজ জপতপ শিকেয় তুলেছেন।  সামনের কাপের চায়েও চুমুক দিয়েছেন দেখা যাচ্ছে। কালীচরণকে দেখেই উঠে দাঁড়ালেন - "এই যে! তোমার তো হয়ে গেল হে!"   
"কী হয়ে গেল?" কালীচরণ ঘাবড়ে যায়। 
"আর কী হয়ে গেল! কাল বিকাশবাবু এসেছিলেন দুপুরের পর। তুমি তার আগেই চলে গেছ।  টেবিলে বসে কিছু কাজকম্ম করছিলেন। সেই সময় এক ভদ্রলোক এসে বোধহয় একখানা খাম দিয়েছিল। বিকাশবাবু খামখানা হাতে নিতেই হাতকড়া বেরিয়ে পড়ে পাশের লোকটির পকেট থেকে। এত ধরপাকড় চতুর্দিকে। লোকটা কেন যে সাবধান হয়নি কে জানে!"
"তারপর?" 
"তারপর আর কী! ওঁর ডিপার্টমেন্টের সব  ফাইল সিল হয়ে গেছে। এখন দেখ কদ্দিনে কী হয়"
"তাহলে? আমার কী হবে?"
আদিবাবু এবার একটু ভালো করে কালীচরণের দিকে তাকান। আধা গেঁয়ো সাহসী ছেলেটিকে দেখে একটু মায়াই হয়। বলেন "চল দেখি  সেকশন ইনচার্জের কাছে।"

সারা সপ্তাহ কেটে যায় অফিসে ট্রেনে স্টেশনে ভ্যানে। শনিবার মা হাত বাড়ায় "চিঠিটা দে খোকা। তুলে রাখি।"
দুপুর নাগাদ মণিপিসিমা হাসিমুখে বাড়িতে ঢোকেন হাতে খানিক সিরির নাড়ু নিয়ে। গাবুটা শেষ পর্যন্ত কলেজের গন্ডি পেরোলো। তিনবছরের জায়গায় চার বছর তিনমাস লাগল। কী ভাগ্যি এখন ইউনিভার্সিটিও পাঁচ বছরের মধ্যে পরীক্ষা দিয়ে দিয়ে পাস করার সুযোগ করে দেয়। 
সন্ধেবেলায় হরিচরণ ফিরল হাসিমুখে। পাঁচ বছর পর বাজোয়ারিসায়েবের নাকি মনে হয়েছে হরিচরণ বড় সৎ মানুষ। নিজে থেকে তাই  দেড়শ টাকা মাইনে বাড়িয়ে দিয়েছেন তিনি।  
রোববার বাজারে গিয়ে সব্জি বাছতে উবু হয়ে বসেছে সবে, বামনমাসি তার পুঁটলি থেকে চারটে হাঁসের ডিম বার করে ঠোঙ্গায় ভরে দিয়ে বলল মনে আছে বাবা সেই যে আমার খোঁড়া হাঁসটাকে একবার এনেছিলুম বাজারে, তুমি বলেছিলে কাঁচা হলুদ থেঁতো করে চোটের ওপর বেঁধে দিতে? আমার সেই সরোর ডিম। ও তুমি নিয়ে যাও, মাকে রেঁদে দিতে বোলো। 
বিকেলে বৃষ্টি নামল জোর। ঠাকমা ঝাল বড়া আর শুকনো লঙ্কা ভাজা দিয়ে মুড়ি মেখে ডাক দেয় "দাদু, আয় দাওয়ায় বসে দুটো জলখাবার খেয়ে নে।" 
বেতের মাথাল মাথায় চাপিয়ে উঠোনে ছপাৎ শব্দে লাফিয়ে ঢোকে কানাই "কালীদাদা ডেকেছিলে?" 

সেকশন ইনচার্জ  কালীচরণের চিঠির ফটোকপি নিজের কাছে রাখেন। তারপর বলেন যে ডিপার্টমেন্টের জন্য নিয়োগপত্র পেয়েছেন সেখানে আপাতত কোনো নিয়োগই সম্ভব না। বিকাশবাবু যে... যাগগে, বাড়ি যান। আমি দেখি চিঠিখানা ওপরতলায় পাঠিয়ে দিই। যেমন অর্ডার আসবে তেমন আপনাকে জানিয়ে দেব।
ভ্যাংচার সাথে গিয়ে সামসুলের সাথে আলাপ করে কালীচরণ। বলে ওর  গাঁয়ের কানাই, ভূপতি, বেজো আর লখার কথা। ওরা পাঁচজন আর সামসুল, এতজনে মিলে আরও পাঁচটা ভ্যাংচার মত বাচ্চাকে সরিয়ে আনতে পারবে না শুকনো নেশার মারাত্মক কবল থেকে?  
সামসুল প্রথমে দোনামনা করে কিন্তু শেষে বুঝি কালীচরণের প্রত্যয়ের কাছে হার মানে।
মাঝের এক বুধবারে কালীচরণ দেখে মা চিঠিটা আবার ফ্রেমের মধ্যে ফেরত পাঠিয়েছে। ফ্রেমের ধার ঘেঁষে কাঁচা চন্দনের ফোঁটা। জিজ্ঞাসা করে জানা যায়  বুধবারের কোনো আলাদা ঠাকুরের পট ছিল না আসনে। অতএব ওই দিনটাই ধার্য্য হল বার্তামঙ্গল পুজোর দিন হিসেবে। মা হাসিমুখে দুটো নকুলদানা সামনের প্লেটে রেখে গড় করে। সরশুনা থেকে খবর এসেছে ছোটকাকাদের বাড়িওয়ালা একতলাটা বিক্রি করতে চান।  টাকাপয়সা যোগাড় হলে ছোটকাকাই তিন চার কিস্তিতে ওই অংশটা কিনে নিতে পারে। 

আজকাল কালীচরণ আর রোজ অফিসে ঢুঁ মারে না। ইনচার্জ বলেছেন এই ইলেকশনের ডামাডোলে কোনো কাজই হচ্ছে না বাপু। খবর এলে তোমাকে আমি নিজেই ফোন করে জানিয়ে দেব। মোবাইলের নাম্বারটা রেখে যাও বরং।
তবে অফিসে ঢুকতে হয় না বলেই কালীচরণ আর কানাই দলবল নিয়ে যে চারটি  ছেলেকে তুলে এনেছে  তাদের পড়াতে বসায় সামসুলের দোকানের পিছনের ঝুপড়িতে। সামসুলের দোকানে তো এতগুলো ছেলের কাজ হবে না তবে পড়াশুনো একটু শিখলে সামসুল  ওর চেনাশোনা জায়গায় ওদের কাজের বন্দোবস্ত করে দেবে বলা আছে।  
মা আর ঠাকুমা রোজই বলে তুই বার্তামঙ্গলের সামনে একটু মাথা ঠেকা, বল এবার যেন তাড়াতাড়ি কোনো একটা ভাল দপ্তরে নিয়োগের বন্দোবস্ত হয়ে যায়। 
বার বার শুনে কালী সত্যিই স্নান করে ঠাকুরের আসনের সামনে এসে বসে তারপর মাথা নিচু করে বিড়বিড় করে "আর কটা দিন দাও। ছেলেগুলো সবে যোগ শিখতে শুরু করেছে..."
পরের দিন দেখা যায়  সেকশন ইনচার্জ তন্নতন্ন করে ড্রয়ার হাতড়াচ্ছেন। আদিবাবুকেও  তলব করেন "আচ্ছা ওই ছেলেটি, ওই যে হেলেকালী ওর ফোন নাম্বারটা কি দিয়েছে আপনাকে? একটা অস্থায়ী নিয়োগের অর্ডার এসেছে ছেলেটার... কোথায় যে গেল নাম্বারটা! বলেছিলাম খবর দিয়ে দেব! এখন যদ্দিন না আসছে... তদ্দিনে যদি আবার হুকুম পালটে যায়..."

দিন পনেরো পরে সামসুল হাসিমুখে চা এগিয়ে দেয় কালীচরণের দিকে। কর্কশ গলাটাকে যতটা পারে নরম করে খবরটা দেয় "চারটেরই হিল্লে হয়েছে। প্লাস্টিকের চুড়ির কারখানায় কাজ।" ছেলেগুলোও খুব খুশি। বসে বসে পড়াশুনোতে ওদের মন বসে না। তায় শুকনো নেশা কাটাতে সামসুলের দাওয়াইও বড় কড়া। সামসুল নিচু গলায় বলে এই জন্যেই চুড়ির কারখানায় পাঠাচ্ছি। আটকে থাকবে। আর মাইনেও হাতে পাবে না। আমার কাছে জমা হবে। পেটভাতায় থাকবে। নেশা করার সুযোগ না পেলে কেটে যাবে নেশা।
মেনে নেয় কালীচরণ। এসবের কোনো ধারণা তো ওর আগে ছিলই না। নেহাত এই সরকারি চাকরির ডামাডোলে ভ্যাংচার সাথে আলাপ আর সেই থেকেই এই সব। কাল থেকে আবার বেকার বাড়িতে  বসে থাকা যদ্দিন না কোনো খবর হয় - ভাবতে ভাবতে পায়ে পায়ে কখন বুঝি ওই হা দুয়োর দে দুয়োরের বিরাট বাড়িটাতেই ঢুকে পড়েছিল আবার। আর ঢুকেই যখন পড়েছে তখন একবার খোঁজ নিলেই হয়, এই ভেবেই ওপরে ওঠা।

"এই যে কালীচরণ জানা, উফহ, তোমার ফোন নাম্বার খুঁজে খুঁজে হয়রান আজ দু সপ্তাহ হল। কোথায় ছিলে?" সেকশন ইনচার্জ নিজের ভুল ঢাকতে কালীচরণের ঘাড়েই দোষ চাপান।
কালীচরণও হাসি মুখেই দোষটুকু মেনে নেয়।
বাড়ি ফিরে সুখবরটা দেওয়ার আগেই মা প্লেটে করে সুজির হালুয়াটা সামনে ধরে - খেয়ে নে খোকা, বার্তামঙ্গলের প্রসাদ। 

ফেসবুক মন্তব্য