পরমা

বর্ণালী মুখোপাধ্যায়



আসলে, আমার গন্তব্য ছিল অন্য। আসলে, আমি কোন অন্য গদ্যময়তায় ডুবে ছিলাম। আসলে, আমরা সকলে-- আমি,পড়শী জেসিন্থা, ঝগড়ুটে পার্শী বুড়িটা আর ঐ ধূর্তচোখ- অশালীন লোক-- সিকিউরিটির নীল পোষাকে, আমরা সে সময় যে যার তন্ময়তায় ডুবে ছিলাম। শীতের বেলা গড়িয়ে এলে ব্রহ্মাণ্ড জুড়ে কেবলই শুকনো ধুলো ওড়ে। ধুলোতে মলিন হয় ফ্র্যাঞ্জিপ্যানির বড় বড় পাতারা।

যখন স্কুলে যেতাম, আমাদের স্কুলের বড় গেটের পাশে সে এক মস্ত বাগান ছিল ঐ গাছের। মশগুল হয়ে দেখতাম, পতঝর এলে গাছগুলি কেমন ভিখিরি হয়ে যায়। নিঃশেষ গাছদের সঞ্চারিত শাখা প্রশাখায় তারপর আবার একদিন ফুল ফুল কেবল ফুল, তাকে ডাকতাম কাঠগোলাপ।

যে আস্তানায় কাঠকুঠো দিয়ে নিশ্চিন্তির ধূনি জ্বালিয়ে গুছিয়ে বসেছিলাম এ যাবৎ, ভেবেছিলাম কোনদিন তল্পিতল্পা গুটোতে হবে না, এখানেই, এই নিখাদ অরণ্য সবুজেই কাটাবো এক অখণ্ড চেতনার কাল---সেখানেও সাদা আর লাল ফুলে ভরা দুটি মস্ত গাছ ছিল। নিষ্পত্র, শাখাময়। এদিকে অমিত ফুল। আমি ডাকতাম গুলঞ্চ।

আদতে এ সকল গাছের গল্পও আজ লেখার ছিল না। রাত্রির রঙ যেমন নীল, গোধূলি নামার আগে হলুদ আর ধূলিকণা মিশে সে রঙ গেরুয়া হতেই হবে, সকলেরই জানা, এমন নির্দিষ্ট কোন লক্ষ্য, বস্তুতঃ ছিল না এ লেখায়। তবু কঙ্কাল গাছে বসে ঠিক সেই সময় তীব্র ডেকে উঠেছে অসময়ের কোকিল!

অনেক নিচে শৌখিন লনে স্প্রিঙ্কলারটা বনবন করে ঘুরছিল। জাভেরিদের পোষা ম্যাকওটা একবার প্রবল ডানা ঝাপটিয়ে অচানক ছত্রাকার করছিল নৈঃশব্দ। সালোনির বারোতলার ওপেন টেরেসের ওপ্রান্তে একক পাহাড়। ডুবন্ত সূর্য। এদিকটা পশ্চিম। কেমন ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া হাওয়া এসে, এই সময় সালোনির গোপন ক্ষত উপশম করে। কাপড় তোলার বাহানায় সে নিজের কাছে দাঁড়ায় তখন। সেভাবে দাঁড়িয়েই আজ সে দেখলো পশ্চিম বারান্দার পাশ দিয়ে ভাসমান সেই মেয়ে। একটি ক্ষণের ও ভগ্নদশায় সে দেখার কোন লক্ষ্য ছিল না, আগে থেকে প্রস্তুতি ছিল না, নিয়ন্তা দেখাল শুধু, তাই দেখা। ঘুরতে ঘুরতে নামতে নামতে একটা ছেঁড়া চিঠির মতো মেয়েটি নিচে তলিয়ে যাচ্ছিলো। হাওয়াতে নাছোড় মুঠি বাড়িয়ে সে ডালপালা খুঁজছিল শেষবারের মতো!

একটা পতনের শব্দে মেয়ে এসে পড়লো পিছনের বাগানের মার্বেলের উপর। থরথর করে কাঁপলো তার শরীর, কোন যণ্ত্রনায়? যা সে শরীরে বোধ করলো অথবা যে যণ্ত্রনায় সে তেরোতলার উপর থেকে একটা অবাঞ্ছিত চিঠির মতো শরীরটাকে ফেলে দিল! নিজের হাতে নিজেকে! কতো যত্নে প্রসাধিত হাত, পা, নখ, চুল, চোখ, চোখের কাজল সব মিলিয়ে সে একজন মেয়ে। সকাল থেকে রাত অনন্তে ঝুঁকতে থাকলে যে মেয়ে ঘুমের ভিতরেও সকালের রুটিন সাজায়। নিজের হাতে ছেলেটাকে স্কুলভ্যানে তুলে টিফিন গুছিয়ে অফিসে রওনা দেবে যে মেয়ে, সে একদিন বেলাশেষে নিজেকে তেরোতলার বানজারা বারান্দা থেকে ভাসিয়ে দেয়!

যারা সেই পতন দেখেছে, কান পেতে শুনেছে একটিমাত্র অভিমানী চিৎকার, তারা গন্তব্য ভুলেছে। অ্যাম্বুলেন্স তীক্ষ্ণ ব‍্যস্ততায় ছুটে এলো, সিকিউরিটি অফিসার আর পুলিশে ছেয়ে গেল শীতের শৌখিন বাগান, সময়ের আগেই জ্বলে উঠলো সমস্ত আলো, যেন এই তৎপরতায় কেটে যাবে মুঠিভরা অন্ধকার! সিসিটিভিতে তন্ন তন্ন করে খোঁজা হতে লাগলো কেন সে মেয়ে মেঘের মতো ভাসিয়ে দিল নিজেকে, কেন অভিমানের বৃষ্টি হয়ে ঝরলো সেই শানবাঁধানো মেঝেতে, অথচ সবুজের অফুরান সঞ্চয় ছিল আশেপাশেই।

এ ভাবেই গন্তব্য না থাকলেও নিয়ন্তা তোমাকে দিয়ে সেই ঝাপসা শব্দগুলি লেখাবে এলোমেলো। তুমি বিভ্রান্ত হয়ে যাবে সেই সিদ্ধান্তে কেন সে পৌঁছলো ভেবে। বয়সের ভারে নিঃঝুম ফিরোজা পূনেওয়ালা একা কফি মাগটির দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ভাবছিল, লোনলিনেসের চেয়েও তাহলে বড় কোন ব্যথা আছে এই প্ল্যানেটের!

কুসুমশাহ ডালবাটি চুর্মার ডাব্বাটি কাস্টমারের জন্য রেডি করতে করতে খেয়াল করলো তার চোখে বারবার জল জমছে। সে চিৎকার শুনেছিল। সেই অচেনা মেয়েটির জন্য কুসুম কাঁদছিল। তার সক্ষম হাতদুটি বিকল হয়ে যাচ্ছিল আজ। প্রতি রাতে যে ভাবে তার যোনি যণ্ত্রনায় মুচড়ে ওঠে, বর ঘুমোলে যখন সে আর তার আত্মা গলা জড়াজড়ি কাঁদতে বসে বিয়ের এতোদিন পরেও, এক মুহূর্তের জন্য মনে হয় ভেসে যাওয়া বেশ তো সহজ! দশতলার ঐ কাচের দেওয়াল পেরিয়ে নিজেকে ছেড়ে দেওয়া যেতেই পারে, একটাই তো পা বাড়ানো! পাশের ঘরে ঠিক তখন ছেলেটা স্বপ্নে হাসে---কুসুম শিউরে উঠে হাত চালিয়ে ডাব্বা প্যাক করে।

কারা সব জটলা করে, কারা আজকের জন্য জুম্বা ক্লাস মুলতুবী রাখে, কাদের সান্ধ্যভ্রমণে বিষন্নতা জমা হয়।
সকলে জানতে চায় ভাসতে ভাসতে, নামতে নামতে, মুখ বুজে, শেষে তীব্র চিৎকারে সে কি বলে গেল! কোথায় থাকলো সেই ঝাপসা চিঠিখানা!

মাধুরী শর্মা, আইটি সেক্টর। সুইসাইড করলো। গাড়ির চাবি আর মোবাইল ফোন রেফুইজ এরিয়ায় রাখা। কোন সুইসাইড নোট পাওয়া যায় নি। সে যে এ সোসাইটির কেউ নয়, তা কনফার্মড। আত্মীয়দের ঠিকানাটা পুলিশ খুঁজছে।

ফেসবুক মন্তব্য