কমিউনিকেশন

অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়



এই ছুটির মরশুম এলে সস্তার এয়ারলাইনগুলোর মনে হয় হিস্টিরিয়া হয়ে যায়।

আমি এবং আমার ব্যাগেজ এক সাথে গন্তব্যে পৌঁছবো কি না কোনো ঠিক নেই।

তাছাড়া পাঁচপেঁচি ভিড়ে ছুটিখোর জনতা আর কেজো লোকের পরস্পর বিরুদ্ধ প্রায়োরিটিতে পুরো টার্মিনালে একটা ফুল কাঁওতালির পরিবেশ। একজন সেল্ফি তুলতে এমন মগ্ন যে একটা সেল্ফ-চেক-ইন কিওস্ককে রাহুর মত গ্রাস করে দাঁড়িয়ে আছেন, সেটা অন্যজন তাঁকে বিড়বিড় করে জানাতে গেলে তিনি আবার গলা তুলে বলছেন, অ্যাঁ, কি বললেন মোহাই!

তাছাড়া বুকিং-টুকিং মারো গোলি। আগে থেকে চেক ইন করে না রাখলে এয়ারপোর্টে পৌঁছে "আর সীট নেই।" জাতীয় পোকার ফেস প্রত্যাখ্যান তো খুব হয়। যা আজ আমারও হল। তারপর যা হয়, বাদানুবাদ, পয়সা-ফেরত-নাও টাইপ শরীরী ভাষা, আমার নাছোড় মনোভাব, ম্যানেজার কল, আরেকপ্রস্থ তর্ক-পঞ্চাননগিরি, শেষে মনে হয় আমি আমার জরুরী প্রয়োজনটা বোঝাতে সক্ষম হলাম।

ডিউটি ম্যানেজার পরের ফ্লাইটে, মানে তিন ঘন্টা পরে, আমায় একটা বন্দোবস্ত করে দিলেন, আর বললেন, এটা কিন্ত মিডল সিট স্যার, আইল বা জানালা স্রেফ হবে না।

আমি আবার শুরু করবো কি না ভাবছি, ইনি আমার হাতে একটা লাউঞ্জ কার্ড ধরিয়ে দিয়ে মিষ্টি হেসে বললেন, তিন ঘন্টা সময় আছে স্যার, ঘুমিয়ে নিন।

হাসির আড়ালে আড়ালে ঠিক বুঝিয়ে দিলেন, আমাদের সস্তাগন্ডার এয়ারলাইনের পক্ষে যা খাতিরদারী করা সম্ভব করা হয়েছে। নিলে নাও, নইলে রাস্তা মাপো। খুব এফেক্টিভ কমিউনিকেশন।

লাউঞ্জটা বেশ ছোট, গরীব রাজ্যের সাদামাটা বিমানবন্দরে যেমন হয়। গোটা পাঁচসাত লাউঞ্জ সোফা, কয়েকটা কফি টেবল। দুজন অল্পবয়সী ছোকরা মিলে আবছা আলোয় রিসেপশনে দাঁড়িয়ে কি যেন ফিসফিস করছে। কি আর করবে, মারবার মত মাছি-টাছিও দেখা যাচ্ছে না।

সারা লাউঞ্জে আমি ছাড়া আর মাত্র একটি গেস্ট... চব্বিশে ডিসেম্বরের সন্ধ্যায় কে-ই বা মূর্খের মতন ঘর ছেড়ে ধ্যাদ্ধারে গোবিন্দপুরের লাউঞ্জে বসে থাকতে চায়! কেবল উল্টোদিকের একটা সোফায় তিনি আধশোয়া অবস্থায় দুইহাতে ট্যাব ধরে ঝড়ের বেগে টাইপ করে চলেছেন। আন্দাজ করলুম, সোশ্যাল মিডীয়া হবে। সম্ভবত টিনেজার।

বান্ধবীকে তোয়াজে রাখার আপ্রাণ চেষ্টাই হবে, এই ভেবে নিজের মনেই হাসতে যাবো, এমন সময় নৈঃশব্দ খানখান করে তিনি এমন "ইয়োওওওওওওওওওঃ" বলে আড়মোড়া ভাঙলেন যে কাউন্টারে দুটি ছেলেই সশব্যস্তে তাঁর দিকে দৌড়ল। আমি ততক্ষণে সেই বিশিষ্ট আড়মোড়ার স্টাইল দেখে চিনে ফেললাম, আরে! এ তো আমাদের বিজু!




কিন্তু সে তো থাকে দিল্লীতে, আজকের সন্ধ্যায় সে যে এই শহরে যে ঘাপটি মেরে বসে আছে, এটা আবিষ্কার করে দিল একদম গার্ডেন গার্ডেন হো গয়া। আমি হোয়াটস আপ গ্রুপে লিখলাম, বিজু, তুই বড়দিনের সন্ধ্যায় এই শহরে কি মনে করে?

মিনিট দশেক কেটে গেল। আমি উত্তেজনায় ছটফট করছি। কোনো উত্তর নেই। এমন কি, ও যে মেসেজটা দেখেছে, সেটাও মনে হচ্ছে না, রাইট চিহ্নজোড়া নীল হয়ে উঠল না তো! তবে কি ও বিজু নয়? নাকি নোটিফিকেশন অফ করা আছে?

কিন্তু ওরকম বিকট আড়মোড়া ভাঙা মানুষের জুড়ি কি আর ভূভারতে আছে? পাশের ঘরে চিঠি লিখতে লিখতে রাত-বিরেতে এরকম শব্দ করে আড়মোড়া ভাঙলে, অমিত ঘুম ভেঙে উঠে বসত, আর গিয়ে হুমকি দিত, চিঠি লিখছিস লেখ, কিন্ত তা বলে এরকম চ্যাঁচালে কিন্তু মাটিতে পুঁতে দেব, শালা!

অগত্যা গুটি-গুটি উঠলাম। সেই গেস্ট ততক্ষণে আবার মন দিয়েছেন ট্যাবে। দুইহাতে ধরে ঝড়ের গতিতে টাইপ করে চলেছেন। আমি গিয়ে দাঁড়াতে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে মুখ তুললেন। আর কোনো সন্দেহ রইল না, এ আমাদের বিজু-ই বটে। জিজ্ঞেস করে জানলাম, সে দিল্লীর ফ্লাইটের অপেক্ষায় আছে, কাজেই আরো ঘন্টা দুয়েক তাকে কাটাতে হবে এখানে। আমাদের বন্ধুবর্গের আজকাল একটা রীতি হয়েছে, কোথাও দেখা হয়ে গেলেই একটি সেল্ফি (বা ডুলফি?) পোস্ট করার। সেসব চুকানো গেল।




আমাদের কলেজের রিচার্ডসন হলের তিনতলার পাশাপাশি দুটো ঘরে আমি আর বিজু ছিলাম দুবছর। সে বিশ বচ্ছর আগের কথা, মাঝখানের দশবারো বছর যোগাযোগ না থাকলেও এই ইলেকট্রনিক মিডিয়ার যুগে সব হাতের মুঠোয় এসে গিয়েছে। আক্ষরিক অর্থেই, কারণ আমার মুঠোফোনেই তার নম্বর আছে। সেখানেই জেনেছিলাম, সে এখন ইলেকট্রনিক্স ছেড়ে নাকি মিডীয়ায় আছে। তবে কী যে করে, ঠিক স্পষ্ট কোথাও লিখেছিল বলে মনে পড়ে না, অথচ মাঝেমাঝেই সে বেশ বড়বড় মানুষের সাথে ছবি শেয়ার করে আমাদের ব্যচের হোয়াটস এপ গ্রুপে, তার নিজস্ব রসের টীপ্পনীসহ। তার সেসব লেখা পড়ি আর একলাই কুলকুল করে হাসি। এ গুণ তো তার কলেজ-জীবন থেকেই ছিল। আরো একটা ব্যপার ছিল, আর কেউ না জানুক, আমি বা আমাদের মত সীমিত কয়েকজন যারা একসময় ঘনিষ্ঠ ছিলাম, তারাই জানি। কিন্তু আমি নিজে সেসব বড় একটা লিখে উঠতে পারি না। কলেজের ভাষায়, বিশুদ্ধ ল্যাদ। ফোন তুলে একবার যে কথা বলে নেব, তাও করা হয়ে ওঠে নি এতদিন।

তখন কতদিন রাত একটা-দেড়টায় শুতে যাওয়ার আগে বাথরুম ঘুরে আসার পথে দেখতাম বিজুর ঘরে টেবল ল্যাম্পের আলো। নিশ্চয় বিজু চিঠির উত্তর লিখছে। পায়ের নিচে পাপোষের ওপর বেড়ালটা বসে থাবা চেটে চেটে পরিষ্কার করে রাখছে। পরিষ্কার বাতিক আছে মালটার। ফাস্টিডিয়াস, বলেছিল অমিত। অমিতের ইশকুল ছিল লা মার্টস। এসব শব্দ তারই ঝুলি থেকে বেরয়। তা বিজুও খুব ফাস্টিডিয়াস, চিঠির ভাষা পছন্দ না হলে বারবার কাটত আর রবি ঠাকুরের মত নকশা করত। তার কিছুকিছু একদম গা শিরশির করা। অদ্ভুত সব মুখ, মুখোশের মত, প্রাগৈতিহাসিক দানোর মত... তা, ভাগ্যিস ওগুলো খসড়া। মুসাবিদা সম্পূর্ণ হলে, বিজু আবার ইনল্যান্ড লেটারে মুক্তোর মত অক্ষরে সেই চিঠি কপি করতো। সব শেষে "আজ এটুকুই, আবার দেখা হবে ইতি " লিখে, আবার একেকবার একেকটা নাম লিখতো, যেগুলোর একটাও ওর না। একদম আগমার্কা, বিশুদ্ধ একশো শতাংশ সত্য, ওই চিঠিগুলোর একটাও ওর নামে আসে নি।

আমাদের কলেজের মেস সেকশনের সামনে একটা বড় টেবলে পড়ে থাকতো অনাথ চিঠির দল, পোষ্টকার্ড, ইনল্যান্ড, লেফাফা... যাদের গায়ে অসম্পূর্ণ নাম ঠিকানা থাকায় তার আসল প্রাপককে কোনোদিন সনাক্ত করা যেত না।

তার অনেকগুলিই প্রেমের চিঠি... কোথায় কোন ছেলে পিকনিকে গিয়ে বন্ধুত্ব পাতিয়ে বড় বড় স্বপ্ন দেখিয়ে সরে গিয়েছে চিরজীবনের জন্য... যাকে উদ্দেশ্য করে লেখা সে নামের কাউকে কলেজে চেনা যাচ্ছে না... মেয়েটির সেই ভীরু আকুতিভরা চিঠি শীতের বিষণ্ণ বেলায় একলা পড়ে আছে দেখলে বিজু তাকে ঘরে তুলে নিয়ে যেত। যেমন বেড়ালের ছানাটাকে ডাস্টবিনের সামনে থেকে তুলে নিয়ে এসে হোস্টেলের ঘরে পুষেছিল...

তারপর দিনের কাজ শেষ করে সে চিঠি নিয়ে বসত। অনেক যত্ন করে শাদা পাতায় শুরু করত, প্রিয়তমাসু... তোমার কথা ভুলে যাওয়া কি সম্ভব? আসলে ইঞ্জীনিয়ারিঙের পড়া, চাপ বেড়ে গিয়েছে, আশা করি তুমি বুঝবে... ইত্যাদি প্রভৃতি।

ভাগ্যিস খুব বেশি ছেলে এই ব্যপারটা জানতো না, তা হলে বিজুর ঘরের সামনে অন্যের প্রেমপত্র পড়বার জন্য লাইন পড়ে যেত।




বিজু নাকি এখন একজন পুরো দস্তুর সাংবাদিক, যাকে বলে "পত্রকার"। যে পত্রিকা গ্রুপটার নাম বলল, তাদের ইংরাজি ও হিন্দি দুই ভাষাতেই দৈনিক কাগজ আছে। তার একটিই ছেলে, সে লন্ডন স্কুল অভ ইকোনমিক্সে পড়াশুনা করতে গিয়েছে সদ্য। গিন্নি আপাতত বাপের বাড়ি। এখানেই। ও ফিরে যাচ্ছে দিল্লী।

তাহলে আজকের এই বিশিষ্ট শীত সন্ধ্যায় শ্বশুরালয়ের উষ্ণ আপ্যায়ন অগ্রাহ্য করে এই লাউঞ্জে পচে মরবার কারণ কি? কে জানে বাবা, বলার হলে ও নিজেই বলবে।

-বিজু, তোর সেই চিঠি লেখার কথা মনে আছে? অন্যের প্রেমপত্র লিখে দেওয়া? সেই যে- "প্রিয়তম xxx, সেই যে পিকনিকের সময় নদির ধারে গড প্রমিস দেখা হবে বলেছিলে সে কি শুধুই মিথ্যা প্রতিশ্রুতি? আমি তারপরে অন্তত দুবার অনেক কষ্ট করে বটানিক গার্ডেনে গিয়েছি... তোমার দেখা পাই নি... এ জিবন নিয়া কি করিব?"

বিজু একদৃষ্টে আমার দিকে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ, তারপর সাথের ব্যাগটার ফোল্ড থেকে একটা ম্যাগাজিন বের করে একটা পাতা বের করে আমার দিকে বাড়িয়ে ধরল, এই দ্যাখ।

আমি আমার টুটাফুটা হিন্দি জ্ঞান নিয়ে একটু ধরে ধরে পড়বার চেষ্টা করলাম। অপনি বাতেঁ, নিজে লেখা দেবপ্রসাদ রায়, বিজুর ভাল নাম। তারপর প্রশ্নোত্তর। ও হরি! এ তো সেই কলেজের হোস্টেলে দেখা চিঠির উত্তর দেবার মতই ব্যপার। অ্যাগোনি আঙ্কল? না বহুরূপী প্রেমিক?

মনে পড়ে বিজু উত্তর লিখেছিল, "জীবন কি এতই ছোট যে এক আমি একটু সরে গেলে তা অর্থহীন হয়ে পড়বে... তাছাড়া আমি তো কোথাও যাই নি, শুধু লেখাপড়া নিয়ে একটু ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। তুমিও লেখাপড়ায় মন দাও, আমি ঠিক একদিন এসে দাঁড়াবো তোমার সামনে, গড প্রমিস।"

অমিত সালকিয়ার সেই বালিকার কাঁচা হাতের লেখায় করুণ আকুতি, আর বিজুর মুক্তোর মত গোটাগোটা অক্ষরে তার জবাব পড়ে হেসে লুটোপুটি খাচ্ছিল।

-এ তো রীতিমত কাউনসেলিং রে শালা, তোর লেখা পড়ে তো মরা মানুষও জেগে উঠে বসবে, করেছিস কি!

কোলে বেড়ালটাকে নিয়ে চটকাতে চটকাতে বিজু আমাদের দেখছিল, তা কি করলে ভাল হত? সোজা মেয়েটাকে লিখে দিতাম, তোর কলির কেষ্ট ভেগে গেছে? ভুয়ো নাম ঠিকানা দিয়ে? এবার গঙ্গা ছাড়া তোর আর গতি নেই?

সেটা যে ভাল হত না এনিয়ে আর কথা কিসের! কিন্ত এই মিথ্যা আশ্বাসটাও যে খুব কাজের কিছু নয়, সেকথা বিজুকে বলি কী করে?

বললাম, কিন্তু তুই ইলেকট্রনিক্স-টেলিকমি িকেশন ছেড়ে এসব কী আরম্ভ করেছিস বল দিকিনি!

বিজু বলল- আরে আমি তো শুধু ইলেকট্রনিক্স ছেড়েছি। কমিউনিকেশন ছাড়ি নি। এই সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে একজন অপরিচিত মানুষের থেকে লাইক পাওয়ার চেয়ে কোনো পরিচিত রক্তমাংসের মানুষের স্পর্শলাভ করা যে কত শক্ত, তা কি বুঝতে পারিস না?

কথার জাহাজ একখানা, আমি হাল ছেড়ে দিয়ে বললাম, কিন্তু তুই নাকি সাংবাদিক, একে কি সাংবাদিকতা বলে?

-আমি করেসপন্ডেন্ট। খবর থাকলে স্টোরি করা আমার কাজ। কিন্তু পত্রিকাটায় এই কলামটা এখন দারুণ পপুলার সেটা জানিস? পাঁচবছর আগে জায়গা ভরবাব জন্য এটা শুরু হয়েছিল, এখন পুরো পাতা আমার কলামের জন্য বরাদ্দ। হিন্দিতে তো বটেই, উর্দুতেও লিখে প্রশ্ন পাঠায় ছেলেমেয়েরা। চোদ্দ পনেরো থেকে উনিশ-কুড়ি। যদিও পড়ে সারমর্ম লিখে দেওয়ার লোক আছে, তবুও তাদের লেখা বুঝবার জন্য আমি টিউটর রেখে আলিফ-লাম-মীম শিখবার চেষ্টা করে যাচ্ছি। চিঠি ডাকেও আসে, ইমেইলেও। চিন্তা কর এমন একটা সময়, যখন মা-বাপেরা ছেলেমেয়েদের দামী দামী ফোন কিনে দিচ্ছে, কিন্তু তাদের জন্য একটু সময় দিতে পারছে না। ভালবাসতে চেয়ে, ভাল থাকতে চেয়ে দাগা খেয়ে ছেলেমেয়েগুলো কার দিকে তাকাবে সান্ত্বনার জন্য? কি নেই জানিস? একটু চোখে চোখ রেখে তাকানো, একটু কমিউনিকেশন!

-বাজে বকিস না বিজু, কাগজের কি চোখ থাকে? না তুই বাড়ি বাড়ি গিয়ে সবাইকে জড়িয়ে ধরিস? তাছাড়া এরকম করলে তোর বউ-বাচ্চা তোকে ছেড়ে কথা বলবে?!

বিজু চোখগুলো একটু অপ্রকৃতিস্থ লাগছিল, কাচের চোখের মত, যেন দেখেও দেখেনা।

-ঠিক, খানিকটা সমস্যা হয়েছে। আমার অফিসের মেইলবক্স ভরে যাচ্ছে ক্রমাগত। ডাকে পাঠানো চিঠির পাহাড় তো আছেই। যা আসছে , তার অতি অল্পই ছাপা হচ্ছে। সীমা রেগে যাচ্ছে খুব। কাগজটা দেখলেই। বলছে, কোনটা আসল আমি, সেটা গুলিয়ে যাচ্ছে।

-সে কি ওর দোষ? তুই নিজেই মনে করে দেখ, যেরকম চিঠি ,তার সেরকম জবাব তুই লিখিস কি না! বাংলা অনার্স হলে একরকম, আবার গ্রামের সাদাসিধে মেয়ে হলে আরেকরকম। সেসব পড়ে, কোনটা আসল বিজু, আমাদেরও তো মাঝেমাঝে গুলিয়ে যেত । তাও বন্ধুরা মেনে নিতে পারে, স্ত্রীর পক্ষে সেটা তো খুব চাপের।

-হয়তো তাই, আমাকে বলছে অন্য কোথাও চাকরি নিতে, আর তা না করলে অন্তত এই কলাম বন্ধ করতে। আমাদের চীফ এডিটরকে বলেছিলাম, এটা বন্ধ করতে, তা তিনি বললেন, কেয়া আপ ক্যাশ রেজিস্টার কো ঠপ কর দেনা চাহতে হ্যাঁয়? আমি তখন বলেছিলাম, তাহলে এটা কিছুদিন না হয় অন্য কেউ হ্যান্ডল করুক। কিন্তু তাতেও কেউ রাজি হচ্ছে না ।

-তাতে তোর কি! তুই জব চেঞ্জ কর। করেসপন্ডেন্ট হয়ে যা অন্য কোনো গ্রুপে... তোর লেভেলে ঠিক পেয়ে যাবি কিছু।

-আমি সীমাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এসেছিলাম, তা ওর এক কথা, যতক্ষণ না ওর সতীন দূর হচ্ছে, ও আর ফিরবে না। কী যে করি!

চুপ করে গেলাম, দুজন মানুষের পরস্পরবিরোধী স্বাধীন ইচ্ছার সংঘাতে আমাদের সত্যিই কী করার আছে। ইতিমধ্যে ওর ফ্লাইটের বোর্ডিং কল এসে গেল। অনিচ্ছুক পা জোড়া টানতে টানতে বিজু চলে গেল।

বসে থাকতে থাকতে আমার মনে হল, আচ্ছা, বিজু যদি নিজের স্ত্রীকে গুছিয়ে একটা চিঠি লিখত, যেমন ও লিখে এসেছে সারা জীবন। কথায় যা ঘটে ওঠেনি, হয় তো লেখায় সেই সেতু গড়ে উঠবে।

যে অন্যের প্রেমাস্পদের মনোভাব আন্দাজ করে পরিস্থিতি অনুযায়ী সদুপদেশ দিয়ে এসেছে বরাবর, সে কি নিজের স্ত্রীকে এই সরল সত্যটা বুঝিয়ে উঠতে পারবে না যে মনোবিদরা যেমন রোগীর সহায়তা করেন পেশাদারি দক্ষতায় অথচ রোগির ব্যক্তিগত জীবনের অংশ হয়ে না পড়ার মত দূরত্ব বজায় রাখেন, ঠিক তেমনিই পেশাদারিত্বের সাথে বিজুও তার জনপ্রিয় কলাম চালিয়ে যাচ্ছে? হয়ত, চিঠির দ্বারাই বিজুর পক্ষে এফেক্টিভ কমিউনিকেশন করা সম্ভব হবে, হলই বা সীমা তার বিবাহিতা স্ত্রী। সবসময় সব কথা মুখে তো গুছিয়ে বলে ওঠা যায় না।

নাকি সীমা সত্যিই টের পেয়েছ প্রতিটা চিঠির সঙ্গে সঙ্গে বিজুও বদলে যাচ্ছে একটু একটু করে, পদার্থবিদ্যার নিয়মে ভরবেগ যেভাবে সঞ্চারিত হয়ে যায় দুটি চলমান বস্তুর সংঘাত-সংক্রমণে? না কি সে বুঝেছে আসলে এক বিজুর মধ্যে অনেকগুলো বিজুর সঙ্গে তার এতদিনের গেরস্তালি... তার কিছু সেই কাটাকুটি, মুখোশ, দানো... আবার কিছু একদম ঈশ্বরের মুখশ্রীর মত। এই সম্ভাবনাটার কথা ভেবে আমার মেরুদণ্ড বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত চলে গেল।

ফেসবুক মন্তব্য