রসায়ন

অনিরুদ্ধ সেন

ট্যাক্সিটা বাড়ির সামনে থামল। জানালা দিয়ে অভিজিৎ দেখলেন, হাসিমুখে ওপরে তাকাতে তাকাতে নেমে এল দেব আর রশ্মি। তারপর উনি হাত নেড়ে অপেক্ষা করতে বলার আগেই মালপত্র নিয়ে চটপট লিফটের দিকে পা বাড়াল।
এই একটা গুণ ঐ বিদেশবাসী ছেলেমেয়েগুলির – তারা স্বাবলম্বী। এয়ারপোর্টে রিসিভ করতে যাওয়ার প্রস্তাব শুনে রশ্মি বলেছিল, “বাবা, তোমার মেয়ে এখন বড় হয়ে গেছে, সে এয়ারপোর্ট থেকে বাড়ি আসতে পারে। আর তুমি না সিনিয়র সিটিজেন হয়েছ? বয়েসটাকে এবার একটু মান্যি করে চলো।”
একটু পরই দুটিতে হৈ-হৈ করতে করতে ঢুকে পড়ল। এই দৃশ্য দেখার জন্য যেন অভিজিৎ ও সুমনা যুগ যুগ অপেক্ষা করে থাকতে পারেন। রশ্মি বা টুপুর তাঁদের গুণী মেয়ে, বিয়েও দিয়েছেন যোগ্য পাত্রের সঙ্গে। ছেলেটি শুধু কৃতী নয়, দরদী – যেটা নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে চলার সময় সংসারকে ধরে রাখতে অপরিহার্য গুণ।
বছর পাঁচেক বিদেশে থেকেও কিন্তু ওরা দেশের পরিস্থিতির সাথে এখনও চট করে মানিয়ে নিতে পারে। আমেরিকায় ওদের বাংলো বাড়ি, দুটো গাড়ি, বাথটব, ঘরে ঘরে এসি। অভিজিৎ বড়োজোর সচ্ছ্বল মধ্যবিত্ত, তার টু বি-এইচ-কে’র সংক্ষিপ্ত ফ্ল্যাট। তবু কেমন দুটিতে তার মধ্যেই বেশ হাসিমুখে মানিয়ে নিয়েছে। সুমনা বিব্রতভাবে আয়োজনের সীমাবদ্ধতার কথা তুলতে গেলেই মেয়ের আগে জামাই বলে উঠছে, “ছাড়ো তো মা, যেন আমরা কোনওকালেই এমন অবস্থায় ছিলাম না! আবার ক’বছর পর ইন্ডিয়ায় ফিরে এলেও তো এভাবেই থাকতে হবে। আসলে জানো, ওসব বড় বড় বাড়ি, গাড়ি কিছু নয় – আমরা মুখিয়ে থাকি দেশে এসে কদ্দিনে তোমাদের সাথে প্রাণ খুলে গল্প করব, তোমার হাতের রান্না খাব।”
তা, জামাইকে খাইয়ে সুখ আছে। সে যেমন চিংড়ি মাছের মালাইকারির ভক্ত, তেমন শাশুড়ির রান্না লাউচচ্চড়িও চেটেপুটে খায়। মেয়ে বরাবরই কম খাইয়ে, কিন্তু পছন্দ করে বাছা বাছা জিনিস। তারও কিন্তু মায়ের হাতের রান্নাই সবচেয়ে পছন্দ।
বয়েসের ফারাক সত্ত্বেও অভিজিতের সঙ্গে দেব আর রশ্মি দুজনেই চুটিয়ে গল্প করে। জামাই ম্যানেজমেন্টের আর মেয়ে আই-টির স্পেশালিস্ট। কিন্তু সিনেমা, সাহিত্য আর গানে ওদের খুব অনুরাগ। সপ্তাহান্তে প্রায়ই দুটিতে ঘরে বসে টিউবে সিনেমা দেখে, কখনও হলে যায়। শুধু ইংরেজি নয়, হিন্দি-বাংলা সিনেমাও। জামাইয়ের সাথে শ্বশুরের সেই নিয়ে আলোচনা চলে। অভিজিৎ নতুন ভালো বাংলা সিনেমা বেরোলে তার সন্ধান দেন। মেয়ের আবার ইংরেজি সাহিত্যে প্রবল অনুরাগ। তাই নিয়েও আলোচনা চলে – অরবিন্দ আডিগা থেকে অমিতাভ ঘোষ, অনিতা দেশাই অবধি। সব মিলিয়ে কখনও মনে হয় না ওরা কোনও দূর গ্রহের প্রাণী, ফর্মাল ভিজিট দিতে এসে অস্বস্তিকর ভদ্রতার বেড়াজালে আটকে পড়েছে।

কিন্তু স্বামী-স্ত্রী তার থেকেও স্বস্তি পান ওদের দুটির খুনসুটি দেখে। মেয়েকে ওঁরা সুপাত্রের হাতে দিয়েছেন, সন্দেহ নেই। দেব জুয়েল স্টুডেন্ট। স্বভাবচরিত্রেও সে দেবতুল্য, অতি বড় শত্রুও তার নিন্দা করতে পারবে না। তাঁদের মেয়েও ফ্যালনা নয়। কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে গোল্ড মেডেলিস্ট। একের পর এক কম্পানি থেকে অফার, যেখানে যায় সেখানেই কদর আর পদোন্নতি। বিয়ের পর কিছুদিন চেষ্টাচরিত্র করে নিজেই চাকরি নিয়ে আমেরিকা গেছে। আরও কিছুদিনের চেষ্টায় বরের সাথে একই শহরে পোস্টিং পেয়েছে। এসব করতে কিছুদিন লেগে গেছে দেখে এখনও ফ্যামিলি বাড়াবার বিষয়ে চিন্তা করে উঠতে পারেনি। তা, সেটা এ যুগে অস্বাভাবিক নয়। অনেক চাকুরে দম্পতিই এখন ক্যারিয়ারে একটু সেটল করে তবে বাচ্চাকাচ্চা আনার কথা ভাবে।
তবু এখনকার দিনে নিশ্চিন্ত হওয়া যায় না। ওরা দুজন শুধু ভালো স্কলার আর প্রফেশনালই নয়, মানুষ হিসেবেও খুব ভালো। কিন্তু আজকাল প্রত্যেক মানুষই যেন সমুদ্রে ভাসমান এক একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপ, যারা আপ্রাণ চেষ্টা করছে কাছাকাছি আসতে। কখনও পারছে, কখনও পারছে না। যেসব বৈবাহিক সম্পর্ক ভেঙে যায়, তার অনেক ক্ষেত্রেই পেছনে থাকে কুমন্ত্রণা, শঠতা, লাম্পট্য। কিন্তু এমন অনেক দম্পতিও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, যারা দুজনেই নিখুঁত ও নির্দোষ। শুধু তারা কিছুদিন পর যেন ঐ কোন অদৃশ্য স্রোতের টানে দূরে সরে গেছে, দু হাত বাড়িয়েও বিচ্ছেদ এড়াতে পারেনি।
সন্তান এত দূরে থাকলে বাপ-মা’র তার নিরাপত্তা সম্বন্ধে চিন্তা হওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু অভিজিৎ-সুমনা জানেন মেয়ের অসুখবিসুখ বা অন্য কোনও সমস্যা হলে দেব যা করার করবে আর প্রয়োজনে তাঁদেরও জানাবে। কখন ঝটকায় চলে যেতে হয়, এই আশঙ্কায় তাঁরা আমেরিকার ট্যুরিস্ট ভিসা করে রেখেছেন। ওরাও নিয়মিত ফোনে, স্কাইপে যোগাযোগ রাখে। তবু কখনও কোনও কারণে যদি মেয়ে ফোন না করে বা ফোনে তাকে ক্লান্ত বা বিষণ্ণ শোনায়, মনে নানা অশুভ চিন্তা উঁকি মারে। শরীর খারাপ, লুকোচ্ছে? নাকি তার চেয়েও খারাপ – ওদের মধ্যে কিছু হল?
এটা স্বামী-স্ত্রীর এক স্থায়ী দুশ্চিন্তা। অনেকবার ভেবেছেন যদি দুর্ভাগ্যক্রমে তেমন কিছু হয়ও, তা তো আর মৃত্যুর চেয়ে ভয়ঙ্কর নয়! এটা তো আজকাল আকছার হচ্ছে, মানুষ মানিয়ে নিয়ে আবার উঠেও দাঁড়াচ্ছে। কিন্তু তবু মন মানে না। বিবাহবিচ্ছিন্নদের মধ্যে অনেকেই দেখেছেন শেষ অবধি ভালো নেই, অভাব, রোগ বা ডিপ্রেশনের শিকার। ব্যক্তিমানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক কালের ধর্মে দুর্বল হয়েছে। কিন্তু কারুর ব্যক্তিগত বিপর্যয়ে সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দেবার জন্য দরদী সমাজই বা তৈরি হল কই? তাছাড়া মেয়ের মতো জামাইও ওঁদের অতি প্রিয়। ওদের কাউকেই হারাবার কথা ওঁরা ভাবতে পারেন না।
সুমনা মেয়ের সাথে অনেক খোলামেলা। শিষ্টাচারের মাথা খেয়ে মাঝে মাঝে সরাসরি জিগ্যেসও করে বসেন, “কী রে, কী লুকোচ্ছিস? তোদের মধ্যে আবার কিছু হয়নি তো?”
মেয়ে হেসে উড়িয়ে দেয়, “মা, তুমিও যেমন! কী আবার হবে?”
“না, তোর গলার স্বরটা ঠিক ঠেকছে না। গত সপ্তাহে ফোনও করিসনি।”
“আমাদের যে কী কাজের চাপ আর অফিস পলিটিকস, তুমি কী বুঝবে! করো তো স্কুলের চাকরি।”
“নে রাখ, অফিস পলিটিকস আমাকে দেখাস না! তবে হ্যাঁ, হাজার ঝামেলা থাকলেও আমাদের চাকরি পাকা। আর তোদের –”
“হায়ার অ্যান্ড ফায়ার! একটু পা পিছলোলেই চাকরি নট, ভিসা ক্যানসেল, অতএব স্বর্গ হইতে পতন। তাই মুড তো সবসময় এক রকম থাকে না। এ নিয়ে তোমরা যদি অকারণ টেনশন করো –”
ঠিক। তাছাড়া, পদে পদে টের পান যে ওদের একের অপরের প্রতি খুব দরদ। চাকরির টানে রশ্মিকে মাঝে মাঝেই বাইরে যেতে হয়। তবু ফিরে এসেই রান্নাঘরে ঢুকে পড়ে। মা’কে ফোন করে রেসিপি নিয়ে দেবের প্রিয় বাঙালি খাদ্য রেঁধে খাওয়ায়। দেবও বৌ ট্যুরে গেলে তাকে নিয়মিত এয়ারপোর্টে পিক আপ ও ড্রপ করে। খোঁজপত্র নিয়ে বৌয়ের পছন্দমতো বই, গানের ডিভিডি সারা তল্লাট চষে জোগাড় করে রাখে। সেদিক থেকে বাহ্যিক দৃষ্টিতে কোনও গণ্ডগোল নেই।
তবু স্বামী-স্ত্রী দুজনের মনের ভেতরে একটা অস্বস্তির কাঁটা খচখচ করে – কে জানে, তলায় তলায় কী দানা বাঁধছে! দূর থেকে তো বোঝা যায় না। শুধু ওরা কাছে এলেই দেখেশুনে নিশ্চিন্ত হওয়া যাবে। মেয়ের মুখের দিকে তাকালেই ঠিক বোঝা যাবে, ভেতরে ভেতরে কোনও চোরা স্রোত তাকে বিপর্যস্ত করছে কিনা।

তাই ওদের দেখে প্রৌঢ় দম্পতির সবচেয়ে বড় স্বস্তি – তাঁদের সমস্ত আশঙ্কাই অমূলক। ওদের মধ্যে সম্পর্ক এক কথায় বলতে গেলে – ঈর্ষণীয়। না, দেব আর রশ্মির ব্যবহারে সেটা জাহির করার বিন্দুমাত্র চেষ্টা নেই। ওদের শিক্ষা-সহবত তেমন নয়। বাইরে ভাব দেখায় যেন এ ওর সম্বন্ধে কত উদাসীন। কিন্তু একটু পরই সেই খোলস ছিঁড়ে বেরিয়ে পড়ে দুজনের প্রতি দুজনের আকুলতা আর উৎকণ্ঠা। রশ্মি চুপিচুপি সুমনাকে বলেছিল, দেব বেকড ভেজিটেবল খুব ভালোবাসে। সুমনা কিন্তু-কিন্তু করেছিলেন, ওসব সাহেবি ডিশে তাঁর তেমন এলেম নেই। শুনে মেয়ে মৃদু হেসে প্রথমে ঝাঁ করে বেরিয়ে পাড়ার দোকান থেকেই কীসব যেন কিনে এনেছে। তারপর কিচেনে ঢুকে নিপুণ দক্ষতায় কাটাকুটি থেকে শুরু করে যাবতীয় কাজ নিজেই সেরে জিনিসটা মাইক্রোওয়েভে চাপিয়েছে। স্বাদের সুযোগ এখনও না হলেও দৃশ্যে ও গন্ধে সুমনা সহজে অনুমান করতে পারছিলেন যে ব্যাপারটা (ওদের ভাষায়) দারুণ ‘য়াম্মি’ হবে।
তা, খবরটা কানে যেতেই দেব রান্নাঘরে চলে এসেছে। প্রতিবাদের ভঙ্গীতে বলেছে, “এখানে তোমার এসব তাল তোলার কী দরকার ছিল? ওসব খেয়ে খেয়ে তো মুখ পচে গেছে। কোথায় এখন ক’দিন মায়ের হাতের ফাটাফাটি সব ভেজ আইটেম খেয়ে জিভে তার করব, তা না! আর তোমার না কাল মাথা ধরেছিল? কিচেনে থাকলে সে ব্যাপারে সুবিধে হবে?”
নিজের রন্ধনকুশলতার তারিফে সুমনা গর্বিত হতে পারতেন। কিন্তু তিনি বোঝেন, এহ বাহ্য। আসলে বৌয়ের কষ্ট হচ্ছে দেখে জামাই ছুটে এসেছে। রশ্মিও অবশ্য ঝাঁঝিয়ে বলেছিল, “যাও যাও, অত আদিখ্যেতা করতে হবে না। তুমি জানো, প্লেনের এসিতে ডিহাইড্রেশনের জন্য আমার মাথা ধরে। ও আবার খাবার, জল খেলে ঠিক হয়ে যাবে।”
তারপর দুটিতে কিচিমিচি, ছদ্ম ঝগড়া। শেষে মেয়ে একটা ছল করে মা’কে বের করে দিল। একটু পর এসে দেখেন, জামাই ঝাঁপিয়ে পড়ে মেয়ের রান্নার বাসনগুলি মেজে দিচ্ছে।
এভাবেই দুটিতে সব সময় বকবকম। ভাবটা যেন কে তুমি, চিনি না। কিন্তু অভিজিৎ, সুমনার সঙ্গে বসে আড্ডা মারতে মারতেও প্রতি মুহূর্তে এ ওর দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছে ইশারার নয়নবাণ। ওঁরাই মাঝে মাঝে ছল করে উঠে যান, মেয়ে-জামাইকে যথাসম্ভব ‘প্রিভেসি’ দিয়ে। সাধারণত ওদের ঘরটা তাঁরা এড়িয়ে চলেন। কিন্তু একবার সুমনার কী একটা জিনিসের খুব দরকার হওয়ায় দরজা খোলা পেয়ে ঢুকে পড়েছিলেন। নক করতে ভুলে গিয়েছিলেন। দেখেন মেয়ে জামাইয়ের কোলে শুয়ে, দুজনে অপলকে এ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে। তাঁকে দেখেই অবশ্য ধড়মড়িয়ে উঠে পড়ল।
রাতে শুয়ে সুমনা তৃপ্তমনে বলছিলেন, “কত কষ্ট করে দুটিতে বিদেশ-বিভুঁইয়ে থেকে টাকা রোজগার করে। দুজনার রোজ দেখাও হয় না। তবু দ্যাখো, ওদের পরস্পরের প্রতি একটা অদ্ভুত টান। এই টানটাই শত অসুবিধার মধ্যেও ওদের সম্পর্কটাকে ঠিক ধরে রাখবে।”
“হ্যাঁ, একেই বোধহয় বলে কেমিস্ট্রি বা রসায়ন, যা বাইরের শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে দুটি ভিন্ন ভিন্ন পদার্থকে একত্র রাখে।” অভিজিৎ বললেন।

এত শান্তির মধ্যেও বাবা-মা’র মন ভার – আর দুটো মাত্র রাত, তারপর ওরা চলে যাবে। দেব মা-বাবার ছোটো ছেলে। তার বাবা তার ছেলেবেলাতেই মারা গেছেন, মা’ও চলে গেলেন বিয়ের বছর দুই পর। অভিজিৎ-সুমনাকেই সে এখন বাবা-মা মনে করে। বরাবরের মতো এবারও ওরা এয়ারপোর্ট থেকে সোজা এখানেই চলে এসেছে। এরপর ওদের আদি বাড়ি কল্যাণীতে গিয়ে দিন দুই থাকবে। দাদা, কাকা, পিসিদের সাথে দেখা করে আসবে। বোনেরাও ওখানেই এ দু’দিন জড়ো হবে। তারপর ফেরার পথে মাত্র একটা রাত এখানে থেকে পরদিন সকালের ফ্লাইট ধরবে।
সেই রাতটুকুর জন্যই অবশ্য কর্তা-গিন্নি এখন থেকে নানা প্রস্তুতি নেবেন। না, যাত্রার আগের দিন ওরা গুরুপাক কোনও খাবার খাবে না। কিন্তু সুমনা নানা রান্না সঙ্গে দিয়ে দেবেন আর কর্তৃপক্ষের নজর এড়িয়ে মেয়ে সেসব ঠিক আমেরিকায় পাচার করবে। সাথে থাকবে মশলা, ঘি, বড়ি, আরও নানা কলকাতার স্পেশালিটি, যা ওদেশে ইন্ডিয়ান স্টোরগুলিতেও সহজে মেলে না।
# # #
“আর মাত্র দুটো দিন। তারপর ছুটি শেষ, আবার যে যার চাকরির গ্রাইন্ডে ফিরে যাওয়া।” ওদের অস্টিনের বাড়িতে বসে বলছিল রশ্মি।
“হ্যাঁ টুপুর, এবারের ছুটিটা খুব ভালো কেটেছে।” উদাসভাবে বলল অভিজিৎ।
“মেনি থ্যাঙ্কস, দেব – তুমি আমার অনুরোধটা এত সুন্দরভাবে রেখেছ বলে।” রশ্মি ছলছল চোখে বলল, “এই হয়তো আমাদের শেষবার একত্রে দেশে যাওয়া। তাই আমি চাইনি অন্তত এবার বাবা-মা’র মনে কষ্ট দিই। মনে যাই থাক, তুমি আমার সাথে এমন সুন্দর ব্যবহার করেছ যে তাঁরা কোনও আঁচই পাননি। খুশিমনেই আমাদের বিদায় দিয়েছেন। এখন আমিও তোমায় কথা দিচ্ছি, মিউচুয়ালের ব্যাপারটায় আর আপত্তি করব না।”
রশ্মির দিকে অপলকে চেয়ে দেব বলল, “আমি কিন্তু মন যা চেয়েছে তাই করেছি, টুপুর। আগেই বলেছি আমি তোমাকে ভালোবাসি, ভবিষ্যতেও বাসব। তাই সেটা দেখাতে আমাকে কোনও ছলনা বা অভিনয় করতে হয় না। সত্যি বলতে, তোমাকে তো এখন এতদিন একটানা কাছে পাই না, তাই ছুটিটা আমার খুব ভালো কেটেছে। আর আমার ধারণা, তোমার ফিলিংটাও তাই।”
রশ্মি মুখ নিচু করে বলল, “কিন্তু ছাড়াছাড়ির প্রস্তাবটা তো তোমার।”
“ঠিক। কিছুদিন থেকেই আমি বুঝতে পারছিলাম, আমাদের নিজ নিজ উচ্চাশা ও তার সংঘাত আমাদের ভালোবাসার ভিতটাকে ক্রমে ক্ষইয়ে দিচ্ছে। কালক্রমে এই সুন্দর ভালোবাসার সম্পর্কটা হয়তো হয়ে দাঁড়াবে শুধু একটা সামাজিক দায়, বোঝা। তার আগেই –”
“আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ করমর্দন করে নিজের নিজের পথ দেখা বাঞ্ছনীয়, তাই তো? সরি দেব, সেই মুহূর্তে তোমার প্রস্তাবে একটা ধাক্কা খেয়েছিলাম। কিন্তু আজ ভেবে দেখলাম, তুমি যা বলেছ সব অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। তাই ঠিক করলাম, তোমার কথাই মেনে নেব।”
“কিন্তু টুপুর, আজ যে আমার মনেই একটা সংশয় জাগছে।”
“হঠাৎ?” রশ্মির ভ্রু কুঞ্চিত হল।
“জাগছে তোমার বাবা-মা’কে দেখে। আমি পিতৃমাতৃহীন, আমার কাছে ওঁদের বরাবরই শ্রদ্ধার আসন। কিন্তু এবার আর একটা জিনিস দেখে অভিভূত হলাম – সে হচ্ছে তাঁদের সুখী দাম্পত্য জীবন। পরস্পরের প্রতি তাঁদের কী গভীর আন্তরিকতা, কী সীমাহীন দরদ! তিন দশকের বেশি জীবনের ঝড়ঝাপটার মধ্যেও তা এতটুকু ম্লান হয়নি। একদিন রাতে ওঁদের বেডরুমের দরজা খোলা ছিল। বাথরুম যাবার পথে চোখে পড়ল – দুজনে দুজনের গায়ে হাত রেখে কী নিবিড় তৃপ্তিতে ঘুমোচ্ছেন!”
“বাবা-মার সত্যিই এর-ওর ওপর ভীষণ টান। এত বছরে ক’বার ঝগড়া করতে শুনেছি, হাতে গুনে বলা যায়।” রশ্মির চোখ ছলছল।
“কিন্তু এই দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনে নিশ্চয়ই ওঁদের জীবনে অনেক সঙ্কট এসেছে। আকস্মিক ঝাপটায় চেনা ছক বারবার এলোমেলো হয়ে গেছে।”
“তা তো বটেই। জানোই তো, আমার ছোটো ভাই ভুল চিকিৎসার ফলে অল্প বয়েসে মারা গেছে। বাবাকে কাজের সূত্রে মাঝে মাঝে বাইরে থাকতে হয়েছে, তখন মা’কে অনেক কষ্টে একা হাতে ঘর-বার সামলাতে হয়েছে। আর আমি – ভালো স্টুডেন্ট ছিলাম, কিন্তু এখন বুঝতে পারি বয়ঃসন্ধির সময় ওদের কীভাবে জ্বালিয়েছি।”
“আর এতসব সংঘাত নিশ্চয়ই ওঁদের সম্পর্কের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। পরস্পর পরস্পরকে নিশ্চয়ই কখনও কখনও জীবনের যত কষ্ট আর দুর্ভাগ্যের জন্য মনে মনে হলেও দায়ী করেছেন। তবু দ্যাখো, এই সুখেদুঃখে পথ চলেও তাঁরা শেষ অবধি সেই সম্পর্ককে শুধু অটুট রাখেননি, দৃঢ়তর করেছেন। বলতে পারো কীসের জোরে এতগুলি বছর ওঁদের বন্ধন অক্ষয় হয়ে রইল?”
“ওদের কেমিস্ট্রি, অসাধারণ কেমিস্ট্রি। আর ভেবো না এটা ওদেরই স্পেশালিটি। আগের প্রজন্মের অনেক দম্পতিকেই আমি দেখেছি, অনেক সঙ্কটের মধ্যেও ঐ কেমিস্ট্রিই তাঁদের এক করে রেখেছে।”
উত্তেজিত দেব বলল, “কী সেই অসাধারণ রসায়ন, বলতে পারো টুপুর? দ্যাখো, আমরা ক’বছর পথ চলেই ক্লান্ত হয়ে পড়ছি। আমাদের প্রজন্মের অনেকের মতোই ভাবছি আমরা দুটি আলাদা ব্যক্তিত্ব, আমাদের আলাদাভাবে ক্যারিয়ারে উন্নতি করা দরকার, নিজস্ব স্পেস থাকা দরকার। কিন্তু বলতে পারো অ্যাট দ্য এন্ড অফ দ্য ডে কোনটা বেশি দামী – অঢেল অর্থ, নামযশ, নাকি ভালোবাসার মানুষের বুকে হাত রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারা?”
“জানি না, আমি জানি না।” রশ্মির চোখ ছলছল।
“আমিও না।” বলে দেব দু’পা এগিয়ে রশ্মিকে জড়িয়ে ধরল। আর রশ্মি “তুমি আমাকে ছেড়ে থাকতে পারবে?” বলে ফুঁপিয়ে উঠল। তারপর দু’জন নিবিড় আশ্লেষে আবদ্ধ হয়ে পরস্পরের নৈকট্যে যেন কোনও দুরারোগ্য সমস্যার সমাধান খুঁজতে লাগল।
# # #
সেখান থেকে অনেক হাজার মাইল দূরে আনোয়ার শা রোডের এক ফ্ল্যাটে গম্ভীর অভিজিৎ আর সুমনা মুখোমুখি বসে। “ওরা নিরাপদে পৌঁছে মেল করেছে।” অভিজিৎ বলছিলেন, “তবে টুপুর লিখেছে, এখন বেশ কিছুদিন ওরা সংসার ও চাকরি ‘রি-বুট’ করতে ব্যস্ত থাকবে। তাই যদি শিগরিরও আবার যোগাযোগ না করতে পারে তবে আমরা যেন চিন্তা না করি।”
“হ্যাঁ, টুপুর যেমন সংসারী, সব কিছু গুছিয়ে না রেখে ও ট্যুরে বেরোবে না।” সুমনা বললেন।
“ঠিক।” অভিজিৎকে একটু বিষণ্ণ দেখাল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “আজকের থেকে আবার আলাদা বিছানায়, তাই না?”
“হ্যাঁ, মেয়ে-জামাইয়ের সামনে তো আর ওভাবে – তাছাড়া, তোমাকে বাইরের ঘরে কাউচে শুতে হতো, পিঠ ব্যথা হয়ে যেত। তার চেয়ে ক’দিন কষ্ট করে বৌয়ের সঙ্গে –”
স্ত্রীর দিকে নিবিড় দৃষ্টিক্ষেপ করে অভিজিৎ বললেন, “সত্যিই কি আমার কষ্ট হয়েছে? নাকি তোমার?”
ভাবলেশহীন চোখে তাকিয়ে সুমনা বললেন, “কিন্তু ব্যবস্থাটা তো তোমারই করা।”
“হ্যাঁ। আমিই বলেছিলাম, একটা বয়েসের পর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে একটা দূরত্ব থাকা দরকার। এতদিনের জীবনযাত্রায় যে কোনও ক্ষোভ, গ্লানি জমেনি, তা নয়। কিন্তু আমরা ভবিষ্যৎ আর সন্তানের কথা ভেবে সেসব মানিয়ে নিয়েছি। আজ আমরা ঝাড়া হাত-পা। বার্ধক্যের দোরগোড়ায় এসে আমাদের কোনও ভবিষ্যতও নেই, আছে শুধু বর্তমান অর্থাৎ সীমিত ক’টা বছর। সেটুকু তাই স্রেফ নিজের ইচ্ছেমতো বাঁচার অধিকার আমাদের দু’জনের আছে।”
“আরও বলেছিলে, পরস্পরের প্রতি দায়বোধ আমাদের সেই ইচ্ছাকে বরাবর ব্যহত করে এসেছে। কিন্তু এখন দুজনের মঙ্গলের জন্যই আমাদের সেই বাধ্যতার নাগপাশ থেকে নিজেদের মুক্ত করা দরকার। তবে এই বয়েসে দুজন একেবারে বিচ্ছিন্ন হতে গেলেও নানা সমস্যা দেখা দেবে। সমাজের চাপ, আর্থিক চাপ, অসুস্থতা এগুলো ওই নতুন পাওয়া স্বাধীনতায় মুহূর্তে নতুন শেকল পরাবে। তাই –”
“অপটিমাল সলিউশন হচ্ছে দুজন একই ছাদের তলায় আলাদা আলাদা থাকা। অর্থাৎ দুজন বন্ধু বা রুমমেটের মতো – পরস্পরের প্রতি বেদরদী নয়, তবে তার বেশি কিছুও নয়। তা, একটু ভেবে তুমিও তো ব্যবস্থাটা মেনে নিয়েছিলে।”
“হ্যাঁ। মানে আমরা এখন আলাদা শুচ্ছি, আলাদা বেড়াচ্ছি, তুমি তোমার অর্থনীতির রিসার্চ আর আমি আমার গান নিয়ে আছি। হিসেবপত্র আলাদা, এমনকি রান্নাও আলাদা।”
“সে আর করতে দিলে কই? সেই তো রাঁধুনি রাখলে।”
“না রেখে উপায় ছিল? শেষে তুমি আধসেদ্ধ, আধপোড়া খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে তো আমাকেই দেখতে হতো। তা, ওটুকু ছাড়া তো সবই মেনে নিয়েছি।”
“মেনেছ কি নিজের ইচ্ছায়? না আমার চাপে?”
“না না, নিজের ইচ্ছায়। তোমার কথায় বিশ্বাস তো আমার কখনওই হারায়নি। তোমার কত প্রজ্ঞা, জীবন সম্বন্ধে কত গভীর উপলব্ধি। সে তুলনায় আমি কতটাই বা বুঝি? তাছাড়া শুনতে ভালো না লাগলেও, তুমি ভুল তো কিছু বলোনি।”
“কে জানে, সুমি – আজ কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, সত্যিই আমি জীবনকে কতটা বুঝি? বোধহয় অনেক শেখাই বাকি রয়ে গেছে।”
“হঠাৎ?”
“মানে, বলছি ওই দেব আর টুপুরকে দেখে। প্রায়ই আমরা নতুন প্রজন্মের বিবেচনাবোধের ওপর আস্থা রাখতে পারি না। কিন্তু একটু ভেবে দেখো, ওদের জীবনযাত্রা আজ কত সমস্যাসঙ্কুল, কত দ্রুতগতি। প্রি-স্কুলে ভর্তি থেকে শুরু করে প্রতিটি ধাপই ওদের সামনে এক একটা কঠিন পরীক্ষা। সেসব সম্মানের সঙ্গে উৎরে ওরা বিশ্বের দরবারে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করছে। এই দ্রুত ও জটিল জীবনযাত্রায় ওদের ছ’বছরের বিবাহিত জীবন তো কার্যত আমাদের বিবাহিত জীবনের চেয়ে দীর্ঘ। তবু দ্যাখো, বাইরের নিষ্ঠুর পৃথিবীর সঙ্গে প্রতি মুহূর্তে যুঝতে যুঝতেও ওদের পরস্পরের প্রতি কী আবেগ, কী দরদ!”
“তার পেছনে হচ্ছে – ওই তুমি যা বলেছিলে, ওদের মধ্যে কেমিস্ট্রি।”
“হ্যাঁ। কিন্তু কী সেই কেমিস্ট্রি বলো তো, যার সন্ধান ওই দুটো বাচ্চা ছেলেমেয়ে এই বয়েসেই পেয়ে গেল আর আমরা এতদিনেও পেলাম না?”
সুমনা অনেকক্ষণ নীরব। তারপর ধরা গলায় বললেন, “মনটা ভালো লাগছে না। অন্তত আজকের দিনটা যদি একত্রে শুই?”
“আজকের দিনটা কেন, নাহয় এই সপ্তাহটা?” অভিজিৎ স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে পরম আবেগে তাঁর হাত চেপে ধরলেন।

# # #

আর এভাবেই তরঙ্গক্ষুব্ধ সমুদ্রে ইতস্তত ভাসমান কিছু বিচ্ছিন্ন দ্বীপ কখনও একটু কাছে আসছে, কখনও আবার দূরে সরে যাচ্ছে। পরস্পরের দিকে ব্যাকুল হাত বাড়িয়ে তারা কখনও কেমিস্ট্রিতে, কখনও অ্যালকেমিতে বিপ্রতীপ শক্তির দাপটের সামনে একত্র থাকার রসায়ন খুঁজে চলেছে।

ফেসবুক মন্তব্য