প্রাপ্তি সংবাদ ও তার পরিপ্রেক্ষিত

অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়

পার্থ ঘোষের "আমি, আপনি ও একটি হারানো সংবাদ" (নীহারকা, ISBN 978-93-86781-19-2) কাব্যগ্রন্থের শেষ মলাটে জানানো রয়েছে যে এটি কবির দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ। শ্রী ঘোষ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক এবং বর্তমানে ত্রিপুরা সরকারের আরক্ষা বিভাগে কর্মরত।

বইটির মলাটে আরও বলা রয়েছে, যে গতানুগতিকতার বাইরে বেরিয়ে কাব্যের বিষয়ের সন্ধান করেন তিনি, এবং তাঁর ব্যক্তিগত বিষাদের সংলাপেও পাঠক নিজেকে খুঁজে পেতে পারেন। এই আত্মবিশ্বাসটুকুকে পড়ে নেওয়া, কবিকে তার লেখার মধ্য দিয়ে স্পর্শ করার জন্য খুব জরুরী। যেমন জরুরী বইটির শিরোনামটির প্রতি, (যেখান উত্তম পুরুষ ও মধ্যম পুরুষ উভয়ে বিদ্যমান), বিশেষ মনোযোগ।

বইটিতে কম-বেশি ৭০টি কবিতা স্থান পেয়েছে। ৪৮ তম কবিতার শীর্ষকেই বইয়ের নামকরণ। মিস মণিকা দাশগুপ্তের নিঁখোজ হওয়ার খবরেও মধ্যবিত্তের রক্তকণিকায় যথেষ্ট তরঙ্গ ওঠে না আজকাল, এই-ই প্রতিপাদ্য এ কবিতার।

এই উদাসীনতার পরিপ্রেক্ষিতে পাঠককে কবিতা ভুবনের অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়ার তাগিদে কবিকে সম্ভবতঃ তাকাতেই হবে সেই পাঠকের দৈনন্দিনীর দিকে, তা যেমন হতে পারে বাস্তুহারা প্রৌঢ় সুবোধের নিদ্রার খোঁজে সন্ত্রস্ত নগর পরিক্রমা, যে নগরে "বাতাস বড় নিজের কথা বলে" অথবা "যাবতীয় জমানো ক্লেদ" গয়নার নৌকোয় তুলে দিয়ে ভারমুক্ত মৃন্ময়ের ফের কবিতার কাছে ফিরে যাওয়া (তবু কবিতা কেন লিখ-মৃন্ময়)।

অথচ এই নির্লিপ্তি বা দূরে থাকার অভ্যাস আমাদের আধুনিকতার অন্তর্গত। কবির "বিভাজন রেখা" কবিতাটিতেই সেই সময় তার ছাপ রেখে যাচ্ছে-

"এসব খোয়াব জেনে

আগেভাগেই সরলরেখা আঁকি

স্পষ্টতর করি বিভাজন

আপাতত

আগুন থেকে দূরেই থাকি।"



কিন্তু কবি ঠিকই লক্ষ্য করেছেন, এ আসলে নিরুপায় নির্লিপ্তি। কারণ এই ঘোর বর্ষায় যখন "তুলসীতলা ভেসে গেছে বানভাসি (যল্লিখিতম্) জলে" তখন এমনকি "শাঁখ বাজাবে না আর শহরতলীর মেয়ে"-রাও (সংস্কার)। এ এক মন খারাপের সময়। মানুষ কখনো "অলীক জোনাকী"র মত নিঃসঙ্গ, কখনো স্রেফ "মহান লুইচ্যা" অথবা "নির্লজ্জ দালাল" আবার কখনো "ধ্বস্ত প্রেমিক। কাঙাল পুরুষ।" এই মানুষের স্ববিরোধ এবং সামাজিক অবনমন-জনিত হতাশা যে তাঁকে মানুষ সম্পর্কে বীতশ্রদ্ধ না করে আরো মানবাভিমুখে চালিত করেছে সেই সত্যই সম্ভবত এই বইটির সবচেয়ে বড় আশার কথা, উদযাপনের উপলক্ষ্য, কারণ

"যে কোন বিরুদ্ধ মতের শেষে"...

"ভালোবাসার মত বিরুদ্ধতাও কিছু রাখি

গোপনতম বুকের ভাঁজে।

আসলে যেকোন বেঁচে থাকারই

রসদ কিছু খুব জরুরী।"



আবার একদম উল্টোদিকে বিষণ্ণ নির্জনতা তাঁকে হাতছানি দেয় যা ডিঙোবার কথা কবি মুখে বললেও, বার বার সেই অনুচ্চ টিলায় তিনি ফিরে আসেন, তাঁকে আসতে হয়...

"বিগত বর্ষায় গান ভেসে এলে

বিস্মৃত সেই নারীর গায়ের গন্ধ

মনে পড়ে যায়,

এসব বিষণ্ণ মেঘলা রাতে লুকোচুরি চলে

ভেজা চাঁদ ও জ্যোৎস্নায়....

আসলে মৃত্যু নয়

অদ্ভুত এক ফ্যাকাসে নির্জনতায়

অনুচ্চ টিলার মতো চুপ করে থাকি...

কী করে এ দূরত্ব ডিঙোবো, ভাবি!" (দ্বিধা)



তবুও বলি, কবি বেঁচে থাকুন, তাঁর লেখায় জায়মান নব্য-আশাবাদ ক্রমশ আরো সাহসী, আরো বলিষ্ঠ হোক, এই ভাবনা নিয়ে আজকে নটেগাছটি রোপণ করা গেল।

ফেসবুক মন্তব্য