এবং দেবদাসী

উত্তম বিশ্বাস

ভোগারতির ঘণ্টাধ্বনি শুরু হলেই ছেলেটি ক্ষুধাক্ষুধা মুখ আর দগ্ধ উলুবনের মতো উল্লোখুল্লো চুল নিয়ে মন্দিরের চাতালে এসে দাঁড়ায়। বছরের অন্যান্য দিন পুরোহিত মশাইয়ের মেজাজ থাকে তিরিক্ষি। কেননা এমনিতেই অঞ্জলির ফুল পাওয়া যাচ্ছে না। নৈবেদ্যর ফলেও দুষ্টুগ্রহের ক্ষত! তাঁর ওপর যদি তাঁকে নিয়ম মেনে প্রত্যেক অমাবস্যা পূর্ণিমা তিথিতে ঢাউস একটা দড়ি ধরে পাঁচমন পেতলের ঘণ্টাতে বছর গুনে ধ্বনি দিতে হয়, কাঁহাতক ধৈর্যে কুলায়! কিন্তু আজ কেন জানি দরাজদিল হয়ে বিরাট বারকোস হাতে নিয়ে বাইরে এসে হাঁকলেন,-“এই ছোকরা, এসে গেছিস? নে হাত পাত।’’ ছেলেটি করুণার দৃষ্টিতে একবার পুরোহিত মশাইয়ের দিকে তাকাল। তারপর নাক কুঁচকে, ভ্রু ভেঙে লম্বা একটা ছুট দিল বসন্তবাহার বাগিচার মধ্যদিয়ে। পুরোহিত মশাই হাঁকতে হাঁকতে ওর পিছু পিছু ছুটলেন। কিন্তু বাগানের মধ্যে খানিকটা ঢুকেই ভয়ে ওঁর হাড় হিম হয়ে এল।

মন্দিরের আলো নিভে গেলে পুরোহিত দেবদত্ত আজকাল কাননের কাছে যান। কানন এ মন্দিরের অসূর্যম্পশ্যা দেবদাসী। প্রথম বয়সে পূর্ণচন্দ্রে আরতির প্রদীপের সামনে গা ভর্তি জড়োয়া গয়না নিয়ে যখন মঙ্গলদীপের সেঁক নিতে আসত দেবদত্ত ওঁকে আদর করে ডাকতেন,’দেবী কানন বাঈ!’ তখন অবশ্য ছিল শিব সাধনার কাল। আর সেদিনের যোগ্য দেবনটিনী ছিল সাধিকা কাননবালা। কালে কালে দত্তবংশে জমিদার পালটেছে। আর মর্জি মাফিক তাদের সাধনার স্বরূপও পালটেছে। শিব সরিয়ে এ মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মূল্যবান কষ্ঠিপাথরের পাঁচপোয়া শাক্ত দেবী। কাননের মুজরা কবে থেমে গেছে, পুরোহিত দেবদত্ত এখন আর মনেও করতে পারেন না। বহুবার ওর জন্যে মৃত্যুদণ্ডের সুপারিশ হয়েছে, অথবা অজ্ঞাতবাস। কিন্তু দেবদত্তের কৃপায় কিছুই করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এখন অবশ্য কালান্তক ব্যাধি আর সর্বশরীরে দুরারোগ্য জরাভার নিয়ে শুয়ে থাকে নাটমন্দিরের পেছনে অন্নকূট লাগোয়া ছোট্ট একটি একচালা খুপরিতে। দেবদত্ত কাছে এলে কানন ঘন ঘন দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। আর তখন জটাজূটধারী মেঘের ঘোলা সরে গিয়ে আকাশে একচুমুক চাঁদের তরল গড়িয়ে নামে ওর গণ্ডদেশ বেয়ে।

নিশি নিস্তব্ধ হবার সাথে সাথে পুরোহিত দেবদত্ত কথায় মিষ্টি মিষ্টি মদিরা মাখিয়ে কঙ্কালসার কাননের সাথে আলাপ জমাবার চেষ্টা করেন, “বাক্সটা কোথায় পুঁতেছ মনে করতে পারলে কানন?”
-“আঃ! তোমার এই একই কথা! বলেছি না এই বেশে তুমি আসবে না। ভুলে গেলে? তুমি কথা দিয়েছিলে,--একহাতে গড়গড়া আর একহাতে বসন্তবাহার থেকে তুলে আনা তাজা বেলিফুলের মালা---!”
-“আঃ দেবদাসী সংযত হও! তাছাড়া দেবীর গহনা এভাবে তুমি একা ছলনা করতে পার না!”
-“তুমি পাষাণকে ঠকিয়েছ। আর আমি না হয়--! জান, আমি মুজরো শেষ করেও ব্যথাপায়ে কতোদিন ঘুঙুর জড়িয়ে অপেক্ষা করেছি। মন্দিরের চাতাল হতে চুপিচুপি অর্ধ পোড়া মোমবাতির টুকরো কুড়িয়ে এনে আমি আমার কামকুঞ্জের বেলোয়ারি জ্বালিয়ে চোখের সবটুকু ঘুম পুড়িয়ে ছাই করে ছেড়েছি, তবু তুমি তাঁকে আনো নি। আমার মজলিস,--আমার মুজরো-- আমার গহনা পরার সখ,-- কোথায় যে কবে কবর দিলাম কে জানে!”
-“নারীকণ্ঠে এসব চাতুরি বড্ড বাজখাঁই লাগে কানন!—সত্যি করে বলো! আমি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিশিঘোরে দেবীর গা থেকে এক এক করে এসব মহামূল্যবান অলংকার তোমার জিম্মায় রেখে নিশ্চিন্তে শুতে গেছি! ধরা পড়লে এর সাজা কি হতে পারত, সে তো তুমি জানতেই!”
কানন অকালমেঘের অহং ডেকে গর্জন করে উঠল, “কত টাকার সোনা আছে তোমার ওই ছোট্ট কাঠের বাক্সে? কতই বা ওর মূল্য? সবই তো ধর্মভীরু উন্মাদ মানুষের ছুড়ে দেওয়া অচল পয়সার মতো!—এর জন্যে যদি এত আসক্তি রাখতে পার,--তবে এই হতভাগ্য দেবদাসীর যে আজন্ম সঞ্চয়,- তার হিসাব কে দেবে দেবদত্ত?” বলতে বলতে কাননের কণ্ঠি শুকিয়ে আসে।
দেবদত্ত ওঁকে ঝাঁকিয়ে দিয়ে আবারও জিজ্ঞাসা করেন,-“শেষ পর্যন্ত বিশ্বাসের এই মর্যাদা দিলে দেবদাসী?”

কানন অর্ধদগ্ধ সর্পের মতো আড়মোড়া ভাঙবার চেষ্টা করে ক্লিষ্ট স্বরে বলল, “একটা কাজ করতে পার ঠাকুর?- পারলে আমার প্রাচিত্তির ব্যবস্থা করো! এ দেহে এখন যে ঢুকে আছে, তার আর আগের কথা কিছু মনে নেই। যদি খাঁচাছাড়া হতে পারি, নরকের পথে যেতে যেতে নিশ্চই তোমার গয়নার বাক্স খুঁজে দেব, কথা দিচ্ছি! করবে আমার প্রাচিত্তির?”
দেবদত্ত আক্ষেপ ঝরিয়ে বলেন, “এবার বুঝতে পারছি, তোমার এমন দশার কারণ কী। নিশ্চই ওই অশুভ আত্মার ছোঁয়া লেগেছে!”
কানন তাঁর শিথিল অস্থিগুলি গুছিয়ে নিয়ে উঠে বসবার চেষ্টা করল,-“সে কী! কে সে অশুভ আত্মা?”
-“সেদিন মাঘীপূর্ণিমা। মন্দিরের একশ আটান্ন বছর পূর্তি। একটি ছেলে রোজই অবশ্য এসে দাঁড়ায় যেখানে দেবীর জন্যে বলি প্রস্তুত হয়, ওই চাতালে। বয়েসটা ঠিক অনুমান করতে পারিনি। তবে যেভাবে টাট্টুঘোড়ার মতো লাফিয়ে উঠল, যৌবন না থাকলে অসম্ভব! বাগানের ভেতর ও যখন গাঢাকা দিল, আমি মরিয়া হয়ে উঠলাম। এক ঝাঁক বাদুড় আমার চোখের ওপর ছোঁ মেরে ধেয়ে এল! কয়েকটা এঁড়ে উল্লুক আমার প্রসাদের বারকোস উল্টে সব এঁটো করে দিল। তারপর আমাদের বসন্তবাহার বাগিচায় ঢুকে যা দেখলাম! একটা রক্তমাংসের জ্বলজ্যান্ত মানুষ মুহূর্তের মধ্যে ভল্লুক হয়ে চোখ পাকিয়ে চেয়ে থাকল। ওমা! তারপর এককদম এগোতেই -- থাক, ও আমি বলতে পারব না।” এসব কথা শুনতে শুনতে কাননের শুকিয়ে আসা বুকের হাপর ঠেলে সাঁ সাঁ শব্দ বেরিয়ে আসে। কলসি গড়িয়ে দেবদত্ত একগ্লাস জল দিয়ে, ভয়ে ভয়ে ওঁর কাছ থেকে বিদায় নেন।

কথাটা এখন অন্নকূট থেকে দত্তবাড়ির অন্দরমহল অবধি ভয়ের কারণ হয়ে উঠেছে। আর এ ব্যাপারে পুরোহিত দেবদত্ত মন্দিরের ধুনো যতটা পারলেন তাঁর শুকনো সংস্কারের ছিবড়ের সাথে জ্বালিয়ে অন্যত্র ছড়িয়ে দিতে লাগলেন। বিশেষকরে যখনি পাঁচজন ধর্মভীরু, অথবা যুক্তিবুদ্ধিহীন বখাটে মানুষের জটলা দ্যাখেন, অমনি আগবাড়িয়ে বলেন,-“কলির কথা আর কী বলব, আগে কাননের সদগতি কীসে হয়, সেই চিন্তা একটু করুন। ওর নিঃশ্বাসে গাছের ফুল পাতা পর্যন্ত শুকিয়ে ঝরে যাচ্ছে,--এসব খেয়াল রাখেন?”
-“সে কী গো? বলছে কী? এও কী সম্ভব?” দেবদত্ত মুখ গম্ভীর করে বললেন, "আগে তোদের সন্তান আদির জ্বরজ্বারি হলে কী করতিস মনে আছে? প্রথমে ক্ষীর খাটালের গোমাতাদেবীর তরল প্রাতকৃত্য, তাতেও যদি না উপশম আসত পূজা শেষে মায়ের চরণামৃত একচুমুক খেলেই--! আর এখন? ডাক্তার বদ্যি তোরা তো আঁচলে করে নিয়ে ঘুরছিস রে! তাতেও কী সুখে আছিস? অন্ধ মাকড়শাও টের পায় তার চারপাশে আঠার জাল বিছানো আছে!—আর তোরা--!”
সকলে পাংশুু মুখে বলে উঠল,-“এখন কী হবে? কী হবে?”
-“তলে তলে সময় অনেক গড়িয়ে গেছে, আমি আর কী জানি!” এই একটিমাত্র কথা বলে দেবদত্ত বিদায় নেন। কেননা এরপরে ওখানে যত সময় অতিবাহিত করবেন, একে একে জমায়েতের মধ্য থেকে উঠে আসবে নানা প্রসঙ্গ-অপ্রসঙ্গ!” অর্থাৎ এখান থেকে যত শীঘ্র সম্ভব সরে পড়াটাই সমীচীন মনে করেন পুরোহিত দেবদত্ত। কিন্তু পুরো মহল্লার মানুষের আর কিছু না থাক, দুশ্চিন্তা বলে তো একটা কিছু আছে! সে দায় কে নেবে? ভাবনার ভার গড়াতে গড়াতে একসময় পুরোটাই ভারাপ্পন এসে বর্তাল সেই বৃদ্ধ দত্ত মহাশয়ের ওপর। কেননা উত্তরাধিকার সূত্রে এই মন্দির এই মহল্লা—সবেরই অলিখিত অভিভাবক তিনি। উপযুক্ত মুক্তির পথ খুঁজবার জন্যে উনিও গড়গড়ার নলে টান দিতে লাগলেন। এরপর বুকের বহুকাল সঞ্চিত শ্লেষ্মা সরিয়ে বললেন, “কী আর করা! এখন কি আর হাতিবেগার কাল আছে! তাছাড়া মুহূর্তে মুহূর্তে ওই বদ আত্মাটা যেভাবে রূপ পাল্টাচ্ছে, তাকে কে খুঁজে বার করবে? অর্থাৎ জঙ্গল জ্বালানো ছাড়া তো আর সহজ উপায় দেখছি নে!”

মুহূর্তের মধ্যে আদেশটি হল্লায় পরিণত হল, ‘জঙ্গল জ্বালাও! জঙ্গল জ্বালাও!” দত্ত মশাইয়ের ইশারা মতোই অনুষ্ঠিত হল দাবানল। প্রায় মাস তিনেক ধরে শুকনো ফল আর পশুর চর্বি পোড়া শব্দে মুখরিত থাকল মন্দিরের আকাশ। আশেপাশের অনেকগুলি গ্রাম পুড়ল। কিন্তু এতে গৃহী মানুষের কোনও তাপ উত্তাপ দ্যাখা গেল না। বরং তারা শীতের আগুনের মতো এই নতুন খাণ্ডবদহনের পুণ্য তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতে লাগল! ওদের কলহাস্য আর জয়ধ্বনির আওয়াজে ঝলাসানো পাখির কাতর আলাপ, দিকদগ্ধ গাভীর হাম্বারব, আরো এক অতিপ্রাকৃত ছায়াশরীরের অশুভ আর্তনাদ —সবই চাপা পড়ে গেল!

মাঝে মাঝে কানন দেবদত্তকে কাছে পেয়ে খবর নেয়, “আগুন কদ্দুর ছড়াল ঠাকুর? বসন্তবাহার জ্বলে গেছে সবটুকু? অর্ঘ্য কোথা থেকে আনছ এখন?” দেবদত্ত কিছু একটা ভেবে চুপ করে থাকেন। দেবদাসী আবার কথা শুরু করে, “ওকে আর দেখতে পাও? চরণামৃত খেতে আর আসে না, না? আচ্ছা বলো তো যখন ও কোষাকুষির দিকে একদৃষ্টে চেয়ে থাকত তখন ওর চোখদুটো ক্যামন দেখতে লাগত? শুকনো নয়ানজুলির মতো নিশ্চই?—খুব তৃষ্ণামাখানো তাই না?” বলতে বলতে কাননের কণ্ঠ অসাড় হয়ে আসে। দেবদত্তের সন্দেহ হয়। তিনি অনুশাসনের সুরে বলেন, “ওকে তুমি চেন? ওর সাথে তোমার কী সম্পর্ক আগে বলো? যদি না’ই স্বীকার হও, তাহলে সর্দার পাড়াকে একবার লেলিয়ে দিই? বল্লমের আগায় ওকে যখন গেঁথে এনে পায়ের কাছে ফেলবে, তখন কিন্তু--!”

দেবদাসী অনুযোগের ভঙ্গিতে বলল, “তুমি কী মনে কর, আমি বুঝি গয়নার বাক্সটি ওর হাত দিয়ে পাচার করে দিচ্ছি তাই না? এমন মতিভ্রম যার, ভল্লুক তাকে তো খাবলাবেই!” দেবদত্ত কাননের হাতখানি ধরে ওর দিকে করুণ চোখে একবার চাইতেই কানন একটু হাসবার চেষ্টা করল, “তুমি ভাবছ আমি এখনো ক্যানো মরছিনে এই তো ঠাকুর? কয়খানা গ্রাম পোড়ালে?”
--“বাহারের উত্তরে একখান আর দক্ষিনে--!”
-“কাঞ্চন গাছটিও কি জ্বলে গেছে?”
-“কোন কাঞ্চন?”
-“যেদিন প্রথম নিবেদিত হয়েছিলাম এই পাষাণের বেদিতলে, তুমি ওই গাছের ফুল দিয়ে বেণী বাঁধতে বলেছিলে, মনে আছে?”
--“তুমি আজও সেই বোকাটিই রয়ে গেছ দেবদাসী! জান না এ মন্দিরের যুগ্ম বিগ্রহ সেই কবেই গুড়িয়ে গেছে! এখন আর নটরাজ সাধন হয় না গো, হয় শক্তির আরাধনা! তাই তো তুমি আজ এমন অপাংক্তেয়। ভরন্ত কলসের মতো হাসা অভ্যাস দেবদাসীর। আজ হাসতে গিয়ে বাঁধা পেল সে, কাশি আর কফের সাথে খানিক রক্তও উঠে এল।

অবশেষে ধোঁয়ার কুণ্ডলী যেদিন সীমান্ত পেরিয়ে দূর ধুসরে বিলীন হল, সেদিন বাহান্ন কলস মহিষের দুধ, আর ধবলধেনুর মূত্রবিষ্ঠা দিয়ে মন্দির সুচিশুভ্র করা হল। দেবদত্তের পায়ের আওয়াজ পেয়ে কানন আড়মোড়া ভেঙে প্রেতাত্মার মতো ঠেলে উঠল,-“আগুন তো জ্বালালে ঠাকুর, সবটুকু পুড়েছে? পার তো জানলার একটা কপাট খুলে দাও। ধোয়া যা ঢুকেছে একেবারে দোম আটকে আসছে!” দেবদত্ত আজ অনেকটাই সুস্নাত চিত্তে ছিলেন। তবু দেবদাসীর চোখের দিকে একটিবারমাত্র তাকিয়ে বুঝতে পারলেন, এইখানে আগুন অন্য! এ অনন্ত গিরিগুহা থেকে যে কুণ্ডলায়িত ধুমরাশি নির্গত হচ্ছে, তা শীতল গঙ্গোদক কী সহস্র ধবলধেনুর দুগ্ধে আদৌ নির্বাপিত হবে না! দেবদত্ত মিহিস্বরে বললেন, “তোমাকে আর সোনা খুঁজে দিতে হবে না দেবদাসী। পারলে এবার শান্তিতে চোখ বোজার চেষ্টা করো!”

প্রলাপের মতো এবার কানন সমানে বলেই চলল,-“আজ আবার পুজোর পর নাটমন্দিরে লহরা উঠবে নিশ্চই? কে নাচবে? আমি কিন্তু আবারো বলছি, কিছুতেই ওই গয়নার বাক্স--- আঃ! সেই তো এখনও এল না গোপন সুড়ঙ্গের চাবি পাব কোথায়!” বলতে বলতে ঠিক পূর্বের মতোই বিছানার সাথে মিশে গেলেন দেবদাসী! দেবদত্ত কাননের বুকের ওপর পুরু একটা কম্বল চাপা দিয়ে মাথার কাছে একগুচ্ছ ধূপ জ্বেলে দিয়ে অদৃশ্য জনের উদ্দেশ্যে বলে উঠলেন, “এখন কী আর সে যুগ আছে? কুণ্ডহাড়িতে কতকাল মুখ দ্যাখোনি?” এবার তিনি মনে মনে উচ্চারণ করলেন, “মূর্খ রজঃস্বলা রমনী! শুনছ না শবরীমালার জন্যে ভারতভূমি কীভাবে দ্বিধাবিভক্ত? প্রণামীর বাক্সের মতো বোকা নারীজন্ম বয়ে বেড়ানোর পুরস্কার তুমি অবশ্যই পাবে! অপেক্ষা করো, দেবীর জন্যে আজ জান্তব নৈবেদ্য নিবেদিত হবে! যদি ক্ষণজন্মা হও, তবে অবশ্যই সেই প্রসাদের কণিকামাত্র পাওয়ার সৌভাগ্য লাভ করবে!”

কানন উত্তর দিল না। শুধু ধোঁয়ার কুণ্ডলী সরিয়ে মাঝে মাঝে পচা বদগন্ধযুক্ত দীর্ঘশ্বাস ঘরময় ঘুল্লি খেয়ে বেড়াতে লাগল।

সেদিন মাঘমাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী। মধ্যরাতের ভোগারতির আওয়াজ শুনে গর্ভগৃহের ঠিক সামনের সিঁড়িতে এসে দাঁড়াল সেই ছেলেটি। পাশেই খড়্গে খসখস করে শাণ দিচ্ছিলেন নিশানাথ। তিনি এ মন্দিরের বলির পরম্পরাসূত্রে জহ্লাদ। চরণামৃতের বাটি নামিয়ে একখানি নামাবলী চাদর নাকে চেপে দেবদত্ত নরম পায়ে নেমে এলেন। এরপর ধীরোদাত্ত স্বরে বললেন, “বাঃ বেঁচে আছিস তাহলে? এসেছিস যখন নে ছোকরা, হাত পাত!”

বাক্যব্যয় না করে ঝলসানো একটা মুষ্টিবদ্ধ হাত এগিয়ে দিল।
--“কী হল, খোল!” ছেলেটি সেগুনগাছের গুড়ির মতো দাঁড়িয়েই রইল।
--“আঙুলগুলো একটার সাথে আর একটা ঝলসে জড়িয়ে গেছে তো? আস্তে আস্তে চেষ্টা কর, অবশ্যই পারবি!”
অনেক কষ্টে মুঠো খুলল। আর ঠিক তখনই ওর পোড়া পাঁচআঙুলের মধ্যথেকে একটি রঙধনু আঁকা প্রজাপতি গর্ভগৃহ, নাটমন্দির, অন্নকূট -- সর্বত্র তার পাখার পরাগ ছিটিয়ে পতপত করে উড়তে লাগল! পায়ের তলায় মাটিটা যেন একটুখানি কেঁপে কেঁপে উঠল? কী জানি কী এক সন্দেহ বশে গর্ভগৃহে নজর ঘুরাতেই দেখলেন বহুকালের পরশপাথরের বেদীখানিতেও আড়াআড়ি ফাটল! সহসা নিশানাথ রাতের আকাশ কাঁপিয়ে আর্তনাদ করে উঠল, “জয় মা!”

আর ঠিক তখনই নাটমন্দির থেকে প্রলয়ের মতো নূপুরের নিক্কন ভেসে আসতে লাগল। দেবদত্তের বুকের ভেতরটা সহসা মোচড় দিয়ে উঠল। উনি ভাবলেন, “কানন কি আবার সত্যি সত্যিই মুজরার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছে?”

ফেসবুক মন্তব্য