দক্ষিণের তাজ

পার্থ প্রতিম চ্যাটার্জী



সপ্তদশ শতাব্দির মাঝামাঝি সময়, মুঘল সাম্রাজ্যের পরবর্তী সম্রাট ঔরংজেবের জীবনে নেমে এলো এক চরম দুঃসময়। পঞ্চম সন্তানের জন্মের পর মাত্র কয়েকদিনের জ্বরে মারা গেলেন তাঁর প্রিয়তমা পত্নী, দিলরাস বানু বেগম। এর সঙ্গে সঙ্গেই এই ঘটনার আকশ্যিকতায় স্নায়ুবৈকল্য ঘটলো ঔরংজেব ও দিলরাসের জ্যেষ্ঠ পুত্র শাহাজাদা আজমের। পরবর্তী কয়েক বছর ঔরংজেবের জীবনে এলো অনেক চড়াই -উতরাই। সম্রাট শাহজাহানের অসুস্থতার সুযোগে শুরু হল পুত্রদের মধ্যে সিংহাসন দখলের লড়াই। বছর খানেকের মধ্যে অন্য ভাইদের পরাস্ত করে এবং পিতা শাহজাহানকে বন্দি করে ঔরংজেব দখল নিলেন মুঘল সাম্রাজ্যের। পিতার মৃত্যুর আগে নিজেই, নিজেকে মুঘল সাম্রাজ্যের সম্রাট ঘোষণা করলেন।

ইতিমধ্যে মাতৃবিয়োগের আঘাত কাটিয়ে উঠেছেন কিশোর শাহাজাদা আজম। কিন্তু মনে বাড় সাধ মায়ের জন্য কিছু করার। দেখেছেন দাদু শাহাজাহান, দিদিমা মুমতাজ মহলের মৃত্যুর পর তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে বানিয়েছেন এক অতুলনীয় সৌধ। বাবা ঔরংজেব এক কঠিন পুরুষ, রাজকার্য ছাড়া কিছু বোঝেন না, তিনি তো আর তাঁর প্রিয়তমা পত্নীর জন্য সে রকম কিছু করবেন না। অনেক ভাবার পর কিশোর আজম, মাতৃপ্রেমকে শ্রদ্ধা জানাতে বাবার কাছে উপস্থিত হলেন মায়ের জন্য এক স্মৃতিসৌধ বানানোর প্রস্তাব নিয়ে। বাবাকে জানালেন তাঁর মনের কথা, বললেন মায়ের স্মৃতিতে বানাবেন আরেক তাজমহল। সম্রাট ঔরংজেব পড়লেন মুশকিলে, তিনি জানেন তাজমহল বানানোর ঝামেলা অনেক, কিছুদিন আগে নির্মিত তাজমহল বানাতে খরচ হয়েছিল প্রায় ৩২ লক্ষ টাকা। মাত্র কিছুদিনের মধ্যে আবার, সেই পরিমান টাকা খরচ করে আরেক তাজমহল বানানোর প্রস্তাবে রাজি হওয়া, সদ্য সিংহাসনে বসা সম্রাটের পক্ষে খুবই মুশকিল। কিন্তু প্রিয় পুত্রের আবদার একেবারে ফেলে দেওয়াও যায়না।

অনেক শলাপরামর্শের পর, সম্রাট রাজি হলেন শাহাজাদার প্রস্তাবে, বরাদ্দ হলো ৭ লক্ষ টাকা। শুরু হলো কিশোর শাহাজাদা আজমের তত্ত্বাবধানে আর এক তাজমহল বানানোর কাজ। কিন্তু কে করতে পারে এই প্রস্তাবিত তাজ আর কোথায় বা করা যেতে পারে তা। শেষমেশ আওরংজেবের প্রিয় শহর ঔরঙ্গাবাদের এক বিশাল উদ্যান নির্বাচিত হলো এই নতুন তাজমহল বানানোর জন্য। ডাক পড়লো সেই সময়ের প্রসিদ্ধ স্থপতিদের, এলেন শাহাজাহানের তাজমহলের প্রধান স্থপতি, উস্তাদ আহমেদ লাহৌরির পুত্র আতা-উল্লাহ, এলেন আর এক প্রসিদ্ধ বাস্তুকার, হান্সপত্ রাই। দুজনে মিলে তৈরী করলেন ছোট তাজমহলের নকশা। অনুমোদিত হলো সেই নকশা আর শুরু হলো এদের নেতৃত্বে ঔরঙ্গাবাদের চারবাগ উদ্যানে নির্মাণের কাজ।





প্রায় ১ লাখ ২৬ হাজার বর্গমিটার অঞ্চল চিহ্নিত হলো এই নির্মাণকার্যের জন্য। আগ্রার তাজ বানানো হয়েছিলো উৎকৃষ্ট প্রকারের সাদা মার্বেল পাথর দিয়ে। আর তার জন্য খরচ হয়েছিলো অনেক টাকা। চারবাগের এই তাজ বানানোর জন্য রাজকোষ থেকে বরাদ্দ টাকার পরিমাণ অনেক কম। তাই ঠিক হোল কেবলমাত্র বিশেষ কিছু অংশে ব্যবহৃত হবে মার্বেল পাথর। আর এই মার্বেল আনা হোল জয়পুরের নিকটবর্তী অঞ্চল থেকে। মূল তাজের মত এই সমাধিটিও উদ্যানের মধ্যস্থলে চারটি মিনার বেষ্টিত এক উচ্চস্থানে অবস্থিত। সমগ্র উদ্যানটি বেষ্টিত এক সুন্দর প্রাচীর দ্বারা। উদ্যানের মুখ্যদ্বার দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলে একটি ছোট জলাধার চোখে পড়বে, যার জলে এই সমাধি সৌধের প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে। জলাধার পেরিয়ে সমাধি সৌধটি অবধি পৌঁছনোর পথটিতে রয়েছে অসংখ্য ফোয়ারা। সিঁড়ি দিয়ে মঞ্চে উঠে পড়ার পর সমাধির দ্বার দিয়ে মার্বেল পাথরে তৈরি সৌধতে প্রবেশ করার পর পৌঁছনো যায় দিলরাস বানু বেগম বা "রাবিয়া-উদ-দুরানির” সমাধিস্থলে। সমাধিগৃহের ঠিক মধ্যস্থলে মার্বেল পাথরের কাজ করা এক অষ্টকোণী স্থলে শায়িত রয়েছে রাবিয়ার মরদেহ । প্রায় বেশ কয়েক বছরের পরিশ্রমের পর এই সমাধি সৌধটি তৈরির কাজ সম্পূর্ণ হয়, নামকরণ করা হয় "বিবি কা মাকবারা"। এই “বিবি কা মাকবারা” লোকমুখে দাক্ষিণাত্যের তাজমহল হিসেবেও পরিচিত। শাহাজাদা আজমের ইচ্ছা ছিল মায়ের জন্য আর একটি তাজমহল বানানোর, কিন্তু অর্থের অভাবে এই "বিবি কে মাকবারা" তাজমহলের এক অতি সাধারণ অনুকরণ হয়ে রইলো।








রাবিয়া-উদ-দুরানি সমাধি


দুই তাজমহলের সৃষ্টির কারন এক – প্রেম, কিন্তু দু ক্ষেত্রে তার রূপ আলাদা।

আগ্রার তাজমহল তৈরী হয় সম্রাটের শাহজাহানের পত্নীপ্রেমের জন্য।

আর দক্ষিণের তাজের সৃষ্টি তাঁরই পৌত্র আজম শাহের মাতৃপ্রেমের উদ্দেশ্যে।

ফেসবুক মন্তব্য