ব্যাঙ

সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়

আমি পড়াই বাংলা সাহিত্য। জয়িতা বায়োসায়েন্স। একই কলেজে যদিও, তবু আমাদের কর্মক্ষেত্র একদম আলাদা। কিন্তু তাতে আমাদের বন্ধুত্ব হতে বাধা কোথায়? প্রেম হতে দোষ কী? এই সহজ কথাটা জয়িতা মানতেই চায়না। বলে, “ভালো করে ভেবে দেখো সায়ন্তন, প্রেম করলে, নদীর ধারে কদম গাছের তলায় দাঁড়িয়ে তোমার সঙ্গে কী কথা বলব? আমি তোমাদের ওই ঘোর প্যাঁচের সাহিত্য-মাহিত্য বুঝি না বাপু। পড়লেই মনে হয় ললিত লবঙ্গ লতা চারুশীলা সন্ধ্যেবেলা গা ধুয়ে বিনোদ বেণী বাঁধতে বসেছে।” সায়েন্স ফ্যাকাল্টির চারুশীলার চুল বেশ পিঠ-ছাপানো। আমায় দেখলে সে হেসে হাত-টাত নাড়ে বটে, কিন্তু আমি তার প্রতি কোনোদিন কোনও দুর্বলতা দেখিয়েছি বলে মনে পড়েনা। আমি আপত্তি করতে যাই। সব সাহিত্যই কি – জোছনা রাতে চিালের ছাতে একলা কোকিল ডাকে? আজকাল না’হয় বাংলা সাহিত্য পারিপার্শ্বিকতার চাপে নেতিয়ে পড়েছে। সর্বদাই কেমন ভিজে ভিজে ভাব। নিউজ প্রিন্টের ওপর শব্দ পড়লে মনে হয় টপ টপ করে কর্পোরেশনের কলের জল পড়ছে। কিন্তু অনেক বলশালী সাহিত্যও তো আছে। যারা একটানে সমাজের মেকি মুখোস খুলে দিয়েছে। কারার ওই লৌহ কপাট ভেঙ্গে লোপাট করে দিয়েছে। আসলে জয়িতার মেয়েলী ব্যাপার-স্যাপার নিতান্তই অপছন্দ। চেহারাতেও টানটান ঋজুতা। তাকে এসব কথা বোঝাবে কে? আমার কথা খ্যাঁচ করে কেটে দিয়ে জয়িতা মুখ ঘুরিয়ে চলে যায়। জয়িতার ঘাড় অব্দি ছোটছোট করে ছাঁটা বয়কাট চুল। তার নীচে খাটো কলারের জামার থেকে নাক উঁচিয়ে থাকা আধখানা ট্যাটুর দিকে আমি হাঁ করে তাকিয়ে থাকি। আভাষে দেখে মনে হয় নোঙ্গরের ট্যাটু। জাহাজি নাবিকদের বাহুতে যেমন আঁকা থাকে। জয়িতার ঘাড়ের ওই ট্যাটুটা কোনদিন কি আমি পুরোপুরি দেখতে পাব? জানতে পারব সত্যি সত্যি ওটা নোঙ্গরেরই ট্যাটু কিনা।
ঐ অর্ধেক ওঠা নোঙ্গরের ট্যাটু দেখে আমার সব ভুল হয়ে যায়। মাথা টলটল করে। কোথাও যেন যাবার ছিল, জরুরী দরকারে। মনে করতে পারি না। খালি মনে হয় সমুদ্রে যেতে হবে। অ্যাহয় নাবিক! নোঙ্গর তোলো। হৃদয় তোলপাড় করে সমুদ্র ডাকছে। তড়িঘড়ি করে কলেজ থেকে বেরিয়ে দেখি আকাশ কালো করে মেঘ করেছে। যেন সমুদ্রে ঢেউ উঠেছে। মনে পড়ে যায় কাল কলেজের পিকনিক। আমার ওপর ভার পড়েছে ব্রেকফাস্টের ব্যবস্থা করার। এখন আমায় ক্ষুদিরামদার দোকান থেকে সাত পাউণ্ড পাঁউরুটি আর চার ডজন ডিম কিনতে হবে। বাড়ি গিয়ে বৌদিকে ম্যানেজ করে ডিম সেদ্ধ করতে হবে। কাল ভোর ভোর রওনা দেবার প্ল্যান। জয়িতাও যাবে। দিল্লী রোড পার করে মজুমদারদের বাগানবাড়িতে পিকনিক। কিংশুক ভেনু ঠিক করতে গিয়েছিল। ফিরে এসে রিপোর্ট দিয়েছে – মনোরম পরিবেশ। মজুমদাররা অবশ্য নেই, মরে হেজে গেছে। তবে বাগান আছে। মাঝ মধ্যিখানে একটা বড় দিঘি আছে। বাড়িটার দু একটা ঘরও নাকি বাসযোগ্য করে রাখা আছে। একজন বয়স্ক কেয়ার টেকার দেখভাল করে। সে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে রাখবে। খাবার জল ধরে রাখবে। কালকে বৃষ্টি হলেই সব ম্যাসাকার। ছাদের নীচে বসে গুলতানি করে সময় কাটাতে হবে। জল জঙ্গলের মধ্যে জয়িতার সঙ্গে একা কথা বলার সুযোগ পাওয়া যাবে না। পেলেও যে কাজের কাজ কিছু হবে তা নয়। তবু লেগে থাকা। কথায় বলে ঘষতে ঘষতে পাথরও ক্ষয়ে যায়। জয়িতার মন কি পাথরের চেয়েও কঠিন? কে জানে?
আমার আশঙ্কা কিন্তু অমূলক প্রমাণিত হল। আমরা যখন বাস থেকে হই হই করতে করতে নামলাম আকাশের রঙ কটকটে নীল। নিরঙ্কুশ ধোয়া মোছা, মেঘের চিহ্ন মাত্র নেই। বিস্তর জায়গা জুড়ে মজুমদার বাড়ি। পিচ রাস্তা পার হয়ে ঢালু জমি, ইতস্তত গাছপালা। ঝুপ্সি পাতার আড়ালে ভাঙাচোরা জানলা কপাট নিয়ে পুরোন বাড়িটা কোনোমতে অষ্টাবক্র দাঁড়িয়ে। ইট বার করা দেওয়ালে কোথাও কোথাও চুন সুরকির সস্তা পলেস্তারা। জং ধরা লোহার উঁচু গেট ঠেলে ঢুকলেই কিন্তু সবুজের সমারোহ। আম জাম জামরুলের গাছ ছাড়াও ভেঙ্গে পড়া বাউণ্ডারি ওয়াল বরাবর ইউক্যালিপ্টাস গাছের সারি। আগাছা নিড়ানি দিয়ে বাড়ির সামনের দিকটা পরিষ্কার রাখার একটা আপ্রাণ চেষ্টা নজরে পড়ে। কাল ভোর-রাতে মনে হয় বৃষ্টি হয়ে গেছে। মাটি ভিজে। গাছের পাতা থেকে টুপ টাপ করে জল খসে পড়ছে। সকালের রোদ্দুরে পড়ন্ত জলের দানা মুক্তোর মত ঝিকিয়ে উঠছে। হঠাত্‌ দেখলে শহরের কংক্রিট-ক্লান্ত রেটিনা ঝলসে যায়।
ঘাসের মধ্যে তেকোনা ইটের পাড় দেওয়া রাস্তা। এককালে মোরাম বিছানো থাকত। খুঁজলে হয়তো এখনও দু-চারখানা পাথর এদিক ওদিক পাওয়া যাবে। কিছুটা হেঁটে গেলেই সদর দরজা। বাড়িতে ঢুকতেই একটা খোলা চত্বর। তার তিন দিকে টানা বারান্দা। পার হয়ে ঘরের সারি। কেয়ার টেকার বলল, দুখানা ঘর আমাদের বসার জন্য সাফ সুতরো করে শতরঞ্চি পেতে রেখেছে। ক্যাটারারের লোকজন ফাঁকা চত্বরেই হাঁড়ি কড়াই গ্যাসের সিলিণ্ডার নামাচ্ছে। সেখানেই রান্না হবে। আমরা সিঁড়ি দিয়ে বারান্দায় উঠে সামনের ঘরটায় ঢুকলাম। বিশাল একখানা অন্ধকার হল। বড় বড় জানলা। এগিয়ে গিয়ে ধূলো পড়া কাঠের পাল্লা খুলে দিলাম। লোহার গরাদ পার করে এক ঝাঁক আলো আর ঠাণ্ডা হাওয়া উঠে এল দিঘির থেকে। বাড়িটা যেন সরাসরি দিঘির জল থেকে উঠে এসেছে। দিঘির অন্য পাড়ে ঘন জঙ্গল। ছায়া পড়ে জল সবুজ হয়ে আছে। গাছেদের মাথায় পাখিদের সমবেত কিচির মিচির। এক ঝাঁক টিয়া দল বেঁধে উড়ে গেল। নীচে জলে শোল কালবোস ঘাই দিয়ে উঠছে। সহিষ্ণু জলের আপাত মৃদু মোনোটনি ভেঙ্গে যাচ্ছে। একটা জলঢোঁড়া সাপ হেলে দুলে সাঁতার দিচ্ছে। গন্তব্যে যাবার তাড়াহুড়ো নেই।
জয়িতাও দেখলাম জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। ফেডেড জিনসের ওপর আজকের আকাশের থেকেও গাঢ় নীল রঙের একটা টপ পরে এসেছে। ছোট্ট কপালের মাঝখানে একটা ডায়ামন্ড শেপের টিপ, চোখের নীচে কাজল, গালে অল্প রূপটান। মারকাটারি দেখতে লাগছে। ব্রেকফাস্টের কাগজের প্লেট দিতে গিয়ে হাত কেঁপে গেল। টালমাটাল প্লেট থেকে সেদ্ধ ডিমটা গড়িয়ে পড়ল মেঝেতে। পাশ থেকে কিংশুক ফ্যাক ফ্যাক করে হাসতে লাগল। জয়িতা কড়া চোখে তাকাল আমার দিকে। হাত কেঁপে যাওয়া জয়িতা একদম পছন্দ করে না। জয়িতার হাত সাঙ্ঘাতিক স্টেডি। একবার বায়োলজি ল্যাবে উঁকি দিয়ে দেখেছিলাম, জয়িতা ব্যাঙ কাটছে। একটা সদ্যমৃত ব্যাঙ ট্রের ওপর চিত হয়ে শুয়ে আছে। তার বুকের সাদা চামড়াটা চিমটে দিয়ে তুলে একটা কাঁচি দিয়ে খ্যাস খ্যাস করে কেটে ফেলল। ভিতর থেকে টুকটুকে লাল রঙের হৃৎপিণ্ড, শিরা, ধমনী দেখা যেতেই আমি করিডোরে বেরিয়ে এলাম। জয়িতা ছাত্র ছাত্রীদের ব্যাঙের শারীরিক গঠনের ইতিবৃত্ত বোঝাতে লাগল।
ব্যাঙ কাটা দেখার পর থেকে ধোঁয়া ওড়া চা খাবার জন্য আমার খুব গলা সুলোতে লাগল। আমি কলেজের মেন গেটের বাইরে মুরলীদার চায়ের দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ছোট্ট একটা গুমটি ঘর। মুরলীদা স্যাণ্ডো গেঞ্জি আর পাজামা পরে দাঁড়িয়ে তদারকি করে। দোকানে একটা কাঠের টেবিলের ওপর বিস্কুটের টিন আড়াল দেওয়া কেরোসিনের স্টোভে সর্বদাই চা ফোটে। মুরলীদা একটা মাটির ভাঁড় উল্টো করে দুবার ঠুকে পোড়া মাটির গুঁড়ো ঝেড়ে নিয়ে দেড়ফুটের চা বাড়িয়ে দিল। সরবতের মত মিষ্টি। আমি ঠিক তিন চুমুক দিয়ে সিগারেট ধরালাম। ভাঁড়টা তলানির চা সুদ্ধু ছুঁড়ে ফেললাম। ভাঁড়টা ভাঙল না, গড়িয়ে গেল। ভাঁড় ছোঁড়ার নিয়ম হচ্ছে মাটিতে পড়ে সেটা ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। আমার দ্বারা হয় না। কোথা থেকে একটা বেড়াল এসে চলকে পড়া চাটা চেটে চেটে খেতে লাগল।
“নাও চা খাও।”
জয়িতা প্লাস্টিকের কাপে চা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমি কৃতার্থ হয়ে দুহাত বাড়িয়ে চা নিলাম।
“তাড়াতাড়ি চা খেয়ে নাও। তারপর আমার সঙ্গে বেরোবে। আমি পাখি দেখতে যাব।”
এ যে মেঘ না চাইতেই জল। হল কী আজ জয়িতার? আমি চা খেতে খেতে জয়িতার বডিগার্ড হবার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিতে থাকলাম। আস্তে আস্তে আমি সাধারণ মধ্যবিত্ত সায়ন্তন থেকে বাইসেপ ট্রাইসেপ ডেল্টয়েড সমৃদ্ধ সালমান খানে রূপান্তরিত হতে লাগলাম। আড়চোখে চেয়ে দেখলাম জয়িতার হুঁশ নেই। আমার এই দৈহিক পরিবর্তনের কথা সে খেয়ালই করছে না। অন্যমনস্ক হয়ে জানলা দিয়ে দিঘির কাকচক্ষু জলের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে আছে।
“কোথায় চললেন গো মা জননী?” বুড়ো কেয়ার টেকার প্রশ্ন করল।
জয়িতা আগে আগে যাচ্ছিল। বলল, “এই চারপাশটা একটু ঘুরে দেখে আসি।”
“একটু দেখে শুনে পা ফেলবেন। যা জঙ্গল হয়ে আছে চাদ্দিকে। সাপে ব্যাঙ ধরার আওয়াজ পেলে সিদিকে যাবেন না। এ বাড়িতে ব্যাঙেদের খুব উৎপাত। দুফোঁটা জল আকাশ থেকে পড়তে না পড়তেই দিঘির পাড়ে বসে গলা ফুলিয়ে চেল্লাতে শুরু করে। রাত্তিরে ঘুমুতে দেয় না।”
ব্যাঙের ভয় দেখাচ্ছে জয়িতাকে। আমি মনে মনে হাসলাম। নেহাত শাড়ি পরে না, তাই। নইলে টপ টপ করে ব্যাঙ ধরে আঁচলে বেঁধে ফেলত। জয়িতা এগোল। আমি সঙ্গে। কিংশুক পিছন থেকে চেঁচিয়ে বলল, “তাড়াতাড়ি ফিরিস। অজানা অচেনা জায়গা। হারিয়ে যাস না যেন।”
যা ভেবেছিলাম তাই। ঘাস মাড়িয়ে জয়িতা বাড়ির পিছন দিকে চলল। বোঝা যায় পারতপক্ষে লোকজন এদিক মাড়ায় না। ঝোপ ঝাড় জঙ্গলে ভরে আছে। আমরা মাকড়সার জাল সরিয়ে এগোলাম। মাথার ওপর বিন বিন করে কতগুলো ছিনে মশা ঘুরপাক খেতে লাগল। দিঘির একদিকে সিমেন্টের বাঁধান ঘাট দেখা যাচ্ছে। ভাঙ্গাচোরা ফাটল থেকে পাখির ঠোঁট থেকে বীজ-পড়া বট অশ্বত্থর গাছ মাথা চাড়া দিয়েছে। একটা পায়ে চলা সুঁড়ি পথ গেছে ঘাটের পাশ বরাবর। মেটে রঙের একটা গিরগিটি ঘাড় উঁচু করে দেখছে। দিঘির ধার থেকে ব্যাঙ লাফাচ্ছে। জয়িতার ভ্রূক্ষেপ নেই। হন হন করে হাঁটছে। যেন চেনা যায়গা। আগেও অনেকবার এসেছে এখানে। হাঁটতে হাঁটতে আমরা দিঘির ঘাট পেরিয়ে গেলাম। গাছপালার ঘনত্ব বাড়ছে। পাখিদের কলাকাকলিও। আগে বুঝিনি। বাড়ির পিছন দিকে দিঘি পার হয়ে এতখানি জায়গা জমি আছে। জয়িতা যেন নিশ্চিত জানে কোথায় যাচ্ছে। আমি ওর হাঁটার সঙ্গে তাল রাখতে পারছি না।
“জয়িতা, দাঁড়াও।”
জয়িতা প্রায় দৌড়োচ্ছে। একবার পিছন ফিরে দেখল। সামান্য গতি কমাল। থামল না। চলতে চলতে আচমকা পাখিদের চিৎকার চেঁচামেচি বন্ধ হয়ে গেল। ব্যাঙ্গেদের তুরুক নাচ থেমে গেল। ঘাড় তুলে দেখলাম মাথার ওপর থেকে মশার ঝাঁক উধাও। সামনে একটা ফাঁকা ঘাসজমি। একানে একটা চালা ঘর। পাশে পাতকুয়ো। সামনে একটা গোল পাথরে বাঁধানো ফোয়ারা। ফোয়ারার মাঝখানে একটা মার্বেল পাথরের নারীমুর্তি। জয়িতা থেমে পড়ল। আমিও হাঁফ ছেড়ে দাঁড়ালাম। একটা লোক ফোয়ারার কানার পাথরে খালি গায়ে উবু হয়ে বসে আছে। লোকটার পরণে নীল চেককাটা লুঙ্গি। সিড়িঙ্গে পাঁজর বার করা চেহারা। গায়ের চামড়ার ওপর ধূলোর আস্তরণ। সাতজন্মে চান করে বলে মনে হয় না। হাঁটুর ওপর রাখা হাতে বড় বড় ময়লা নখ। লোকটা আমাদের সাড়া পেয়ে ফিরে তাকাল। ড্যাবড্যাবে জলকাটা চোখ। কেউ যেন আলাদা করে চোখদুটো অক্ষিকোটরে গুঁজে দিয়েছে। ভালো করে বসে নি। তোবড়ানো মুখের বাইরে ঝুলে আছে। জয়িতার দিকে তাকিয়ে বলল, “এয়েছ? সেই কখন থেকে বসে আছি।”
জয়িতা অনিশ্চিত ভাবে বলল, “কেন আমার কি আসার কথা ছিল নাকি?”
লোকটা বলল, “সে কী, ছিল না? বলো কী?”
জয়িতা সন্দেহের চোখে তার দিকে তাকাল, “আপনি কি আমাকে চেনেন?”
লোকটা কালো কালো দাঁত বার করে হাসল। সোজা জবাব না দিয়ে বলল, “সে অনেক লম্বা গল্প। সময় থাকলে বলো, শোনাই।”
বেরোবার সময় দেখে এসেছি ফুলকপির পকোড়া ভাজার তোড়জোড় চলছিল। এতক্ষণে নিশ্চয়ই সেগুলো ছাঁকা তেলে ভাজা হয়ে থালায় উঠে পড়েছে। জয়িতা আমার মৃদু আপত্তিতে কান না দিয়ে ঘাসের ওপরেই বসে পড়ল। লোকটা খুশি হয়ে ফাটাফাটা ঘ্যানঘেনে গলায় গল্প বলতে শুরু করল, “একটা ফুটফুটে বাচ্ছা মেয়ে ছিল। মনে কর তার নাম ছিল ফুটকি।”
জয়িতা বলল, “মনে করব কেন? আপনি সত্যি গল্পটা জানেন? নাকি বানিয়ে বানিয়ে বলছেন?”
লোকটা বিরক্ত হয়ে বলল, “আঃ! শোনো না মন দিয়ে। ফুটকির মা ছিল না। সে বাবার সঙ্গে থাকত। তার বাবার পেশা ছিল ব্যাঙ ধরা।”
ওঃ! আবার ব্যাঙ! ব্যাঙ শুনেই জয়তি আগ্রহভরে এগিয়ে বসল। লোকটা বলে যাচ্ছে, “ফুটকি ঘরে রান্নাবান্না পড়াশুনো করত। আর তার বাবা আদাড় বাদাড় জলা জায়গায় ব্যাঙ ধরে বেড়াত।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “ফুটকির বাবা ব্যাঙ ধরে করত কী?”
লোকটা বলল, “সে সব আমি কী জানি? আমি মুখ্যু সুখ্যু মানুষ। ফুটকির বাবা ব্যাঙ ধরে কাঁচের বয়ামে ভরে রাখত। সে সব ব্যাঙ ভালো পয়সায় বিক্কিরি হত। ভদ্দর লোকেরা এসে কিনে নিয়ে যেত। ব্যাঙ গুলো যতদিন বাড়িতে থাকত, ফুটকি বয়ামের ঢাকা খুলে পোকা-টোকা খেতে দিত।”
আমি বললাম, “ফুটকির দয়ার শরীর।”
লোকটা কড়া চোখে আমার দিকে তাকাল। জয়িতা আমায় থামিয়ে দিল, “গল্পটা শুনতে দাও। মাঝখানে ফুট কেটো না।”
লোকটা আশ্বস্ত হয়ে আবার শুরু করল, “একদিন হয়েছে কী, যেই বয়ামের মুখ খোলা, একটা কোলা ব্যাঙ থপ করে বাইরে লাফিয়ে পড়ল। ফুটকি ধর ধর করে ছুটল। ব্যাঙটা ঘরময় লাফিয়ে বেড়াতে লাগল। কিন্তু ফুটকিও নাছোড়। ব্যাঙটাকে ধরবেই।”
লোকটা ভালো কথক। খানিকক্ষণ চুপ করে রইল। জানে কোথায় থামলে শ্রোতার ঔৎসুক্য বাড়বে। জয়িতা জিজ্ঞেস করল, “শেষ পর্যন্ত ধরতে পারলো?”
লোকটা বলল, “পারলো। আর তখনই সেই আশ্চর্য ঘটনাটা ঘটল। ফুটকি তাকে ছুঁতেই হতকুচ্ছিত ব্যাঙটা রূপ বদলে এক সুদর্শণ যুবাপুরুষ হয়ে গেল। তার ফর্সা গায়ের রঙ, এক মাথা বাবরি চুল, প্রশস্ত কপাল, টানা টানা চোখ, খড়গের মত নাকের নীচে সরু গোঁফ। ফুটকি তাকে দেখা মাত্রই ভালবেসে ফেলল।”
আমি বললাম, “আরে, এটা তো ঝাড়া গল্প। ফ্রগ প্রিন্স - গ্রিম ভাইয়েদের উপকথায় আছে।”
লোকটা আমার দিকে জ্বলন্ত চোখে তাকাল। পারলে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। জয়িতা বলল, “ওর কথা ছাড়ুন। আপনি গল্প বলুন।”
লোকটা আবার ধরল, “পুরোন দিনের কথা তো। তখন এসব আকছার হত। মজুমদার বাড়ির ছোটবউ ছিল ছদ্মবেশী ডাইনি। বড় বৌয়ের ছেলেকে তন্ত্র-মন্ত্র করে ব্যাঙ বানিয়ে দিয়েছিল। আর কে না জানে একমাত্র অনাঘ্রাতা কুসুমসম কোনো মেয়ের ছোঁয়া লাগলেই ব্যাঙ জন্মর অভিশাপ ঘোচে।”
লোকটাকে ভালো করে নজর করলাম। এখন আর লোকটাকে মূর্খ মনে হচ্ছে না। সে বিসদৃশ রকমের লম্বা জিভ বার করে শুকনো ঠোঁট চেটে নিয়ে আবার শুরু করল, “মজুমদাররা ছিল এই অঞ্চলের জমিদার। কী তাদের রমরমা। তখন এই বাড়িটাকে লোকে বলত রাজবাড়ি। মজুমদার কর্তার রোয়াবে বাঘে গরুতে এক ঘাটে চুকচুক করে জল খেত। একে অন্যের দিকে মুখ তুলে তাকাতে পর্যন্ত সাহস পেত না। ছেলে হারিয়ে ইদানীং কর্তা খানিক মুষড়ে ছিলেন। ছেলে বেঁচে আছে খবর পেয়ে ছুটে গিয়ে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।”
“আর, ছোট রানির কী হল?”
“তখন এই বাড়ির পিছন দিয়ে সরস্বতী নদী বইত। কর্তা সেই ডানকে হেটোয় কাঁটা দিয়ে নদীর চরে পুঁতে ফেললেন। কাক পক্ষীও টের পেল না।”
লোকটা এমন ভাবে বলছে যেন ঘটনাগুলো সচক্ষে দেখেছে, “ফুটকিকে দেখে এমনিতেই কর্তাবাবুর খুব পছন্দ হয়েছিল। ফুলের মত সুন্দর মেয়ে। যখন শুনলেন তার ছোঁয়াতেই ছেলে শাপমুক্ত হয়েছে তখন আর পায় কে? শঙ্খ বাদ্যি বাজিয়ে ফুটকিকে ছেলের বৌ করে ঘরে এনে তুললেন। দুবেলা কলমী শাক দিয়ে ভাত খাওয়া গরিব ঘরের মেয়ে এসে উঠল রাজপ্রাসাদে, যেখানে পঞ্চব্যাঞ্জন ছাড়া মানুষের মুখে এক গ্রাস ভাত ওঠে না।”
জয়িতা মন্ত্রমুগ্ধর মত শুনছিল। লোকটা দম নেবার জন্য থামতে বলল, “তারপর?”
আমি বললাম, “তারপর আবার কী? বিয়ের পর ফুটকি আর মজুমদার বাড়ির বড় ছেলে... কী যেন নাম... সুখে শান্তিতে অনন্তকাল ঘর সংসার করতে লাগল।”
লোকটা খুনে দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “তার নাম ছিল জয়ন্ত।”
আমি তার চাহনি নস্যাৎ করে দিয়ে জয়িতাকে বললাম, “চল জয়িতা, গল্প শেষ, এবার ফেরা যাক।”
লোকটা বলল, “হায় রে, গল্প যদি এখানেই শেষ হত, কী ভালোই না হত!”
জয়িতা বলল, “কেন, কী হল আবার?”
লোকটা চুপ করে থাকল, যেন বলতে কষ্ট হচ্ছে। তারপর থেমে থেমে বলতে লাগল, “বেশ চলছিল। কর্তা বাবু বড় রানিমা খুশি ছিলেন। প্রজারা খুশি ছিল। কিন্তু যা হয় আর কী। বড়লোকের ঘরের ছেলে। জমিদারের রক্ত বইছে শরীরে। জয়ন্ত বখে গেল। বড় কর্তার বয়স হচ্ছিল। আস্তে আস্তে জমিদারির ভার জয়ন্তর ওপর ছেড়ে দিচ্ছিলেন। সে প্রজাদের ওপর অনাচার অত্যাচার শুরু করল। রোজ জুড়ি গাড়ি হাঁকিয়ে বাজারি মেয়েদের ঘরে গিয়ে মদের ফোয়ারা ছোটাত। এমনকী ভদ্র গেরস্ত ঘরের মেয়েদের জ্বালাতন টানাটানি শুরু করল।
ফুটকি সব খবরই পেত। তার সোনার সংসারটা ছারখার হয়ে যাচ্ছিল। কর্তা বাবু আর রানিমা দুঃখে চোখের জল ফেলতেন। ফুটকি কাঁদত না। সে কাঁদলে যে সব ভেসে যাবে। সে মুখ বুজে ঘরের কাজ করত আর জয়ন্তর ঘরে ফেরার অপেক্ষা করত। তার সুখ দুঃখ বোধ ফিকে হয়ে যাচ্ছিল, ভোঁতা হয়ে যাচ্ছিল, সে খবর কেউ রাখত না। আসলে ফুটকি সমস্ত চোখের জল বুকের নীচে জমিয়ে রেখে দিত। কেউ দেখতে পেত না।”
আমি জয়িতার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। দেখছিলাম তার সুন্দর চোখ দুটো জলে ভরে উঠছে। সে চোখের কোণ থেকে জল সরিয়ে বলল, “ফুটকির কি কোনো অসুখ করেছিল?”
লোকটা মুখ তুলে ফোয়ারার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা স্ট্যাচুটার দিকে তাকালো। বলল, “অসুখ তো বটেই। না কেঁদে কেঁদে ফুটকির বুকের ভিতর উঁচু হয়ে পাথর জমছিল। দেখতে দেখতে একদিন সে সত্যি সত্যি পাথরের মূর্তি হয়ে গেল।”
আমি আর জয়িতা দুজনেই মুখ তুলে মূর্তিটার দিকে তাকালাম। সাদা মার্বেল পাথরে গড়া একটি মেয়ের দেহাবয়ব। সময়ের লাঞ্ছনা সহ্য করেও অটুট দাঁড়িয়ে আছে। সুন্দর মুখশ্রী। পাতলা ঠোঁট, ভাসা ভাসা চোখ। চিবুকের ডৌলটির থেকে চোখ ফেরে না। লোকটা গল্প বলা থামিয়ে চুপ করে বসে ছিল। মনে হল একটা অপার্থিব স্তব্ধতা আমাদের ঘিরে ধরেছে। একটু আগেও ঝিঁ-ঝিঁর ডাক শোনা যাচ্ছিল। এখন সব শুনশান। কেবল শুকনো পাতা পড়ার খস খস শব্দ উঠছে মাঝে মধ্যে। একটা ডাঁশ বোঁ বোঁ করে ঘুরছিল। সেটা লোকটার মাথার ওপর যেতেই লোকটা অসম্ভব ক্ষিপ্রতায় খপ করে হাতের মুঠোয় ধরে ফেলল। খসখসে ভাঙা গলায় বলল, “তারপর এক অদ্ভুত ব্যাপার ঘটল। জয়ন্তর চেহারায় আবার পরিবর্তন দেখা দিল। তার রাজপুত্রর মত চেহারা ভেঙ্গে পড়ল। গাল থেকে মাংস ঝরে গেল। চোখের নীচে গাঢ় কালি পড়ল। চোখ ঠেলে বেরিয়ে এল। গায়ের চামড়া পুরু হয়ে চাকা চাকা দাগ বেরল। সে কেবল বৈঠকখানা ঘরে জবুথবু হয়ে বসে থাকত। যেই তাকে দেখত, সেই বলত সে আবার ব্যাঙ হয়ে যাচ্ছে। কত ডাক্তার বদ্যি, কত চিকিৎসা কিছুতেই কিছু হল না। শেষে এক সাধু বাবা বললেন, ছোটরানি মরার আগে অভিসম্পাত দিয়ে গিয়েছিল। যতদিন ফুটকি ছিল সে অভিসম্পাত লাগে নি। ফুটকি পাথর হয়ে যাবার পর জয়ন্তর ব্যাঙ জন্ম আবার ফিরে আসছে। কর্তাবাবু তখন অশীতিপর বৃদ্ধ। তিনি সাধুবাবার পায়ে পড়ে ছেলের শাপমুক্তির উপায় চাইলেন। সাধুবাবা বললেন, জয়ন্তর পাপের শাস্তি তাকে পেতেই হবে। এই মজুমদার বাড়িতেই তাকে অপেক্ষা করতে হবে যতদিন না ফুটকি আবার ফিরে আসে। কেবলমাত্র ফুটকির ছোঁয়াতেই তার মুক্তি।”
লোকটা সোজা হয়ে বসল। টান লেগে পায়ের পাতার থেকে লুঙ্গিটা সরে যেতে দেখলাম তার পায়ের আঙ্গুলগুলো যেন চামড়া দিয়ে জোড়া। আমার শরীরের প্রতিটি রোমকূপ শিউরে উঠল। কোনো অজ্ঞাত বিপদের আশঙ্কায় মাংসপেশী শক্ত হয়ে উঠল। আমি জয়িতার হাত ধরে টানলাম। জয়িতা উঠে দাঁড়াল। লোকটা জয়িতার দিকে হাত বাড়িয়ে অনুনয় করে বলল, “ফুটকি, আমায় একবার ভালবেসে ছুঁয়ে দেবে না?”
হাজার হোক সালমন খানের একটা দায়িত্ব আছে। পাশে একটা মোটা সোটা শুকনো আমডাল পড়ে ছিল। আমি সেটা উঠিয়ে জয়িতাকে আড়াল করে দাঁড়লাম। বললাম, “কে ফুটকি? কাছে এসে দেখ না, ঠ্যাঙ ভেঙ্গে দেব।”
লোকটা বসা অবস্থা থেকেই লাফ দিল। অন্তত দশ ফুট দূর থেকে উড়ে এসে জোড়া পায়ে আমার বুকে লাথি মারল। তার রোগা ভোগা চেহারায় যে এমন অমানুষিক জোর থাকবে আমি ভাবতেই পারিনি। আলটপকা পড়ে গিয়ে শানের পাথরে আমার মাথা ঠুকে গেল। কোত্থেকে চোখের সামনে অজস্র হলুদ হলুদ সরষের ফুল ভেসে এল। আমের ডালটা হাতের মুঠো আলগা হয়ে ছিটকে গেল। জয়িতা সেটা কুড়িয়ে নিল। আমার চোখ খুলে রাখতে কষ্ট হচ্ছে। কারা যেন আমার আর জয়িতার নাম ধরে ডাকছে। গলার স্বর চেনা চেনা লাগছে। লোকটা জয়িতার পায়ের কাছে উবু হয়ে বসে আছে। বারবার বিনতি করে বলছে, “ফুটকি একবার আমায় ছুঁয়ে দাও। আমি মুক্তি পাই।”
জয়িতাকে মা দুর্গার মত লাগছে। কপালের মাঝখানে লেগে থাকা টিপটা তৃতীয় নয়ন। আমের ডালটা ত্রিশূলের মত তুলে ধরে আছে। সেটা দিয়ে একটা ঠেলা দিয়ে লোকটাকে মাটিতে ফেলে দিল। লোকটা কাঁদতে লাগল। জয়িতার পিছনে আনেক লোকের পায়ের শব্দ পাচ্ছি। সবাই আমাদের খুঁজতে খুঁজতে এসে পড়েছে। ঘোর কেটে আমার মাথা পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। আমি উঠে দাঁড়ালাম। লোকটা একবার মাথা তুলে আমার দিকে তাকাল। তার চোখে বিষদৃষ্টি। তারপর থপ থপ করে লাফাতে লাফাতে পালাল। তাকে শেষ দেখলাম কুয়োর শান বাঁধানো পাড়ে বসে আছে। তারপর সে কুয়োয় ঝাঁপ দিল। অনেকক্ষণ পরে একটা ঝুপ করে শব্দ হল। আমরা সবাই এগিয়ে গিয়ে দেখলাম কুয়োর তল দেখা যায় না। ঘন অন্ধকার।
জয়িতা আমার কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো, “তোমার লাগে নি তো?”
মাথার পিছন দিকটা বেশ ফুলে আছে। কিন্তু সালমন খানের ব্যথা বেদনা হতে নেই। আমি বললাম, “না না...।”
জয়িতা আমার হাতে টান দিয়ে বলল, “আমার খুব খিদে পেয়েছে। চল ফিরি।”

ফেসবুক মন্তব্য