আরোহী

বর্ণালী মুখোপাধ্যায়

অবশেষে সে বলেই দিল। রত্নেশ্বর যেন জবাবটা জানতোই, এমন ভাবে তাকে প্রশ্ন করলো - ‘স্বপ্ন আসে? আমাকে লজ্জা কোরো না বাপ। আমিও একের রকমের ডাগ্দার।’

গত মাস ছয়েক ধরে মাঝে মধ্যে সাপের গর্তে ঢুকে সে ঘুমিয়ে পড়ে। শরীর থেকে খোলসের মতো ঝরে পড়ছে শার্ট প্যান্ট অন্তর্বাস। সে নিজ উলঙ্গ শরীরটাকে কুঁচকে ঘুমিয়ে আছে। সাপটা তখন মাথার কাছে এসে বসে। তার শীত করে। তাই সে আরও কুঞ্চিত হয়ে যায়। আরও গুটিয়ে ভিতরে ঢুকে যায় তার শিশ্ন। কে যেন বলে - তুমি কি পুরুষ? তুমি কি পুরুষ!

এই স্বপ্ন বিবরণ শুনে তান্ত্রিক রত্নেশ্বর হাজরা বললো - ‘তালেই হয়েচে। তোমার ঘুমিয়েও লিঙ্গোথ্থান হয় না! তবে স্বপ্নে সর্প যখন আসে, সন্তান আসবে আবার তোমার ঘরে, গ্যারেন্টি! তবে তুমি বাপু বড়ো মেনিমুখো।’

মগরা ধুপের নাক জ্বলানো গন্ধে শ্রীমন্ত এমনিই অবশ বোধ করছিল, মেনিমুখো শুনে সে একটু নড়েচড়ে বসে। বললো - ‘না তেমন কিছু না। আমার সন্তান চাই আর একটি। আগের মতো স্বাভাবিক হয়ে যাক সব কিছু। জানেন, সব নর্মাল ছিল। তিন্নি যতোদিন ছিল-’

রত্নেশ্বর বাধা দিলো -‘তিন্নি মানে তোমার সেই মরা মেয়ে?’

শিউরে উঠলো শ্রীমন্ত, - ‘ও ভাবে বলবেন না বাবা।’

রত্নেশ্বর হোহো করে হেসে উঠলো। এমনিতে এতো ক্ষণ কালো শার্ট আর লাল লুঙ্গিতে অতো ভয়াবহ লাগছিল না রত্নেশ্বরকে। হাতের আঙটি আর বগলের কাছে বাঁধা তাবিজে প্রতিফলিত হচ্ছিল ঘরের গুমোট আলো। কিন্তু এই হাসিটা বড় বীভৎস হয়ে কানে লাগলো শ্রীমন্তর।

অথচ উপায় নেই। নীলকান্তবসাক লেনের এই বাড়িতে যে একবার পা রেখেছে, তার ফেরার পথটি বন্ধ। নিষ্ক্রমণহীন এই গলিতে সে এসে পড়লো একটি দীর্ঘতর যণ্ত্রনার পরে।

মিতা শ্রীমন্তের মাঝখানে তিন্নি ছিল মোটে তিনটি বছর। জ্বরটার কি যে নাম ছিল, সরকারি ডাক্তাররা বলতে পারে নি। এমার্জেন্সি থেকে আই সি ইউ পৌঁছানোর আগেই হিসেব শেষ। প্রাইভেট নার্সিংহোম কনসাল্ট করার সুযোগ অবধি পেলো না। অনামী সংবাদপত্র লিখলো ‘অজানা জ্বরে শিশু মৃত্যু।’

তিন্নি চলে গিয়েছে তারও তিন বছর হয়ে গেলো। অথচ চলে গিয়েও সে যেন রয়ে গেল নিরেট অন্ধকারের মতো। অকাল মৃত্যুটি তুমুল শোক নিয়ে এসেছিলো। আর সেই সন্তাপের হাত ধরে আত্মীয় পরিজন রাত দিন---শোকের তো নিজস্ব ভার থাকে। সে ভরে রাখে। তারপর শোক ধীরে ধীরে শূন্য হয়ে গেলো। কি গহন গহ্বর! শ্রীমন্ত হাত বাড়ালো এক রাতে- তখন বছর খানেক হয়ে গিয়েছে। দুজনের মাঝের সেই পরিখার ভিতর থেকে ডাকলো - ‘মিতা! এসো। আবার চেষ্টা করি।’

মিতা স্থির পাতাটির মতো পড়ে থাকলো বিছানার কোণ ঘেঁষে। তার হাতটা ধরে আলতো টান দিতেই সে বললো - 'ছিঃ। তোমার শখের বলিহারি!’

সমস্ত ইচ্ছে সেই মুহূর্তে ফাঁকা ঘরে ঢুকে গেলো। শ্রীমন্ত মরা হয়ে পড়ে থাকলো। সকালে উঠলো, যেমন মরা ওঠে, নিষ্প্রাণ ভাত সব্জির দলা গিলে অফিস গেলো, এলো। সন্ধের দিকে দেখলো তাদের একতলার ঘর গুলিতে আলো জ্বলে নি। মিতার লম্বা চুলে বিশৃঙ্খল জট।

সেই প্রলম্বিত জট রাতগুলিতে জটিল হয়ে উঠলো। কতো বৃষ্টি এলো, জুঁই ফুল গন্ধ ছড়ালো, আকাশে চাঁদ উঠলো। তার ইচ্ছেরা ফিরে ফিরে আসতে লাগলো। কতোদিন বাবা বলে ডাকে নি কেউ। মিতা সেই স্থির পাতাটির মতো ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে বলে - ‘তুমি আবার বিয়ে করো। শুধু আমাকে রেহাই দাও। ও সব আমার দ্বারা হবে না আর।’ মিতা আর সন্তান চায় না। একটা শূন্যতা শরীরে বুকে ধারণ করে মিতা দিব্য দিনরাত কাটাতে লাগলো। মাঝে মধ্যে শ্রীমন্ত ভাবে এই শোক শোক ভাবটা আদতে মিতার চালাকি। মিতা ঝাড়া হাত পায়ে থাকতে চায়। প্রবল রাগে এক ছুটির সন্ধেবেলা সে হামলে পড়ে মিতার উপর। লম্বা চুল হাতে পেঁচিয়ে কুৎসিত টান দিলে মিতা চিৎকার করতে গিয়েও জিভ গুটিয়ে নেয়। দাঁতে দাঁত চেপে পটাপট নাইটির বুকের বোতাম খুলে বলে - আয়! কি চাই তোর? এই তো?

শ্রীমন্ত সেই উদোম নারীর সামনে দৃশ্যত বরফ হয়ে যায়, অথবা লেজ গুটোনো কুকুরটা... কতো জোরে জোরে সেদিন থেকে টিভি চলতো ওদের বাড়ি।

একদিন অফিস-ফেরত শ্রীমন্ত বিজ্ঞাপনটা দেখেছিল। লাল টিনের বোর্ডে কালো দিয়ে লেখা। সিদ্ধ পুরুষ রত্নেশ্বর। স্বপ্নদোষ থেকে বশীকরণ সবেতেই সিদ্ধ হস্ত।

তার আগে অবশ্য সে গেলো মনোবিদ অলোকেশমামার কাছে। স্বপ্নটুকু বলবো বলবো করেও বলে না শ্রীমন্ত। বাকি সব কিছু বলে দেয় সে। বলে - ‘লাইফটা নর্মাল করতে চাই মামা। মিতা কেন আর চায় না... আমার কি দোষ বলুন তো?’

পুরোদস্তুর সহানুভূতি নিয়ে তার কথা শুনলেন মামা। বললেন - ‘খুব স্বাভাবিক। তবে মিতাকেও সময় দাও। ওষুধ দিচ্ছি। ধীরে ধীরে ডিপ্রেশনটা কাটিয়ে উঠবে। আর তোমাকেও শক্ত থাকতে হবে বাবু। ধৈর্য রাখো।’

এ সব শুনে আরও কুঁকড়ে যায় শ্রীমন্তের ইচ্ছেগুলো। যেন সে একটি কামুক। যৌন তাড়নায় বৌটাকে জ্বালিয়ে মারছে। লোকগুলি তাকে কি ভাবে কে জানে! ডিপ্রেশনের ওষুধ গুড়িগুড়ি ধুলোবালি হয়ে গোদরেজ আলমারির তলায় জমা হয়।

সর্প-দর্শন স্বপ্ন হয়ে ফিরে আসে ভোর রাতে প্রায়ই। অবশেষে করবো না ভেবেও এক দুপুরে সিদ্ধ পুরুষকে ফোন করে সে। অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়েছিল সেদিন। সেই লাল বিজ্ঞাপনটার কাছে এসে উসখুস করে তার মন। দুবার ভুল নম্বর ডায়াল করে তিনবারে লেগে যায়। সিদ্ধপুরুষ তখনই ডেকে নিলো তাকে।

তাণ্ত্রিক কানে খড়কে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বললো - ‘বুজলুম। এই পুরিয়া নাও। জাফরানি দুধ সহযোগে সেবন করবে। ঠিক বারোটা বাহান্ন মিনিটে উপগত হবে। সন্তান অনিবার্য।’

সে ইতস্ততঃ করে বললো - ‘আমার ওয়াইফ, মানে, সে ঠিক চায় না।’

‘ন্যাকা বটে। সাধে মেনিমুখো বললুম।’ আবার খুব অস্বাভাবিক হাসি হাসলো লোকটি। তারপর খাদের কাছে স্বরটি নামিয়ে সে বলে দিলো - ‘সে যে তার চারপাশে আছে, বোঝ না কেন?’

-কে?

-‘তোমার মেয়ে। সে যায় নি এখনও। তোমার বৌকে বেঁধে রেখেছে।’

কেঁপে উঠলো শ্রীমন্ত। সে বিজ্ঞানের ছাত্র,তাও কেঁপে উঠলো।

এই বদ্ধ ভূমির মতো ঘর, আগলরুদ্ধ, অসহ্য ভারী ধূপের গন্ধ, জানলার ওপারে অস্তমিত দিন, সকলে তার কানে ফিসফিসিয়ে বলতে লাগলো - সে আছে, সে আছে।

তারা মেঝেতে একটা ময়লা লাল কার্পেটের উপর বসেছিল। সামনে একটা বেঁটে ডেস্ক পেতে রত্নেশ্বর বসেছিল ওপাশে। রত্নেশ্বর এবার বললো - ‘তুমি বলছি বলে রাগ করো না। আমার চেম্বার দেখে হালও ছেড়ে দিও না। ইচ্ছে করলেই এসিফেসি লাগাতে পারি, বুজলে কিনা।’

সে চুপ করে আছে দেখে আবার বলতে লাগলো - ‘ঐ যে মায়ের ফটো দেখছো, সে আমাকে আগে থেকে বলে সব। এক অঘোরপন্থী আমার চারপাশে আমাকে ঘিরে রখে, যাক গে যাক। শোন, এই পুরিয়ার ভস্মটুকু সেবন করো। বৌমাকে ভালোবেসে চাট্টি কথা বলো। আর সে ঘুমুলে এই লাল সুতো তার বাম হস্তে বেঁধে দেবে। চুপিসারে। বুঝলে?’

শ্রীমন্ত বললো-আচ্ছা।

তান্ত্রিক বললো -‘আগামী অমাবস্যায় একটা হোম করবো। খরচ পড়বে তিনহাজার।’

শ্রীমন্ত বললো-বেশ।

রত্নেশ্বর বললো-সস্ত্রীক আসতে হবে কিন্তু।

শ্রীমন্ত বললো-আচ্ছা।

আর কথা জমলো না দেখে সিদ্ধ পুরুষ হাত পাতলো। এবারের ফিজ পাঁচশো টাকা।

বাইরে তখন জমকালো একটা সন্ধে ঘনিয়েছে। এই গলিটার রংচটা বাড়িগুলো এতো কথা বলছিল, এতো টিভি চলছে, গান বাজছে, যেন কি উৎসবমুখর পৃথিবী, কোথাও শোক নেই, শোকের পরের শূন্যতা নেই - হঠাৎ মনে হলো সে যেন জীবনের মাঝখানে এসে দাঁড়িয়েছে।

গলির পরে বড়রাস্তা। কতিপয় জীবিত ট্রামের একটা ধীরে ধীরে চলেছে। বাসগুলি লোক ভরার ব্যবসায় আপ্রাণ লড়ে যাচ্ছে - কোথা থেকে একটি নরম বাতাস এসে শ্রীমন্তকে বলে - সে আছে। যায় নি এখনও। বাস ট্রাম বা অটো না ধরে বাড়ির দিকে সে হাঁটতে শুরু করে। তার হাতে পুরিয়াটি ধরা। কারণ না কাচা প্যান্টটি অশুদ্ধ বলে পুরিয়া পকেটে ঢোকাতে না করেছে রত্নেশ্বর। গুণ নষ্ট হবে। সমস্ত রাস্তা হাতের মুঠোয় নিয়ে যেতে হবে তাকে। শেয়ালদার বাজার থেকে জাফরান কিনতে হবে। লাল সুতো বাঁধতে হবে মিতার কব্জিতে।

বাবা-

হঠাৎ ভয়াবহ চমকে গেল শ্রীমন্ত। রিনরিনে গলায় কে ডাকলো তাকে? সে তখন প্রাচী সিনেমার সামনের ফুটপাথে। চারপাশের শোরগোলের মধ্যেও স্পষ্ট শুনেছে সে - ‘বাবা’। চোখ নামিয়ে নিচে তাকিয়ে দেখে কুচকুচে কালো হাত তার হাঁটুর কাছে। মাথার লালচুলে জটা, বড় চোখ দুটোতে আকুল খিদে। মেয়েটা তোতাপাখির গলায় ভিক্ষে চাইছে -‘ও বাবা, ও চাচা, ও আঙ্কল, দশ রূপেয়া দাও। ভুখ লেগেছে।’

সে তিন্নির মতো নয়। কিন্তু অবিকল তিন্নি। তাকে বাবা বলে ডাকলো। বড় চোখদুটোতে তখন ভয় আর বিস্ময়। শ্রীমন্ত ফিসফিস করে বললো - ‘কি বলছিলি? আবার বল!’

মেয়েটা বুঝতে পারে না, কি হচ্ছে। ‘মেরি গলতি নহী’ এমন আগড়ম বাগড়ম বকতে বকতে সে পিছু হটতে গিয়ে হোঁচট খায় আর দৌড়ে একটু দূরে বসে থাকা এক মহিলার পিছনে লুকোয়।

শ্রীমন্ত আকুল নেশার ঘোরে সেখানে ছুটে গিয়ে মহিলাকে বলে - ‘তোমার মেয়ে ঐটে?’

ঘাঘরা পরা লাল চুল মহিলা খিঁচিয়ে ওঠে - ‘তো! তুম ক্যায়া করোগে! হামে সব সমঝ মে আতা হ্যায়। গন্দা আদমি! বুরহি নজর। বাচ্চিকো ভি নহী ছোড়তা!’ মহিলা মেয়েটার হাত ধরে শেয়ালদা স্টেশনের দিকে হনহনিয়ে হাঁটতে থাকে।

শ্রীমন্তের কানে ঐ সব বাজে কথা কিছুই ঢোকে না। সে ওখানে দাঁড়িয়ে থাকে দু মুহূর্ত। ভিখারি মহিলাটি ব্যবসায়ী ও সাবধানী। লোকটা পুলিশের লোক হতে পারে আঁচ করে ভিড়ে মিশে যায় দ্রুত। আর শ্রীমন্ত দেখেছে ছোট মেয়েটা দুবার পিছন ফিরে দেখেছে তাকে।

সত্যিই তিন্নি কোথাও যায় নি তো। তারও চারপাশে তিন্নি আছে! কান পেতে রাখলে হাওয়ায় সে আদুরে গলায় ডাক দেয় - বাবা।

ধুস---- বলে হাতের পুরিয়া আর লাল সুতোটা ছুঁড়ে ফেলে দিলো সে।

তারপর শতাব্দী ছোঁয়া চাপাতার দোকান থেকে দুশো গ্রাম দার্জিলিং চা পাতা কিনলো।

তারপর বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগলো।

ফেসবুক মন্তব্য