জাতীয়তাবাদের সাম্প্রতিকতা ও রবীন্দ্রনাথ

পল্লব গাঙ্গুলি

সৃজনে-মননে-নন্দনে তিনি ছিলেন। আছেন। থাকবেনও। কিন্তু সুরের নন্দন, ছন্দের শ্রুতি, নাটকের দর্শনের বাইরেও কোথায় যেন তাঁকে প্রাসঙ্গিক মনে হয় অন্য কারণেও।

RSS এর শিক্ষা শাখা বিদ্যাভারতীর General Secretary দীননাথ বাটরাকে মনে পড়ে? NCERT এর পাঠ্যপুস্তক নিয়ে তিনি আপত্তি তুলেছিলেন। কিছু মানবিক আদর্শের বিপ্রতীপে জাতীয়তাবাদের অবস্থান চিহ্নিত করে তার পক্ষে রবীন্দ্রনাথের ধারণা ব্যবহার করেছেন NCERT। বাটরাজি তারই বিরোধিতা করেছিলেন কিছুদিন আগে।
."...... the Class X English textbook “places nationalism against other ideals” as “an attempt has been made to show a rift between nationality and humanity by citing thoughts of Rabindranath Tagore”.

বিষয়টা এ কারণে নয় যে রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতিতে-মননে-চেতনায় সংশ্লেষনবাদী বা সমগ্রতাবাদী ছিলেন। বরং আরো categorically বলা যায় মানবসভ্যতার সাংগঠনিক ভাবনায় “জাতীয়তাবাদ” বিষয়টাও তাঁর কাছে ছিল আর পাঁচটা খণ্ডচেতনার মতোই। যা মানবসভ্যতাকে ভিতর থেকে ভেঙে ফেলে।
“গোরা”, “চার অধ্যায়” বা “ঘরে বাইরে”র সৃজনাত্মক implication এ জাতীয়তাবাদী চেতনার অন্তঃসারশূন্যতার প্রতি ইঙ্গিত না হয় ছেড়েই দেওয়া গেল। “Nationalism” এ জাতীয়তাবাদী চিন্তার অসংবেদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তাঁর ঐ সূচিমুখ আক্রমণ, সতর্কবাণী আর মরমি আবেদনকেতো উপেক্ষা করা যায় না!

Political philosophy হিসেবে nationalism এর conceptটা রবীন্দ্রনাথের“ Nationalism” এর প্রকাশকাল পর্যন্ত ছিল মাত্র আশি বছরের পুরনো। সত্যদ্রষ্টার বোধিতে তাঁর ভবিষ্যত ভয়াবহতা ধরা পড়ার পক্ষে এই সময়টা যথেষ্টই।

ইউরোপের অতিখণ্ডচেতনা, আঞ্চলিক সংস্কৃতির বৈচিত্র্য, সম্পদের অপ্রাচুর্য, আর ঔপনিবেশিক প্রতিযোগিতার অনিবার্য স্বার্থ-সংঘাত জাতীয়তাবাদ লালনের জন্য ছিল আদর্শ। কিন্তু ঠিক বা ভুল, রবীন্দ্রনাথের মনে হয়েছিল ভারতীয়দের চিরকালীন প্রকৃতি বা সমাজবন্ধনের চারিত্রিক লক্ষণের সঙ্গে এই আমদানিকৃত জাতীয়তাবাদ একেবারেই যায় না।

তিনি ইঙ্গিত করেছিলেন মানবিক বন্ধন আর সমগ্র মানবিক চেতনাকে এই স্বার্থসর্বস্ব জাতীয়তাবাদ ধ্বংস করে। ইউরোপের আত্মক্ষয়ী প্রথম বিশ্বযুদ্ধই তার প্রমাণ।

জাতীয়তাবাদের মধ্যেই কি নিজস্ব সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের দুর্মর আকাঙ্ক্ষা, প্রতিবেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় আঞ্চলিক প্রভূত্ব নিয়ে কামড়াকামড়ি আর অন্যের অনেক বড় স্বার্থহানির বিনিময়েও নিজের অতি ক্ষুদ্র স্বার্থরক্ষার তাগিদ লালিত নয়?

তা হলে আদর্শ হিসেবে জাতীয়তাবাদ তো নিন্দনীয়ই। অন্তত অখণ্ড মানবসভ্যতা আর মানবকল্যানকে অগ্রাধিকার দিতে হলে।

মূদ্রার আরও একটা পিঠ অবশ্য আছে। কোন দেশ এই মুহূর্তে জাতীয়তাবাদী নয়? বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের অন্তরে প্রবহমাণ শোষিত মানুষের মুক্তির অখণ্ড চেতনা! সমস্ত খণ্ডচেতনার বিপ্রতীপে দুনিয়ার শোষিত মানুষের কল্যাণে একটাই মাত্র আহ্বান ছিল। কিন্তু ট্রাজেডিটা অন্যত্র। সেই সমাজতন্ত্রের সবথেকে বড় অনুসরণকারীর মধ্যেও সুতীব্র জাতীয়চেতনা। সেই আঞ্চলিক প্রভূত্ব কায়েমের অদম্য লোভ! জাতীয় স্বার্থের সুরক্ষায় দরকারে সন্ত্রাসবাদী দেশকেও মদত দাও। ছোট্ট স্বাধীন দেশের সার্বভৌমত্ব ছিনিয়ে নাও। এটা প্রয়োগ বা উপায়ই নয় শুধু। বহূক্ষেত্রে pragmatic ideologyও।

ইদানিং কেউ কেউ লিখছেন রবীন্দ্রনাথ সাম্রাজ্যবাদ অার জাতীয়তাবাদ কে অালাদা করতে পারেননি বা অালদা করতে চাননি। বিষয়টা হয়তো এরকম একমাত্রিক নয়। রবীন্দ্রনাথ অাগেই অনুমান করেছিলেন যে শেষ পর্যন্ত জাতীয়তাবাদী চেতনার ক্রমিক পরিণতি এক অসংবেদী প্রভূত্বরাজে। নিজের শ্রেষ্ঠত্ব কায়েমে সর্বাত্মকবাদ (Totalitarianism) ও তারপর অনিবার্য এক বৃহত্তর সংস্করণের ফ্যাসিবাদ ও রাজনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ তারই বিবর্তিত স্তর!

ধর্মীয় সাম্রাজ্যবাদও সারা পৃথিবীতে নিজেদের ছড়াতে চেয়েছে অন্যধর্মের দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে ও শক্তির যথেচ্ছ প্রয়োগে। আপাতদৃষ্টিতে একছাতার নীচে আনার প্রচেষ্টার অন্তরালে রয়েছে আঞ্চলিক সংস্কৃতির অস্তিত্ব বিপন্ন করে ভয়ঙ্কর সর্বগ্রাসী এক আগ্রাসনের লালন। সেই ভৌগোলিক ও সাংখ্যিক বিস্তার চেতনার বিবর্তন সুনিশ্চিত করেনি এতটুকু! এটাও খণ্ডচেতনা। বরং আরো ভয়ঙ্কর মাত্রার।

এই গো-সর্বস্ব সরকারের কাছ থেকে কোথাও কি জাতীয়তাবাদের বিকল্প হিসেবে অন্যকিছুর প্রতিশ্রুতি ছিল? বরং এটাই কি পূর্বানুমিত ছিল না যে ক্ষমতায় এলে সংখ্যাগুরুর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে জাতীয়তাবাদের নতুন সংস্করণ রচনা করবেন এঁরা? তাহলে দীননাথ বাটরা অন্যায়টা নতুন করে কি বলেছেন? তাঁর সঙ্ঘবিশ্বাসের কোণ থেকে এটা বলাই তাঁর পক্ষে স্বাভাবিক ছিল।

ভাবাবেগের উপরে উঠে একটু যুক্তিবাদী হতে অসুবিধা কী আমাদের? রবীন্দ্রনাথ এগিয়ে ছিলেন কয়েক প্রজন্ম আমাদের থেকে। তিনি তো জাতীয়তাবাদের বিরোধীই ছিলেন। বারবার তাঁর কথা গান্ধী সুভাষকেও কি বিব্রত করে নি? “জাতীয়তাবাদী” চেতনার বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ-রোঁলার প্রচারের বিরোধিতা কি সমগ্র ইউরোপ আমেরিকা জাপান করে নি বারবার? দীননাথ তো বরং "rift" কথাটা ব্যবহার করেছেন। জাতীয়তাবাদ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের ভাবনা জাতীয়তাবাদ আর মানবিকতার মধ্যে ফাটল কেন, বলা উচিত ফাঁক তৈরী করেছে। রবীন্দ্রনাথ নির্দ্বিধ কন্ঠে বলছেনই তো মানবিকতার সঙ্গে জাতীয়তাবাদ যায় না। মানবকল্যাণের উদ্দেশ্যে রচিত সমস্ত পরিশীলিত সংবেদ আর নিঃস্বার্থ মরমি চেতনার বিপ্রতীপেই জাতীয়তাবাদের অবস্থান।

পূর্বতনদের মতো ওঁরাও যদি ক্ষমতার অপব্যবহার করে পাঠক্রম নিয়ন্ত্রণ করতে চায় করুক। ওঁদের হাত ধরে রবীন্দ্রনাথের স্বীকৃতির দরকার নেই। আদর্শ হিসেবেই হোক বা প্রত্যুত্তরী Necessary evil হিসেবে, জাতীয়তাবাদের দাপাদাপি যতদিন চলবে ততদিন অন্তত এই প্রশ্নে রবীন্দ্রনাথ দূরেই থাকুন। রবীন্দ্রনাথের জন্য না হয় মানুষ অপেক্ষা করুক আগামী শতাব্দী পর্যন্ত। পৃথিবী প্রস্তুত হোক ততদিনে অখণ্ড মানবসভ্যতার জন্য।

ফেসবুক মন্তব্য