ধুলি-ধূসরিত ঐ ঘ্রাণ

সমরজিৎ সিংহ

একটিই শব্দ, আমি, তার রূপ নয়, ঘ্রাণ নিই, না, এটা বকুল নয়, বকুলের গন্ধে আশ্চর্য এক বিষাদ লেগে থাকে, ঝরে যাওয়ার সেই বিষাদ স্পর্শ করে আমার লেখাকে, এই শব্দে বকুলের ঘ্রাণ নেই, বকুল নয়, আজ আমি চাইছি বিষাদ নয়, কবিতা হয়ে ওঠুক অন্নময়, বলি, অন্নহীনে অন্ন দাও, বস্ত্রহীনে বস্ত্র । এই উচ্চারণ তদগত, আবার অর্থহীনও, কেন না, কে দেবে এই অন্ন ? সকল অন্ন যার ঘরে, সে এক বধির বনিকদেবতা, জনগণেশের তিনিই কুবের । বধির যেজন, শব্দ তার কাছে বৃথা-অস্ত্র, সে জানে গন্ধ বয়ে নিয়ে আসে অঘ্রাণের মোহ, যা মূলত বিষাদসম্ভব ।
তা হলে, কি করে বিশ্বাস করি ঐ শব্দরূপ, যার গন্ধ বকুল নয় ? আমি মুছে ফেলতে চাই ঐ শব্দরূপ, যা মূলত আমারই প্রতিকৃতি, যা আমি আঁকতে চেয়েছি সেই ঊষাপৃথিবীর আগে, অন্ধকার ও আলোর আগে ! বলি বটে ! ঐ গন্ধ তা হতে দেয় না, বরং তাতিয়ে তোলে ! তা হলে, এই গন্ধ কি যৌনতার দূত মাত্র ? সৃষ্টি যৌনতার ফসল, আবার হন্তারকও ! এই স্ববিরোধী ভূমিকা, তার ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়া থেকে জন্ম নেয় আশ্চর্য মধুর এক বিষাদ, তা না হলে, সকল রস হয়ে ওঠত নশ্বরের দাস । এই নশ্বর রূপ বকুলের গন্ধে নেই, আছে শুধু ঝরে পড়ার ঐ বিষাদ, যা ধরে রাখে বকুল তার ঐ গন্ধে !
কবিতাও কি বকুলের ঝরে পড়ার বিষাদসম্ভব গন্ধ মাত্র, যার কোনো সংজ্ঞা নেই ? এই কারণেই কি শব্দচয়নের ক্ষেত্রে আমাকে তার ঘ্রাণ জেনে নিতে হয় প্রতিমুহূর্তে ? নীহারিকাপুঞ্জ থেকে প্রতিদিন যে ছাই পড়ে, ভেসে থাকে আকাশে, তার গন্ধ কুয়াশার ভেতর স্পষ্ট টের পাই আমি । ঐ ছাই-এর কণা থেকে বিজ্ঞানসাধক জেনে নেবেন তার মৌলরূপ, আর আমি জেনে নিই নশ্বরতার বিষাদ এই কণায় লেগে আছে কি না ! অপলক চেয়ে দেখি, ছাইফুল ফুটে আছে সমগ্র আকাশ জুড়ে, আর ঐ নিশিরূপ, তার অনির্বচনীয় শূন্যতার থেকে ক্রমে ছড়িয়ে পড়ছে আশ্চর্য এক গন্ধ, মাতাল করে তুলছে এই মরপৃথিবীকেও, সেই নেশা সহস্র বোতল ভদকার চেয়েও বেশি ।
শব্দেরও প্রকারভেদ আছে, রস আছে, গন্ধ আছে, নেশা আছে । ভর আছে, ভার আছে । এ ছাড়া আছে কিছু দাবিও । একটি কবিতা হয়ে উঠতে গেলে, মেনে নিতে হয় শব্দের ঐ দাবি বা আবদার । না মেনে নিলে সে হিসি করে, তার ঐ বিটকেল গন্ধ ক্ষুণ্ণ করে তোলে কবিতাকে । আর তার আবদার মেনে নিলে, সে তখন দৈববলে হয়ে ওঠে বলীয়ান, কবির অজ্ঞাতে নিজেই ডেকে আনে বাকিদের, শুরু করে রস-কীর্তন । কবি তখন থাকে এক ঘোরের ভেতর, আসলে মেতে থাকে রূপ-রস-গন্ধ ও স্পর্শের এক পরাজগতের আনন্দে ।
আমি ঐ পরাজগতের কথা লিখি আমার গল্প ও কবিতায় । 'অতিজীবিত', আমার ঐ উপন্যাসের প্রথম অধ্যায় তো ঐ গন্ধের উৎস সন্ধানে কেটে গেল ! মাথা ধরে যাবার উপক্রম হযেছিল সেখানে । এই মাথা ধরা নেই কবিতায় । আমি শুধু লক্ষ্য করি, কিভাবে চলে আসছে পংক্তির পর পংক্তি, ঐ ঘ্রাণ পেয়ে...
দেখ, নুলো, ছিন্নজিহ্বা, অন্ধ এক প্রেত
এসেছে তোমার ঘরে, দূর দেশ থেকে,
মরুভূমি, উপত্যকা, নদী ও পাহাড় পার হয়ে
বাঁ পা নেই, কাঁটাঝোঁপে ক্ষত ও বিক্ষত
দরজায় বাইরে দাঁড়িয়ে
আছে, তাকে স্থান দিও টানা বারান্দায় ।
ও কিসের গন্ধ ? নাকে ভরে নিচ্ছে ঘ্রাণ,
মনে হয়, বহুদিন অভুক্ত সে, তাকে
খেতে দিও ক্ষুদ-কুঁড়ো, অক্ষরের 'পরে
লেগে থাকা ধুলি সহ ইতিহাসবোধ,
ঘরের ভেতরে যেন ঢুকে
না পড়ে, খেয়াল রেখ, পিতৃপরিচয়
সহ তছনছ করে দিতে পারে এক লহমায়
জমে থাকা চাপা হাহাকার...
এই পংক্তিগুলি এসেছে ধুলিধূসরিত ঘ্রাণে, অনুভব করি, এক বিপর্যস্ত পথিকের পদশব্দ, অবর্ণনীয় সেই শব্দ, কিছুটা ভুতুড়ে, দু-পায়ে চলা কোনো লোকের নয়, বরং মনে হল, এক পা টেনে টেনে, আসছে ! দরজা খুলে, দেখি, নুলো, অন্ধ এক প্রেত ঘরের সামনে ।
তারপর, সে নিজেই লিখিয়ে নিল বাকি পংক্তিগুলি !
কবিতা, এইই, অনুভূতি, বোধ আর দেখার, আর কিছু নয়, শুধু ঐ পরিভ্রমণ...

ফেসবুক মন্তব্য