শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোট গল্প

সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়

আমার বইয়ের আলমারিতে শুধু একজন লেখকেরই সম্পূর্ণ সাহিত্য-সমৠভার আছে – সেটি হল শরদিন্দু অমনিবাস। মুম্বাই ব্যস্ত শহর, সারাদিন কাজেকর্মে কীভাবে কেটে যায় তার হিসেব থাকে না। বই পড়ার অবসর পাই রাত্তিরে ঘুমোতে যাবার সময়। তখন আর সিরিয়াস কিছু পড়তে ইচ্ছা করে না। চোখ বুজে বইয়ের র্যাকক থেকে শরদিন্দু অমনিবাসের একখণ্ড বের করে পড়তে শুরু করি। পড়তে পড়তে ঢুলি, স্বপ্ন দেখার আয়োজন সম্পূর্ণ হয়। এই সব ব্যক্তিগত সাতকাহনের উদ্দেশ্য হল শরদিন্দু বন্দ্যোপাঠ্যায়ের গল্প নিয়ে কিছু কথা বলা। তাঁর মতো নির্ভার অথচ বুদ্ধিদীপৠত লেখা সম্ভবত বাংলা ভাষায় আর কেউ লেখেননি, যেমন অসাধারণ উইট, তেমনই ঠাসবুনোন প্লট।

শরদিন্দুর গল্পে আমার সব থেকে প্রিয় চরিত্র হল – বরদা। একটা গল্প পড়ছিলাম - “প্রেতপুরৠ€â€à¥¤ বরদার সঙ্গে প্রায়ই ভূতের মোলাকাত হয়, অন্তত বরদা তাই দাবী করে। “ব্যোমকেশ ও বরদা” বলে একটা গোয়েন্দা কাহিনীও আছে। সেই গল্পে বরদা বলছে, মামাতো ভাইয়ের বিয়ে উপলক্ষে কোন গণ্ডগ্রামৠ‡ গেছে। রেল স্টেশান থেকে এক ক্রোশ কাদা ঠেলে হেঁটে বরযাত্রীরঠযখন বিয়ে বাড়িতে উপস্থিত হয়েছে তখন বর থেকে নাপিত কাউকে চেনা যাচ্ছিল না। কেবল মেসোমশাই গোঁফ থেকে কাদা নিংড়োতে নিংড়োতে কাকে à¦–à¦¿à¦à¦šà§‹à¦šà§à¦›à¦¿à ²à§‡à¦¨, গলার আওয়াজে তাঁকে শনাক্ত করা গেল। অসাধারণ ইমেজারি তাই না! এমন আরো অনেক ছবি পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছে। একসময় সিনেমার জন্য চিত্রনাট্য লিখতেন, তাই গল্পগুলির গঠনও বেশ সিনেম্যাটঠক। এই ইমেজারির জন্যেই সম্ভবত এখনও শরদিন্দুর গল্প নিয়ে সিনেমা তৈরি হচ্ছে। অবশ্য গড়পড়তা নস্ট্যালজি ক বাঙ্গালীর ওপর ব্যোমকেশ বক্সীর সম্মোহনও এর একটি বিশেষ কারণ।

আলোচনা শুরু হয়েছিল ছোট গল্প নিয়ে, শরদিন্দুর ছোট গল্প কেন এখনও এত জনপ্রিয়? এই পরিসরে খুঁজে দেখা যাক আদর্শ ছোট গল্পের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য কী কী হওয়া উচিত এবং তার মধ্যে কতগুলি শরদিন্দুর গল্পে আমার চোখে পড়েছে। সুকুমার সেন বলছেন তাঁর গল্পের মনোরঞ্জন-সঠ¾à¦®à¦°à§à¦¥à§à¦¯à¦° কথা। গল্প পড়তে কখনও ক্লান্তি আসে না, বরং একটা মৃদু হাসি অজান্তেই ঠোঁটের কোণে লেগে থাকে। এখানে একটা কথা বলা জরুরি যে উইট এবং আনন্দময়তাঠতত্ত্বে এতখানি বিশ্বাস রেখেও কিন্তু নরনারীর সম্পর্কের মৌলিক এবং আদিম ব্যাপার-স্ঠাপার তিনি কখনও রঙ চড়িয়ে পরিবেশন করেননি। সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং তার থেকে তৈরি হওয়া অন্ধকার স্বরূপেই এসেছে, অস্বীকৃত হয়নি (টুথব্রাশ, স্মরগরল)। তবে শ্লীলতার সীমা লঙ্ঘন করে কখনও তিনি সেই অন্ধকার সুড়ঙ্গে ঢোকেননি, একটু দূরে দাঁড়িয়ে গল্পের চরিত্রগুলঠর সুড়ঙ্গে প্রবেশ ও প্রস্থান লক্ষ্য করেছেন মাত্র।

একটা কথা খুব মনে হয় যে ছোটো গল্পর মধ্যে যৌক্তিকতাঠ° পরিমাণ খুব বেশি মাত্রায় থাকা দরকার। মানে, যখন ম্যাজিক রিয়ালিজম বা ফেয়ারিটেল রিয়ালিজম (ফ্যাবুলিজঠ) লেখা হচ্ছে, তখনও ঘটনার একটা অল্টারনেটঠ¿à¦­ যুক্তিগ্রঠ¾à¦¹à§à¦¯ বাস্তবসম্ম ত ব্যাখ্যা থাকবে। অন্তত গল্পের মধ্যে একটা হিন্ট থাকা দরকার যে ঘটনাটা এভাবেও হতে পারত, কারণ আমরা রিয়ালিজমেঠমধ্যেই বসবাস করি, তাকে অস্বীকার করা যায় না। ম্যাজিক যেমন... দর্শক সম্মোহিত হয়ে ভেলকিবাজি দেখছে, বোকা বনছে, কিন্তু মনে মনে জানে যা দেখছে সত্যি নয়, কেবল জাদুকরের হাতের কারসাজি অথবা বিজ্ঞানের নির্মাণ।

শরদিন্দুর সময় ম্যাজিক রিয়ালিজম বা ফেয়ারিটেল রিয়ালিজমেঠখবর তেমন জানা ছিল না। লোকে বলত অলৌকিক গল্প বা ভূতের গল্প। “রক্ত খদ্যোত” পড়তে পড়তে ওপরের মতের সমর্থন পেলাম। বরদা ক্লাবে এসে গল্প বলতে শুরু করলেই অমূল্য প্রতিবাদ জানাত বরদা গাঁজাখুরি গল্প ফেঁদেছে বলে। বরদা একতাড়া কাগজ নিয়ে একদিন ক্লাবে এসে ক্লেম করল সেটা প্ল্যাঞ্চৠট করার সময় মিডিয়ামের (বরদার ছোট ভাই পাঁচু) হাতে ধরে ভূতে লিখিয়েছে, “...দস্তুরমত পাকা হাতের লেখা। কে বলবে পেঁচো লিখছে?” অমূল্য লেখাটা তদারক করে জানায়, পেঁচো লিখেছে কেউ বলবে না বটে, কিন্তু বরদার লেখা বলে অনেকেই সন্দেহ করতে পারে। সেই অল্টারনেট ব্যাখ্যা। অবশ্য বরদা জানায় সে নাকি মৃত ব্যক্তির শালার বাড়ি গিয়ে তার জীবিতাবস্ঠায় লেখা চিঠি দেখে হাতের লেখা যাচাই করে এসেছে। বস্তু ও অবস্তুবাদৠর টানাপোড়েন চলতেই থাকে।

“টিকটিকির ডিম” গল্পে বরদা একটি দংষ্ট্রাবঠুল টিকটিকিকে ওয়েবস্টার ডিকশনারি ছুঁড়ে হত্যা করে। তারপর থেকে সে সর্বত্র টিকটিকির ডিম খুঁজে পেতে শুরু করে। টিকটিকির প্রেতযোনি প্রতিশোধ নেবার জন্য নাকি তাকে শয়নে-স্বপনৠ‡-জাগরণে ডিম্বাবলোঠন করাতে থাকে। শেষে খাবার পাতে ভাত ভেঙে দেখে দুটি সুসিদ্ধ টিকটিকির ডিম। সে খাবার ফেলে উঠে গিয়ে শুয়ে পড়ে। শুনতে পায় মা বধূকে তিরস্কার করে বলছেন, বোকা মেয়ে! করমচা কখনও ভাতে দিতে আছে! আবার সেই অল্টারনেট থ্রেড, যেটি অনুক্ত থাকে অথচ মূল গল্পের সমান্তরালৠচলতে থাকে। অথবা পাঠককে বানিয়ে নিতে হয়।

এই প্রসঙ্গে আর এক বিখ্যাত বন্দ্যোপাঠ্যায় মানিকের “টিকটিকি” গল্পটি মনে পড়ে যায়। সেখানেও চেতনাতীত বিষয়বস্তুর কারবার। দুই বন্দ্যোপাঠ্যায়ের লেখার শৈলীর মধ্যে প্রায় একশ আশী ডিগ্রির ফারাক। অথচ বিষয় নির্বাচন কত কাছাকাছি! আরো একটি মিল খুব চোখে পড়ে। আধুনিক গল্পের একটি প্রধান গুণ হল, চরিত্রগুলৠর চোখ দিয়ে গল্পটিকে দেখা, লেখকের বর্ণনায় নয়। লেখকের কাজ চরিত্র তৈরি করা এবং নিবিষ্ট হয়ে তাদের অনুসরণ করা। এমনই কিছু কথা মানিক বন্দ্যোপাঠ্যায়ের নোট থেকে পড়েছি বলে মনে পড়ছে। শরদিন্দুও একই পথের পথিক। অহেতুক বর্ণনা তাঁর লেখাকে কখনোই ভারাক্রানৠত করে না। গল্পের কুশীলবদের ওপর ঘটনার প্রক্ষেপণ থেকে গল্পের ত্রিমত্রিঠরূপটি ফুটে ওঠে। ‘মনে মনে’ গল্পটি এই ধারার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

আধুনিক সাহিত্যের মুখরোচক বিষয় - সমান্তরাল পৃথিবীর খবর সর্বপ্রথম তাঁর লেখা থেকেই পাই (ধীরেন ঘোষের বিবাহ)। তিপ্পান্ন বছর বয়সী শ্রীযুক্ত ধীরেন ঘোষ গোপনে দ্বিতীয়বাঠদার পরিগ্রহ করার মানসে ট্রেনে চেপে কাশী যাত্রা করেছিলেন। ট্রেনেই একটি নব যুবকের সঙ্গে আলাপ হয়, সেও গয়া যাচ্ছে বিয়ে করতে। যুবকটিকে চিনি চিনি করেও চিনতে পারছিলেন না। সে ট্রেন থেকে নেমে যাবার পরে তাকে সম্যক চিনতে পারেন – ত্রিশ বছর আগের স্বয়ং ধীরেন ঘোষ। নির্দ্বিধা à§Ÿ বলা যায় বিষয় নির্বাচনে শরদিন্দু তাঁর সময়ের থেকে অনেক এগিয়ে ছিলেন। জন্মান্তর নিয়ে তাঁর à¦—à¦²à§à¦ªà¦—à§à¦²à¦¿à¦•à ‡à¦“ বোধহয় এই পর্যায়ে ফেলা যায়, যেমন, “মায়া কুরঙ্গী”, â€œà¦ªà§à¦°à¦¤à§à¦¨à¦•à§‡à ¤à¦•à§€â€ ইত্যাদি, কারণ গল্পের মুখ্য চরিত্ররা সচেতন ভাবে জন্মান্তর পরিভ্রমণ করে যেন গতাসু সময়ের পৃথিবীটা এখনও পাশাপাশি চলমান।

একটা ভালো গল্পের মধ্যে একাধিক স্তর বা লেয়ারিং থাকে। এই লেয়ারিং-এর ব্যাপারটা সবার নজরে আসে না। হয়তো শিক্ষিত পাঠকের চোখে ধরা পড়ে। অনেকটা মাত্রুশকা ডলের মত (রাসিয়ান নেস্টিং ডল)। বাইরের পুতুলটা খুলতে পারলে ভিতরেরগুলৠ‹à¦° নাগাল পাওয়া যায়। সার্থক গল্পের স্ট্রাকচাঠতেমনই হওয়া উচিত বলে মনে হয়। শরদিন্দুর অধিকাংশ ভূতের গল্পর আতঙ্কের আবহের আড়ালে একটি করে ড্যামজেল ইন ডিস্ট্রেস রূপকথা লুকোনো থাকে। যেমন “শূন্য শুধু শূন্য নয়” গল্পে বাজ পড়ে শরীর হারানো বেচারি ছায়ার দুঃখ-কথা! ওপরের খোলস ছাড়ালেই চিরকালীন প্রেমের গল্পর রূপটি বেরিয়ে পড়ে। তৃতীয় স্তরে থাকে কৌতুক। চৈতালি ঝড় বাদলের রোম্যান্টঠক পরিবেশে গৌরমোহনের গান পায়, সে নির্জন বাংলোয় তারস্বরে গান জোড়ে, “আহা রে ওই ডাকছে ডোবায় ব্যাংগুলি/ মনের সুখে ছড়িয়ে তাদের ঠ্যাংগুলি/ আকাশেতে ছুটোছুটি মেঘে হাওয়ায় ঝুটোপুটি/ ভূত-পেরেতে দত্যি-দানাৠখেলছে যেন ডাংগুলি।”

রূপ বদলানোর কথায় মনে এল “দেহান্তর⠝ গল্পটির কথা। মৃত স্বামীর ক্ষুব্ধ প্রেতাত্মঠজীবিত প্রেমিকের ঘাড়ে চেপে বসেছে, দেহ ছাড়তে চাইছে না, ধীরে ধীরে তার চেহারা বদলে দিচ্ছে। ভয়ঙ্কর কনসেপ্ট। পরবর্তী প্রজন্মের লেখক চলচিত্রকাঠরা এই আইডিয়া নিয়ে আরো কাজ করেছেন। হুমায়ূন আহমেদের “দেবী” উপন্যাসের পরিশিষ্ট অংশের সঙ্গে “দেহান্তর⠝ গল্পর সাদৃশ্য লক্ষ্য করার মত। একটা অতীন্দ্রিৠŸ গল্পের এর থেকে চমকপ্রদ পরিসমাপ্তি ভাবা যায় না। শরদিন্দুর অলৌকিক এবং ভূতের গল্পগুলি অতীন্দ্রিৠŸ গল্প-সাহিতৠà¦¯à§‡ নতুন একটি দিক নির্দেশ করে। বিষয় বিচারে, পাশ্চাত্য-ঠির্ভর হরর স্টোরির বিরক্তিকর হৃদয়হীন পৌনঃপুনিকঠা থেকে গল্পগুলি সম্পূর্ণ আলাদা। শরদিন্দু-কৠƒà¦¤ বেশির ভাগ ভূতেরাই বেশ রসিক এবং কৌতুকপ্রিৠŸà¥¤ ভয় দেখানোর থেকে তারা বন্ধু হতে বেশি আগ্রহী (“অন্ধকারে €, “ভূত ভবিষ্যৎ”)। অবশ্য লম্পট, লোভী, ভীতু ইত্যাদি ভূতেদেরও দেখা মেলে।

বাংলা সাহিত্যে এমন অনেক নতুন ধারার জন্মদাতা শরদিন্দু। যেমন, ইতিহাসের সঙ্গে কল্পনা মিশিয়ে যে অনবদ্য à¦•à¦¾à¦¹à¦¿à¦¨à§€à¦—à§à¦²à ¿ তিনি সৃষ্টি করে গেছেন তাদের সমান্তরাল বিরল। অন্যদিকে সত্যান্বেঠী ব্যোমকেশ বক্সীর মত আদ্যোপান্ঠ¤ বাঙালি, মূলত মগজ-নির্ভর গোয়েন্দা বাংলা সাহিত্য আগে পায়নি। কেন শরদিন্দুর নাম বাংলা সাহিত্যের তিন বিখ্যাত বন্দ্যোপাঠ্যায়ের সঙ্গে এক নিঃশ্বাসে উচ্চারণ করা হয় না, জানি না। হয়তো গোত্র বিচারে তাঁর সাহিত্যকরৠম অন্যদের থেকে এতটাই ভিন্ন যে তাঁকে আলাদা করে স্মরণ করাই শ্রেয়। শেষ করার আগে বলি তাঁর গল্পের মধ্যে à¦¨à§‡à¦—à§‡à¦Ÿà¦¿à¦­à¦¿à¦Ÿà ¿ খুব কম পেয়েছি। একটা অদ্ভুত স্ফুর্তি তাঁর গল্পের মূল আকর্ষণ। পড়ার পর অজান্তেই মন ভাল হয়ে যায়।

ফেসবুক মন্তব্য