একটু আগুন দে

অপরাজিতা ভট্টাচার্য

টিফিন বেলায় এক ছুটে বাড়ি এসে দু মুঠো ভাত খেয়ে আবার স্কুলে ঢুকতাম। পিছনের বেঞ্চিতেই থেকেছি বরাবর। এ গাছ সে গাছে লম্ফ ঝম্প আর দুদ্দাড় করতে করতেই কলেজে পৌঁছে গেছি। লুকিয়ে চুরিয়ে পার্টির কাগজ, ইস্তেহার বিলি করতে করতে টগবগে কমিউনিজম না লাল রঙ ঠিক কোনটায় নিজেকে তখন ডেডিকেট করেছিলাম সে আর এখন আলাদা করতে পারি না। নিজের দাদা ছাড়াও সিনিয়র পার্টি কমরেডরা দেদার আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে কমিউনিজম নিয়ে যা যা বলত হাঁ করে শুনতাম। পাড়ার রোয়াক দালান সরগরম হয়ে থাকত। সব যে বুঝতাম এমনও নয়। দাদার দেওয়া বই পড়ে বোঝার চেষ্টা করতাম। ঈশান স্কলার দাদার বিপরীতে নিতান্ত নিষ্প্রভ একটা বাচ্চা ছেলের কৈশোর থেকে তারুণ্যে এগোনো। বাড়িতে ফ্যাকাসে আলো, দুবেলার বরাদ্দ চা, ডাল ভাত পোনা মাছে মিশে থাকত বিধবা মা, দাদা বৌদি ভাইপো। মাসের পনেরো তারিখ থেকে টানাটানি, সিলিং ফ্যানের এক থেকে পাঁচ, সব পয়েন্টেই এক সমান গতি, তেলচিটে চিরুনি, রেশনের মোটা চাল ইত্যাদির তৃপ্ত অনুষঙ্গ ছিল।

“নিভন্ত এই চুল্লিতে মা একটু আগুন দে

আর একটু কাল বেঁচেই থাকি বাঁচার আনন্দে" তখন মুখস্থ করাতাম ভাইপোকে। দশ বছরের ছেলে আগুনের কি বা বোঝে। ওর বয়সের তুলনায় ভারিও কবিতাটা। তবু গোটা কবিতাটা মুখস্থ করত যতিচিহ্ন মেনে। ফার্স্ট প্রাইজ এনেছে।

খরশান বৃষ্টি, ভুসো অন্ধকার আর কটকটে রোদের সিজনিঙে কারখানার চাকরি, লাল পার্টি আর ভাইপোর বড় হওয়াটা আমার ভেতর বেশ কাঁঠালের আঠা হয়ে ওঠে। অপরিহার্য এই তিনটে উপাদান। আমার রিলিফ শঙ্খ ঘোষের একটু আগুন দে। আমি যে শঙ্খ ঘোষকেও খুব বেশি পড়ে ফেলেছি তা নয়। ডানামেলা গাংচিল ফিল খাতায় লিখি নি। সমুদ্রের তীরে বসে মন খারাপের বমি কোনদিন পায় নি। তেমন মাথা চাড়া দেয়নি বিশেষ কিছু, যাকে বলে প্রেম এবং যাতে পরিবার হয়। তা বলে আমি ফুড়ুৎ গোত্রীয়ও নই। টান বুঝি আমি, পিছুটানও। ডিসেম্বরের রাতে রাস্তার ভিখারিকে গায়ের চাদরটা দিয়ে বাড়ি ফিরি। পরের দিন জ্বর এলে প্রায় বাবার বয়সী দাদা চ্যাঁচায়। বৌদি গার্গেলের জল আর প্যারাসিটামল এনে দেয়। জানতে চায় কোন অনিয়ম করেছি কিনা। জ্বর এল কেন? রাতের ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে যায়। এই জানাজানিতে আমার সঙ্কোচ বাড়ে, তৃপ্তি কমে। বাচ্চাদের গল্প শোনাব বলে হসপিট্যাল অথরিটির থেকে স্পেশ্যাল পারমিশান নেওয়া আছে। ক্যান্সারে আক্রান্ত বাচ্চাগুলো হসপিটালের বেডে কেমোথেরাপির ক্লান্তি ভুলে আমার গল্প শুনে হাসে। হাততালি দিই আমরা। ভালবাসার নার্ভ আছে আমার।

সঁপে দেওয়া লালরঙে সবুজ ছিটে এসে লাগলে সেই নার্ভেই আগুন জ্বলে। দপদপ করে কপালের রগ। বমি পায়, অসহ্য বমি অসম্মানের। তবে এ ভালবাসায় তো আর অসম্মানের পর মধুরেণ সমাপয়েৎ হবার নয়। কারখানার চাকরিটা আর বছর চারেক ছিল। কানাঘুষোয় মনে হল রঙ বদলের ফলে হয়ত বসিয়ে দিতে পারে। নিজে থেকেই সেজন্য ভিআরএস নিয়ে পারফেক্ট অ্যারেঞ্জমেন্ট করি ঘরে বসার।

সমাজতন্ত্রের ঢেউতে খাবি খেয়ে দাদাও তার অফিসে কোন প্রমোশান নেয় নি। কেরানি থেকে গেছে। ভাইপো বড় হয়ে গেছে। আজকাল আর আবৃত্তি করে না। বাংলা মিডিয়াম স্কুলে পড়ানোর জন্য বাবাকে দোষারোপ করে। ভাইপোর কলেজ যাওয়ার সময় হয়ে এল। তার ভেতরে এখন কোন আগুন জ্বলছে ঠিক বুঝি না। আলগাও হয়েছে আগের তুলনায়। ন্যাওটা নেই আর।

দাদা মাঝে মাঝে হাঁকাড় দিয়ে ওঠে “ঐ শালা হারামজাদা পার্টিটার জন্য গোটা পরিবারটাই সাফার করছে।“ মিথ্যে বলব না দাদার এসব কথা আমার ভ্যান্তারা মনে হয়। তোমাদের দেখানো পথেই তো আমরা হাঁটছিলাম। পারলাম কই? সমাজতন্ত্র আনতে গেছিলে তোমরা। কিন্তু বোঝ নি আনতে যাওয়াটা তত সহজ সরল ব্যাপার নয়। বেনোজল অলরেডি ছিল। যারা সমাজতন্ত্রের বুলি কপচে সেই আমলেই যতটা ক্রিম তুলে খাওয়া যায় খেয়েছে। সে নিজের লোকের চাকরির ব্যবস্থাই বল আর লিটিগেশানের জমি হাতিয়ে নেওয়া। তারাই এখন করে খাচ্ছে আর তুমি আদর্শের বুলি মাড়িয়ে ইউনিয়ন করে পরে বিক্ষুব্ধ হয়ে জাস্ট ফুটে গেলে। আমার ভেতরের ঘুটঘুট্টি অন্ধকারে এক ছায়ামূর্তি এসব ভাবে। আর এই আমি কেমন কে জানে। বাইরে কঠোরতার পোচ মেরে ঘুরি। বাড়িতে সেই পোচ ধুয়ে ভেতরের ছায়ামূর্তিকেও লাথ মারি। ছায়ামূর্তি লাথি খেয়ে ধরাশায়ী হলে তো দাদার আক্ষেপগুলো ভ্যান্তারা লাগার কথা নয়। বাড়ির আমি তাহলে কেমন! বা বাড়ির বাকি সদস্যরা আমাকে কিরকম ভাবে? দাদা, বৌদি কি বোঝে আমার ভালবাসার নার্ভ আছে, আমি সহানুভব। ধাঁধাঁ লাগে।

পাশের বাড়িতে তিনটে হিজড়ে ঠপাৎ ঠপাৎ তালি মেরে মেরে ঝগড়া করে।

“এই মাগনার বাজারে ঐটুকু টাকায় হয়? ছেলে হয়েছে বলে কথা" লিডার হিজড়ের দাবী।

যে বউটির ছেলে হয়েছে তার স্বামীর রোজগার তেমন নয়। কাকুতি মিনতি করতে থাকে বৌ আর শাশুড়ি মিলে। একটু একটু করে শ্রীবৃদ্ধির চেষ্টা করছে পরিবারটা। অকারণে অতগুলো টাকা দিতে হবে ভেবেই আমার ভেতরে আঁচড় কামড়।

প্রৌঢ় হয়েছি। একটু সান্টিং টাইপ হয়ে গেছি আজকাল। ভাইপোকে যখন একটু আগুন দে মুখস্থ করাতাম, তখন হলে উপরপড়া হয়ে একটু বিবৃতি গোছের কিছু একটা বলে ফেলতাম। সঙ্গে ধমকধামক। কিন্তু এখন বলি না। বিয়ে না করেও কেমন যেন ভিজে বিড়াল মার্কাই হয়ে গেছি। ভেতরের ফোঁসফোঁসে জল ছিটিয়ে ঘরে ঢুকে গেলাম। আসলে আর পাঁচ জনের জন্ম-মৃত্যু, ভাল-মন্দতে জড়িয়ে পড়লেই দায়িত্ববোধ জন্মায়।ব্যক্তিবোধের বাইরে বেরোনো যায়।সমাজতন্ত্র কি একেই বলে? বই পড়েও যে বিরাট কিছু বুঝে ফেলেছিলাম মনে হয় না। তবে এভাবে জড়িয়ে থাকার দোষ বা গুণ আমার আছে। জড়িয়ে যেতেই চেয়েছি। কিন্তু রঙ বদলের পর, ঘরে বসার পর মনে হচ্ছে বেমক্কা জড়িয়ে যাওয়ার থেকে চুপ করে থাকাই ভাল। ল্যাঠা চুকে যায়।

এই সেই ল্যাঠা। এই ল্যাঠাটাকে এক লাথ মেরে পুরোপুরি নার্ভ ইম্পালসের বাইরে কিছুতেই বের করা যায় না। আর এর থেকেই যতরকমের আগুনের উৎপাত। দাদা বলে পরিবারটার কিছু হল না। হ্যাঁ, পরিবারটা আমারও। কাজের দিদি ছেলেটাকে সঙ্গে নিয়ে এলে বৌদিকে কিছু খেতে দিতে বলি। চলে যাওয়ার সময় গেটের কাছে গিয়ে হাত নাড়িয়ে “টাটা” বলি। মনে হয় পরিবারের একটা অংশ চলে গেল। কখনো বা দু কদম হেঁটেও আসি ওর পিছু পিছু। ভাল বল করে ছেলেটা এই বয়স থেকেই। ভাল ট্রেনিং পেলে স্পিনার হবার সম্ভবনা প্রবল। কেডস কিনে দি। কিন্তু ওর মায়ের হাতে টাকা দি না।

কারখানায় চাকরি করাকালীন পার্টি অফিসের দু তিনটে জনসভায় টুকটাক বক্তব্য রেখেছিলাম। পার্টি অফিসের পাশেই ছিল মেয়েটার বাড়ি, নাম শিখা। তখন হাই স্কুল শেষ করে কলেজে পড়ে। সব কটা বক্তব্যই নাকি শুনেছিল। শিখার বর যখন ওর গায়ে আগুন লাগিয়ে পালিয়ে যায়, কষ্টেসৃষ্টে হসপিটালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করি। ঘণ্টা দুই মত বেঁচেছিল। মরার আগে ঊর্ধ্বমুখী, স্থির মণি আর পোড়া ঠোঁট থেকে ঠিকরে বেরিয়েছিল শিখার কথা “আপনার বক্তৃতা শুনেছি আমি। ভাল লেগেছিল।আপনাকে খুব শ্রদ্ধা করি।" একটা হান্ড্রেড পারসেন্ট বারন্ট কেস আমাকে পুরো কেস খাইয়ে মরে গেল। কপালও বটে আমার। প্রেমিকারা শুনেছি বেহেড টাইপের হয়ে ভালবাসার কথা বলে। আর শিখা শ্রদ্ধা জানিয়ে মরেই গেল। জীবনের মুখ্য খিলানই হচ্ছে ভরসা, ভালবাসা। ফলে বিপজ্জনকও। নড়ে গেলেই হুড়মুড় করে ভেঙ্গে পড়ে সব। আমারও দিন কতক ঘেঁটে গেছিল সব। শিখার ছেলেকে নিয়ে গেছিল শিখার বাবা মা। কারণ শিখার বর আবার বিয়ে করেছিল। শিখার ছেলের স্কুলের, কোচিঙের মাইনেটা শিখার মায়ের কাছে দিয়ে আসা শুরু করি। কাউকে বলতে মানা করি। আমি তো জানি শিখা কিছু না বলে মরলেও এই টাকা আমি দিতাম।

আমাদের বাড়ির পাশের মাঠে বেশ বড় ফ্ল্যাট উঠছে। ইটের গাঁথনির ছোট্ট ঘর বানিয়ে মিস্ত্রিরা থাকে। সন্ধ্যেবেলা রান্না করে ওরা।ফোড়নের গন্ধ ভেসে আসে, তবে ঝাঁঝালো নয়। এই গন্ধটা আমার খুব চেনা।মায়ের রান্নাঘর থেকে এরকম গন্ধ পেতাম। পুরনো ভাড়া বাড়িতে কলতলা পেরিয়ে যেতে হত সেই রান্নাঘরে। ফলে সে গন্ধও ছিল ফিকে।মা মারা যাওয়ার পর দাদার নতুন বাড়িতে বৌদির রান্নাঘর ঘাড়ের ওপর।রোজ তেল মশলা কষানোর কড়া গন্ধ পাই। সে গন্ধে টান নেই। কিন্তু মিস্ত্রিরা কি ছাই রাঁধে কে জানে! গন্ধটা টানে খুব।

বিকেলে এক চোট বৃষ্টি হল। ভেজা হাওয়ায় এক শান্ত অবসাদ নিয়ে বারান্দায় বসেই ছিলাম। বৃষ্টি থামলে উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়াব বলেই বাড়ির গেট খুলেছিলাম।নেড়ি কুত্তার মত ল্যাং ল্যাং করেই এগোচ্ছিলাম। হাওয়াতে রান্নার গন্ধ পাচ্ছিলাম। শুঁকছিলাম। কোন কুকুর ঘেউ করলেই যেন জবাব দেব আমি। কুকুরের মতই গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে থকথকে কাদা মাড়িয়ে ওদের ঘর কাম রান্নাঘরের দিকে চলে গেলাম। স্টোভের আগুনে পেঁয়াজ, আলু, সেদ্ধ ডিম টকটকে লাল ঝোলে ফুটছে। আটা মাখা হচ্ছে। রুটি হবে। মোবাইলে ভোজপুরি ভাষায় গান চলছে। কেউ শুনছে কিনা কে জানে। চারটে বিহারি মিস্ত্রি মিলেমিশে রাঁধাবাড়া করছে। ওদের ঘরেও কম ওয়াটের বাল্বের ফ্যাকাসে আলো। এ আলো আমার বেড়ে ওঠার আলো। ঔজ্জ্বল্য কম।এরকম আলোর গলি ঘুঁজিতে প্রশ্ন বাসা বাঁধে সহজে। পষ্টাপষ্টি উত্তর আসে না কখনোই। কাদামাখা পা নিয়ে একটা টুল টেনে আধো অন্ধকার সোঁদা ঘরটায় বসলাম। রান্না শেষ হলে ওরা কলাইয়ের থালায় আধ খানা আলু, একটা ডিম, অনেকটা ঝোল দিল। কড়াইয়ের ডিম চট করে গুণে নিয়ে বুঝলাম গোনা গুনতি ডিম ছিল। সেটাই স্বাভাবিক। আমি তো বলে কয়ে আসি নি। আমি খেলে একটা ডিম কম পড়বে। আমি রাতে ডিম খাই না বলে ডিমটা তুলে দিলাম। সঙ্গে দুটো রুটিও দিয়েছিল। রুটি দুটোতে কেরোসিনের গন্ধ। কখনো এরকম রুটি আমি খাই না। কিন্তু না বলার কথা মাথায় এল না। ঢেকুর তুলে বাড়ি যাওয়ার জন্য উঠে পড়লাম। চারজনেই কাল আবার আসতে বলল। আমি আসতামই, না এসে উপায় নেই। ল্যাঠা বা পিছুটান।

বাড়ি ফিরলে বৌদি গজগজ করতে করতে খাবারগুলো ফ্রিজে তুলে দিল। বাইরে খাওয়া আর বাড়িতে না খাওয়ার এই প্যারালাল রিয়্যালিটিটা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়লাম।

ভাইপো চাকরিতে যাবে। এ রাজ্যে জুটল না জুতসই চাকরি। অন্য রাজ্যে যেতে হবে। প্রথমবার আমিই সঙ্গে গেলাম। সব গুছিয়ে দিয়ে মাস দুয়েক থেকে ফিরে এলাম। এরপর দাদা বৌদি যাবে। চাকরি করলেও ভাইপো সবে একা থাকতে আরম্ভ করেছে। অফিসে কাজের চাপও খুব। ওকে আরেকটু অভ্যস্ত হতে হবে নতুন সব কিছুর সঙ্গে। আমি, দাদা বৌদি পালা করেই যাতায়াত করব। দাদা বৌদির যাওয়ার তোরজোড়ের সময় থেকেই বড় বেশি খালি হয়ে যাচ্ছি। আমি যখন ভাইপোর কাছে গেছিলাম তখন হয়ত দাদা বৌদির এতটা ফাঁকা লাগে নি। আসলে এ ধরণের খালি জায়গার তো আর ক্ষেত্রফল মাপা যায় না। তাই কম বেশি বোঝা সম্ভব নয়। আমার খুব বলতে ইচ্ছে করছিল “তোমাদের ছেলে ওখানে ভালই আছে। আমি সব ব্যবস্থা করে দিয়ে এসেছি। এখুনি যাওয়ার দরকার নেই।" ব্যাপারটা যদিও এখুনি যাচ্ছে বলে নয়। যখনই যাবে আমার এমনটাই মনে হবে। অথচ আমরা পালা করে যাব সেটাই স্বাভাবিক। আমার ভেতরের ছায়ামূর্তি কি এসব ভাবে? না বাইরের আমি? মানুষ বড় স্বার্থপর। আমিও ব্যতিক্রম নই। কিন্তু প্রবল পরাক্রমে নিজেকে নিরাসক্ত দেখানোর চেষ্টা করি না ভান করি? যেহেতু আমি দাদা বৌদিকে মুখে যেতেই বলছি, সেহেতু একে ভান বলাই শ্রেয়। যারা যত বুলি কপচাই তাদের ভান তত বেশি।

শরীরটা ভাল যাচ্ছে না। হাতপায়ে অবশ ভাব, ক্লান্তি। ঘুম পায়। অথচ শুলে ঘুম হয় না। বর্ষার স্যাঁতস্যাঁতে ভাবেই এরকম হয়। তবে চেপে আছি। জানলে ওরা যাবে না। ল্যাং ল্যাং করে হাঁটি, ঘুরঘুর করি পাড়াময়। দূরে যেতে ভরসা পাই না। মনে হয় হেঁটে ফিরতে পারব না। চলতে চলতে হাঁটু থেকে ভাঁজ হয়ে যাবে পা,পড়ে যাব।

পাড়ার রিক্সা স্ট্যান্ডে বিশ্বকর্মা পুজোর প্যান্ডেল হচ্ছে। আগামীকাল বিশ্বকর্মা পুজো। রিক্সাওয়ালারা পুজোর নামে মদ খেয়ে অসভ্য মাতলামি করে। এই পুজোতে সেজন্য আমি চাঁদা দিই না। রিক্সাওয়ালারাও আমাকে বিশেষ পছন্দ করে না। এবার দিয়েছি বেশ কিছু টাকা। একদিন বৈ তো নয়। করে নিক। সান্টিং টাইপ হয়ে গেছি বলেই বোধ হয় চাঁদা দিলাম। আমাকে পাড়ায় হাঁটতে দেখে ওদের একজন বেশ খাতির করে চেয়ার এগিয়ে বসতে বলল। প্যান্ডেল কেমন হচ্ছে জানতে চাইল। পৃথিবীতে সমাজতন্ত্র কেন, কোন তন্ত্রই আদতে নেই। টাকার খেল পুরোটাই। এই স্বতঃসিদ্ধটা অ্যাদ্দিনে মানলাম।

দাদারা আজকেই রওয়ানা হবে। পুজোর মুখেই ফিরবে দাদা বৌদি,ভাইপোও আসবে। মাস খানেক মত একা থাকতে হবে। ওরা এলেই ডাক্তার দেখাব। বাঁচার আনন্দ আর নেই। বুঝতে পারছি। এবার শুধু টেনে নিয়ে যেতে হবে। লালের প্রতি আকর্ষণ বা সবুজের প্রতি ঘৃণাও আর নেই তেমন। কত লোককে আপদে বিপদে টাকা ধার দিয়েছি। একটা ফোন পর্যন্ত করে না। শিখার ছেলেটাকে দেখতে ইচ্ছে করে। অনেকদিন টাকা পয়সা পাঠানো হয় না। ছেলেটা কলেজে পড়ে, টিউশনি করে শুনেছি।

বিশ্বকর্মা পুজো বলে মিস্ত্রিগুলোও বাড়ি গেছে। দিন দশ পরে ফিরবে।একটু গিয়ে যে বসব তার উপায় নেই। দাদা বৌদি, ভাইপো, মিস্ত্রি চারটে আর কাজের দিদির ছেলেটার জন্য পুজোর জামা কাপড় কিনে রাখব। আজ বিশ্বকর্মা পুজো। রিক্সা পাব না। হেঁটে গিয়ে জামা কাপড় কিনে ফিরতে পারব না। শরীর তেমন ভাল নয়। কাল বরং যাব।

সকাল সাড়ে ছটা বাজতে চলল কে বলবে! মেঘে কালো হয়ে আছে সকাল,অন্ধকার। বৃষ্টি হচ্ছে। ভাদ্রের পচা গরমও রয়েছে। আজ শুয়েই থাকি। উঠতে তো পারছিও না। বুকটা কেমন যেন করছে। কাজের দিদি এসে তালা খুলে চা বানিয়ে দিলে তবেই উঠব। কি হবে উঠে। কাজ তো কিছু নেই। কাজের দিদির ছেলেটা আজ আসবে। একসঙ্গে ঘুড়ি ওড়াব।

জীবনভর শুধু প্যারালাল রিয়্যালিটির মধ্যে দিয়েই আমরা যাই। কথাটা কে যে বলেছিল মনে পড়ছে না।কত লোকে কত কিই তো বলেছে আমাকে। কিছুই ঠিকঠাক মনে থাকে না। চল্লিশের পর থেকে নাকি স্মৃতিভ্রংশ হয়। আমি তো শালা জন্ম ভোলা। পিথাগোরাসের থিওরেম মনে রাখি তো সেই ফর্মুলায় ফেলে অতিভুজের মান আর বেরোয় না। আসলে ফর্মুলাটাই ভুল লিখি।ভাবি ঠিক লিখেছি। তাও আজ কত কি মনে পড়ছে স্পষ্ট।

ভাইপো ভাল রেজাল্ট করে নামকরা কলেজে ঢুকল। কোন সংগঠনে না জড়িয়ে শুধু পড়াশুনোতে মন দিতে বলেছিলাম আমি আর দাদা। কিন্তু পার্টি করার সময় কি করেছি! ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তির সময় থেকেই পড়ুয়াদের বামমনস্ক করে তোলার চেষ্টা করেছি। শ্রেণীহীন সমাজের স্বপ্ন দেখানোর জন্য কত লেকচার। অবোধগুলো ক্লাস কেটে শুনত সেসব। লোকাল পলিটিক্সের শক্তি বাড়াতে এগারো বারো ক্লাসের ছাত্র ছাত্রীদেরও টার্গেট করেছি। এটাও ঠিক যে একসময় আমাদের এক অংশ ভাবতে শুরু করেছিল যে এই বাচ্চা ছেলেপুলেগুলো পড়াশুনো করুক, বামমনস্ক হোক, চিন, সোভিয়েত রাশিয়ার কথা জানুক। কিন্তু তার জন্য ব্রিগেডে যাওয়ার দরকার কি? কলেজের ক্লাস কামাই করে ব্রিগেডে যাওয়া চলবে না। কিন্তু পার্টির বিরাট অংশকে সেটা বোঝানো যায় নি। ওদের জমায়েত দরকার, ভিড় চাই। মেলাতে পারি নি। দাদার কথা তো ভুল নয়। কিন্তু দাদার সঙ্গে তর্ক তো করেছি দাদা বলেই।

প্রতি সপ্তাহে শুক্র বা শনিবার কোন না কোন পার্টি কমরেডের বাড়িতে মিটিং হত সেসময়। রেড কার্ড হোল্ডাররা যেত সেসব মিটিঙে। আমিও রেড কার্ড হোল্ডার হয়ে যেতাম মিটিঙে। ওখানেই শুনেছিলাম “নিভন্ত এই চুল্লিতে মা একটু আগুন দে” কবিতাটা। আরো অনেক কবিতা পাঠ হত তখন। বুঝতাম না বেশিরভাগই। কিন্তু এই কবিতাটা মনে তো হয় বুঝেছিলাম। যেসব বস্তির ছেলেমেয়েরা স্কুলে যায় না তাদের স্বাক্ষর করে তোলার কর্মসূচি তৈরি হয়েছিল মিটিঙের পর মিটিঙে। কিন্তু আদতে কিচ্ছু করতে পারি নি আমরা। কি কি করতে হবে সেসবই শুধু আলোচনা হয়েছে। স্কুলে না যাওয়া বাচ্চাদের চিহ্নিতই করে উঠতে পারি নি। কোন কোন বস্তিতে এরকম ছেলেমেয়েরা আছে জানতাম। কিন্তু করা তো হয় নি কাজের কাজ। তাদের অআকখ, নামধাম লিখতে শিখিয়ে তো স্কুলমুখো করা যায় নি।

অথচ পার্টির তরফ থেকে স্বাক্ষরতা কর্মসূচি সফল হয়েছে বলা হল। উদযাপনের জন্য পদযাত্রা হল। যেসব বস্তির ছেলেমেয়েরা স্কুলে যায় তাদের দেখিয়ে দেওয়া হল। রেড কার্ড তখনই ছিঁড়ে ফেলেছি। হাঁটি নি সে পদযাত্রায়। দাদা জানে না আজও। দাদা ফিরে এলে এবার অনেক কথা বলার আছে। একটা বই পড়তাম তখন। বিখ্যাত রুশ লেখক নিকোলাই অস্ত্রভস্কির লেখা বইয়ের অনুবাদ। ইস্পাত না কি যেন নাম। কিচ্ছু মনে পড়ছে না। কোথায় আছে বইটা কে জানে ! নাকি নামটাও ঠিকঠাক মনে পড়ছে না। প্রতি বিপ্লবের ফল মারাত্মক... এরকম জাতীয় কিসব লেখা ছিল। বড় বেশি দমবন্ধ লাগছে যেন!

ছোড়দা... ও ছোড়দা... ছোড়দা... ও ছোড়দা...

কাজের দিদি ডাকতে থাকে।

“ছোটদাদু উঠবে না? তুমি যে বলেছিলে আজ আমার সঙ্গে ঘুড়ি ওড়াবে। ওঠ না ঘুম থেকে...”

কাজের দিদির ছেলেও ডাকতে থাকে...





ফেসবুক মন্তব্য