দুটি কবিতা

শেখর সেন

[ বাঙালি মাত্রই জীবনে কখনো না কখনো কবিতা লিখেছে, এমন একটা কথা প্রচলিত আছে। সে কথা কতটা সত্য জানি না। তবে এমন কিছু বাঙালির সংস্পর্শে এসেছি যাদের বেশিরভাগেরই শিক্ষা ও বড় হওয়া পশ্চিমবঙ্গের বাইরে। বাংলা কবিতা তারা খুব বেশি পড়ার সুযোগ পাননি। অনেকে বাংলা বলতে পারলেও ভাল করে লিখতে পড়তে পারেন না। কিন্তু কবিতা তাদের রক্তে। কবিতা তাদেরও প্রেম, প্যাশন। তারাও কবিতা না লিখে থাকতে পারেন না। তারা লেখেন হিন্দি বা ইংরাজিতে। এবারের 'আমচি মুম্বাই' বিভাগে এমনি চারজন জন্মসূত্রে বাঙালির কবির হিন্দি এবং ইংরাজিতে লেখা মূল কবিতা থেকে বাংলায় অনুবাদ দেওয়া হল পাঠকদের জন্য।
প্রথমেই পড়ুন সঙ্গীত কলা একাদেমীর চেয়ারপার্সন, নাট্যকার, গীতিকার, অভিনেতা পদ্মশ্রী শেখের সেনের হিন্দিতে লেখা দুটি কবিতার অনুবাদ...। ]



প্রজন্ম

শেখর সেন



আমি সেই প্রজন্মের
যখন গ্লাস, ঘটি-বাটিতে লেখা হত মালিকের নাম

জল খেতে খেতে নীরজকুমার,
ডালে রুটি ডোবাতে ডোবাতে মঞ্জুরানী,
মন জেনে যেত কোন নামে বেজে উঠবে কৃতজ্ঞ সুর

কর্মচারীর হাতের লেখা ভাল হলে
দোকানের বাসন বিক্রি যেত বেড়ে

বিরিয়ানীর পাত্রে রিজোয়ান আলি
ডেভিড স্যারের টিফিন বক্সে মেরি ডিকোস্টা
দেখে দেখে বড় হয়েছি আমরা
কারো বাড়ি থেকে খাবার পাঠালে
জানতাম কার বাড়ি ফিরে যাবে শূন্য পাত্র

এখন কাচের গ্লাস আর চিনেমাটির ডিনার সেট
বেনামী চিঠির মতো খুঁজে চলে...
হারানো সময় আর আসল ঠিকানা

হে গ্রীষ্ম!

শেখর সেন


ঐ দেখো ঝলসে যাওয়া ছোট্ট বাগান আর
লোহার জালি লাগানো একা গেট কেমন অপেক্ষা করছে
ঢাকা বারান্দার টিনের ঘোমটা তেতে উঠেছে উত্তেজনায়
শিকল তোলা কাঠের দরজায় যেন জড়িয়ে আছে দীর্ঘশ্বাস
দোলনায় বসে পড়শি মাসী বেছে রাখছে বিষণ্ণ মেথি শাক
কাল রাতেই ঠাম্মা নেভা উনুনের কয়লায় রেখে দিয়েছে কাঁচা আম
আমপান্না বানানোর জন্য জিরা গুড়োতে মা মিশিয়ে রাখছে সৈন্ধব লবন
ঘোল বানানোর জন্য মাটির হাঁড়িতে পেতেছে টক দই

কুয়োর ঠান্ডা জল রাখা আছে প্রতিটি ঘরের কুঁজোয়
জানলা দরজায় ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে কুশের চাটাই
ঘন্টায় ঘন্টায় তাকে জলে ভিজিয়ে দেব আমি
নন্দুর রেখে যাওয়া তরমুজে ফুঁটো করে ঢেলে দেব চিনি ও সামান্য নুন
আর 'মথনী' ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বানানো হবে সরবৎ
আইসক্রীমের বালতি ধুয়ে রেখে আসা হয়েছে ছাতে
মামা গ্রামের বাড়ি থেকে আম নিয়ে এলেই বানানো হবে আইসক্রীম
গত শনিবারই মা দরজি ডেকে রিফু করিয়ে রেখেছে সব মশারি
আমরা দুভাই মিলে কষে বেঁধে রেখেছি খাটিয়ার ঢিলে হয়ে যাওয়া নিয়ার
শান্তিপিসিকে চন্দন ও মুলকানি মাটির প্রলেপ পাঠাতে বলেছে বাবা
ঘামাচি মারার জন্য...

এসবই হচ্ছে যেন যুদ্ধকালীন তৎপরতায়
আজ সকালেই তো আমি নিমন্ত্রণ পত্রে লিখেছি...
নতুন বছরের চৌকাঠ ডিঙিয়ে চলে এসো
তোমাকে আলিঙ্গন করতে আমরা প্রস্তুত - হে গ্রীষ্ম!

[ অনুবাদ: অর্ঘ্য দত্ত ]

ফেসবুক মন্তব্য