কবিতা পথের একলা পথিক

মৃণাল কান্তি দাশ



[মাস কয়েক আগেই পশ্চিমবঙ্ঠসরকারের পক্ষ থেকে 'বিদ্যাসাগঠ° পুরস্কার'-এ সম্মানিত হলেন কবি শ্যামলকানৠতি দাশ। তাঁর কবিতার সঙ্গে আমরা সবাই কমবেশি পরিচিত, এখানে আমদের অনুরোধ ওঁর সহোদর কবি মৃণালকান্ঠি দাশ মানুষ শ্যামলকানৠতি সম্বন্ধে লিখেছেন কিছু কথা। ]

নিজের সহোদরকে নিয়ে কিছু লেখা মোটেই সহজ নয়। বিশেষ করে যখন মনে পড়ে যে সেই সহোদরকে জীবনে দাদার চেয়েও বেশি পেয়েছি বন্ধুর মতো করে। বুঝতে পারি না কোথা থেকে শুরু করব, আর কতটুকু বলব। একসাথে ভিড় করে আসে অমূল্য সব স্মৃতি, হাজারো কথা। তবে আজ এখানে দাদার কবিতা নিয়ে কিছু লিখছি না। সেসব লেখার জন্য উপযুক্ত মানুষ আছেন। আমি বরং লিখি দাদা শ্যামলকানৠতির অজানা কিছু দিক।

অখন্ড মেদিনীপুরৠ‡à¦° এক ছোট্ট গ্রাম রাজনগরে কেটেছে আমাদের বাল্য-à¦•à§ˆà¦¶à§‹à °à¥¤ সেই বিজলিহীন, পাকারাস্তঠহীন গ্রামের হাইস্কুলে আমাদের বাবা ছিলেন সাহিত্যের শিক্ষক। সে গ্রামে ছিল একটি পাঠাগারও-- গণশিক্ষা কেন্দ্র। আর সেই পাঠাগারের ছোটদের বিভাগের গ্রন্থাগাঠ°à¦¿à¦• কে ছিলেন জানেন? ক্লাশ সেভেন এইটের ছাত্র আমার দাদা শ্যামলকানৠতি।

গ্রন্থাগাঠ° ছাড়াও গ্রামে ছিল একটা ছোট্টো ডাকঘর। মাটির ঘরে। অমলের মতোই রোজ দাদার দিনের বেশ কিছুটা সময় কাটতো ডাকপিয়নের প্রতীক্ষাৠŸà¥¤ ঐ বয়সেই দাদা চিঠি লিখত নরেন্দ্র দেব, আশাপূর্ণা দেবী, সৈয়দ মুজতবা আলী, তারাশঙ্করৠ‡à¦° মতো মানুষদের। তাদের উত্তরের অপেক্ষায় থাকত দাদা। তবে দাদা যে সেবয়সে শুধু বইপত্রের সঙ্গেই সময় কাটাতো তা কিন্তু মোটেই নয়। লুকিয়ে যাত্রাপালা বা মেলায় নররাক্ষসেঠ° কান্ড দেখতে যাওয়া, নদীর ঘাট থেকে নৌকা খুলে নিয়ে নিরুদ্দেশ যাত্রা, সাঁতরে নদী পারাপার এসবেও দাদার ছিল সমান আগ্রহ।
দাদার প্রথম প্রেম কিন্তু কবিতা নয়। বরং ছবি আঁকা। ছবি আঁকার নেশা দাদাকে এমন ভাবে পেয়ে বসেছিল যে পড়াশোনা শিকেয় ওঠার অবস্থা। একদিন বাবা রাগ করে ওর আঁকা সব ছবি ছিঁড়ে ফেললেন। তখন থেকে শুরু হল দাদার কবিতা লেখা। দাদার রবীন্দ্রসঠগীতের গলাটিও ছিল ভারী চমৎকার। অসংখ্য গান ছিল ওর কন্ঠস্থ। এছাড়া দাদা কাবাডিতেও ছিল বেশ পটু। তবে চেহারাটা রোগা টিঙটিঙে হওয়ার কারণেই হয়তো খেলার মাঠ থেকে প্রায়শই প্রতিপক্ষৠর মার খেয়ে বাড়ি ফিরত। এমনিতে দাদা ভিতুই ছিল, বিশেষ করে অন্ধকার হলেই ভূতের ভয়ে কাবু। কিন্তু এক অন্যরকমের দুঃসাহস ছিল ওর মধ্যে যা ঐ বয়সের ছেলেদের মধ্যে আজও বিরল।

ওর ছেলেবেলার তেমনি কিছু অসীম দুঃসাহসের গল্প বলি। ঘাটাল থেকে একটি সংবাদ পাক্ষিক বেরোত। একদিন দাদা সেই পত্রিকার দপ্তরে হাজির। না, পত্রিকায় লেখা ছাপানোর আবদার নিয়ে নয়। সেই পত্রিকার ছোটদের বিভাগটি পরিচালনার দাবি নিয়ে। সম্পাদক মশাই অবাক হলেও নিরাশ করেননি সপ্তম শ্রেণীতে পড়া ছেলেটিকে। অবশ্য ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ার সময়ই তো স্কুল ম্যাগাজিনৠর ছাত্র-সম্পঠ¾à¦¦à¦• শ্যামলকানৠতি।

স্কুলজীবনৠ‡ শ্যামলকানৠতি আর একটি দুঃসাহসের ঘটনা উল্লেখ করি। সম্ভবত সে বছরই যুব কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দাদা তখন দশম শ্রেণী। অঞ্চল যুব কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হল এক মাস্টারমশা ইয়ের সস্নেহ উশকানিতে। চলতে থাকল বাবাকে লুকিয়ে মিটিং মিছিল সভায় বক্তৃতা। মাঝে মাঝে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে। বাবার টের পেতে দেরি হল না। ফলে বাবার বেত্রাঘাতৠদাদার রাজনৈতিক নেতা হওয়ার বাসনায় সেখানেই ইতি।

দাদার আরো একটা সাহসের গল্প বলি। কলেজে পড়ার সময় হাত খরচের পয়সা বাঁচিয়ে পত্রিকা করছে। 'জনপদ' সংবাদ পাক্ষিক। সেবার দুর্গাচকে বি পি আই এন টি ইউসি-র সম্মেলনে দাদা জনপদ পত্রিকার একটি কপি তুলে দিলেন সমবায় মন্ত্রী জয়নাল আবেদিনের হাতে। একটি তথ্যগত ভুল চোখে পড়ায় রাগে ফেটে পড়লেন তিনি। দাদাকে বললেন পত্রিকা বন্ধ করে দিতে। দাদাও সপাটে উত্তর দিয়েছিল, "কোনো মন্ত্রীর বদন্যতায় বেরোয়না এ কাগজ। হাত খরচের পয়সা বাঁচিয়ে বের করি। আপনার ক্ষমতা থাকলে বন্ধ করে দেখান!"

দাদা বরাবরই এরকম। স্পষ্টবক্ঠা। তোষামোদে ভরসাহীন। ওর একটাই প্যাশন, এবং সেটা হল কবিতা। কবিতা নির্মাণে কখনও ছেদ পড়েনি দাদার। হাজার অপমান, লাঞ্ছনা, অভাবের মধ্যেও কবিতার প্রতি অবিচল। একনিষ্ঠ। কবিতা থেকে দাদা সরে আসেনি কখনও।

শুধু নিজের কবিতা লেখাই নয়, অন্য কবিসাহিত্ঠিক, শিল্পীদের জন্যও দাদা অক্লান্ত ভাবে কাজ করে গেছে। নতুন কবি খুঁজে বের করা, তাদের হয়ে প্রচার করা, পত্রিকা দপ্তরে তাদের লেখা নিজে হাতে পৌঁছে দেওয়া, এমন কত যে করেছে! শুধু কী তাই! সারারাত জেগে অসুস্থ বন্ধুর সেবা করা, কোনো বন্ধুর চাকরীর জন্য উমেদারি করা, কাউকে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যাওয়া, রাত জেগে কারো কবিতা এডিট করে দেওয়া-- বন্ধুদের জন্য কোনো পরিশ্রমেই যেন ওর ক্লান্তি ছিল না। আর দাদার বন্ধুবান্ধ বের তালিকাও ছিল ঈর্ষণীয় ভাবে দীর্ঘ। কিন্ত তাদের সবাই তো আর প্রকৃত বন্ধু ছিল না, বন্ধুর মুখোশ পরা শত্রুও ছিল অনেক। দাদা বারবার তার প্রমাণ পেত, তবু যেন ফুলের সঙ্গে কাঁটাকেও মেনে নিয়েছিল সহজ ভাবে।

মহিষাদল কলেজে পড়ার সময় দাদা কলেজ পত্রিকার সম্পাদনা করেছিল দুবার। বাংলাদেশ মুক্তিযুদৠধের সময় ওর সম্পাদনায় 'আমরা' পত্রিকাটি কলেজ পত্রিকার জগতে এক অনন্য সংযোজন। এসময় থেকেই দাদার সম্পাদনায় কয়েকটি ক্ষীণায়ু ও দীর্ঘায়ু পত্রিকার জন্ম। কনসার্ট, প্রতীতি, জনপদ, কবিতা সংবাদ,বররুঠšà¦¿ ইত্যাদি পত্রিকাগুঠ²à¦¿ সে সময় পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল খুব।

সংগঠক হিসাবেও শ্যামলকানৠতির দক্ষতা প্রশ্নাতীঠ। শুধু মেদিনীপুর কেন সারা পশ্চিমবঙ্ঠে কবি জীবনানন্দৠর জন্মদিন অমন মর্যাদার সঙ্গে কেউ পালন করেছেন কিনা জানা নেই। অবশ্য এই উদ্যোগে সঙ্গী ছিল কবি তপনকুমার মাইতি বা নীলকন্ঠ ঘাটীর মতো বন্ধুরা। সারা বাংলা তরুণ লেখক সম্মেলন, সারা বাংলা কবিতা উৎসব, সৌহার্দ্য সত্তর, বিশ্ব বাংলা কবিতা উৎসব-- সর্বত্রই ছড়িয়ে রয়েছে শ্যামলকানৠতির সাংগঠনিক দক্ষতার পরিচয়।

শুধু কবিতার জন্য একটা আস্ত জীবন খরচ করে ফেলা কোনো সহজ কথা নয়, কিন্তু অসম্ভবও যে নয় শ্যামলকানৠতি একথা জানত। তাই কখনো সুতাহাটার তিনশো বত্রিশ টাকা বেতনের এক অস্থায়ী স্কুল শিক্ষকের চাকরি ছেড়ে দেড়শো টাকা মাসিক সাম্মানিকৠকৃত্তিবাস পত্রিকায় যোগ দিয়েছে, কখনো বা আত্মমর্যাঠার প্রশ্নে স্বেচ্ছা অবসর নিয়েছে আনন্দবাজাঠের মতো প্রতিষ্ঠান থেকেও।

আজ, নিজের দাদা বলে নয়, তার একজন পাঠক হিসাবেই ভালো লাগে খুশি হই যখন এই কবিতা পাগল মানুষটা সম্মানিত হয়, স্বীকৃতি পায়। যদিও মনে হয় যে সম্মান তার পাওয়া উচিত ছিল, আজও তা অধরা। তবে এও জানি, দাদা কোনো সম্মান, পুরস্কার, প্রশংসা, পিঠচাপড়ান োর প্রত্যাশা করে কবিতাকে ভালোবাসেনঠ¿à¥¤ সে অনন্ত কবিতা-পথ হেঁটে যাবে নির্বিকারॠএকা। একলা।

ফেসবুক মন্তব্য