ব্রায়ন জিসিন : কাট-আপ কবিতার জনক

মলয় রায়চৌধুরী

বাংলায় অনুবাদ করতে গেলে কবিতাটার আহ্লাদ নষ্ট হয়ে যেতে পারে বলে ব্রায়ন জিসিনের মূল ইংরেজি কবিতার অংশ তুলে দিচ্ছি, ‘মিনিটস টু গো’ কাব্যগ্রন্হে ‘সানডে মরনিং’ শিরোনামে এটি তাঁর প্রথম কাট-আপ কবিতা, এবং বেশ দীর্ঘ :
the hallucinated have come to tell you that yr utilities
are being shut off dreams monitored thought directed
sex is shutting down everywhere you are being sent
all words are being taped agents everywhere
marking down the live ones to exterminate
they are turning out the lights
no they are not evil nor the devil but men
on a mission with a spot of work to do
this dear friends they intend to do on you
you have been offered a choice between liberty and
freedom and Not you cannot have both
the next step is everyone into space but it has been
a long dull wait since the last tower of babel
that first derisive visit of the paraclete
let’s not hear that noise again and again

১৯৯৭ সালে ‘দি গার্জিয়ান’ সংবাদপত্রে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে উইলিয়াম বারোজ বলেছিলেন, “আমার জীবনে একমাত্র ব্রায়ন জিসিনকে আমি শ্রদ্ধা করি । আমি অনেকের সম্পর্কে উচ্চধারণা পোষণ করি, অনেককে পছন্দ করি, কিন্তু উনি একমাত্র মানুষ যাঁকে আমি শ্রদ্ধা করি।” তার আগে ১৯৬৬ সালে ‘দি প্যারিস রিভিউ’ পত্রিকায় কনর‌্যাড নিকারবকারকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বারোজ বলেছিলেন, “ ব্রায়ন জিসিন নামে এক বন্ধু, মার্কিন কবি ও পেইনটার, যিনি ৩০ বছর ইউরোপে ছিলেন, আমি যতোদূর জানি, তিনিই প্রথম কাট-আপ টেকনিক প্রয়োগ করেছিলেন । তাঁর কাট-আপ কবিতা ‘মিনিটস টু গো’ বিবিসি থেকে প্রসারিত হয়েছিল, এবং সেটি তিনি পুস্তিকার আকারে প্রকাশ করেছিলেন । এই টেকনিকের সম্ভাবনা সম্পর্কে আমার আগ্রহ জন্মায়, এবং আমি নিজেও তা নিয়ে নিরীক্ষা আরম্ভ করি । অবশ্য আপনি যদি ‘দি ওয়েস্ট ল্যাণ্ড’ এর কথা ভাবেন, সেটি ছিল প্রথম বিখ্যাত কাট-আপ-কোলাঝ, এবং ত্রিস্তঁ জারাও একই লাইনে কিছু কাজ করে গেছেন । একই আইডিয়া ডস প্যাসস ‘ইউএসএ’-র ‘দি ক্যামেরা আই’ তে প্রয়োগ করেছিলেন । আমার মনে হয়েছিল যে আমিও সেই একই লক্ষ্যে কাজ করে চলেছি । যখন নিজের সামনে টেকনিকটা প্রয়োগ করতে দেখলুম, তখন তা ছিল আমার কাছে এক বিস্ময়কর রহস্যোদ্ঘাটন।”
উইলিয়াম বারোজের বিখ্যাত বইগুলো, যেমন ‘নেকেড লাঞ্চ’ ( ১৯৫৯, প্রথম সংস্করণে কাট-আপ করা হয়েছে ), ‘দি সফ্ট মেশিন’ ( ১৯৬১, প্রথম সংস্করণে কাট আপ করা হয়েছে ), ‘দি টিকেট দ্যাট এক্সপ্লোডেড’ ( ১৯৬২, প্রথম সংস্করণে কাট-আপ করা হয়েছে ) এবং ‘নোভা এক্সপ্রেস’ ( ১৯৬৪, প্রথম সংস্করণে কাট-আপ করা হয়েছে ) কাট-আপ টেকনিক প্রয়োগ করে লেখা। কাট-আপ পদ্ধতিকে উইলিয়াম বারোজ বলেছেন তা হল সাহিত্যে আণবিক বোমার আবিষ্কার ।
ব্রায়ন জিসিন ( ১৯১৬ - ১৯৮৬ ) ইংল্যাণ্ডে ক্যাথলিক পরিবারে জন্মেছিলেন, পনেরো বছর বয়সে ক্যাথলিক কলেজে শিক্ষার শেষে ১৯৩৪ সালে প্যারিসে সরবন বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ফরাসি সভ্যতা’ পড়তে গিয়ে পিকাসো, সালভাদর দালি, ডোরা মার, ভ্যালেনটাইন হিউগো প্রমুখের সঙ্গে পরিচিত হন। ক্যাথলিক পরিবারের সদস্য হওয়া সত্ত্বেও তিনি ঈশ্বরে বিশ্বাস করতেন না । ১৯৩৫ সালে পিকাসো, হ্যান্স আর্প, হ্যান্স বেলমার, মার্সেল দুশঁ, ম্যান রের সঙ্গে তাঁর আঁকা পেইনটিঙের প্রদর্শনীর ব্যবস্হা হয় । কিন্তু প্রদর্শনীর প্রিভিউয়ের দিন আঁদ্রে ব্রেতঁর নির্দেশে পল এলুয়ার ছবিগুলো দেয়াল থেকে নামিয়ে দ্যান । উনিশ বছর বয়সী ব্রায়ন জিসিনের ওপর তার ক্ষতিকর প্রভাব পড়েছিল । ব্রায়ন জিসিনের জীবনীকার জন গিগার লিখেছেন যে জিসিনের অঙ্কনপদ্ধতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হবার ফলে আঁদ্রে ব্রেতঁ আশঙ্কিত ছিলেন যে ধনী ক্রেতারা জিসিনের ছবিগুলো কিনে তাঁর কর্তৃত্বকে খর্ব করতে পারে ।


আঁদ্রে ব্রেতঁ

ত্রিস্তঁ জারার সঙ্গেও একই রকম দুর্ব্যবহার করেছিলেন আঁদ্রে ব্রেতঁ । ১৯২০ সালে একটি পরাবাস্তব র‌্যালিতে টুপির ভেতর থেকে কাঁচি দিয়ে কুচোনো ছাপা কাগজ বের করে ত্রিস্তঁ জারা একটি তাৎক্ষণিক কবিতা তৈরি করে ফ্যালেন, আর তার দরুন নাট্যগৃহে হুল্লোড় আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল, এবং অমন মৌলিক কৃতির দরুণ আঁদ্রে ব্রেতঁ তক্ষুনি ত্রিস্তঁ জারাকে পরাবাস্তব আন্দোলন থেকে বের করে দেন । জিসিন বলেছেন যে শব্দেরা যে কারোর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, সে ধারণা আঁদ্রে ব্রেতঁর ছিল না ; ব্রেতঁ মনে করতেন যে পরাবাস্তব আন্দোলন তাঁর পৈতৃক সম্পত্তি ।
প্যারিসে অপমানিত হয়ে ব্রায়ন জিসিন চলে যান আমেরিকা । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন সেনাদলে কাজ করার পর আঠারো মাসের একটি কোর্সে জাপানি ও আরবি ভাষা এবং ক্যালিগ্রাফি শেখা আরম্ভ করেন যা পরবর্তীকালে তাঁর কাজে প্রভুত ছাপ ফেলেছে । ১৯৪৯ সালে ফুলব্রাইট বৃত্তি নিয়ে স্পেনে যান ক্রীতদাসদের সম্পর্কে গবেষণা করার জন্য । মাঝপথে ছেড়ে দিয়ে লেখক ও সঙ্গীতকার পল বাওলসের সঙ্গে চলে যান মরোক্কোর ট্যানজিয়ার, সেখানে গিয়ে মোহম্মদ হামরি নামে এক রাঁধুনির সঙ্গে রেস্তরাঁ খোলেন ; সেই রেস্তরাঁ লাটে উঠে গেলে ১৯৫৮ সালে তিনি প্যারিসে ফেরেন । আশ্রয় নেন বেয়াল্লিশ ঘরের লজে, যেটি ক্রমশ ‘বিট হোটেল’ নামে খ্যাত হয় । তার কারণ অ্যালেন গিন্সবার্গ, পিটার অরলভস্কি, উইলিয়াম বারোজ, গ্রেগরি কোর্সো, ডেরেক রেমণ্ড, হ্যারল্ড নর্স, সিংকলেয়ার বেইলেস প্রমুখ বিট আন্দোলনকারীরা সেখানে ষাটের দশকে জড়ো হয়েছিলেন। এই লজে থাকাকালে গিন্সবার্গ ‘ক্যাডিশ’ লিখেছিলেন, বারোজ লিখেছিলেন ‘নেকেড লাঞ্চ’, কোর্সো লিখেছিলেন ‘বম্ব’।


বাঁদিকে ব্রায়ন জিসিন ও ডানদিকে উইলিয়াম বারোজ

১৯৫৯ সালে ব্রায়ন জিসিন একদিন বিট হোটেলে নিজের ড্রইঙ নিয়ে কাজ করার সময়ে আকস্মিকভাবে কাট-আপ টেকনিক আবিষ্কার করেন । তাঁর নিজের কথায়,”ছবি আঁকার জন্য, এক তাড়া সংবাদপত্রের ওপরে রাখা, একটা বোর্ডের চারপাশ ধারালো ছুরি দিয়ে কাটছিলুম, আর মনে হল, ছয় মাস আগে বারোজকে যা বলেছিলুম, যে ছবি আঁকার টেকনিককে লেখালিখিতেও সরাসরি প্রয়োগ করতে হবে, তা স্পষ্ট হয়ে গেল। আমি সংবাদপত্রের কেটে-ফেলা সদ্যপ্রসূত শব্দগুলো এলোমেলো সাজিয়ে একেবারে আলাদা একটা টেক্সট তৈরি করে ফেললুম, যা পরে প্রথম কাট-আপ হিসাবে আমার ‘মিনিটস টু গো’ ( ১৯৬০ ) কাব্যগ্রন্হে প্রকাশিত হয়েছে ।” ‘মিনিটস টু গো’ কবিতায় কোনো সম্পাদনা ও পরিবর্তন করা হয়নি, কাগজের ফালি সাজানোর পর শব্দগুলো যেমনভাবে সেজে উঠেছে, হুবহু তেমন করেই প্রকাশ করা হয়েছিল । ‘মিনিটস টু গো’ প্রকাশের পরে জিসিন কাঁচি-কাটা শব্দের পারমুটেশান কম্বিনেশান নিয়ে খেলেছেন । যেমন ‘আই অ্যাম দ্যাট আই অ্যাম’ কবিতাটি, এটি বাইশ লাইনের কবিতা, আমি প্রথম কয়েকটা লাইন তুলে দিচ্ছি, যাতে আকস্মিকতা ও তাৎক্ষণিকতার মিশ্রণ সম্পর্কে জিসিন যে কাজ করেছেন তার ধারণা হয় :
I AM THAT I AM
AM I THAT I AM
I THAT AM I AM
AM THAT I I AM
THAT I AM I AM
I AM I THAT AM
AM I I THAT AM
I I AM THAT AM
উইলিয়াম বারোজ সেসময়ে তাঁর ‘নেকেড লাঞ্চ’ বইটির পাণ্ডুলিপি তৈরি করছিলেন, তাতে প্রয়োগ করলেন ব্রায়ান জিসিন আবিষ্কৃত কাট-আপ পদ্ধতি, এবং মার্কিন সাহিত্য জগতে তা হুলুস্হুল ফেলে দিল । তাঁর, বারোজের, পাণ্ডুলিপিতে কাট-আপ প্রয়োগ করার সময়ে জিসিন ও বারোজ দুজনে মিলে প্রয়োজনমতো সম্পাদনা ও পরিবর্তন করেছিলেন । বারোজের ‘নোভা ট্রিলজি’তেও একই পদ্ধতি প্রয়োগ করেছেন, কিন্তু খেয়াল রেখেছেন যাতে তা অত্যন্ত দুর্বোধ্য ও অর্থহীন হয়ে না যায় । এই পদ্ধতি প্রয়োগের দরুন ভাষাকে আক্রমণ করে টেক্সটে অন্তর্ঘাত ঘটানো ও রৈখিকতা ভাঙার সুবিধা হয়ে গেল কবি ও লেখকদের ।


ব্রায়ন জিসিন-এর আঁকা ছবি

‘দি থার্ড মাইন্ড” ( ১৯৭৮ ) গ্রন্থে ব্রায়ন জিসিন বলেছেন যে, “ছবি আঁকার তুলনায় সাহিত্য পঞ্চাশ বছর পেছিয়ে আছে । আমি চাই ছবি আঁকার টেকনিকগুলো লেখালিখির ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা হোক, কোলাজ আর মন্তাজের মতন সরল ও তাৎক্ষণিক । যে কোনো বই বা সংবাদপত্রের পৃষ্ঠা নিয়ে লম্বালম্বি কেটে ফেলুন, আর সেগুলোকে এলোমেলো করে সাজিয়ে দিন, যেমন দুইয়ের পাশে চার, একের পাশে তিন । চার টুকরোর চেয়ে আরও বেশি লম্বালম্বি কেটে ফেলা যেতে পারে । ওইভাবে সাজাবার পর যে নতুন রচনা গড়ে উঠল তা পড়ুন । এগুলো আপনি নিজের জন্য করবেন । নিজের বই থেকে কাঁচি-কাটা করে সেই শব্দগুলো নিয়েও করতে পারেন ; কিংবা অন্য কোনও জীবিত বা মৃত লেখক বা কবির, যে শব্দগুলোকে এতোকাল মনে করা হয়েছিল সেই কবি বা লেখকের নিজস্ব। আপনি কাট-আপ প্রয়োগ করলেই দেখবেন যে শব্দেরা প্রকৃতপক্ষে কারোর নিজস্ব নয় । শব্দেরা স্বয়ম্ভর, তাদের রয়েছে নিজস্ব সঞ্জীবনীশক্তি ও চেতনা ; আপনি বা যে কেউ তাদের সক্রিয় করে তুলতে পারেন।”
‘দি থার্ড মাইন্ড’ গ্রন্থে বারোজ এবং জিসিনের সাক্ষাৎকার এবং কাট-আপ রচনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে । বস্তুত ব্রায়ন জিসিন নিজের আবিষ্কারগুলোর কোনো কপি রাইট রাখেননি, যে চেয়েছে তিনি তাকে নিজের আইডিয়া দিয়েছেন । এর দরুন তাঁর আর্থিক অবস্হা কখনও ভালো ছিল না, ফুসফুসের ক্যানসারে দুস্হ অবস্হায় মারা যান । বারোজ তাঁকে সাহায্যের জন্য এই বইটি প্রকাশের ব্যবস্হা করেছিলেন । বারোজ সারাজীবন আর্থিক সাহায্য করেছেন জিসিন কে ।
যে নতুন গদ্য বা কবিতা কাট-আপ করে গড়ে ওঠে, জিসিন বলেছেন, তার শব্দেরা নিজস্ব নৃত্যভঙ্গিমা নিয়ে জেগে ওঠে, অর্থময়তার ঢেউয়ের পর ঢেউ তুলে বাক্যের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে প্রতিধ্বনি হয়ে, অথচ পুরোনো গদ্য বা কবিতায় এই ক্ষমতা তাদের ছিল না । জিসিন আরও বললেন, কবিদের কাজ হল শব্দদের মুক্তি দেয়া, আত্মনির্ভরশীলতা দেয়া । ভাবপ্রকাশের শব্দসমষ্টিতে শব্দদের শৃঙ্খলিত করা কবিদের কাজ নয় । কে বলেছে কবিদের কাজ চিন্তা করা ? কবিদের কাজ হল শব্দদের বুকে যে গান ভরা আছে সেগুলো তাদের গাইতে দেয়া । কবিদের “শব্দের মালিকানা” হয় না, “কোনো কবির নিজস্ব শব্দবন্ধ হয় না । কবে থেকে শব্দেরা ব্যক্তিগত সম্পত্তি হয়ে উঠল ?”
জিসিন বললেন, কাট-আপ পদ্ধতি কবি-লেখকদের এনে দিয়েছে ধ্বনি ও দৃশ্যের কোলাজ, যে পদ্ধতি ছবি-আঁকিয়েরা বহুকাল ব্যবহার করছেন, ঠিক তাই ; একই পদ্ধতি দেখা যায় মুভি ক্যামরা বা স্টিল ক্যামেরায় তোলা ফোটোয় । পথে তোলা ফোটোগুলোতে পাওয়া যাবে অপ্রত্যাশিত পথচারীদের, তারা আকস্মিকভাবে দৃশ্যের ফ্রেমে কাট-আপ শব্দের মতন দেখা দেয় । খ্যাতনামা ফোটোগ্রাফাররা জানেন যে সবচেয়ে ভালো ফোটোগুলো আকস্মিকভাবে তোলা ; একই কথা বলবেন কবি-লেখকরা, যাকে অনেকে বলেন প্রেরণা । আকস্মিকতা ও তাৎক্ষণিকতা ভেবেচিন্তে হয় না, তা আপনা থেকে উদয় হয়, কাট-আপে পাওয়া অর্থময়তার ঢেউদের মতন, একখানা কাঁচির সাহায্যে । ব্রায়ান জিসিনের আলোচক মারিনা ক্যাশডান বলেছেন যে, বর্তমান যুগের কাট-আপ হল টুইটার ফিডগুলো । কাশডান বলেছেন যে জিসিন “সামাজিক নিয়ন্ত্রণ থেকে চেতনাকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন।”
কাট-আপ পদ্ধতি ছাড়াও ব্রায়ন জিসিন আবিষ্কার করেছিলেন ‘সাউন্ড পোয়েট্রি’ এবং ‘ড্রিমমেশিন’। বিভিন্ন জিনিসের আওয়াজকে সাজিয়ে কবিতা লিখেছিলেন তিনি, যার মধ্যে বিখ্যাত হল ‘পিস্তল পোয়েট্রি’, বিবিসি থেকে প্রসারিত হয়েছিল, ইউ টিউবেও আছে । পিস্তলের গুলি ছোঁড়ার আওয়াজকে বিভিন্ন দূরত্ব থেকে রেকর্ড করে কবিতা তৈরি করেছিলেন ।
ইয়ন সমারভিলের সঙ্গে কাজ করে তিনি ড্রিমমেশিন নামে একটি গ্যাজেট তৈরি করেছিলেন । গ্রামোফোন রেকর্ডের টার্নটেবিলের ওপরে রাখা চারিদিকে-কাটা একটি গোলাকৃতি সিলিনডারের ভেতরে ঝোলানো আলো ; সেদিকে চোখ বন্ধ করে বসে থাকতে হবে । টার্নটেবিল ঘুরতে থাকবে ৭৮ বা ৪৫ আর পি এম-এ, এবং সেদিকে চোখ বন্ধ করে একাগ্র থাকলে চোখের শিরায় তার এমন প্রভাব পড়বে যে বহু অচেনা দৃশ্য ভেসে উঠতে থাকবে। যাঁদের এই গ্যাজেটের সামনে বসার অভিজ্ঞতা হয়েছে, তাঁদের কারোর-কারোর ক্ষেত্রে, দৃশ্যের পরিবর্তনের দ্রুতির কারণে, মাতনের অবস্হা হয়েছে, এবং শব্দেরা নতুন অর্থময়তার ঢেউ তুলেছে ।
ব্রায়ন জিসিনের কাট-আপ পদ্ধতি বহু দেশের সাহিত্যিকরাই নিজেদের কবিতা ও গদ্যে প্রয়োগ করেছেন। হুলিও কোর্তাজার তাঁর ‘হপস্কচ’ ( ১৯৬৩ ) উপন্যাসে এবং অ্যালান বার্নস ‘ইউরোপ আফটার দি রেইনস’ ( ১৯৬৫ ) গ্রন্হে ।
বাংলা সাহিত্যে, আলোচকরা বলেছেন, বাসুদেব দাশগুপ্ত কাট-আপ পদ্ধতি প্রয়োগ করেছেন ‘দেবতাদের কয়েক মিনিট ( ১৯৭১ ) গল্পে। ১৯৬৭ সালে কলকাতা হাইকোর্টে হাংরি আন্দোলন মামলার ফয়সালা হবার আগে আমি বাসুদেব দাশগুপ্ত ও সুভাষ ঘোষকে কাট-আপ পদ্ধতি ব্যাখ্যা করেছিলুম । বাসুদেবের ‘দেবতাদের কয়েক মিনিট’ গল্পটা আমি পড়িনি । সুবিমল মিশ্র তাঁর একাধিক গদ্যে প্রয়োগ করেছেন । শাশ্বত সিকদার করেছেন তাঁর ‘ শাশ্বত অভিধান’ গদ্যে । স্বপনরঞ্জন হালদার করেছেন তাঁর একমাত্র গ্রন্হে । নব্বুই দশক থেকে বাংলা কবিতায় শব্দবিন্যাস দেখে আঁচ করা যায় যে কবিরা কাট-আপ প্রয়োগ করছেন, কাঁচি দিয়ে কেটে নয়, কোনো-কোনো শব্দ বাক্যের মাঝখান থেকে সরিয়ে দিয়ে, উল্লেখ্য হলেন মিতুল দত্ত, শ্রীদর্শিনী চক্রবর্তী, অলোক বিশ্বাস, দীপঙ্কর দত্ত, দেবযানী বসু, প্রণব পাল, সরসিজ বসু, অনুপম মুখোপাধ্যায়, তানিয়া চক্রবর্তী প্রমুখ ।

ফেসবুক মন্তব্য