তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল

প্রগতি বৈরাগী

বাঁশির আওয়াজে ঘুম ভাঙে রোজ। ছোট্ট একটু গড়ান দিয়ে পৌঁছে যাই সিঙ্গল বেডের একূল থেকে ওকূল। বিছানায় সার দেওয়া গতরাতের আধখাওয়া কফির কাপ, চ্যাপটানো সিগেরেটের প্যাকেট, অ্যাশট্রে, ল্যাপটপ- খচমচ টুংটাং তুলে সরে গিয়ে জায়গা করে দেয়। ময়লা ফেলার গাড়ির সাথে চোখাচোখি হয় না আমার কোনোদিনই। কানে বালিশ চেপে আর একখান ঘুম দিই, ওটুকু বিলাসিতা আমি প্রতিমাসে আড়াইশো টাকা দিয়ে কিনে নিয়েছি। লোকটিকে ফোন করলেই বেলায় এসে নিয়ে যায় ময়লা জমানো পলিথিন ব্যাগ। সকাল সকাল আমাকে আর ফিরে যেতে হয় না ইনারওয়্যারের আঁটোসাঁটো অনিচ্ছার ফ্রেমিং-এ।

বেলা বাড়লে জানালার কাঁচের স্লাইডারে রোদ আর ঘরের মধ্যে শীত ঘন হয়ে আসে। কাঁপতে কাঁপতে উঠে বসি সুজনির ভিতর, হাতড়ে খুঁজি সাড়হীন পাদুটো, ঠুঁটোভাব কাটানোর জন্য ঘষে দিই দুহাতের তালু দিয়ে। বেকায়দার ঝড়ে পড়ে যাওয়া ক্ষুদে জাহাজটিকে কোরাল রিফে আছড়ে পড়ে টুকরো হওয়া থেকে বাঁচিয়েছিল এক মাছেদের মেয়ে। বুক ঢেকে রাখা স্টারফিশের কাঁচুলি সরিয়ে বালিকাঁদা, সমুদ্রশঙ্খ কিচকিচ জাহাজের ডেকে ওম দিয়েছিল ছমছমে বলিষ্ঠ অথচ ঝড়তুফানে চোখ খোয়ানো নাবিকটিকে। এক মধুকৃষ্ণা রাতে, গাঢ় বেগুনি আকাশ ব্লুবেরি স্কুপের মত গলে পড়ছে সমুদ্রবাটিতে, ঢেউয়ের আগায় ফেনিয়ে উঠেছে আদরপরবর্তী পুরুষদাগ। নাবিক তার আঙুল ছুঁইয়ে দেয়, ঠোঁট ঘষে মাছকুমারীর় কচি আঁশঢাকা মেয়েচিহ্নে। নাবিকের দৃষ্টি ফিরিয়ে আনার নিদান শুধু একটি জলজ সঙ্গম। মৎস্যকুমারী ব্যথা গিলে দুহাতে একটি একটি করে ছিঁড়ে ফেলে করুণ জাফরানি আঁশ, নখে শরীর চিরে বের করে আনে রক্তাক্ত, থরথরে দুটি মানুষী পা আর পাতাঢাকা গর্ভকুঁড়ি। ঘুম ভাঙার পর মেঝেয় দাঁড়িয়ে মাথার ভিতরে পা ব্যথা হয় আমার, টলমল করতে করতে এগোই বাথরুমের দিকে। খুঁটে খুঁটে খুঁজি পুরোনো আঁশ, শুকিয়ে আসা মরচে-রং রক্তদাগ।

ব্রাউন ব্রেডের মাঝখানে অনেকটা পিনাট বাটার মাখাই, চায়ের কাপে চোখ আটকায় আমার। সিপিয়ারং গ্রিন-টি যেন শান্তজল, তাতে আধভাঙা কাঠের জাহাজের আভাস। দুপুর গড়াতে তাপ বাড়ে, জল সরে গিয়ে মুখ বের করে ছাই-ছাই পাথুরে রাস্তা। ওই কাঠকুটো জড়ো করে আমি কোনোমতে একটা হাতে-টানা রিক্সা দাঁড় করাই। কাঠের গায়ে গায়ে চোখ টানছে জাহাজের ফ্রেস্কো, অথচ এমন ভাঙচুর, যে একটা পাজলও কমপ্লিট হয় না!

রাস্তায় বেরিয়ে ফুটপাত ঘেঁষে এগোই, পায়ে চলা লোককে দৌড়ে পার হয়ে যাই, বড়সড় গাড়িকে ফুটপাতে উঠে গিয়ে জায়গা ছেড়ে দিই। হাওয়ায় জমাট বাঁধছে ঝাঁঝালো রোদ্দুরের গন্ধ। ...তেষ্টা পায়, জিভে খিদে-খিদে ভাব! হাঁটতে হাঁটতে ধর্মতলা, রাস্তার পাশে পাইস হোটেল, ঢুকে পড়াই যায়, কিন্তু খেতে আসা অন্য খদ্দেরদের চোখে বারণ দেখি। আমার স্ট্রাটেজিক্যালি ছেঁড়া জিন্স, মধ্যবিত্ত মাজা মুখ ওদের বিরক্ত করে। খেতে খেতে বেঞ্চিতে চাপতালি মেরে বসা হাঁটুর উপর লুঙ্গি ঢাকা দেয়, ভাতের গরাস ছোট করে, খাবার মুখে ঠা ঠা করে হাসে না, যদি ভাতের কণা ছিটকে এসে লাগে আমার গায়ে, আইভরি শেড অ্যাডিডাসে।

মিনেরেল ওয়াটারের বোতল কিনে এগিয়ে যাই, পেভমেন্টে নীল পলিথিনের তাঁবু, গুছিয়ে বসেছে নিউক্লিয়ার পরিবার। পুরুষের মৃদু গজগজ মিইয়ে যায় দোধারি সাপিনীশব্দে, “কামকাইজ করবা না, কী রানমু ...তুমার বিচি?” আহা, লকলকে বাতিটিকে চোখ ভরে দেখতে ইচ্ছে করে! ঈষৎ পৃথুলা শিখাটি ততক্ষণে হাতখোঁপা বেঁধে পথের উপরেই তোলা উনুনে আগুন দিয়েছে। আমার দিকে একদলা বিষনজর ছুঁড়ে মরদকে ঠেলা মারছে, “এইহানে খাড়াও ক্যান? মাইয়ারে যাইয়া দ্যাহো, ভাত হইলে ডাকুম নে।”

আমি তবুও বেহায়ার মতো দাঁড়িয়ে থাকি, হাঁ করে দেখি ওদের ঘরকন্না। ভাত ফুটছে, ডাল সম্বরার গন্ধ নাকে নিয়ে শ্বাস আটকে রাখি, মুখে জল জমে। কতদিন আমায় কেউ এমন খেতে দেয়নি! গোল হয়ে বসে নাক মুছিয়ে ভাতের দলা গুঁজে দেয়নি মুখে। কতদিন বাড়ি যাইনি, ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ করলে ঘরের মধ্যে শুধু একজোড়া পায়ের আওয়াজ! টান হাওয়ায় শিরশির করে গা, মনে হয় আমার মা নেই। মরে গেছে আমার মা! বাবা জাহাজ সাজিয়ে বাণিজ্যে গেল, আর ফিরে আসেনি। ভাতের পাতে ছাই দিয়েছিল সৎমা, তারপর তো ভুলিয়ে রেখে গেছে এই ডাইনি রোজিনা লেকেরমলের জঙ্গলে! একথালা সাজানো ভাতের জন্য আমার মন কালো হয়ে যায়, ফোড়নের ডাল আর পেয়াঁজ, কাঁচা লঙ্কা, সর্ষের তেল মাখা আলুভাতের জন্য কান্না পায়।

শালপাতায় চাট বিক্রি হচ্ছে, ফুচকাওয়ালাকে একপ্লেট পাপড়িচাট দিতে বলে রাস্তা দেখি। বাসের গায়ে চাপড়াতে চাপড়াতে পিছনে ছুটছে লোকেরা। বাস থামে দুমিনিটের জন্য, যারা উঠতে পারেনি, মুখ খেঁচায়, “শালা বাঞ্চোত”, তারপর আবার বাসের লাইনে গিয়ে দাঁড়ায়, হাঁপায়, থুতু ফেলে। রাস্তা পার হওয়ার জন্য ট্রাফিক সিগন্যালের দিকে বারবার বোকা তাকায় চোখে মোটা কাজল আর কপালের কোনায় নজরটিপ দেওয়া বাচ্চা কোলে মা। বাঁহাতের কনুই থেকে ঝুলছে পোটলাপুঁটলি, পলিথিনেরর প্যাকেট। ডানহাতে শক্ত করে ধরা মেয়ের কবজি, তার ন্যাড়ামাথায় লালফিতে আর পলিয়েস্টারের নীলফ্রকের বুকে নেটের বড়বড় চুমকি দেওয়া ফুল। রাস্তা পার করে মা উবু হয়ে বসে ফুটপাতের দোকানগুলোতে, ছেলেকে কিনে দেয় প্লাস্টিকের হলুদ হাঁস, মেয়ের পায়ের হাওয়াই চটি খুলিয়ে প্যাকেটে ঢোকায়, দরদাম করে কেনে ক্যাটকেটে সোনালি রঙের ব্যালেরিনা। ন্যাড়ামাথা মেয়ে ফোকলা মুখে একঝাঁক রংমশাল জ্বেলে লাফায়, হিহি করে হাসে। চাট বানাতে বানাতে লোকটি বারবার তাকায় আমার বুকের দিকে। আমি ওর চোখে সোজা তাকিয়ে থাকি, চোখ নামিয়ে নেয়, প্লেট এগিয়ে দেবার সময় দুটো পাপড়ি বেশী দেয়।

জিভ দিয়ে চেপে ভাঙি সেদ্ধ আলুর টুকরো, টকঝাল নুন মরিচ স্বাদ মিশে যায় মুখের ভিতর লালায়। এসপ্ল্যানেডের মোড়ে গোল করে লোক জমছে, ঠেলেঠুলে ঢুকে যাই গোলের এক্কেবারে ভিতরে। “মাই নেম ইজ শীলা, শীলাকি জওয়ানি”... ঘুরে ঘুরে না ফোটা বুক কোমর দুলিয়ে, পাছা টুয়ার্ক করে নাচছে সাত-আট বছরের যৌবনবতী। জিপারছেঁড়া জামার পিঠের সেফটিপিন খুলে নামিয়ে আনছে বুকের মাঝবরাবর, ...ভিড় ঘন হয়ে আসে আরো। ও কাঁধ নাচিয়ে ঘুরে ঘুরে হাত পাতে, আমার মুঠোর মধ্যে পাথর হয়ে যায় দশটাকার নোট। ওর চোখের পিচুটি, ঠোঁটের পাশের ময়লার দাগ দেখে ঘেন্না করে, কাঠিকাঠি হাত-পা আর লালচে চুল কষ্ট দেয়। মুখ শক্ত করে বেরিয়ে আসি।

একটু দূরে মাটিতে বসে ভিক্ষা করছেন এক বৃদ্ধা, তার চোখে আঁচল চেপে বিড়বিড়োনির মাঝেই হাতে ধরিয়ে দিই টাকাটা। বুড়ির চোখ বারবার আটকে যাচ্ছে আমার হাতের চাটে। প্লেট নামিয়ে রেখে হাঁটা দিই। মেট্রোর সিড়ি দিয়ে নামতে নামতে মাথা ঘুরিয়ে দেখি পয়সা কুড়োনো ছেড়ে বুড়ির কোলের কাছে বসে এতোলবেতোল বকছে আর পাপড়ি তুলে তুলে মুখে দিচ্ছে সে। মনে মনে বলি, “ও বুড়ি, শুনছো গো বুড়ি, সামলে রেখো ওকে কাঠ, পাথর, গাছের ডাল, লোহার রড আর সার্জিক্যাল রাক্ষসদের থেকে।”

মেট্রো স্টেশনের গেট দিয়ে বেরিয়ে বাঁদিকে ঘুরতেই তৃতীয় লিঙ্গের একজন মানুষের সাথে ধাক্কা খেতে খেতে সামলে নিই। (এসব সময়ে নিজের দ্বিচারিতায় নিজেই চমকে যাই, আমি এতও পারি! মাথার ভিতরে সেকেন্ডেরও ভগ্নাংশে এল ‘হিজড়ে’, অথচ লিখলাম ‘তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ’। আর কীইবা লিখতাম, আজ থেকে ওদের নাম দিলাম ‘হ্যাঁ-মানুষ’।)

খুব কাছ থেকে দেখি তাকে, নিখুঁত করে আঁকা ভুরু, মভ শাড়ির সাথে ম্যাচিং বেগুনি নেল পেইন্ট আর গোলাপি লিপশেড। সোনালি চুড়ি পড়া ওয়্যাক্সড হাতে বারবার ফোন তুলে সময় দেখে। আমি যেন কবে ম্যানিকিউর করিয়েছিলাম, পেডিকিউর! মনে পড়ছে না! শেষ কবে গোড়ালিদুটো ঘষে নিয়েছিলাম স্নানের ঘরে! তার মানুষটি আসে, টিমটিমানো চোখ আর হাত আকড়ানি দেখে বুঝতে পারি সব! ওরা দুটি অচিনগন্ধী ওয়াটার লিলির মত পাশাপাশি টলমল করে, দুজনের আঙুল আর হাত গল্প করতে করতে চলে যায়। সামনে যতদূর চোখে পড়ে, রাস্তাটুকু বয়ে চলেছে অস্কার ক্লঁ মনের ফিরোজারঙ ছলছল ইজেলের মত।

আমারো ইচ্ছে করে এমন একটি প্রফুল্ল গল্পের মধ্যে ঢুকে পড়তে, পদ্মপাতায় অমন জলের ফোঁটাটি হয়ে ঝলমল আলোর কারিকুরি ছড়াতে। আকাশ ঘন হয়ে আসে, ভিতর-বাহির রসস্থ আমি ঘরে ফিরি। উন্মুক্ত স্নানের পর, সমুদ্র নীল রেশমের শাড়িটি জড়িয়ে নেব শরীরে উজ্জ্বল, কনুই ঢাকা হলুদ ব্লাউজ, তার পিঠের উপর ট্যাসেলে নীল আর সোনালি সুতোয় এমব্রয়ডারির ফোঁড় তোলা “মনে রেখো”। আয়নায় ঝোলানো স্যান্টেলিয়র লেস গুনগুন করে,

“সখি কি পুছসি অনুভব মোয়।
সোই পিরীতি অনুরাগ বাখানিতে
তিলে তিলে নূতন হোয়।।”

কপালের মাঝখানে আকাশনীল জাপানি সিঁদুরের টিপ, চোখের কোণে রামগিরি পর্বতের বপ্রক্রীড়া করা খেলুড়ে আর ফিচেল মেঘের দল। যতবারই কেটে ফেলি, কল্পনায় আমার চুল হয়ে যায় রূপকথার রমণীদের মত, তেমনই ফিঙেরঙ আর হাঁটু ছুঁইছুঁই। বাঁদিকের প্রোফাইল আলো করে রাখে মোতিয়া বেশর, চুলে জাতিফুল, অপেক্ষার মত করুণ আর নীরক্ত।

সন্ধে হলে জানালার পেলমেটে আর ব্যালকনিতে ঝুলিয়ে দিই রোহিণী অভিসার। কোবাল্ট ব্লু প্যালেটে কে যেন এইমাত্র একটা চারকোল ব্ল্যাকে ডোবানো মোটা ব্রাশ ঘষে দিল। আজাইরা বারিষ ফিরে ফিরে আসছে বারবার অপমানিত হবার পরও পাড়ার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা মুখ-নিচু যুবকের মত। সমস্ত বিষাদ ভ্যাকুয়াম করে ফেলে দিই ওয়েস্ট বাস্কেটে, ভাবতে চাই কোথাও কোন দুঃস্বপ্ন নেই, ডায়েরিচাপা অসুখ, লেসঢাকা কালশিটে নেই কোনো। চন্দনগন্ধী বাক্সে ময়ূরকণ্ঠী রেশমে আমাদের ব্যক্তিগত মধুকর, ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’, তার উপর দুমুঠো কুন্দফুল। এমপিথ্রি প্লেয়ারে অগুরু ছড়াচ্ছেন পণ্ডিত যশরাজ।

“শ্যাম বিনা উনে ইয়ে বদরা
আজ শ্যাম সপনে মেই দেখা
ভরি আয়ি নায়ন ধুরাক গ্যায়ো কজরা”

স্ট্রিটলাইটের টিমটিমে আলোয় মোটা গুনসূচে এবড়োখেবড়ো ফোঁড়ে সন্ধ্যার সাথে সেলাই হয়ে গেছে গভীর রাত। বারবার সান্ত্বনা দিয়ে বিষণ্ন অন্ধকার ফেলে উঠে গেছেন যশরাজ। আসেনি কেউ, ...আসে না কেউ। সেরামিক প্লেটে বেতের ঝুড়িতে ঢাকা হানিচিকেন এতক্ষণে শুকিয়ে কাঠ, এবার টান মেরে ফেলে দিলেই হয়!

আমি শেষবিন্দু অবধি উচাটন ঘষে ঘষে সাফ করি লিকুইড সোপ দিয়ে। যেন এমনই স্বাভাবিক, এমনই হওয়ার ছিল। ময়েশ্চারাইজারের সাথে মেখে ফেলি পাখার টিকটিক আওয়াজ আর বাথরুমে জলের ফোঁটার শব্দ। তারপর সবথেকে ফেভারিট ফুশিয়া ফেল্টপেনটা নিয়ে ব্যালকনিতে দাঁড়াই। বৃষ্টির গায়ে বুলিয়ে-বুলিয়ে লিখি –

“একদিন শরীরের স্বাদ আমি জানিয়াছি, সাগরের জলে
দেহ ধুয়ে, - ভালোবেসে ভিজিয়েছি আমাদের হৃদয় কেমন!
একদিন জেগে থেকে দেখিয়েছি আমাদের জীবনের এই আলোড়ন,
আঁধারের কানে আলো- রাত্রি দিনের কানে কানে কত কথা বলে…”

সমুদ্রের গন্ধ পাই, ...পোড়া নুন, লোনা বাতাস, আঁশটে গন্ধ... টুপ করে খসে পড়ি স্বপ্নের ভিতর।

ফেসবুক মন্তব্য