ঘাড় ঘুরিয়ে দেখা

অর্ঘ্য দত্ত



যে কোনো পছন্দের কাজ শুরু করার সময় একটা প্রবল উত্তেজনা প্রাথমিক চালিকাশক্তি হিসাবে কাজ করে। তারপর যত দিন যায় সেই উত্তেজনার ক্ষয় হতে থাকে। সেই কাজ শুরু করার পেছনের উদ্দেশ্য, তার এগিয়ে যাওয়ার পথের স্পষ্ট রূপরেখা, তার স্থির গন্তব্যকেই তখন হয়ে উঠতে হয় মূল চালিকা শক্তি। তাই যারা কোনো উত্তেজনার বশবর্তী হয়ে, কোনো স্বপ্ন ছোঁয়ার প্রণোদনায় হঠাৎ যাত্রা শুরু করেন, তাদের বোধহয় মাঝে মাঝে থমকে দাঁড়িয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে নিতে হয় পেছনে পথে ফেলে আসা পায়ের চিহ্নগুলো, বুকের মধ্যের স্বপ্নটিতে লাগিয়ে নিতে হয় নতুন রঙের প্রলেপ, গন্তব্যের স্থির ঠিকানাটিকে চোখের সামনে ধরে মাঝেমাঝে মিলিয়ে নিতে হয় দূর বাতিঘরের ইশারার সঙ্গে।

বম্বেDuck যাত্রা শুরু করেছিল দুহাজার ষোলোর দোসরা অগষ্ট। আবার কেন নতুন একটি পত্রিকা, এর কী প্রয়োজন, কী চরিত্র হবে এই পত্রিকার এমন নানান প্রশ্নের বারবার মুখোমুখি হতে হয়েছিল আমাদের। তবু দেখতে দেখতে কেটে গেছে দু-দুটি বছর। কেটে গেছে জন্মলগ্নের সেই উত্তেজনা। পরিকল্পনা মতোই নিয়মিত বেরিয়েছে ওয়েব সংখ্যাগুলি। গত কলকাতা বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে প্রথম কাগজে ছাপা সংখ্যাটি। প্রশংসাও জুটেছে কিছু।

আজ যখন থমকে গিয়ে ভাবতে বসি আমরা যে স্বপ্ন দেখেছিলাম, যা ভেবেছিলাম, যেমনটি ভেবেছিলাম তার কতটুকু ছুঁতে পেরেছি, সত্যি বলছি মনের মধ্যে এক মিশ্র প্রতিক্রিয়া হয়। আমি জানি, সিদ্ধার্থ বা অরিন্দম যারা আড়ালে থেকে, নীরবে, নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছে বম্বেDuck-এর জন্য, তাদের মনেও হয়তো এ প্রশ্ন এসেছে। আমরা ঠিক পথে আছি তো! ঠিক দিকে যাচ্ছি তো! তাই আজ একটু মিলিয়ে নেওয়া যাক চাওয়া পাওয়ার খতিয়ানটা।

বম্বেDuck প্রকাশের উদ্যোগের পেছনে আমাদের প্রাথমিক উদ্দেশ্যগুলোর অন্যতম ছিল, এই পত্রিকাকে ঘিরে মুম্বাই শহরে একটা সিরিয়াস বাংলা সাহিত্যচর্চার পরিবেশ তৈরি করা, আগ্রহী পাঠক তৈরি করা। এবং এ ব্যাপারে বম্বেDuck অনেকটাই সফল হয়েছে। আজ বম্বেDuck আয়োজিত শুধুমাত্র সাহিত্য বিষয়ক অনুষ্ঠানগুলোতেও আগ্রহী ও রসিক দর্শক-শ্রোতাদের অভাব হয় না। তাছাড়া এ শহরে একসঙ্গে এতজনকে লেখালেখি করতে আগে কখনো দেখেছি বলে আমার মনে পড়ে না। যেহেতু বম্বেDuck নিয়মিত প্রকাশিত হয়, তাই আমরা যারা এই শহরে বা আশেপাশে, মানে পুণে, বরোদা, আহমেদাবাদে বসেও লিখছি তারা চাইলে এটি তাদের ভালো লেখাগুলো প্রকাশের একটি নির্দিষ্ট পত্রিকা হয়ে উঠতে পারে।

এ শহরে বসে সবে লিখতে শুরু করেছেন এমন বেশ ক'জনের লেখা কবিতা বম্বেDuck প্রকাশ করেছে, প্রয়োজনীয় সম্পাদনাটুকু সেরে নিয়ে। আজ বম্বেDuck আর শুধুই আমন্ত্রিত লেখা নির্ভর নয়। সারা বছর ধরেই বম্বেDuck-এর মেলবক্সে এসে পৌঁচচ্ছে অচেনা, অপরিচিত কবি-লেখকদের বহু লেখা। এবং আমরাও চেষ্টা করছি অতিপরিচিত লেখক কবিদের লেখার পাশে পাশে নতুন, অপরিচিতদের লেখাও প্রকাশ করতে।

এবারের'আমচি মুম্বাই'বিভাগে এমন চারজন কবির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি যারা মুম্বাইয়ে বসে নিয়মিত কবিতা লিখছেন হিন্দি ও ইংরাজীতে। তাদের কবিতার বাংলা অনুবাদ পাবেন এই বিভাগে।


কিন্তু শুধু কি এটুকুই! না। আমরা চাই এবার ক্রমশ গতানুগতিকতার গন্ডী ডিঙিয়ে বম্বেDuck গড়ে তুলুক তার নিজস্ব বিশিষ্ট চরিত্র। সে পরিচিত হোক, মান্য হোক তার স্বকীয় বৈশিষ্টে।
সামনের দিনগুলিতে বম্বেDuck-এর চলার পথে আসুক নতুন বাঁক। নতুন লেখকের অপরিশীলিত ওস্তাদিহীন লেখার স্বাভাবিক মায়াময়তার সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিটি সংখ্যার গায়ে পড়ুক কিছু নতুন ভাবনা, মনন ও মেধার তির্যক ছায়াও। এর চরিত্রে গাঁথা হতে থাক কিছু ধূসরতার দ্যোতনা।

কবি, লেখক ও পাঠক বন্ধুরা সঙ্গে থাকুন।

ফেসবুক মন্তব্য