সেলস ম্যান

সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়



“জীবনের প্রতি বিশ্বাস হারাইবেন না, ভাইলোগ! চর্মরোগ থেকে ধর্মরোগ, এ চূরণ মুহূর্তে সারায় সর্বরোগ, বিশেষত, যারা অকর্মার ধাড়ি, হাঁড়িমুখ, ছাতা পড়া মাড়ি তাদের জন্য এ এক অব্যর্থ নিদান। ব্যাস, শর্ত একটাই - দু চামচ করে দুই বেলা জলে গুলে খান। নিয়মিত খেলে গাবরু জোয়ান হবে রোগাভোগা ছেলে। এলেবেলে খেলোয়াড় ফুটবলে পা লাগালে হয়ে যাবে পেলে। অফিসের বস বশে আসবে, ঝামা হামা দিয়ে গিয়ে শত্তুরের নাক ঘষে আসবে।”

“ক’দিন লাগবে?”

স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে কাঠচাঁপা গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে যে লোকটা চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে ওষুধ বিক্রি করছিল, সে একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল, “কীসের ক’দিন?”

“ওষুধটা ধরতে?”

বিক্রেতা আড় চোখে ছেলেটাকে জরিপ করল। গোল গলা রঙ ওঠা গেঞ্জি, হাঁটু অব্দি লম্বা হাফ প্যান্ট, ভাঙ্গা গাল, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। চোখ দুটো অস্বাভাবিক রকমের জ্বলজ্বলে। সামান্য থতমত খেয়ে জিজ্ঞাসা করল, “আফনার সমস্যাটা কী?”

ছেলেটা কথার জবাব দিল না। একদৃষ্টে রেল লাইনের দিকে চেয়ে রইল। তারপর বিড় বিড় করে নিজের মনে হাবিজাবি বকতে বকতে এগোল।

“জীবনের প্রতি বিশ্বাস হারাইবেন না, ভাইলোগ! নিকষিত হেমরোগ থেকে বিকশিত প্রেমরোগ, এ চূরণ মুহূর্তে সারায় সর্বরোগ। বিশেষত, যারা ভালবাসা পেয়ে, সেধে হারিয়েছে, প্রেমে ঘা খেয়ে সরে দাঁড়িয়েছে, তাদের জন্য এ এক আশ্চর্য বিধান।”

ছেলেটা হাঁটা থামিয়ে পিছন ফিরে দেখল। দোনামোনা করে ফিরে এল, “এক শিশি দেখি... কত?”

ছেলেটার বয়স আন্দাজ করা কঠিন, পঁচিশ ছাব্বিশ হবে, তিরিশ-বত্রিশও হতে পারে। ঢোলা প্যান্টের পকেট থেকে ময়লা একটা নোট বার করে পয়সা মেটালো। চূরণের শিশিটা নিয়ে টপ করে প্যান্টের অন্য পকেটে চালান করে দিল। চারপাশটা একবার দেখে নিল, কেউ নজর করছে কিনা, যেন কোনো অপরাধ করেছে, কেউ দেখে ফেললে মুশকিল হয়ে যাবে। আচমকা ঘুরে দাঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করল, এমন একটা ভাব, খুব দরকারি কোনো কাজ মনে পড়ে গেছে। অবশ্য একটু এগোতেই একজন পিছু ডাকল, “কী রে চাঁদু, তাড়াহুড়ো করে কোথায় চললি?”

চাঁদু যার ভাল নাম চন্দন, তাকে এ চত্বরে মোটামুটি সবাই চেনে। রোজ সন্ধের দিকে প্ল্যাটফর্মের শেষ বেঞ্চির অন্ধকারে বসে চার-পাঁচজন বাপে খেদানো মায়ে খেদানো ছেলে নেশাভাং করে। সেই দলে চন্দনকে নিয়মিত হাজিরা দিতে দেখা যায়। এমন নয় তারা চন্দনের জিগ্‌রি দোস্ত। বর্ষা বাদল হলে ঠেক ভেঙে যায়, পকেট খালি থাকলেও তারা চন্দনকে ভাগিয়ে দেয়। চন্দন শুকনো মুখে শেডের নিচে এসে দাঁড়ায়। চেনা লোক দেখলে এগিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বলে, “পঞ্চাশটা টাকা হবে? কালকে ফেরত দিয়ে দেব।”

চন্দন চমকে ফিরে তাকাল। ঠাহর করতে পারল না কে ডাকছে। একটু অবাকই হল। চেনা পরিচিত বন্ধু-বান্ধবরা তাকে সাধারণত এড়িয়েই চলে। অবশ্য আজ তার পকেটে যা খুচরো খাচ্‌রা পড়ে আছে তা দিয়ে দু-এক দিন অনায়াসে চলে যাবে, আপাতত কারো কাছে হাত পাতার দরকার নেই। প্ল্যাটফর্মের ওপর পাঁচমিশালী মানুষের ভিড়। চেনা মুখ খুঁজল চন্দন। রাত হয়ে আসছে, সনাতনদার চায়ের স্টল ফাঁকা। সিমেন্টের বেঞ্চে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দু-চার জন। ওটা কে? বাপ্পা না? হাত তুলে ইশারা করছে।

বাপ্পা চন্দনের স্কুলের বন্ধু, চেন্নাইতে চাকরি করে, অনেকদিন দেখা হয় না ওর সঙ্গে। চন্দন পাশে গিয়ে বসল। প্যান্টের পাতলা কাপড় ভেদ করে হাড় মাংস চামড়ায় সিমেন্টের বেঞ্চের ঠাণ্ডা লাগল। চন্দনের পেচ্ছাপ পেয়ে গেল। আজকাল বেশিক্ষণ পেচ্ছাপ চেপে রাখতে পারে না চন্দন। উঠতে যাচ্ছিল, বাপ্পা খপ করে হাত টেনে ধরল, “কী চেহারা করেছিস? খাওয়া দাওয়া করিস নাকি শুধু উইড ফুঁকেই দিন কাটাস?”

চন্দন হে হে করে হাসল। বলল, “বাসাংসি জীর্ণানি... কিছুই তো অবিনশ্বর নয় রে। এই যে দেখছিস রেল-লাইন, বেশি নয়, পাঁচশ বছর আগেও এখান দিয়ে সরস্বতী নদী বইত, পাল তোলা জাহাজ চলত, আজ দেখ সব ভোঁ ভাঁ। মাঝে মাঝে খালি বুনো বাইসনের মত একটা করে ট্রেন চলে যায়।”

বাপ্পা হতভম্ব হয়ে ওর দিকে চেয়ে রইল। কী কথার কী উত্তর! বলল, “কী, আজেবাজে বকছিস!”

চন্দন বলল, “মা কালীর দিব্যি, চোখ বুঝলেই আমি দেখতে পাই রেল লাইনের ওপর দিয়ে একটা দামড়া জাহাজ ভেসে আসছে। এক দঙ্গল মেয়ে সেই জাহাজের আপার ডেকে সারি দিয়ে বসে আছে। তাদের পরনে জরির পাড় দেওয়া ঘিয়ে রঙের পোশাক। রেলিং আঁকড়ে পা দোলাতে দোলাতে তারা ছেনালি করছে, একে অন্যের গায়ে ঢলে পড়ে হাসছে।”

বাপ্পা বলল, “চাঁদু, আলবাল না ভাটিয়ে বাড়ি যা।”

চন্দন বাপ্পার হাত দুটো ধরে কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, “বিশ্বাস করলি না তো? কেউ করে না। তুই আমার ছোটোবেলার বন্ধু, তোকে ঢপ মেরে আমার কী লাভ বল? মাইরি বলছি, ফিনিক দিয়ে জ্যোৎস্না ফুটতে পায় না, মেয়েগুলো একসঙ্গে লো ফ্রিকোয়েন্সিতে গান ধরে। কুড়ি হার্জের নিচে ব’লে কথা স্পষ্ট বুঝতে পারি না, শুধু সুর শুনতে পাই।”

বাপ্পা উঠে পড়ল, “তুই বসে বসে জাহাজী মেয়েছেলেদের গান শোন, আমি চলি, আমার ট্রেন ঢুকছে।”

ঝমঝম করে ট্রেন এল, বাপ্পা আলোকিত কামরায় চড়ে হাত নাড়ল। বাপ্পার শ্বশুরবাড়ি শ্রীরামপুরে, সেখানেই গেল মনে হয়। চন্দনের মনে পড়ল, বাপ্পার বিয়েতে বন্ধুরা দলবেঁধে বরযাত্রী গিয়েছিল। গঙ্গার ধারে একটা বাড়ি ভাড়া নিয়ে বিয়ের অনুষ্ঠান হয়েছিল। মনে হয় গত জন্মের কথা, কুয়াশার মধ্যে আবছা কতগুলো মুখ, চেনা চেনা মনে হয়, নামধাম মনে পড়ে না। ধীরে ধীরে স্মৃতি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, রাস্তায় কাউকে দেখে মনে হয় খুব পরিচিত, আপনজন, অথচ নাম মনে করতে পারে না। পুরোপুরি স্মৃতি নষ্ট হয়ে গেলে আপত্তি ছিল না। সে এক শান্তির ব্যাপার হত। অর্ধেক স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকা বড় কষ্টের।

চন্দনও উঠল। স্টেশানের পার্টিশান ভাঙা, হলুদ হয়ে যাওয়া ইউরিনালে নিজেকে হালকা করল। সাধারণ মানুষ পাকে না পড়লে স্টেশানের পাব্লিক টয়লেটে ঢোকে না, গন্ধে অন্নপ্রাশনের ভাত উঠে আসে। চন্দনের সেসব বোধ চলে গেছে কবেই। এলোমেলো পায়ে বাড়ির রাস্তা ধরল। মা এখনও খাবার আগলে জেগে বসে থাকে। অনেক বারণ করেছে, শোনে না। আজ বাপ্পার সঙ্গে দেখা না হলেই ভাল হত। পুরনো কথাগুলো মাথার মধ্যে ঘাই দিচ্ছে, নন্দীদের পুকুরের দীর্ঘজীবি কালবোস মাছেদের মত, শালাদের অনন্ত পরমায়ু। নন্দীদের বাপ দাদারা কবে মরে-ঝরে গেছে, ছেলেগুলো যে যার মত এদিক ওদিক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে... প্রাসাদোপম বাড়িটা পায়ে পুকুর নিয়ে, হাড় বার করে, ঝুনো কঙ্কালের মত দাঁড়িয়ে আছে। ঘাটের ভাঙা সিঁড়িতে শ্যাওলা জমেছে, জলের ওপর সবুজ আস্তরণ, অথচ রাত বাড়লেই মাছগুলো খল্‌বল করে উঠবে। চন্দন একবার ঘাড় ঝাঁকালো, দু-চারটে আলটপকা স্মৃতি, বেমক্কা ঘটনা, নাছোড়বান্দা মানুষ ওই মাছগুলোর মতই ভূত হয়ে মাথায় চেপে বসে থাকে। যেমন, সেই রাত্তিরটা, মাঙ্কি টুপি, মাফলারে অর্ধেক মুখ ঢাকা শয়তান লোকটা...।



কতদিন আগে... বছর তিন চার? দুটো টিউশান সেরে ফিরতে ফিরতে চন্দনের বেশ রাত হয়ে গিয়েছিল। গলির মুখটা বারোমাসই অন্ধকার হয়ে থাকে। ল্যাম্পপোস্টের বাল্বটা অন্ধকার খোঁজা লোকাল প্রেমিক প্রবররা নিয়মিত ঢিল ছুঁড়ে ভেঙে দিয়ে যায়। শীতের রাত জলদি নামে, মফঃস্বলের সাদামাটা গলিটাকে তখন কোনো শোকার্ত বিদেশী রমণী বলে ভুল হয়ে যায়। মুখে কালো ভেল ঝুলিয়ে কোনো নিকটাত্মীয়ের ফিউনেরাল সেরিমনিতে এসেছে যেন। কার ফিউনেরাল? চন্দনের, আবার কার? এই গলিটার সঙ্গে চন্দনের সম্পর্ক তো অস্বীকার করা যায় না! তাছাড়া এই বেঁচে থাকাটাকে সত্যিই কি বেঁচে থাকা বলা যায়?

একটা লম্বা সিড়িঙ্গেপানা লোক চন্দনের রাস্তা আটকে দাঁড়িয়েছিল, “একখানা চিঠি আছে আপনার নামে।”

চন্দন চমকে উঠেছিল, লোকটা যেন দু-হাতে জমাট অন্ধকার ঠেলে বেরিয়ে এল। এত রাতে ক্যুরিয়ার! লোকটা কাঁধের ঝোলা থেকে চিঠির খাম, কাগজ বের করছে, “অনেকক্ষণ থেকে দাঁড়িয়ে আছি...”

“বাড়িতে ছেড়ে দিলেই পারতেন...,” চন্দন বিড়বিড় করে বলেছিল।

“বাড়িতে গিয়েছিলাম, শুনলাম আপনি নেই। চিঠিটা আপনার হাতে দেওয়া জরুরী, তাছাড়া একটা সই নিতে হত।”

এত কর্তব্যপরায়ণ ক্যুরিয়ার জীবনে দেখেনি চন্দন। এমন কিছু শীত পড়েনি, তবু একটা হাঁটু অব্দি ঝোলা ওভারকোট পরে আছে, মাথায় মাঙ্কি ক্যাপ, গলায় মাফলার। অল্প আলোয় দেখেছিল লোকটার চোখের নিচে গাঢ় কালি, যেন কাজল পরেছে, সালভাদোর দালির মত সরু পাকানো গোঁফ। খামটা হাতে নিতে নিতে চন্দন বলেছিল, “এঃ হে, আপনার অনেক দেরি করিয়ে দিলাম।”

লোকটা বলল, “না না, এ আর এমন কী? ব্যবসার খাতিরে এটুকু না করলেই নয়।”

চন্দন অবাক হল, “ব্যবসা...? মানে ক্যুরিয়ার কোম্পানিটা আপনার নিজের নাকি?”

লোকটা ততক্ষণে একটা পাতা বাড়িয়ে ধরেছে, স্ট্যাম্প পেপারের মত ওপর টাইপ করে অনেক কিছু লেখা, “এখানে একটা সই...”

ক্যুরিয়ারের লোক সাধারণত একটা সাদা লাইনটানা পাতায় সইসাবুদ নেয়, ফোন নম্বর লিখে নেয়। চন্দন খানিক থমকাল। লোকটা ধমক দিল, “কী হল? সই করুন...”

চন্দন বলল, “এটা কীসের কাগজ? দেখে তো এগ্রিমেন্ট মনে হচ্ছে।”

লোকটা চোখ কুঁচকে খিট খিট করে হাসল, চন্দন দেখল লোকটার চোখে মণি নেই বা এত কটা, চোখের সাদার থেকে মণি আলাদা করা যাচ্ছে না। লোকটা বলল, “হ্যাঁ, চাকরির চিঠি নেবেন, আর এগ্রিমেন্টে সই করবেন না? তা কি হয়?”

চাকরি? চন্দনের হৃৎপিণ্ডটা কয়েকটা বিট মিস করল, “মানে?”

“মানে আর কী? যে চাকরিটার জন্যে হা-পিত্যেশ করে বসে ছিলেন সেটা আপনার হয়ে গেছে।”

চন্দন মোবাইল বার করার জন্য পকেটে হাত ঢোকাতে যাচ্ছিল, এই মুহূর্তে তার একটা ফোন করা দরকার, “চাকরিটা আমার হয়ে গেছে বেলা শুনছ...?”

লোকটা তার হাত চেপে ধরেছিল, “বেলাকে পরে ফোন করবেন, আগে সই।”

চন্দনের একটু সন্দেহ হল, “কী লেখা আছে এগ্রিমেন্টে?”

লোকটা ওকে আশ্বস্ত করল, “সিরিয়াস কিছু নয়, সাধারণ কিছু শর্ত... সব চাকরির এগ্রিমেন্টে যেমন থাকে... আপনাকে ম্যানেজমেন্টের কথা শুনে চলতে হবে, নির্ধারিত দিনের বাইরে ছুটি নিলে মাইনে কাটা যাবে, ইউনিওনবাজি করতে পারবেন না, ইত্যাদি প্রভৃতি... এক কথায়, হে হে... আজ থেকে ম্যানেজমেন্ট আপনাকে কিনে নিচ্ছে। আর হ্যাঁ, একটা বিশেষ শর্ত - খামটা আপনি কালকে সকালের আগে খুলতে পারবেন না... খুললে কিন্তু...”

চন্দনের বুকের ভেতরে খুশির খই ফুটছিল, কতক্ষণে নেই-আঁকড়ে লোকটার হাত থেকে রেহাই পাবে, পেন টেনে নিয়ে সই করে দিল। লোকটা যত্ন করে মুড়ে কাগজটা ব্যাগে ঢুকে রাখল, বলল, “আসি... সাবধানে ফিরবেন, আর যা বললাম... কাল সকালের আগে খামটা ছিঁড়বেন না...।”

“ঠিক আছে, ঠিক আছে...”, দু-পা এগিয়েই চন্দনের মনে খটকা লাগল, লোকটা বেলাকে চিনল কী করে। জিজ্ঞেস করার জন্য পিছন ফিরে আর তাকে দেখতে পেল না। সে ভোজবাজির মত অন্ধকারে মিলিয়ে গেছে। চন্দন ভাবল, এগ্রিমেন্টের একটা কপি চেয়ে রাখলে ভালো করত। না দেখে কোন কাগজে সই করে দিল কে জানে? যাক গে! বাড়ি পর্যন্ত বাকি পথটা সেদিন চন্দন উড়ে উড়ে ফিরেছিল। পিঠের ব্যাগপ্যাকে রাখা খামটা যেন কোনও মামুলী কাগজের টুকরো নয়, এক জোড়া ডানা। উড়তে উড়তে বেলাকে ফোন করেছিল। রিং হয়ে হয়ে থেমে গিয়েছিল, বেলা ফোন ধরেনি। মেসেজ করল, বেলা দেখল না, লাস্ট সীন ঘন্টা চারেক আগে... বেলা তুমি কোথায়?

বাড়ি ফিরে কোনোমতে নাকে মুখে দুটো গুঁজে চন্দন নিজের কোটরে সেঁধোল। ব্যাগ প্যাক থেকে চৌকো খামটা বার করে দেখল, বেশ ভারী... স্বপ্ন এবার হয়ে যাবে বেলা সত্যি... ওপরে তার নাম ঠিকানা লেখা, প্রেরকের নাম নেই। লোকটা বলেছিল কাল সকালের আগে খামটা না ছিঁড়তে, যেন আজ রাতে ছিঁড়লে চিঠিটা বদলে যাবে। একটা ফালতু ক্যুরিয়ারের কথায় পাত্তা দেবার মানে হয় না। সাদা খামটা আলোর সামনে ধরে সাবধানে এক কোণ ছিঁড়ে আঙুল ঢোকাল।

জানলায় একটা শব্দ হল। চন্দন মুখ তুলে দেখল সেই লোকটা, জানলার গ্রীল ধরে দাঁড়িয়ে আছে, হাসছে, ঝুল পড়া ষাট ওয়াটের বাল্বের বিবর্ণ হলুদ আলোতেও তার শ্বাদন্ত ঝিকিয়ে উঠছে, “জানতাম, লোভ সামলাতে পারবেন না...।”

চন্দন আঁতকে উঠেছিল, “আপনি... এখানে...?”

“ডীলটা ঠিকঠাক এগজিক্যুট হচ্ছে কিনা না দেখে যাই কী করে বলুন? হাজার হোক আমাদের ধান্ধার কারেন্সি হল কাম, ক্রোধ, লোভ... এক কথায় মানুষের মন... কোন পথে চলে তার কোনও ঠিক আছে?”

চন্দনের কানে কিছু ঢুকছিল না। কীসের ডীল? কার সঙ্গে ডীল? চন্দন চোখ নামিয়ে দেখেছিল, বেলার বিয়ের কার্ড, ছেঁড়া খামের থেকে অর্ধেক মুখ বের করে টেবিলের ওপর নিশ্চিন্তে শুয়ে আছে... বেলা বোস ম্যারিজ... খামটার কোণে হলুদ ছোপ লেগে ছিল আগে লক্ষ্য করেনি।



মা যথারীতি বসে ছিল। আজকাল মা কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। শুধু তার সঙ্গে নয়, বাড়ির সবার সঙ্গেই। চন্দনকে খাবার বেড়ে দিয়ে নিজে নিল। দুজনে নিঃশব্দে খাচ্ছে। এমন নয় যে দুজনের বলার কথা ফুরিয়ে গেছে। চন্দন জানে, কথাগুলো আপাতত শীতের সিলিংফ্যানটার মত স্থবির হয়ে দুজনের মাঝখানে ঝুলে আছে। কেউ যদি ফ্যানটা চালিয়ে দিতে পারত! চন্দন একবার চেষ্টা করল, "জানো মা, আজ স্টেশানে বাপ্পার সঙ্গে দেখা হল, অনেকদিন পর।"

মা নিরুৎসাহ মুখ তুলল যেন বাপ্পাকে চেনে না, অথচ বাপ্পা কতবার তাদের বাড়িতে এসেছে। মায়ের এই অবস্থার জন্য অবশ্য লোকটাকে দায়ী করতে পারে না চন্দন। দায়িত্ব তার নিজেরও কম ছিল না। সেই রাতের পর থেকে বারবার লোকটার সঙ্গে দেখা হয়ে যেত। ফুটপাথ ধরে হাঁটছে, হঠাত্‌ কোত্থেকে উদয় হত। পাশে পাশে হাঁটতে হাঁটতে বলত, “বুঝলেন তো আমি নিরুপায়, এটাই আমার ব্যবসা...”, তারপর চন্দনের মুখের দিকে তাকিয়ে বলত, “খুব কষ্ট হচ্ছে না? আসুন একটা ব্যবস্থা করছি।”

নেশার আড্ডার খোঁজ সেই দিয়েছিল, বলতে নেই নেশা করলে খানিকটা সময় ভালো কাটে, অসহ্য মাথার যন্ত্রণার থেকে সাময়িক নিষ্কৃতি পাওয়া যায়। চন্দন ভাবে এবার দেখা হলে লোকটাকে জিজ্ঞেস করবে, এগ্রিমেন্টটা কতদিনের, পাঁচ বছর... দশ বছর... আমৃত্যু? ভেঙ্গে দেবার শর্ত নেই কোনও? ভেঙ্গে দিয়েই বা কী করবে? কোথায় যাবে? তার থেকে রোজ প্ল্যাটফর্মে গিয়ে বসে থাকা ভালো। কবে তাকে নিয়ে যাবার জাহাজটা আসবে, ডেকের ওপর থেকে বেলা হাত নেড়ে ডাকবে, উঠে এস? একটা দড়ির মই নামিয়ে দেবে কোনও নাবিক, আর সে চড়তে শুরু করবে। মইটা দুলবে, খুব দুলবে... ছোটবেলায় সে আর বেলা যেমন পার্কে দোলনা দুলত।

আঁচিয়ে এসে চন্দন দেখল মা তখনও ওঠেনি। দেওয়ালের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে বসে আছে। মায়ের শিরা ওঠা হাতের ওপর হাত রেখে জিজ্ঞেস করল, “উঠবে না?” মা ফিরে তাকাল, তারপর থালা বাসন তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। শোবার আগে চন্দন পকেট থেকে ম্যাজিক চূরণের শিশিটা বের করে খাটের পাশে টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখল। আজকাল অনেক অবাস্তব জিনিষও বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করে। চন্দন জানে যে এগুলো স্রিফ ভাঁওতাবাজি। তবু ভাবে যদি কোনও উপকার হয়! অন্তত মা যদি আবার কথা বলতে শুরু করে!

জানলায় টোকা পড়ল। মা আজকাল সন্ধে হতে না হতেই ঘরের জানলা বন্ধ করে দেয়। একটা নিরাপত্তাবোধের অভাব মায়ের মনের মধ্যে দখল নিচ্ছে। বন্ধুবান্ধব কেউ নয়, এত রাতে জানলায় টোকা দেবার মত বন্ধুত্ব এখন আর কারো সঙ্গে তেমন নেই। চন্দন নিশ্চিত পাল্লার পেছনে লোকটা এসে দাঁড়িয়েছে। এখন আবার কী দরকার পড়ল? শান্তিতে ঘুমোতেও দেবে না? জানলাটা খুলতেই লোকটার উদবিগ্ন মুখ চোখে পড়ল, “একটা কথা বলার ছিল।”

“কী?”

“আপনি ষ্টেশনে একটা ঠগবাজের কাছ থেকে চূরণ-মূরণ কী একটা কিনলেন, ওটা না খাওয়াই ভালো।”

“আপনি জানলেন কোত্থেকে? আমায় চব্বিশ ঘন্টা ফলো করছেন নাকি?”

লোকটা বলল, “না, তার দরকার পড়ে না। যা বলছিলাম, ওটা খেলে কিন্তু বিপদে পড়বেন।”

“কী যা তা বলছেন!”

“যা তা নয়, সত্যি, লোকটাকে আমি চিনি, ওর মতলব ভালো নয়, আমার কথা শুনুন”, লোকটা রীতিমত কাকুতি মিনতি শুরু করল।

শালা বিপদ দেখাতে এসেছে! শেয়াল কাঁটার বিছানায় শুয়ে বিপদের ভয়! সামান্য কৌতূহল হল, লোকটাকে এমন নাজেহাল হতে আগে কখনও দেখেনি, জিজ্ঞেস করল, “কে ওই স্টেশানের লোকটা?”

“আমাদের রাইভ্যাল গ্রুপের সেলস এজেন্ট, ওরা প্রেম, ভালবাসা, সৎসাহস টাইপের টিপিক্যালি ন্যাকা ন্যাকা বস্তাপচা ফীলিংস নিয়ে বিজনেস করে, হোয়াইট ভারচ্যুজ... স্টেডিয়ামে সাদা পায়রা ওড়ায়, বেসিক্যালি লোক ঠকানোর ফাঁদ... সেল ফেল নেই... আপনাকে ফাঁকি দিয়ে ডেট এক্সপায়ার হয়ে যাওয়া মাল গছিয়েছে... ফেলে দিন, ও জিনিষ ঘুণাক্ষরে মুখে দেবেন না।"

চন্দনের আর সহ্য হল না। তখন থেকে একই কথা ভ্যাজ ভ্যাজ করে বকে যাচ্ছে। লোকটার মুখের ওপর জানলাটা ঠকাস করে বন্ধ করে ছিটকিনি তুলে দিল। যাও ভাঁড়মে! ন্যাংটার আবার বাটপাড়ের ভয়! শিশিটা খুলে পুরোটা মুখের মধ্যে উপুড় করে দিল। তারপর জাগ থেকে গ্লাসে জল নিয়ে ঢক ঢক করে গলায় ঢালল। চূরণটা মিষ্টি মিষ্টি খেতে, লোকটা বলেছিল দু-চামচ... যা হবার হোক। চন্দন পরোয়া করে না। চাদরটা পা থেকে বুক পর্যন্ত টেনে খাটে লম্বা হল। চোখ ভরে ঘুম এল চন্দনের, নিঃস্বপ্ন ঘুম! আজ আর নদীর স্বপ্ন দেখবে না চন্দন, জাহাজী মেয়েদের স্বপ্ন দেখবে না, দারুচিনি দ্বীপের স্বপ্ন দেখবে না। জরায়ুর উষ্ণ অন্ধকারের মত গাঢ় ঘুমের মধ্যে নির্দ্বিধায় তলিয়ে যাবে।

*****


আসলে এটা ঠিক গল্প নয়, বরং ম্যাজিক চূরণের বিজ্ঞাপন, খেলেই সব সমস্যার সমাধান, যে বোঝে সে বোঝে। অধিকাংশ সেলস টকই বোগাস হয়, লোককে বোকা বানানোর চক্রান্ত। লোকে জেনে বুঝে বোকা বনে, ঠকে। ঠকে গিয়ে বলে, দেখলে! কী কাণ্ড! ধ্যুর মশাই, কেনার আগে প্যাকেটের গায়ে লেখা ক্ষুদে ক্ষুদে শব্দগুলো পড়ে নিতে কী হয়েছিল? কেউ পড়ে না। তাই সেলস ম্যানরা করে খায়। তাদের কী দোষ? তাদের কাজই হল তিলকে তাল করা। খেঁদি পেঁচিকে র‍্যাম্প মডেল বানানো। কোটিকে গুটিক সেলস ম্যান সোজাসুজি প্রোডাক্টের গুণাগুণ বর্ণনা করে। তার সাইড এফেক্সেটস সম্পর্কে সতর্ক করে দেয়। সে মানুষ নয়, ঈশ্বরের প্রতিনিধি।

এমনও তো হতে পারে আজকের স্টেশনের লোকটা তেমনই একজন জেনুইন সেলস ম্যান... কোটিকে গুটিক! আশ্চর্য চূরণটা সত্যিই চন্দনকে ভালবাসার কাছাকাছি পৌঁছে দেবে। যদি চন্দনের ঘুম আর না ভাঙ্গে! যদি ভালবাসার কাছ থেকে সে আর ফিরে আসতে না চায়! থেকে যেতে চায় সেই শান্তির উপত্যকায়! আহা তাই যেন হয়! ছেলেটা খুব কষ্ট পেয়েছে। ঘুমোক বেচারা, অনন্ত ঘুম ঘুমোক! আদৌ যদি কোনোদিন ঘুম ভাঙ্গে সে যেন এক সমান্তরাল পৃথিবীতে জেগে ওঠে যেখানে লোভের বেসাতি হয় না, খাম ছিঁড়ে চাকরির অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার পাওয়া যায়, ফোনের অন্য প্রান্ত থেকে বেলা বোস বলে ওঠে - এবার তাহলে সংসারটা পেতে ফেলা যায়, বলো?

(ঋণ স্বীকারঃ শ্রী অঞ্জন দত্ত মহাশয়ের একটি বিখ্যাত গানের দুটি হৃদয়স্পর্শী লাইন গল্পটিতে ব্যবহার করা হয়েছে।)

ফেসবুক মন্তব্য