অভিসম্পাত

সুজন ভট্টাচার্য

অদ্ভুত অদ্ভুত সব কাণ্ড হয় আজকাল। ছেলেরা ঘুম ভাঙলেই ইস্কুলে যাবার জন্য কান্নাকাটি শুরু করে দেয়, সুবাসিনী বাপের জম্মে এমনটা দেখেনি। কাহারের ব্যাটা ভোর হলেই মাঠে যাবে, গোবর বা কাঠকুটো কুড়োবে, সেই তালে দুয়েকটা নারকেল বা মাছ এনে ঘরের সাশ্রয় করবে, এমনটাই তো হবার কথা। কি যে হোল আজকাল! চক্কোত্তি বাড়ির ছোট নাতবৌ বিয়ের পর যেদিন ব্যাগ দুলিয়ে প্রথম অফিসের দিকে হাঁটা লাগাল, সেইদিন নিমাইপুরুত ঘাটের পাশে দাঁড়িয়ে বলেছিল – কলি, কলি, ঘোর কলি। নইলে বামুনের বৌ কিনা চাকরি করতে যায়! সুবাসিনীরও মনে হয় কলি বোধহয় সত্যিই মাঠেঘাটে চরতে শুরু করেছে। নইলে ঘুম থেকে উঠেই সুদামের ব্যাটা কিনা ইস্কুলে যাবার জন্য কান্না জুড়ে দেয়!
সুবাসিনী যখন বামুনপাড়ায় চারপাচটা ঘরের বাসনমাজার কাজ করতো, তখনো বাবুদের ছেলেপুলেদেরও এমনধারা দেখে নি। তারাও দিব্যি এধারেওধারে ফুড়ুৎফুড়ুৎ করে ঘুরে বেড়াত। বাপ-ঠাকুদ্দার তাড়া না খেলে কে আর ইস্কুলের রাস্তা ধরতে চাইত? ইস্কুলে গেলেই যে সক্কলে ডাক্তার-মোক্তার হয়, এমনটা তো নয়। বৃন্দাবনপুরেই বা কি একটাও হয়েছে নাকি আজ অবধি? সুবাসিনী কম দেখল নাকি! ওই সেই ঘোষালবাড়ির বড় ছেলে, চক্কোত্তিদের ঘরে দুই, সন্ন্যাসী হালদারের দুই নাতি আর নগেন কর্মকারের ছোট ছেলে। ইস্কুলে মাথা ঘষে এই কজনাই কলকেতায় চাকরি পেয়েছে। আর চাকরি পেলেই হোল নাকি? সুবাসিনী সব জানে। বাড়ির আর সক্কলে যখন বিছানায় পাস ফিরে শোয়, তখন তারা নাকেমুখে কিছু একটা গুঁজে স্টেশনের দিকে দৌড়োয়। ঘরে কখন ফেরে কে জানে। তবে ফিরেছে যে পরদিন রাত ফরসা হতে না হতেই তাদের সাইকেল চালাতে দেখে বোঝা যায়।
এই যদি হবে বাপু, তবে আর ইস্কুলের বেঞ্চিতে পাছা ঘষাতে যাও কেন? হ্যাঁ, সুবাসিনীও ইস্কুলে বারকতক গেছে বটে। বৃন্দাবনপুরের ইস্কুলটা ছোট। সেই ইস্কুলের টান কাটিয়ে যদি ফের ইস্কুলে যেতে চাও তাহলে ইটালগাছা। সেখানকার ইস্কুল নাকি পেল্লায়। সুবাসিনী অবশ্য সে ইস্কুল চোখে দেখে নি কোনোদিন। বাবুদের বাড়ির যেসব ছেলেপুলেরা যেত, তাদের ছাড়াছাড়া কথা শুনেই ও ছবিটা এঁকে নিতে পারত মনে। তবে ফালতু খাটনিতে সুবাসিনীর কোনদিনই আকর্ষণ নেই। যে ইস্কুলে সুদাম বা পবনকে ও কোনদিনই পাঠাতে পারবে না, তার পেচ্ছাপখানার কিস্যা শুনে কি লাভ!
হ্যাঁ, যদি বল বৃন্দাবনপুরের ছোট ইস্কুলের কথা সুবাসিনী জানে বটে। সে ইস্কুলে ওকে যেতে হয়। শুধু ওকে কেন, বৃন্দাবনপুরের সব মরদ-ঝি-বুড়োবুড়ি সব্বাইকেই যেতে হয়। এমনকি কারুর যদি যাবার খ্যামতা না থাকে, তাকে ভ্যানে বসিয়ে নিয়ে যায়। আহাহা, দুয়েকবছর অন্তর ইস্কুলে গিয়ে যদি আঙুলের ছাপ দেবার পর পিঁ করে শব্দকরা যন্তরটায় চাপ না দিতে পারে, তাহলে যে রাজ্যপাট অন্ধকার হয়ে যাবে গো। সুবাসিনীর মনে হয়, আসলে ইস্কুলগুলো বানানো হয়েছিল ওই ভোটের ছাপের জন্যই। তবে বাবুদের বুদ্ধি তো! সারাবছর ফাঁকা পড়ে থাকবে? খচ্চা উঠবে না তো। অতএব লাগাও ইস্কুল। ওই যেমন হালদারবাড়িতে তোরঙ্গ বানানো হতো। তাতে জামাকাপড় আর থাকবে কতো? বাগানের নারকেলের ছোবড়া ছাড়িয়ে সেখানে ডাই করা হোত।
সে যাদের ইস্কুলে যাবার কথা, তারা যাক না কেন। তাই বলে সুদামের ব্যাটাও! সুদামের বৌ কুসুম যেদিন কথা পেড়েছিল সেদিনই সুবাসিনী ঝাঝিয়ে উঠেছিল। এই বৌটার সবকিছু সৃষ্টিছাড়া। অলক্ষ্মী যাকে বলে। চক্কোত্তিবাড়িতে কাজে পাঠানোটাই ভুল হয়েছিল। কিন্তু করেই বা কী? এতগুলো পেট চালাতে তো নানান ধান্দা কষতে হয়। কাজেই চক্কোত্তিগিন্নী যেদিন সুবাসিনীকে বলেছিল নাতবউয়ের কাজের একটা লোক দেবার জন্য, সেদিন ও নিজেই কুসুমের নাম করেছিল। সেই হয়েছিল খাল কেটে কুমীর আনা।
- মর! মর! সুবাসিনী নিজের মনেই বিড়বিড় করে। কি কুক্ষণে যে সতু কাহারের কথার ফাঁদে পা দিয়ে মা-মরা মেয়েটার সাথে ছেলের বিয়ে দিতে রাজি হয়েছিল!
- মা নেই গো; তা তোমারে এট্টু মা বলি ডেকি মনির সাদ পোয়াতি পারবেনে। সতু কাহারের কথা শুনে ওর মতো ঝুনো নারকেলেরও চোখ ফেটে জল বয়ে এসেছিল। আসলে সুবাসিনীরও সাধ ছিল একটা মেয়ে হয়। মেয়ে থাকার খুব সুবিধে। ধরো, যখন কাজে গেলে, এট্টু চাল ফুটিয়ে দিতে পারল। কিংবা তোমার খুব জ্বর; কাজের বাড়ি যেতে পারবে না। সে গিয়ে হাজিরা দিল। হ্যাঁ, ছেলের বৌ দিয়েও সেসব হতে পারে। তবে তিনি কবে পায়ের ধুলো ঝাড়তে আসবেন, তারপর তো! তদ্দিন কি আর সুবাসিনী বেঁচে থাকবে!
সতুর কথায় তাই সুবাসিনী রাজি হয়ে যায়। বৌটা প্রথমে ভালই ছিল। পুকুর থেকে কলমি বা মাঠ থেকে লাউপাতা জুটিয়ে এনে ঠিক চালিয়ে দিচ্ছিল। কাল হোল ওই চক্কোত্তিবাড়ির নাতবউয়ের কাজে লাগানো। দুটো বাচ্চা হবার পর সুদামের কানে কি মন্তর দিল, কে জানে! সুদাম হাসপাতালে গিয়ে হিজরে হয়ে এল। কি লজ্জার কথা! ব্যাটাছেলের আসল দাম তো হোল তার সুযোগ পেলেই ঘাসের দানা পুতে দেওয়ায়। বাড়ির বৌ হোল বর্ষাকালের নরম মাটি। যত পুতবে, ততই লকলকিয়ে উঠবে লাউ-কুমড়োর ডগা।
সেদিন সুবাসিনী আর মাথা ঠিক রাখতে পারে নি। চিৎকার করে মাটির দেয়ালে মাথা ঠুকতে আরম্ভ করেছিল। - তোর বাপ থাকলি আজ তোর গলাটা কোপ দে নামায়ে দিত।
সুদাম কোনো উত্তর দেয় নি। আর দেবেই বা কী? মা যে এমন শুরু করবে জানলে ও আর কথাটা বলত নাকি? বাপ না হবার অপারেশনটা করালে নগদা আটশো টাকা দেয় হাতে। দালাল থাকলে অবশ্য সে খানিকটা থাবা মারে। তবে ওকে নিয়ে গিয়েছিল চক্কোত্তিবাড়ির ছোট নাতি। সে তো আর দালালি খাবে না। সুদামের খুব ভয় ছিল মনে। না জানি কি আহামরি ব্যাপার হবে। ওমা, কুটুস করে একটা সুঁই। খানিকপরেই ডাক্তার বলে কিনা হয়ে গেছে। চলে আসার আগে শুধু বলেছিল, তিনদিন বউয়ের সাথে শুয়ো না। আহ্লাদে সুদামের মাথা যেন ফড়ফড় করে পাখনা মেলে দিয়েছিল। এমনটা আগে জানলে শালা কবেই এসে অপারেশন করিয়ে যেত!
কাজেই ব্লকের হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার পথে সুদাম একটু খাসির মাংস কিনে ফেলেছিল। আহা, কতদিন খায় নি গো। বাশুলীর মেলার শেষদিন মন্দিরে পাঁঠাবলি হয়। গ্রামের সবাই একটু প্রসাদ পায়। তো সে শালা বেলেড দিয়ে কাটা, নখের মতো একটা পিস। ও খেয়ে কি আর পাঁঠা খেয়েছি বলা চলে? সুদাম যেন উড়তে উড়তে বাড়ি ফেরে।
দরজার সামনে এসে বলে – ও কুসুম, এই দ্যাখ, খাসির মাংস নে এইচি। গুছিয়ে বানা দিকিনি।
সুদাম ভাবতেই পারে নি মা বাড়িতে থাকবে। - খাসির মাংস কিনি আনলি! পয়সা পেলি কই? সুবাসিনী সন্দেহের চোখে ওর দিকে তাকিয়ে বলে।
সুদাম স্বচ্ছন্দে বলে দিতে পারতো চক্কোত্তিবাড়ির ছোট নাতি এমনি এমনি দিয়েছে। কিন্তু পকেটে যার কড়কড়ে সাতশো বাইশ টাকা, সে কেন মিথ্যে বলতে যাবে? কাজেই সুদাম গল্পটা বলে ফেলেছিল। আর তারপরই সুবাসিনী চিলচিৎকার শুরু করে দেয়। কুসুম এমনিতে চুপচাপই থাকে। কিন্তু একটা সময়ের পরে সেও মুখ খুলে দিল।
- খাতি দিতি পারবে না, তালি বাচ্চা পয়দা করার শখ আসে কোত্থিকি?
সুবাসিনী অবাক হয়ে যায়। এ আবার কেমন ধারা কথা! কার খাবার, যে কেউ এসে খেতে দেবে? জম্ম দিয়েছেন ভগমান, তিনিই খাবার ব্যবস্থা করে দেন। কেউ এসে হাতে করে খাবার দেবে, তবে চলবে, এমনধারা ব্যবস্থা যদি হোত, তাহলে কি সুবাসিনী আজ দুই ছেলেকে নিয়ে বাঁচতে পারতো? না দুনিয়ার কোনো কাহার-দুলের সংসার চলত? গরীবের ঘরে একটা বাচ্চা মানে তো বছরদশেক হলেই চাড্ডি উপার্জনের হাতিয়ার। কুসুম জানে না! আর সুদাম! তুইও ভুলে গেলি, দুই ভাই সেই কোন কচিবেলায় বাগালি শুরু করেছিলি! তালে? গরিব ঘরে যতগুলো বাচ্চা হবে, ততটাই আদায়।
সুবাসিনীর ইচ্ছে হয় হারান কাহারের চোদ্দ গুষ্টির নাম তুলে খিস্তি দেয়। দুটো বাচ্চা পেড়েই লোকটা সটকে গেল। কিনা, হাঁড়িয়া চড়িয়ে বাবুর খালে সাঁতার কাটার শখ হয়েছিল। আজ যদি আরো চারপাঁচটা ছেলেমেয়ে থাকতো, তাহলে কি আর সুবাসিনীকে এই বয়েসে কাজের বাড়ি দৌড়োতে হোতো? কাঁচা বয়েসের বিধবার কি জ্বালা, তুই বুঝবি নাকি কুসুম! পেটের জ্বালা, আবার তার সাথে শরীরের চড়চড়ানি। কী করে সামলেছিল, সে তো শুধু সুবাসিনীই জানে। কত লোকে চাপতে চেয়েছিল। সুবাসিনী শুধু দুই ছেলেকে বুকে চেপে পার পেয়েছে। একবার সাধ হচ্ছিল, বলেই ফেলে। পরমুহূর্তে সামলে নেয়। নিজের ছেলের বৌকে বিধবা হবার কথা বলা যায় না। তা সে ছেলে যতই বৌয়ের কথায় হিজরে হয়ে আসুক না কেন।
কিন্তু সারাটা দিন কথাগুলো মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে। রাতে সুবাসিনী টের পায় মাথাটা কেমনকেমন করছে। একবার ভেবেছিল সুদামকে ডাকবে। না, থাক। মাংস রান্না করে কুসুম সুবাসিনীকেও দিতে এসেছিল। সুবাসিনী খায় নি। ছেলের পুরুষমানুষের মুরোদ বিক্রির টাকায় মাংসা খাওয়া আর যাই হোক ওর পক্ষে সম্ভব নয়। এই মাংস খাওয়া, আর ছেলের শ্রাদ্ধের নেমন্তন্ন খাওয়ার মধ্যে ফারাক আর কিসের?
সুবাসিনী তাই সুদামকে আর ডাকে নি। ভোর তখনও হয় নি। সুবাসিনীর হঠাৎ খুব পেচ্ছাপের চাপ আসে। তাই ও উঠে পড়ে। ঘর থেকে বেড়িয়ে রাস্তার পাশে বসে। তারপর আর কিছু ওর খেয়াল নেই। ঘুমটা যখন ভাঙল, কেমন একটা বিশাল পাকাবাড়িতে একটা চৌকির উপর নিজেকে আবিষ্কার করল। সুবাসিনী চমকে যায়। সুদাম কি হিজরে হয়ে এটাও রাতারাতি বাগিয়ে ফেলল নাকি? ধড়মড় করে উঠে বসতে গিয়ে সুবাসিনী টের পেল ওর ডানদিকটা অসাড় হয়ে আছে। একরাত না খেলে এমন দুর্বল হয় নাকি মানুষ! সুবাসিনী অবাক হতে যায়। এমন কতো রাতই তো সুদাম-পবনের সাথে ওরও খাবার জোটে নি। কই, তখন তো এমনটা হয় নি। ওই অলক্ষ্মীটাই সব সব্বোনাশের গোড়া। যে ঘরের ব্যাটাছেলে বৌয়ের কথায় হিজরে হয়ে আসে, সেই ঘরে তো এমনটাই হবার কথা।
কুসুমের বাপ-মার নাম তুলে গালিগালাজ করবে বলে সুবাসিনী চিৎকার করে ওঠে। আর তখনই ও টের পায় চিরকালের চেনা সেই তীক্ষ্ণ গলাটার বদলে একটা গোঙানির আওয়াজ বেরোচ্ছে। কুসুম বোধহয় পাশেই ছিল। একলাফে পাশে এসে ওকে দেখেই কার দিকে তাকিয়ে যেন বলে ওঠে – ও দিদি, শাউড়ির জ্ঞান ফিরিছে গো।
একটা ভ্যাসেকটমির দাম যে এতটা হয়ে যাবে কুসুমও টের পায় নি। তাই বাড়ি ফিরে আসার পর সুবাসিনীর যাবতীয় কাজের দায় নিজেই তুলে নিয়েছি ঘাড়ে। অবশ্য না নিয়েই বা উপায় কী? পবন তো বাদায়। সুদামকেও জন খাটতে হয়। থাকল পড়ে সেই কুসুম। নিজের একটা কাজ ছিল। সাথে শাশুড়ির চার বাড়ির কাজও নিয়ে নিল হাতে। সকালে যাবার আগে পেচ্ছাপ-পায়খানা পরিষ্কার করে যায়। ফিরে এসে যা জোটে, নিজের হাতেই খাইয়ে দেয়।
চক্কোত্তিবাড়ির ছোট নাতবৌ একটা তেলের শিশি দিয়ে বলেছিল হাতপায়ে মালিশ করলে সাড় ফিরেও আসতে পারে। সেটাও করে দেখেছে। বছরখানেক এভাবে যাবার পরে সুবাসিনীর হাল খানিকটা ফিরল। না, নিজে থেকে উঠতে পারে না। বিকেলে কাজ থেকে ফিরে সুদাম ধরে ধরে একটু হাঁটায়। ভোরবেলা পাশের মাঠে নিয়ে গিয়ে সকালের কাজটা করিয়ে আনে। ঘরে ফিরে কুসুমও সাবধানে তুলে দেয়ালে হ্যালান দিয়ে বসিয়ে দেয়।
সেদিনও সুবাসিনী অপেক্ষায় ছিল কুসুম ফিরে এসে ওকে বসিয়ে দেবে। কুসুম যে ফিরল, সেটা সুবাসিনী বুঝতে পারে। কিন্তু না, এঘরে তো আসছে না। সুদামের বড় ব্যাটা কৃষ্ণকে খুব তাড়া লাগাচ্ছে কোথায় যাবার জন্য। তাহলে কি বাগালি ঠিক করে ফেলল? সে বয়েস তো এখনো হয় নি। এখন একটুআধটু ফলপাকুড় কুড়িয়ে আনবে, সেটুকুই যথেষ্ট। সুবাসিনী একটা আওয়াজ দেয়। না, কুসুমের কোন সাড়া পায় না। হারামজাদী! একটা লোক যে হাপিত্যেশ করে বসে আছে একটু তুলে দিবি বলে, তার আর খেয়াল নাই? ছেলেটাকে বাগালিতে পাঠাচ্ছিস যাতে তোর নাগর ঘরে আসতে পারে? সুবাসিনী সব বুঝতে পেরে গেছে। আসুক আজকে সুদাম। এর একটা বিহিত আজ করতেই হবে। এবারে ছেড়ে দিলে পেত্নি হয়েও সুবাসিনী শান্তি পাবে না।
কুসুম যে ছেলে নিয়ে বেরিয়ে গেল, সুবাসিনী টের পায়। ছোটটাকেও নিয়ে গেল নাকি? সেটারও তো সাড়াশব্দ পাচ্চে না। সুবাসিনীর মনে কু ডাকতে থাকে। চেনাজানা পরিবেশটা যে বদলে যেতে চলেছে, ও পরিষ্কার বুঝতে পারে। কী করবে ও? সব টের পেয়েও চুপ করেই থাকবে?
কুসুম ফিরল বেশখানিকক্ষণ পরে। সুবাসিনীকে তুলে বসিয়ে দিল। সুবাসিনী আজকাল আর এই অঞ্চলের ভাষায় কথা বলে না। কুসুম আর সুদামই খানিকখানিক বুঝতে পারে একেকটা গোঙানির অর্থ। কুসুম বুঝে ফেলেছিল। তাই ওর পা দুটো টানটান করে মেলে দিতে দিতে বলেছিল – বড়টাকে ইস্কুলে ভর্তি করে দিলাম গো।
শুনেই সুবাসিনীর মাথায় আবার বাজ পড়ে যেন। এ কোন ভাগাড়ের আবর্জনাকে তুলে এনেছিল ও? এ যে সংসারের একটা নিয়মও মানতে চায় না গো। সুবাসিনীর চোখের নড়নচড়ন আর গোঙানি থেকে কুসুমও বোধহয় বুঝে ফেলেছিল ওর মনের কথা। তাই আর একটা কথাও না বলে নিজের কাজে লেগে গিয়েছিল।
সুবাসিনী শুধু অবাক হয়ে দেখে ডাইনের মতো কুসুম নিজেদের বাচ্চাগুলোকেও বশ করে ফেলেছে। ঘুম ভাঙতে না ভাঙতেই বড়টা ইস্কুলে যাবার জন্য কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছে। ছোটটাও দাদার সঙ্গে যাবে বলে তাল তুলেছে। সুবাসিনী উঠতে পারে না বলে এরা সব ভেবেছে কী, হ্যাঁ! সব বামুনপাড়ার চাল ধরবে নাকি? তারপর আর বাগালি করতে পারবে?
নিত্যদিনের বাঁধা চালের মধ্যে এই নতুন ঢঙ যেন সুবাসিনীকে দম বন্ধ করে মারে। দুই নাতিই সকালবেলা ইস্কুলের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ইস্কুল তো খোলে সেই বেলায়। আবার যখন ছুটি হয়, ততক্ষণে সুবাসিনীকে কুসুম খাইয়ে দিয়েছে। ছেলেগুলো খায় তারো পরে। এতক্ষণ থাকে কী করে, সুবাসিনী অবাক হয়ে যায়। বাড়িতে থাকলে তো খাতি দাও, খাতি দাও বলে বাড়ি মাথায় তুলে রাখে। সুবাসিনী কিছুই বুঝতে পারে না। আবার জিজ্ঞেস করলে কুসুমও কোনো উত্তর দেয় না। ভাবটা এমন যেন সুবাসিনীর কথা ও বুঝতেই পারছে না। রাগে সুবাসিনী দাঁত কিড়মিড় করে।
কোনটা যে রোববার, সুবাসিনী টের পায় কুসুমের কাজে যাওয়ার দেরি দেখে। সেদিনও কুসুম দেরি করছিল। দুই নাতিই বলল ইস্কুলে যাবে। সুবাসিনী কান খাড়া করে শুনল কুসুম কী বলছে।
- আজ তো ইস্কুল ছুটি। মাস্টাররা কেউ আসবেনানে।
কথাটা শুনে সুবাসিনীর পরাণটা যেন শীতল হয়ে যায়। আহাহা, কচিগুলো আজ অন্তত বাবুগিরির নকশা করতে পারবে না। ইস্কুলটা কি আজই বন্ধ? রোজরোজ বন্ধ হয় না কেন গো মা? সুবাসিনী মনে মনে মানত করে। ইস্কুল যদি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে দুটাকার পুজো দেব গো মা। অবশ্য ও আর পুজো দেবে কী করে? সেই কুসুমকেই তো বলতে হবে।
ছেলেদুটো সারাটাদিন ঘ্যানঘ্যান করে চলল। কুসুম যে বিরক্ত হচ্ছে বুঝে সুবাসিনীর মনে যেন হুহু করে হাওয়া বইতে শুরু করে দিল। নে, কত আর খেলবি! দু টাকার মানত। নেহাত ফালতু না। বিকেলবেলা সুদাম যখন ওকে ধরে ধরে হাঁটাচ্ছে, তখন হঠাৎ ছোটটা সুদামের লুঙ্গি ধরে একটা টান দিয়ে বলল – মাস্টারদের বলি দাও না বাবা ইস্কুল রোজ খোলা রাখতি।
সুদাম পাত্তা দিল না দেখে সুবাসিনীর অন্তরে যেন শ্রাবণের বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। হুহু বাবা, কার ব্যাটা দেখতে হবে তো! মাঝখানে বৌয়ের চক্করে পড়ে মাথাটা একটু বিগড়েছিল। আবার লাইনে আসছে।
রাতে ঘুমটাও বড্ডো ভালো হয়েছিল। সকালে মাঠের কাজ সেরে ফিরেও মনটা খব ভালই ছিল। বাবুয়ানির চাল এই বাড়ি থেকে উঠে গেছে ভাবলেই নিজেকে কেমন যেন মা বাশুলীর সমান বলেই মনে হতে থাকে। বেশ ভালই ছিল। হঠাৎ নাতিদের আওয়াজ শুনে ও বুঝতে পারল তারা ইস্কুল যাচ্ছেন বটে। যাওয়া মানে আর কি। ওই দড়িবাঁধা পেন্টুল, যা পরে ওরা সারাদিন থাকে, সেটাই। তবে হ্যাঁ, বড়টার হাতে কয়েকটা বইখাতা থাকে বটে। ছোটটার তাও নেই।
সুবাসিনী মনেমনে হাসে। যাও বাছা। অপেক্ষা করে খানিকবাদে ফিরে এসো। ইস্কুল আর খুলছে না বটে। কুসুম কাজে গেছে। সুবাসিনী শুয়েই কান খাড়া করে থাকে। নাতিদুটো ফিরেই তো আবার হুটোপাটি শুরু করে দেবে।
না;, কোনো আওয়াজ নেই। তালে কি এখনো ইস্কুলেই দাঁড়িয়ে আছে, কখন মাস্টাররা আসবে বলে? নাকি ইস্কুল সত্যিসত্যিই চলছে? আতঙ্কে সুবাসিনী আবার মা বাশুলীকে স্মরণ করে। এভাবে কষ্ট দিও না গো মা। সবাইকে যারযার নিজের পথে থাকবার সুবুদ্ধি দাও গো মা। সুবাসিনী মানতের পরিমাণটা বাড়িয়ে পাঁচটাকা করে দেয়।
বেলা বাড়তে কুসুমও ফিরে এল। সুবাসিনী অবাক হয়ে যায়। এ কেমন মা? একটু ব্যাটাদের খোঁজও করবে না? নাকি আহ্লাদে আছে যে ইস্কুল চলছে?
ওকে তুলে দেবার জন্য কুসুম আসতেই সুবাসিনী প্রশ্নটা করে। ওর কথা বুঝতে কুসুমের সময় লাগে না। খানিকক্ষণ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর আচমকাই বেরিয়ে যায়।
সুবাসিনী অবাক হয়ে যায়। অন্যদিন পাদুটো টানটান করে মেলে দেয়। একটু আরাম লাগে ওর। আজ সেসব কিছুই না করে হুট করে চলে গেল! বড্ড দেমাক হয়েছে তোর, সুবাসিনী মনে মনে কুসুমের শ্রাদ্ধ কামনা করে।
কতক্ষণ চলে গেছে, সুবাসিনীর খেয়াল নেই। অন্যদিন এতক্ষণে কাজের বাড়ি থেকে আনা টিফিনের ভাগ কুসুম ওকে খাইয়ে দেয়। আজ সেসব না করেই হাঁটা লাগিয়েছে। খিদেয় সুবাসিনীর পেট চড়চড় করতে থাকে। যতই সেই আগুনের ভাপ বাড়ছে, ততই কুসুমের বাপমার নামে ও গালিগালাজের বহর বাড়াতে থাকে।
মানুষের রাগেরও একটা ক্লান্তি আছে। তাই একসময় সুবাসিনীর চোখদুটো বুজে এসেছিল। হঠাৎ কুসুমের গলা পেয়ে ও চোখ খোলে। কুসুম দাঁড়িয়ে আছে, পাশে দুই নাতি। যাক ইস্কুল তালে উঠেই গেছে। খিদের জ্বালার মধ্যেও সুবাসিনীর মনটা ভালো হয়ে যায়। তারপর খেয়াল করে বড়নাতির হাতে একটা বাটি। কুসুম ওর পাশে বসে। মুখে কোনো কথা না বলে ছেলের হাতের বাটিটা নিয়ে সুবাসিনীর মুখের কাছে ধরে।
খিচুড়ি। কি গরম, আহা! ধোঁয়া উঠছে এখনো। কুসুম কি এটা আনতেই গিয়েছিল? বেঁচে থাক বাবা।
খাওয়া হয়ে গেলে কুসুম জল দিয়ে ওর মুখটা ধুইয়ে দেয়। তারপর বড়ছেলের দিকে তাকিয়ে বলে – বল, এ খিচড়ি কোত্থেকে পেলি।
তাই বলো। বড়নাতিই ঠাকুমার জন্য যোগাড় করে এনেছে। আর ও কিনা ভাবছে কুসুমের কীর্তি।
- আমাদির ইস্কুলির খিচড়ি।
সুবাসিনী অবাক হয়ে নাতির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। কিছুই বুঝে উঠতে পারে না ও। ঠাকুরবাড়িতে উৎসব হলে খিচুরি খাওয়ায়। ইস্কুলেও কি উৎসব ছিল নাকি!
- ইস্কুলে গেলি রোজ খেতি দেয়, কুসুম পাশ থেকে বলে। ঐ জন্যিই তো ইস্কুলি যাবে বলি সকাল থেকি দক্ষযজ্ঞ বাঁধায়ে রাখে।
কথাটা শুনতে শুনতে সুবাসিনীর চোখ দিয়ে জল পড়তে থাকে। আহা, এমন সুন্দর খাবার দেয় ইস্কুলে গেলে! আর এই খবরটাই ওর কাছে ছিল না। তাহলে তো ও নিজেও ইস্কুলে নাম লিখিয়ে ফেলতে পারতো। দুঃখে সুবাসিনীর গলাটা ঘড়ঘড় করতে থাকে।
সুবাসিনীর কথা কুসুমই বুঝতে পারে। তাই সুবাসিনীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে – তুমি তো আমারে কত্ত গালমন্দ করো। বলো দেখি, এমন তাল না করলি ছেলেদুটার পেট সামলাতি পারতাম!
কুসুমের কথা শেষ হতে না হতেই সুবাসিনী ডুকরে কেঁদে ওঠে। এমন এক খাবারের কল চোখের সামনে থাকতেও নজরে না পড়ার জন্য সুবাসিনী নিজের চোখদুটোকে অভিসম্পাত দিতে থাকে।

ফেসবুক মন্তব্য