অতঃ নদীকথা

মণিশঙ্কর

নদীর পাশে গেলেই আমার ছেলেবেলার কথা মনে আসে। অথচ আমার গাঁয়ের কোনও দিক দিয়ে নদী বয়নি কোনও কালে। শরতের কাশ দেখলে যেমন সফেন সমুদ্র ভেসে ওঠে চোখের তারায়, তেমনিই আমার সাতকুচি-বুড়িবসন্তরা আজ উচ্ছ্বাসহীন তরঙ্গভেলা। বড়াই করে বলার মতো কিছু না। তবু অদ্ভুত ভালোলাগা বিছিয়ে যায় সারা মন-খেয়ায়। আমি ভাসি। শুধু ভেসেই বেড়াই নোঙরহীন নৌকার ছৈ হয়ে। আর তুমি, জৌলুসের অহংকারে পেরিয়ে যাও সাফল্যের এক একটা সিঁড়িধাপ।

তুমি বলবে, এসব ন্যাকামি। ব্যর্থ মানুষের স্মৃতিবিলাস! হবেওবা। পিছিয়ে পড়া এ ভাবনা-বিকেল তোমার চর্চিত চোখের স্বপ্ন-কাজল আর হতে পারল কই! তাই তো আমাকে দেখে বিরক্তির কুঞ্চন জাগায় তোমার ড্রেসিং-টেবিলের আহ্লাদ। মুখ ফিরিয়ে নেয় পারফিউম-ফেয়ারনেশরা। ঠিক এই সময় হয়তো কোনও মলের শোভা বাড়াচ্ছে তোমার গালের টোল। আর আমার বারান্দাজুড়ে বাঘবন্দির ঘর কাটছে হাওয়াহীন গুমোট।

জানো, তবু আমি ভাবি। ভাবি একটা জীবন– মানে তো গোটা একটা নদী। সময় মানে ক্ষয়ে যাওয়া পার। সেই যে কোন ছেলেবেলায় আমার গলায় সুর বসিয়েছিল না জানি কোন গো-রাখালের বাঁশি, বয়ঃসন্দির চঞ্চলতা থিতিয়ে রেখেছিল বসন্ত-বৈরাগীর কুহুডাক! তাই আজও পিছনে টেনে রাখে আমাকে। হ্যাঁ, শুধুই পিছনে। আর তার টানেই আমি পিছিয়ে পড়া বেদনা- যদুঘরের বিষাদ মাখি নিজেরই আঁজলা ভরে।

জানো, তবু আমার কোনও ক্ষোভ নেই। জানো, তুমি যাকে বিকেল ভাবছো, আমার কাছে আসলে তা আরেকটা বাঁচার প্রস্তুতি। জানো, সব বাঁচারই এক একটা মুহূর্ত থাকে। মুহূর্তেরও থাকে এক একটা পরত। সেই পরত খুলে খুলে আমি ঢুকে যাই অচিন দেশে। না, রাক্ষস-খোক্কস নয়। রাজপুত্র-কোটাল পুত্রও নয়। ওই পরতের খাঁজে খাঁজেই আমার জন্য সাজানো থাকে খুদ গন্ধের কুহক। এমন গন্ধই তো মায়ের আঁচলে পেতাম সেই কোন ছেলেবেলায়। এমন কুহকই তো আমার মা’কে আমার কাছে করে তুলত আলাদিনের প্রদীপ। একদিনের ঘটনা তোমায় বলি শোনো, সেদিন ছিল এমনিই হিমশুরুর শরত। সবে আঁধার নেমেছে আমাদের চালা ঘরের খিড়কী দ্বারে। ঢুকি ঢুকি করেও যেন সাহস পাচ্ছে না গণ্ডী পেরুতে। আমিও আহাঁটু ধুলো নিয়ে অপেক্ষায়। সারা দুপুর বাবুদের কুলিতে ঘুরেছি। নাক পেতে টেনেছি ভিয়েনের গন্ধ। দুপুর গড়িয়ে বিকেল, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেছে তাদেরই সব ছঁচকোলে। তবু কারো মন গড়ায়নি এই খুদে ছেলেটার পানে। শেষমেশ আমাদের খিড়কী। ঢুকি ঢুকি করেও পা’জোড়া আড়ষ্ট। হঠাৎ সেখানে মা। খুলে দিল হাতের মুঠো। অবাক হয়ে দেখলাম, যে গন্ধের লোভ আমাকে ঘুরিয়েছে পথে পথে তারই স্বাদ জেগে রয়েছে আমার মায়ের খোলা হাততালুতে। সেদিন থেকেই বুঝলাম, মা আসলে এক নদীর ডাকনাম।

আজও নদী বয়। কিন্তু বড়ো শঙ্কা তার মনে। আজও মা হয়। কিন্তু বড়ো সময়াভাব তার হাতে। সময় মানে তো ক্ষয়ে যাওয়া পার আর জীবন মানে একটা গোটা নদী। আমার মায়ের ডাকনাম।

ফেসবুক মন্তব্য